অন্যমত
ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে
Advertisement
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের অর্থনীতি এক দশক ধরে একটা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ২০১৭-১৮ সাল থেকেই অর্থনীতি নিম্নমুখী হতে শুরু করে। এরপর শুরু হলো করোনা মহামারি। ২০২০ সালে শুরু হওয়া করোনা মহামারি আমাদের অর্থনীতিকে আরও অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়, বিশেষ করে ২০২২-২৩ সালের দিকে আমাদের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপের দিকে গেছে। এ সময় খুব জোরে অর্থনীতির নিম্নমুখী প্রবাহ শুরু হয়। এ অবস্থা চলতে চলতে একটা পর্যায়ে আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যেটা আগে ৪৫ বিলিয়ন ডলারে ছিল। অর্থনীতির কতটা খারাপ অবস্থা থাকলে ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, তা সহজেই অনুমেয়। দেশের অর্থনীতির এ অবস্থা দেখে পাওনাদাররা আমাদের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আদানি ও শেভরন এবং আরও বেশকিছু পাওনাদার তাদের পাওনা অর্থের জন্য ভীষণভাবে তাগাদা দিতে থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শেভরনের ডেলিগেটসরা পর্যন্ত আমাদের দেশে চলে আসে তাদের পাওনা টাকা বুঝে নেওয়ার জন্য। তারা রীতিমতো প্রশ্ন করতে থাকে, শেভরনের টাকা কেন দেওয়া হচ্ছে না ইত্যাদি। অপরদিকে আদানিও তাদের পাওনা টাকা পরিশোধ না করলে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল। বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর ফরেন এক্সচেঞ্জ টিকিটের পাওনাগুলো বাকি ছিল। এদের অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব দেনা ও দায়ের অর্থগুলো পরিশোধ করে। ওই সময় সবকিছু মিলিয়ে এ বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে কয়েক বিলিয়ন ডলার। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোক্তাদের উদ্যমহীনতা লক্ষ করা গেছে এবং সুদের হার এত বেশি ছিল যে, কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে তেমন কোনো বিনিয়োগের মাত্রা যোগ হয়নি। অবশ্য এসব নিয়ে নয়ছয়ও হয়েছে। বাজারকে অস্বীকার করেই এ নয়ছয় করা হয়েছে। কিন্তু এসব কোনোকিছুই বিনিয়োগ বাড়াতে শেষ পর্যন্ত কাজে দেয়নি। আসলে মার্কেটকে কখনো অস্বীকার করতে নেই। কারণ এতে হীতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে।
নানাবিধ কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল। এর পাশাপাশি আমাদের এক্সচেঞ্জ রেটের ওপর ভীষণ একটা চাপ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকার এক্সচেঞ্জ রেটের ওপর চাপের এ বিষয়টিকে প্রকাশ্যে স্বীকার করছিল না। এই স্বীকার না করার পেছনে কারণ ছিল সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার বিষয়টি। যাই হোক, বাজারের চাপের কারণে আমাদের এক্সচেঞ্জ রেট কখনো ৮৫ টাকা পার ডলার, আবার কখনো বেড়ে ৯১-৯২ পার ডলার ইত্যাদি হতে শুরু করে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ছিল। এ সবকিছু মিলিয়ে এক্সচেঞ্জ রেটের ওপর একটা চাপ যাচ্ছিল এবং এর সঙ্গে ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভও কমছিল। পণ্য আমদানিতে বিদেশিরা আমাদের এলসি নিচ্ছিল না, যার ফলে তৎকালীন সরকার বর্ধিত হারে ঋণ করছিল। সরকার শুধু বিদেশ থেকেই ঋণ করছিল তা নয়, আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেও বেশি হারে ঋণ করছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রাইভেট ব্যাংকগুলো থেকে সরকার প্রচুর ঋণ করার কারণে ব্যাংকগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। এ ধারা অব্যাহত থেকেছে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে। ফলে দেশে ঋণের বোঝা এতটাই বেড়ে যায় যে, এটাকে সামাল দেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ঋণের এ ধারাবাহিকতা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অব্যাহত ছিল। এটা বন্ধ করা যায়নি। কারণ, বিরাট আকারে সরকারি ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারের হাতে থাকা রাজস্বের আয় দিয়ে আর কুলাচ্ছিল না। অবশ্য রাজস্বের আয় দিয়ে সরকারের খরচ সামলানো আগেও সম্ভব হতো না। তবে আগে সম্ভব না হলেও ঋণের প্রবাহ এতটা ছিল না। ঋণের প্রবাহ একটা লিমিটের মধ্যে ছিল। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা এতটাই বাড়ল যে, শেষ পর্যন্ত উচ্চ সুদেও ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে। এ ঋণের প্রবাহ বর্তমান সরকারের আমলেও অব্যাহত আছে, মানে উচ্চ সুদ দিয়ে হলেও বর্তমান সরকারকেও ঋণ নিতে হচ্ছে। এখন অধিক হারে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাই আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বিশাল অঙ্কের ঋণের সুদ কড়ায়-গণ্ডায় আমাদের পরিশোধ করতে হচ্ছে। রাজস্ব থেকে আয়ের বেশিরভাগ টাকাই চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে। পাবলিক এক্সপেন্ডিচার বেড়েছে, সেই পাবলিক এক্সপেন্ডিচারকে মিট করার জন্যও সরকারকে ঋণ করতে হচ্ছে। অথচ আমাদের এডিপি তেমন একটা বাড়েনি সাইজে। যেটুকু বেড়েছে তা পাবলিক এক্সপেন্ডিচার থেকে, মানে সরকারি পরিচালনা ব্যয় থেকে ওই রেশিওতে বাড়েনি। এডিপি বৃদ্ধির এ রেশিওটা রিভার্স হয়ে গেছে কয়েক বছর আগেই। একসময় আমাদের এডিপির সাইজ বড় ছিল। সরকারের পরিচালনা ব্যয় যেটা হয়, তা এখন এডিপির সাইজের প্রায় আড়াই থেকে তিনগুণ হয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার আরও একটি কারণ রয়েছে, তা হলো প্রাইভেট সেক্টরে ক্রেডিট ডিমান্ড না থাকা। অর্থাৎ প্রাইভেট সেক্টরের অর্থের জন্য যে চাহিদা ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে আসে, তা এখন নেই বললেই চলে। গত ৩-৪ বছর থেকে একই অবস্থা চলছে। ফলে এখন বিনিয়োগ হচ্ছে না। বলতে গেলে বিনিয়োগে খরা যাচ্ছে। জিডিপি গ্রোথ রেটও খুবই নিম্নপর্যায়ে চলে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪.১৪ শতাংশ, যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্কলন অনুযায়ী এটি প্রায় ৩.৬ পার্সেন্ট। আইএমএফ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা করছে। এভাবে আমাদের জিডিপির নিম্নমুখিতা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বড়জোর ৪.৫ শতাংশও যদি থাকে, তাহলে আমাদের জন্য সেটা একটা খুশির কথা থাকবে। কিন্তু তাও হবে বলে মনে হচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে একটা হতাশা কাজ করছে।
সরকার কর্তৃক মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি এখন খাদে পড়ে গেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। কেননা সরকারের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। অতীতের ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে উন্নয়ন অর্থনীতিতে টানাপোড়েন লেগেই আছে। অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করাই এখন সরকারের এক নম্বর খাত। সুতরাং এটা সহজে ম্যানেজ করা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনে যেটা নিয়ে আমরা শঙ্কার মধ্যে আছি তা হচ্ছে, অর্থনীতি লো গ্রোথ রেটে নেমে যাওয়ার প্রবণতা। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৩.৪, ৩.৫, ৩.২ শতাংশে নেমে আসা মানে তো লো গ্রোথ রেটই। এই লো গ্রোথ রেট থেকে যদি উত্তরণ ঘটাতে না পারি, তাহলে অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে সোজা করে দাঁড় করানো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কেননা লো গ্রোথ রেটে মূল্যস্ফীতি হতে থাকবে। কোনো কোনো দেশের অর্থনীতিতে অতীতে এমনও ঘটেছে যে, লো গ্রোথ রেটে হাই ইনফ্লেশান হয়েছে। মানে প্রবৃদ্ধি নেই, শুধু মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। এমনটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হতে পারে, যদি আমরা কিছু কাজ শক্ত হাতে পালন করতে না পারি।
আমি আগেই উল্লেখ করেছি, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। আমাদের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টেও একইরকম তথ্য আসছে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। আমরা যা চিন্তা করছি, তার চেয়েও বেশি খারাপ। দেশে বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান বাড়ছে না। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে শিল্প উদ্যোগ হচ্ছে না, ফলে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। বাড়ছে না সরকারের রাজস্ব আয়। তিন বছর আগে থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা শুধু বাড়ছেই। আবার ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ করতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থনীতির জন্য এটি অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এ অবস্থায় সরকারকে বেশ কয়েকটি শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বিনিয়োগের জন্য সুদহার কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কোম্পানিগুলো হয় অকশনে দিতে হবে, না হয় শেয়ারবাজারে ছাড়তে হবে। তৃতীয়ত, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মতো ঢাকা বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্বও বিদেশি কোম্পানিকে দিতে হবে। এর বাইরে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সুযোগ নেই। এজন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। আমরা আশা করব, সরকার বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে যোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে সোজা করে দাঁড় করাবে।
আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি
অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার
