শিক্ষা খাতের গলদ থেকে যে বিস্ফোরণ
Advertisement
টমাস পিকেটি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোর শাসনামল সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশটির উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন। তরুণরা খুব সাধারণ একটি দাবি জানাচ্ছে-শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের এ আন্দোলন বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ২০১৭ সালের পর থেকে জনপ্রতি শিক্ষাব্যয় বাস্তব অর্থে প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এমন পতন নজিরবিহীন বলেই মনে হয়।
সরকার অনেক সময় এমনভাবে দাবি করে, যেন উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। তাদের হিসাবে ২০১৭ সালে উচ্চশিক্ষার বাজেট ছিল ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো, যা ২০২৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ নামমাত্র বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু এই হিসাবের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২২ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে উচ্চশিক্ষার বাজেট প্রকৃতপক্ষে কমেছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ, সেখানে তা বর্তমানে ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ। বাজেটের এই হিসাব এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে দেখা যায়, জনপ্রতি বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
পরিশ্রম করেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না তরুণরা : এ সংকটের বাস্তব অর্থ হলো, লাখ লাখ তরুণ উচ্চমাধ্যমিকের সনদ অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষায় তাদের স্বাগত জানানোর মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক ধারায় উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও কোর্সের আসন সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর পরিণতিতে অনেক শিক্ষার্থীকে এমন বিশ্ববিদ্যালয় কোর্সে ভর্তি হতে হচ্ছে, যেগুলোতে ইতোমধ্যেই শিক্ষার্থীর চাপ বেশি এবং যেগুলোর ব্যয় তুলনামূলক কম। এসব কোর্সের অনেকগুলোই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে শুধু তরুণদের ব্যক্তিগত সম্ভাবনাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; জাতীয় অর্থনীতিরও অপচয় ঘটছে। একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা, আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে তার প্রতিভার যথাযথ বিকাশ সম্ভব হয় না।
এ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে সমাজ সম্পর্কে একটি বৈষম্যমূলক ও স্তরভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করবে অল্পসংখ্যক অসাধারণ মেধাবী উদ্ভাবক, নেতা ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তির ওপর। আর বাকিদের অপেক্ষা করতে হবে-কখন সেই সমৃদ্ধির সুফল ধীরে ধীরে তাদের কাছে পৌঁছাবে। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়নকে কেবল ক্ষুদ্র একটি অভিজাত গোষ্ঠীর সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা যায় না। সমাজের বৃহত্তর অংশের শিক্ষা, দক্ষতা ও সক্ষমতার বিকাশ ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন।
উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব : উচ্চশিক্ষায় আসনসংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভর্তিব্যবস্থার জটিলতা ও অস্বচ্ছতা। ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য ব্যবহৃত Parcoursup নামের অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আবেদন ও আসন বণ্টন করা হয়। কিন্তু এ ব্যবস্থার অ্যালগরিদম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য। কোন শিক্ষার্থী কেন একটি নির্দিষ্ট কোর্সে সুযোগ পেল, আর অন্য কেউ কেন পেল না-এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া সব সময় সহজ নয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও গবেষকরা বারবার এ ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০১৯ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জঁ-মিশেল ব্লঁকারের সময় চালু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাক্রম সংস্কারের জটিলতা। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাপথ নির্ধারণের জন্য বিষয় নির্বাচন ক্রমেই জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। পাঠ্যসূচি ও সময়সূচির মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়। ফলে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সংকট কেবল আসনের অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পদ্ধতি, শিক্ষাক্রমের কাঠামো এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যও এ সংকটকে গভীর করেছে।
ধনী ও দরিদ্র অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য : ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বেতনবৈষম্য। অর্থনীতিবিদ আসমা বেনহেন্দার ফরাসি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার বেতনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, তুলনামূলক সচ্ছল অঞ্চল এবং দরিদ্র অঞ্চলগুলোর মধ্যে শিক্ষকের অভিজ্ঞতা ও কর্মপরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দরিদ্রতম অঞ্চলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গড় বেতন সবচেয়ে সচ্ছল অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম। শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল শ্রেণিকক্ষের আকার কিংবা শিক্ষার্থীর সংখ্যার হিসাব যথেষ্ট নয়। শিক্ষকের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, বেতন এবং শিক্ষার্থীরা কী ধরনের শিক্ষা পাচ্ছে-এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কেন বাড়াতে হবে : আগামী কয়েক দশকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির তুলনায় দ্রুত বাড়বে-এমন সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, উন্নত সমাজে মানুষের চাহিদা, শিক্ষার প্রয়োজন এবং স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। তারপরও কেউ কেউ মনে করেন, এসব সেবা বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হলে বেশি দক্ষতার সঙ্গে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি, অলাভজনক ও সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রচলিত মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার চেয়ে ভালো ফল দিতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে কেবল বাজারে কেনাবেচার পণ্য হিসাবে বিবেচনা করা যায় না। এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির অপরিহার্য শর্ত।
যে সমাজে মানসম্মত শিক্ষা কেবল অর্থবান পরিবারের সন্তানদের জন্য সহজলভ্য, সেখানে সামাজিক গতিশীলতা সীমিত হয়ে পড়ে। দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এতে বৈষম্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে, শিক্ষায় যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষকে দক্ষ করে তোলা সম্ভব। এর ফলে ব্যক্তিগত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়।
উন্নয়নের বিকল্প মডেলের প্রশ্ন : শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে বিনিয়োগের প্রশ্নটি শুধু অঞ্চল কিংবা সামাজিক শ্রেণির মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়। এটি উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের সঙ্গেও যুক্ত। আমাদের অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে, সম্পদ কার হাতে থাকবে এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা হবে-এসব প্রশ্নের উত্তরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রকে পণ্য ও মুনাফার যুক্তিতে পরিচালিত করার পরিবর্তে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে মানুষের কল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো মানে কেবল আরও কিছু শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বাড়ানো নয়। এর অর্থ হলো, তরুণদের সামনে ভবিষ্যৎ নির্মাণের বাস্তব সুযোগ তৈরি করা; তাদের পরিশ্রম ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা; এবং সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য উন্নতির পথ উন্মুক্ত রাখা। ফ্রান্সের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলন সেই বৃহত্তর প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। তরুণরা মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সুযোগ চাইছে। তাদের এই দাবি দেশের উন্নয়ননীতি, সম্পদ বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। আসন্ন নির্বাচনগুলোতে এসব প্রশ্ন যেন কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, সেটিই এখন কাম্য।
লে মোঁদ থেকে ভাষান্তরিত
টমাস পিকেটি : ফ্রান্সের সামাজিক বিজ্ঞানবিষয়ক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঊঐঊঝঝ এবং প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিক্সে অধ্যয়ন ও গবেষণার পরিচালক
