Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দেশ-বিদেশের বিত্তবান বনাম আমাদের প্রশান্ত

Advertisement

Icon

মুঈদ রহমান

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশ-বিদেশের বিত্তবান বনাম আমাদের প্রশান্ত

Advertisement

পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যক্তিমালিকানার অনুমোদন ও সুযোগ রয়েছে। যে কোনো ব্যক্তি তার উদ্ভাবনী শক্তি, কর্মদক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার ওপর ভর করে অর্থবিত্তের মালিক হতে পারেন। বিত্তবান হওয়ার স্বল্প ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সহযোগিতা থাকে; তবে চূড়ান্ত অর্থে ব্যক্তি ও তার ওয়ারিশদের মধ্যেই ভোগাধিকার সীমাবদ্ধ থাকে। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন এই বলে যে, বিত্তবৈভবের মালিকানা সৃষ্টিতে লাখো মানুষের শোষণের বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। আমি এর সঙ্গে ষোলো আনা একমত।

কিন্তু শোষণ যত অমানবিকই হোক, যত চরম মাত্রায়ই হোক- পুঁজিবাদ তা নিঃসংকোচে সমর্থন করে এবং উৎসাহ জোগায়। অর্জিত অর্থের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ কর হিসেবে সরকারকে দিলেই খুশি। তখন সরকারই তার জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ সুবিধারও ব্যবস্থা করে দিতে বদ্ধপরিকর থাকে।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির বাস আমেরিকায়। জেফ বেজোজ নামের ৫৬ বছর বয়সী এ ভদ্রলোক অনলাইন শপিং অ্যামাজনের চেয়ারম্যান, সিইও। তার মোট সম্পদের মূল্য ১৩১ বিলিয়ন ডলার। আমরা যদি এক ডলার সমান ৮৪.৭০ টাকা ধরি, তাহলে বাংলাদেশি মুদ্রায় তার পরিমাণ হবে ১১ লাখ ৯ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এ পরিমাণ টাকা আমাদের চলতি বাজেটের দ্বিগুণেরও বেশি।

ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হলেন বার্নাড আরনাল্ট। ৭০ বছর বয়সী ফ্রান্সের এ অধিবাসী ১০৭.৫ বিলিয়ন ডলারের (৯ লাখ ১০ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা) মালিক। বিলাসদ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এলভিএমএইচের চেয়ারম্যান তিনি। বাংলাদেশের একজন সাধারণ মানুষ যেখানে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করতেই অক্ষম, সেখানে তাদের কাছে বিলাসদ্রব্যের রমরমা ব্যবসা অবাক করে দেয়ার মতো।

৬২ বছর বয়সী ভারতের মুকেশ আম্বানি এশিয়ার সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান তিনি। এ ভদ্রলোকের সম্পত্তির পরিমাণ ৬০.৮ বিলিয়ন ডলার (৫ লাখ ১৪ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা)। এ অর্থের পরিমাণ আমাদের মোট বাজেট ছুঁইছুঁই।

ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত এশিয়ান ওয়ার্ল্ড পত্রিকার তথ্যমতে, বাংলাদেশের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় সবচেয়ে ওপরে আছেন ৭৪ বছর বয়সী মুসা বিন শমশের। তিন ইমিগ্রেশন ব্যবসায়ী এবং ডিএটিসিও গ্র“পের চেয়ারম্যান ও সিইও। পরিসংখ্যান বলে, তার সম্পত্তির পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ডলার (১২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা)।

পরিসংখ্যানের বিচারে আমেরিকার জেফ বেজোজের সম্পদের তুলনায় আমাদের মুসা বিন শমশেরের সম্পদ সামান্যই মনে হতে পারে। তবে এ কথাও মাথায় রাখতে হবে যে, আমেরিকার জিডিপির আকার হল ২১ হাজার ৪৩৯ বিলিয়ন ডলার, আর আমাদের হল মাত্র ৩১৭ বিলিয়ন ডলার। আয়তনের দিক থেকে আমাদের চেয়ে আমেরিকার জিডিপি প্রায় ৭০ গুণ বড়।

বিত্তবানদের এ সাতকাহনে আপনি বিস্মিত হতে পারেন। সারা বিশ্বে যখন লাখ লাখ মানুষ ক্ষুধা-দারিদ্র্যক্লিষ্ট তখন একই বিশ্বে এমনতর ধনবানরা কতটা শোভনীয়? এ প্রশ্ন অনেকটা নৈতিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, পুঁজিবাদী অর্থনীতির ধর্মই হল নৈতিকতার চেয়ে আইনগত বৈধতা। এ ধরনের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় অনেক অনৈতিক কাজকেও আইনগত অুমোদন দেয়া হয়। সে অর্থে আমার, আপনার ভালো লাগুক আর নাই লাগুক, উল্লিখিত ধনবানরা রাষ্ট্রের দ্বারা, সরকার দ্বারা, সমাজ দ্বারা এবং আইন দ্বারা সর্বস্বীকৃত ও সুরক্ষিত।

কিন্তু আপনি অবাক হতে পারেন এ কথা জেনে যে, বাংলাদেশে অনেক পুঁজিবাদী আইন দ্বারা অনুমোদিত নয় এবং সেসব অবৈধ বিত্তশালী নাকের ডগায় বেড়ে উঠেছেন। তাদেরই একজন হলেন প্রশান্ত কুমার হালদার। এই ভদ্রলোক অবৈধভাবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। একেবারে যেন রূপকথার গল্প! এ ৫ হাজার কোটি টাকার ভেতর সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যেই দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন। বাদবাকি দেড় হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আছে। কক্সবাজারে তারকা হোটেলে বিনিয়োগ করেছেন কয়েকশ’ কোটি টাকা, ভালুকায় কুমিরের ফার্মে বিনিয়োগ আছে ৩০০ কোটি টাকা, ফার্মগেটে ৪০০ কোটি টাকার জমি রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে ৩০০ একর জমি কিনেছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। নর্দান জুট মিলসের শেয়ার কিনেছেন ৫ লাখ। ৫০০ টাকার প্রতিটি শেয়ার হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ কোটি টাকা। নিজের স্ত্রীর নামে, মায়ের নামে, আত্মীয়স্বজনের নামে গচ্ছিত রেখেছেন শত শত কোটি টাকা। কিন্তু প্রশান্ত হালদারের এ পর্যন্ত বৈধ আয়ের পরিমাণ ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। জীবনযাপনের জন্য খরচাপাতি বাদ দিলে ১ কোটি টাকাও সঞ্চিত থাকার কথা নয়।

সেই প্রশান্ত হালদার কী করে ৫ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেলেন? ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশান্ত কুমার হালদার ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, প্রশান্ত কুমার হালদারের নিজস্ব হিসাবে ২৪০ কোটি টাকা এবং তার মা লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা।

অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, এসব হিসাবে এখন জমা আছে ১০ কোটি টাকারও কম। অর্থাৎ তাদের এসব অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রশান্ত কুমার হালদার ইন্টারন্যাশনাল লিজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকেই ২০০০ কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন (যুগান্তর, ২৮.০১.২০২০)।

আমরা সত্যিই বিস্মিত! এ প্রশান্ত কুমার হালদার একদিনে গড়ে ওঠেননি এবং এককভাবেও গড়ে ওঠেননি। সাধারণত প্রভাবশালী কারও সহযোগিতা না পেলে প্রশান্তরা দিনে দিনে বেড়ে উঠতে পারে না। প্রশান্ত কুমার হালদারের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে হাজার হাজার মানুষ পথে বসে গেছে। কী করে ফেরত পাবেন তাদের অর্থ?

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেছেন, ‘এখানে দুটি বিষয়। প্রথমত, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনা। দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা সব সময়ই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়। এর সঙ্গে অনেক শক্তি জড়িত থাকে। ফলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। দ্বিতীয়ত, আগে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন ছিল। বর্তমানে কিছুটা সহজ হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক আইন হয়েছে। এসব আইন-কানুনের প্রয়োগ হতে দেখা যায়নি। পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে একত্রে কাজ করতে হবে।’

আমরা মনে করি, অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত এক যুগে আওয়ামী লীগের অর্জন কম নয়। কিন্তু সব অর্জনকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে দুর্নীতি। গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা সরকার নিতে পারেনি। হয় সদিচ্ছার অভাবে, নয়তো দক্ষতার অভাবে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আমরা এ দুটির কোনোটিই আশা করতে পারি না। সরকারের ওপর মহল থেকে এখনও বিএনপির শাসনামলের ত্র“টি-বিচ্যুতির কথা বলেই সান্ত্বনার ঢেঁকুর তোলা হয়।

এক যুগ আগের বিএনপির সঙ্গে তুলনা করাটা অনেকখানিই অসম। ২০১৯ সালের আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ২০২০ সালের আওয়ামী লীগকে তুলনা করতে হবে। তা না হলে তর্ক অনেক দূর এগোবে। আপনি যদি বলেন, ২০০৬ সালে, বিএনপির আমলে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৭ শতাংশ, আর ২০১৯ সালে তা হয়েছে ৮.১ শতাংশ; তাহলে বিএনপির একজনও বলতে পারেন, ১৯৭৩ সালে তা ছিল ৩.৩ শতাংশ।

আবার যদি বলেন, মাথাপিছু আয় বর্তমান সময়ে ১৯০৬ ডলার, যা ২০০৭ সালে ছিল ৫৪২ ডলার; সেক্ষেত্রেও বিএনপির একজন বলে ফেলতে পারেন, ১৯৭৪ সালে তা ছিল মাত্র ১৮২ ডলার। সুতরাং দুই সরকারের মাঝে যদি দীর্ঘ সময়ের ফারাক থাকে তাহলে তুলনা করলে তা হয়ে দাঁড়ায় ‘অসম তুলনা’। আমরা এমন তুলনা আর শুনতে চাই না। আমরা চাই জনগণের অর্থ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। আর এমন প্রশান্ত কুমার হালদার কাদের দ্বারা সৃষ্টি ও প্রতিপালিত হচ্ছে তার একটা পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

বিত্তবান

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

অন্যমত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম