উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও বাস্তবতা
Advertisement
এ কে এম শাহনাওয়াজ
প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
উচ্চশিক্ষা। প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়েই হতাশা প্রকাশ করছি আমরা। শুধু উচ্চশিক্ষা কেন, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং অতঃপর এমফিল, পিএইচডির মতো উচ্চতর গবেষণা, সব ব্যাপারেই আমাদের নানা মহলের অস্বস্তি রয়েছে। সরল চোখে বাস্তবতার উঠোনে দাঁড়িয়ে হতাশ হওয়ার পেছনে প্রামাণ্য তথ্যও দেয়া যাবে।
তবে আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রকৃত সংকট নির্দেশ করে যদি সমালোচনা বা হতাশা ব্যক্ত করি এবং সংকটের কারণ অনুধাবন করি তাহলে এর প্রতিবিধানের পথ পাওয়া সহজ; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ ছাড়া খণ্ডিত সত্যে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে হালকা সমালোচনা করে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়, অন্যদিকে দেশবাসীর সামনে ছড়িয়ে দেয়া হয় নেতিবাচক ধারণা।
বেশকিছু দিন আগে বর্তমান সরকারের একজন সুশিক্ষিত মন্ত্রী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করা এমফিল, পিএইচডি থিসিসের মান নিয়ে ঢালাওভাবে নেতিবাচক সমালোচনা করলেন। আমি জানি না ক’বছর ধরে তিনি কোন রিভিউ সেলে শত শত থিসিস মূল্যায়ন করে এ সিদ্ধান্তে এসেছেন।
কারণ আমরা দেখছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানসম্মত থিসিস করার কারণে অনেক গবেষক উচ্চতর গবেষণার জন্য বিশ্বের নামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সম্প্রতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করা থিসিস বই হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতের একটি স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে সম্মাননা পেয়েছে।
এ ধারার সাধারণীকরণের মন্তব্য আমাদের হতাশ করে বৈকি! অবশ্য কোনো কোনো থিসিসের মান ও বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। মানতে হবে বিশ্বের কোথাও সব গবেষণাই উচ্চমানসম্মত হয় এমন দাবি কেউ করে না।
সবচেয়ে বড় কথা, নেতিবাচক সমালোচনার আগে এ সত্যটি সামনে আসতে হবে যে, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার জন্য যে পরিবেশ ও প্রণোদনা প্রয়োজন তার সামান্য সংস্থানও এ দেশে রাষ্ট্র করতে পারছে কিনা।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নামে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও এর আর্থিক সংস্থান ইউজিসির মাধ্যমে রাষ্ট্রই করে থাকে। তাই প্রশ্ন আসে শিক্ষা-গবেষণার মানোন্নয়নে সরকার কি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়?
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু একাডেমিক কারিকুলাম আর পাঠদানের ওপর নির্ভর করে না। এ ভুবনে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির দায়িত্ব পালন করতে হয়। বায়বীয়ভাবে জ্ঞান সৃষ্টি করা যায় না। এজন্য শিক্ষক-গবেষকদের আর্থিকসহ গবেষণা সহায়ক নানা রকম সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।
এর সংস্থানও প্রধানত রাষ্ট্রই করে থাকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণার পথ কুসুমাস্তীর্ণ থাকে না। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক হবে। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সবাই এমন সংকট অনুভব করেন।
গত ২১ ও ২২ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন মহোদয়ের নেতৃত্বে একটি সফল আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়ে গেল। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিশ্বের ৯টি দেশ থেকে বিদগ্ধ গবেষকরা এসেছিলেন। ১৩০টির মতো প্রবন্ধ পঠিত হয় দু’দিনের সম্মেলনে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক দীনতার কথা জানি।
তাই ডিন অধ্যাপক ফজলুল হকের কাছ থেকে জানতে চাইলাম এত বড় আয়োজন কী করে সম্পন্ন করতে পারলেন। জানলাম তাদের যে পরিকল্পনা ছিল এবং সে মতো যে বাজেট করেছিলেন এর অনেকটাই অর্জিত হয়নি। একপর্যায়ে সম্মেলন বাতিলের চিন্তাও করতে হয়েছিল। বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান দেয়ার সক্ষমতা খুবই কম। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আশ্বস্ত করেছিলেন ব্যয় সংস্থান তারা করে দেবেন। তাদের চরিত্র মতোই গাছে উঠিয়ে শেষে মই সরিয়ে নিয়েছিলেন। সরকারি অনুদান যৎসামান্য। শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন ডিন মহোদয় ও তার সহকর্মীরা।
নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে হলেও তারা সম্মেলন করবেন। আমন্ত্রিত সারা দেশের শিক্ষক-গবেষকদের কাছে ক্ষমা চেয়েই জানালেন তারা যানবাহনের কোনো খরচ দিতে পারবেন না।
উপরন্তু ডেলিগেটরা ১০০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে আয়োজকদের সহযোগিতা করেন।। এ বাস্তবতা আমাদের শিক্ষকদের কাছে নতুন নয়। তাই সবাই সানন্দেই পকেটের পয়সা খরচ করে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার টানে রাজশাহীতে গিয়েছিলেন।
এসব বাস্তবতার কারণে গবেষণার দ্বার উন্মোচন করা এ দেশে খুব কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণার মান নিয়ে যখন সরকারি নীতিনির্ধারকরা প্রশ্ন তোলেন তখন বলতে ইচ্ছে করে অল্প তেলে কীভাবে আপনারা প্রতিদিন মচমচে ভাজা খেতে চান? গত ২৬ ডিসেম্বরের যুগান্তর পত্রিকা প্রথম পাতায় একটি রিপোর্ট ছেপেছে।
শিরোনাম- ‘পুকুর খনন দেখতে ১৬ কর্মকর্তা, ব্যয় হবে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।’ বিদেশ ভ্রমণের এসব শিরোনামে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এমন নানা হাস্যকর কাজে প্রায়ই এ দেশে সরকারি টাকার হরিলুট হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়।
আমরা অসহায়ের মতো কেবল আফসোস করতে পারি, আর হিসাব কষি আহা, এই বরাদ্দে দেশের অন্তত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় চারটি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলন করতে পারত। শুনতে ভালো লাগত, দেশের এসব সুশিক্ষিত মন্ত্রীরা যদি কখনও বলতেন আমলাদের পেছনে এসব অপচয় না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেই।
আর এ কাজটি করলে ইউজিসির মাধ্যমে সরকারের মনিটরিং করার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হতো। দেখুন না, মানসম্মত গবেষণা করার মেধা রাখে কিনা এ দেশের গবেষকরা।
মানসম্মত গবেষণা হচ্ছে না দেখলেন; কিন্তু প্রতিবন্ধকতাগুলো তো বিচার করলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি করতে আসা সরকারি কলেজ শিক্ষকরা অনেক যুদ্ধ করেই গবেষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি পাওয়া অনেক হাঙ্গামার বিষয়।
বারবার ছুটতে হয় শিক্ষা অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ে, যেন কোনো অপকর্ম করতে চাচ্ছেন তারা। সামান্য গুটিকয়েক গবেষক হয়তো ইউজিসির বৃত্তি পান। অধিকাংশই পকেটের পয়সা খরচ করে গবেষণা করেন। বাংলাদেশের নানা প্রান্তের কলেজে এসব শিক্ষক পড়ান। পকেটের পয়সা খরচ করে তত্ত্বাবধায়কের কাছে আসেন।
ছুটিছাটা নিয়েও নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। অর্থ ও ছুটির অভাবে সবসময় তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরি, আর্কাইভ এবং অন্তত প্রতিবেশী দেশের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করতে পারেন না। এরপরও তারা তাদের শ্রম ও মেধা দিয়ে যা করেন, একেও আমরা কম বলতে পারি না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শিক্ষকদেরও ভোগান্তি কম নয়। গবেষণা করা যেন এদের অপরাধ। শত উদাহরণ থেকে সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আমার তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণা করছেন। তিনি গবেষণা করছেন মধ্যযুগের বাংলার স্থাপত্যে পাথরের অলঙ্করণ শৈলী নিয়ে।
নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই গবেষণা করছেন। ফিল্ডওয়ার্কে তাকে বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রত্নস্থল, জাদুঘর ও লাইব্রেরিতে একাধিকবার যেতে হয়েছে। শেষ বেলায় এসে বিপদে পড়েছেন। আমাদের জাতীয় জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর নিয়ন্ত্রিত জাদুঘরগুলোতে ব্রিটিশ যুগের একটি নিয়ম চালু আছে।
এখানে ডিজিটাল বাংলাদেশ অচল। জাদুঘর পরিদর্শনে গেলে প্রথমেই জানিয়ে দেয়া হয় ছবি তোলা যাবে না। এতে কী ক্ষতি হবে তারা অবশ্য বলতে পারেন না। ভারতসহ অল্প কয়েকটি দেশ বাদে আমার জানামতে সারা দুনিয়ায় জাদুঘরের প্রদর্শিত প্রত্নবস্তু ছবি তোলার জন্য উন্মুক্ত থাকে।
বিশ্ববিখ্যাত প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আমি প্রাণভরে ছবি তুলেছি। গবেষকদের জন্য তো এরা উন্মুক্ত করে দেয় প্রদর্শিত ও অপ্রদর্শিত ভাণ্ডার।
এখন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার গবেষক ছাত্র বারবার প্রতিহত হচ্ছেন জাদুঘর কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতায়। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, আমাদের জাদুঘরগুলোতে, বিশেষ করে জাতীয় জাদুঘরে যা প্রদর্শিত থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্নবস্তু গুদামজাত আছে।
একজন গবেষক তো এসব পরীক্ষা করেই মূল্যায়ন করবেন। যেখানে প্রদর্শিত প্রত্নবস্তুর ছবি তোলাই নিষেধ, সেখানে বাকি সব দেখারই অধিকার রাখেন না। আর এসব না বিশ্লেষণ করতে পারলে গবেষণা পূর্ণতা পাবে কেমন করে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে চিঠি দিলাম সহযোগিতা করার জন্য।
আমাদের এ ধরনের চিঠি নিয়ে অনেক গবেষক ইউরোপ-আমেরিকায় গবেষণার অবাধ সুযোগ পেয়ে যান; কিন্তু এ দেশে সম্ভব নয়। আমার চিঠি পাওয়ার পর জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সামান্য দয়া হয়েছে। তারা প্রত্নবস্তু দেখতে দেবেন না; কিন্তু কিছু ছবি পয়সার বিনিময়ে বিক্রি করতে পারবেন।
এর আর্থিক মূল্যও নিতান্ত কম নয়; কিন্তু এসব বিধায়কের কী করে বোঝাই ছবি দেখে গবেষণা হয় না। গবেষক নানা দিক থেকে প্রত্নবস্তুর বিশ্লেষণ করবেন। নানা এঙ্গেলে ছবি তুলবেন। আমার গবেষক ছাত্র সব চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
তাহলে বলুন, এসব প্রতিবন্ধকতার মুখে দাঁড়িয়ে একজন গবেষক কীভাবে গবেষণায় কাঙ্ক্ষিত মান উপস্থাপন করতে পারবেন। এ ধারার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমাদের হতে হয়।
দু’মাস আগে ইংল্যান্ডে কিছুদিন ছিলাম। এ সময় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ডারহামে একজন অধ্যাপক বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, তোমাদের দেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য শিক্ষকদের চেয়ে ব্যুরোক্রাটরা বেশি অসে। অন্য সব দেশে এ প্রবণতা খুব কম।
আমি বললাম- দেখ, ইংল্যান্ডে পড়তে এলে এখন ফান্ড পাওয়া কঠিন। শিক্ষকরা নিজ দেশে সরকারের কাছ থেকে তেমন আর্থিক সহযোগিতা পান না। কিন্তু সরকারি আমলাদের ক্ষেত্রে নানা রকম ফান্ড আছে। তাই ওরা আসতে পারে। অধ্যাপকের পরবর্তী প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল না।
তিনি বললেন, সুযোগ তো বেশি পাওয়ার কথা শিক্ষকদের। তারা তাদের গবেষণার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেবেন ছাত্র ও গবেষকদের কাছে। আর সরকারি কর্মকর্তার সেই সুযোগ কম। তারা নানা দফতরে কাজ করবেন। সেখানে তাদের গবেষণার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ অনেক কম।
এসব সত্য আমরা তলিয়ে দেখি না বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে নিত্য মুখরোচক বিবৃতি দেই। এ কথা তো সত্য, এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাঙ্ক্ষিত মান ধরে রাখতে পারছে না; কিন্তু এর পেছনের কারণগুলো সবসময় বিবেচনায় আনি না।
আমি আমার শিক্ষক জীবনের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। আজ অভিজ্ঞতা থেকে দায়িত্ব নিয়ে বলব, রাজনৈতিক আছরমুক্ত রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-গবেষণার পরিবেশ যদি ফিরে পাওয়া যায়, শিক্ষা গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেয়া হয়, তাহলে অবশ্যই বিশ্বমানের গবেষণা এ দেশে থেকেই করা সম্ভব।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
