Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রংপুরের আলুচাষিদের দরকার বাজার, সহানুভূতি নয়

Advertisement

Icon

ড. সাবরিনা লুৎফা

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

গত ৮ অক্টোবর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, রংপুরের আলুচাষিরা আবারও লোকসানে আলু বিক্রি করছেন। সরকার হিমাগারের ফটকে আলুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতি কেজি ২২ টাকা। অথচ সেই একই ফটকে কৃষক পাচ্ছেন গড়ে ১২ টাকা। এক কেজি আলু উৎপাদন, পরিবহণ ও হিমাগারে সংরক্ষণে কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় ২৪ টাকা। অর্থাৎ যে কৃষক ভালো ফলন তুলেছেন, হিমাগারের ভাড়া দিয়েছেন, ভালো দামের আশায় অপেক্ষা করেছেন, তিনিও প্রতি কেজিতে প্রায় ১২ টাকা লোকসান গুনছেন।

২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের মধ্যে সাত বছরেই লোকসান দিয়েছেন রংপুরের আলুচাষিরা। এসব চাষির প্রত্যেকের রয়েছে পরিবার, যারা বীজ, সার আর হিমাগারের ভাড়ার জন্য ঋণ নিয়েছেন। তারপর দেখেছেন, যে ফসল দিয়ে ঋণ শোধ করার কথা, সেটিই বিক্রি হচ্ছে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে। গত বছরও একই মাঠ থেকে একই ছবি এসেছিল; রাস্তায় ফেলে দেওয়া আলু, আর ন্যায্য দামে কেউ আলু কিনছে না বলে পাশে শুয়ে কাঁদছেন কৃষক। এখন আলুচাষি সমিতির নেতারাও প্রকাশ্যে বলছেন, তারা আলু চাষ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

সমস্যা ফলনে নয়, সমস্যা বাজার ব্যবস্থাপনায় : দেশের মোট আলুর প্রায় এক-চতুর্থাংশ উৎপাদিত হয় রংপুরে, অথচ সেখানকার হিমাগারগুলোয় রাখা যায় উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশের মতো। বাকি আলুর ভালো দামের অপেক্ষায় থাকার কোনো জায়গা নেই। মাঠপর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা সমস্যাটি ঠিকই চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম বলেছেন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি জোরদার করা না হলে কৃষক ধীরে ধীরে আলুচাষ থেকে সরে যেতে পারেন। রংপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও একই কথা বলছে : আলুভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি না বাড়ালে এ সংকট কাটবে না।

সমস্যা হলো চারটি বিষয়-সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার ও রপ্তানি আলাদা আলাদা মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বেসরকারি মালিকের হাতে। এদের কেউই কৃষকের কাছে জবাবদিহি করে না। কৃষকের ফসল খাবারের থালায় পৌঁছানোর আগে ফড়িয়া, হিমাগারের এজেন্ট, পাইকারসহ অনেক হাত ঘোরে। প্রতিটি স্তর নিজের ভাগ রেখে দেয়; কৃষকের হাতে থাকে সামান্যই, আর ভোক্তাকেও দিতে হয় বেশি দাম।

এ কারণেই শুধু দাম বেঁধে দিয়ে কাজ হয় না। ঢাকা থেকে ঘোষিত দাম হিমাগারের ফটকে কার্যকর করার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে তা শুধু একটি ঘোষণাই থেকে যায়। এ বছর এ দুইয়ের ফারাক কেজি প্রতি ১০ টাকা।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু যারা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, তাদের কী মূল্য দিতে হয়, সে প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি।

কৃষকের মালিকানায় একটি প্ল্যাটফর্ম : ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক লেখায় আমি একটি ‘বৃত্তাকার কৃষি উদ্ভাবনী প্ল্যাটফর্ম’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এরপর সেটিকে আরও বিস্তৃত একটি নকশায় রূপ দিয়েছি, যার নাম ‘অ্যাগ্রো-ইনোভেশন অ্যান্ড সার্কুলার হাব’। এর উদ্দেশ্য সহজ-সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারে প্রবেশ ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এক ছাদের নিচে আনা এবং এর নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া।

মডেলটির দুটি পরস্পর সংযুক্ত স্তর আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যা প্রত্যেক কৃষকের কৃষক কার্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এখানে কৃষকরা তাদের ফসলের তথ্য দেবেন, হিমাগার ও পরিবহণ বুক করবেন, ঋণের ব্যবস্থা করবেন এবং কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবেন, স্থানীয় ভোক্তা থেকে রপ্তানিকারক পর্যন্ত।

ভৌত হাব, যার মালিক হবেন কৃষকরা সম্মিলিতভাবে; সমবায় মালিকানা সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত এটি সামাজিক ব্যবসা হিসাবে চলবে। কৃষকরা এখানে বাজারদরে ফসল বিক্রি করতে পারবেন; অথবা সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দূরের বাজারে পাঠানোর জন্য জমা দিতে পারবেন।

অ্যাগ্রো-ইনোভেশন অ্যান্ড সার্কুলার হাবের ধারণাগত নকশা : রংপুরের একজন আলুচাষির জন্য এটি চারটি পরিবর্তন আনবে। হাবে সৌরচালিত হিমাগার থাকায় কৃষককে আর হিমাগারের এজেন্টের বেঁধে দেওয়া দামের ওপর নির্ভর করতে হবে না। টাটকা অবস্থায় বিক্রি না হওয়া উদ্বৃত্ত আলু যাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ লাইনে। তৈরি হবে চিপস, ফ্লেক্স ও স্টার্চের মতো পণ্য, যা মাসের পর মাস টেকে এবং দেশে-বিদেশে দূরের বাজারে পাঠানো যায়। রপ্তানি ডক ও ডিজিটাল ট্রেড ডেস্কের মাধ্যমে কৃষকরা মাঝখানের পাঁচ স্তর ছাড়াই দেশি, বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবেন। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও জৈব সার কারখানা বাজারের বর্জ্যকে জ্বালানি ও জৈব সারে রূপ দেবে, যা কৃষকের কাছে কম দামে বিক্রি করা হবে।

প্ল্যাটফর্মে যুক্ত কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা কোথায় কী চাষ হচ্ছে তা দেখতে পাবেন এবং উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ার আগেই, পরে নয়, কৃষকদের পরামর্শ দিতে পারবেন। হাব চলবে তিন পর্বে : সকালে ফসল গ্রহণ ও বাছাই, দুপুরে অবিক্রীত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, সন্ধ্যায় চালান পাঠানো। এতে কৃষক একটি নিশ্চিত ন্যূনতম দাম পাবেন।

হাবটির জন্য দরকার মাত্র এক থেকে দুই একর জমি। পাঁচ থেকে ছয় হাজার পরিবারের একটি গ্রামেই এর পাইলট করা সম্ভব। এখানে যে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তার বেশির ভাগই বেসরকারি উদ্যোগ, ভর্র্তুকিনির্ভর পদ নয়; তাই প্রকল্প শেষ হলেও এগুলো টিকে থাকবে।

যা বদলাতে হবে

এপ্রিলে সরকার কৃষক কার্ডের প্রি-পাইলট কার্যক্রম চালু করেছে এ প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে, কৃষক সমৃদ্ধ হলেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হবে। প্রতিশ্রুতিটি যথার্থ। কিন্তু একটি কার্ড কৃষককে পরিচয় দেয়, বাজার দেয় না। কৃষক কার্ডের পেছনে দরকার এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে এ পরিচয় রূপ নেবে ন্যায্য দাম, সংরক্ষণ, ঋণ ও ক্রেতায়।

২০২৫ সালে লেখাটি প্রকাশের পর আমি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সাড়া পাইনি। আগস্টে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত উদ্ভাবনী মেলায় মডেলটি উপস্থাপন করেছি। তবু সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আলোচনার জন্য কোনো সভাকক্ষে আমাকে কখনো ডাকা হয়নি, কারণ আমি কৃষিবিদ নই। অথচ রংপুরের কৃষকরা আলু চাষ ভালোই জানেন। তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে বাজার, সংগঠন ও প্রণোদনার ঘাটতি, আর ঠিক এ প্রশ্নগুলো নিয়েই আমার গবেষণা।

নীতিনির্ধারকদের এখনই তিনটি কাজ করতে হবে। আগামী মৌসুমের আলু হিমাগারের ফটকে পৌঁছানোর আগেই একটি উপজেলায় কৃষক কার্ডের সঙ্গে যুক্ত কৃষকের মালিকানাধীন একটি হাবে অর্থায়ন করতে হবে। কৃষি, বাণিজ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষক সংগঠনগুলোকে একক নেতৃত্বের অধীনে আনতে হবে। আর কৃষি আমলাতন্ত্রের বাইরে থেকে আসা প্রস্তাবগুলো যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের জন্য একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

নভেম্বরে আবার আলু রোপণ শুরু হবে। রংপুরের কোথাও কোনো কৃষক হয়তো এ মুহূর্তে ভাবছেন, বীজ আর সারের জন্য আরেকবার ঋণ নেবেন, নাকি হাল ছেড়ে দেবেন। প্রতিবছর আমরা এ খবর পড়ি, ছবিগুলো শেয়ার করি, তারপর ভুলে যাই। আগামী মৌসুমের আগে কিছু না বদলালে আগামী অক্টোবরে আবারও আমরা একই খবর পড়ব। কৃষকরা আমাদের সহানুভূতির চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার যোগ্য। তাদের প্রাপ্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা।

ড. সাবরিনা লুৎফা : সহযোগী অধ্যাপক, ইউল্যাব বিজনেস স্কুল, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

রংপুরের আলুচাষিদের দরকার বাজার, সহানুভূতি নয়

রংপুরের আলুচাষিদের দরকার বাজার, সহানুভূতি নয়

শিক্ষা খাতের গলদ থেকে যে বিস্ফোরণ

শিক্ষা খাতের গলদ থেকে যে বিস্ফোরণ

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম