উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য
Advertisement
ওয়াকিলুর রহমান
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি কী পড়ছেন?’, তিনি হয়তো বেশ সাবলীলভাবেই তার অধ্যয়নরত বিষয়ের নাম বলে দেবেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘কেন পড়ছেন?’, তবে বেশির ভাগ উত্তর আসবে, ‘একটি ভালো চাকরির প্রত্যাশায়’ কিন্তু যদি তাকে আরও গভীরে গিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘এই উচ্চশিক্ষা আপনাকে কেমন মানুষ বা কতটা দক্ষ নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলছে’ তখন উত্তরটি হয়তো আর অত সহজে বা তাৎক্ষণিকভাবে আসবে না। অথচ যে কোনো দেশের উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সাফল্য ও সার্থকতা লুকিয়ে থাকে এই শেষ প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড়ানোর ভেতরেই।
আজকের বাংলাদেশে কতগুলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, সেখানে কত লাখ তরুণ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল কিংবা বছর শেষে কত হাজার শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি তুলে দেওয়া হলো, এগুলো নিঃসন্দেহে একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারের ইতিবাচক পরিসংখ্যান। তবে কেবল এ সংখ্যাই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ থেকে বাস্তবে কী শিখছেন, তার অর্জিত জ্ঞান সামাজিক ও বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তিনি নিজেকে কতটা উপযোগী করে তুলছেন, সেটিই আজ আমাদের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় মৌলিক প্রশ্ন।
সংখ্যার বিস্তার বনাম গুণগত রূপান্তর : বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ৬১টি সরকারি, ১১৭টি বেসরকারি ও ৩টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতেও লাখ লাখ তরুণ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে আগমন নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সচেতনতার এক উজ্জ্বল ছবি তুলে ধরে। কিন্তু এ অভাবনীয় প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এক অস্বস্তিকর ও গভীর বাস্তবতা আমাদের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে : উচ্চশিক্ষার সুযোগ যেভাবে জ্যামিতিক হারে প্রসারিত হয়েছে, শিক্ষার মান কি সেই অনুপাতে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে?
আমাদের কাছে কি কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান আছে, কোন বিষয়ে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং তাদের কর্মসংস্থানের বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু? দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চাহিদার তোয়াক্কা না করে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের বিশ্বমানের দক্ষতা ও স্বনির্ভর চিন্তা নিশ্চিত করতে পারছি? দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার সমান অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে?
আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এই নতুন বাস্তবতায় প্রচলিত বহু কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজ যে দক্ষতাটির অত্যন্ত উচ্চ চাহিদা রয়েছে, আগামী পাঁচ বা দশ বছর পর সেটি হয়তো এআই বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এমন এক অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে কেবল তথাকথিত মুখস্থবিদ্যা আর সিজিপিএ দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীকে এমন এক জীবনমুখী ও প্রায়োগিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা তাকে কেবল তথ্যের নিষ্ক্রিয় ধারণকারী হিসাবে নয়; বরং জটিল সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানকারী, নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং স্বাধীন চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব হিসাবে গড়ে তুলবে।
শিক্ষা খাতে বাজেট, বিনিয়োগ ও প্রত্যাশিত ফলাফল : শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন যে কোনো প্রগতিশীল রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, গবেষণা তহবিলের সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিতকরণে নানা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চলতি অর্থবছর শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকার ক্রমান্বয়ে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছে। লক্ষণীয় যে, দেশের সার্বিক বাজেটের উন্নয়ন খাতে ১৫.৭ শতাংশ এবং পরিচালন খাতে ১১.২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষার জন্য যা প্রশংশনীয়। উল্লেখ্য যে, কেবলমাত্র মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৭,৩০২ কোটি টাকা, যা শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দের প্রায় ৪২ শতাংশ।
তবে বাজেটের অঙ্কে বরাদ্দ বৃদ্ধি করাটাই সবকিছুর সমাধান নয়; আমাদের মূল নজর দিতে হবে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা শিক্ষার পেছনে অর্থ বিনিয়োগের প্রকৃত ফলাফলের দিকে।
অতএব, আগামীর শিক্ষা বাজেটকে কেবল একটি বার্ষিক খরচের খাত হিসাবে দেখলে চলবে না; বরং একে দেখতে হবে গুণগত অর্জন ও মানবসম্পদ সৃষ্টির নিরিখে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে বিএনকিউএফ, ওবিই ও অ্যাক্রেডিটেশনের ভূমিকা : বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এক যুগান্তকারী ও কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন আনতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্ক (বিএনকিউই), আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি)-এর প্রতিষ্ঠা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় নির্ধারিত কোর্স বা সিলেবাস শেষ করাকেই সাফল্য বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা বা ওবিই-এর মূল দর্শন হলো, কোর্স শেষে একজন শিক্ষার্থী বাস্তবে কী শিখল, কতটুকু হৃদয়ঙ্গম করল এবং অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারল। এটি শিক্ষাদানের মূল কেন্দ্রবিন্দুকে ‘শিক্ষক কী পড়ালেন’ থেকে সরিয়ে ‘শিক্ষার্থী কী দক্ষতা অর্জন করল’ সেখানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
তবে এই সার্বিক শিখন কাঠামোর উৎকর্ষ, বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মূল অনুঘটক হলো ‘অ্যাক্রেডিটেশন’। বিএনকিউএফ যেখানে বিভিন্ন স্তরের যোগ্যতা ও দক্ষতার একটি সর্বজনীন জাতীয় মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রোগ্রামের গুণগত মান সূক্ষ্মভাবে মানদণ্ডের নিরিখে যাচাই করে তার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করছে। অ্যাক্রেডিটেশন কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক সনদ বা কাগুজে অনুমোদন নয়; এটি সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, কারিকুলামের সময়োপযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মানের গ্র্যাজুয়েট তৈরির এক শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক গ্যারান্টি।
প্রকৃতপক্ষে, গুণগত শিক্ষা অর্জনে শিক্ষার্থীকে কেবল তথ্যের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা না বানিয়ে প্রশ্নপ্রবণ, গবেষণামুখী ও সমাজ-সংস্কৃতি চর্চায় যুক্ত করে জ্ঞান সৃষ্টির সক্রিয় অংশীদার করে তুলতে হবে। একইসঙ্গে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব নিরসন ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল তৈরিতে অ্যাকাডেমিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্পখাতের সরাসরি মেলবন্ধন ঘটাতে হবে, যেখানে যৌথ গবেষণা, শিল্পের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা ও বাস্তবমুখী ইন্টার্নশিপের সুযোগ থাকবে। সর্বোপরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের মতো জাতীয় সমস্যা সমাধানমুখী গবেষণা জোরদার করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আধুনিক অবকাঠামো ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাই হবে এসডিজি-৪ অর্জনের মূল চাবিকাঠি।
আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা একটি উন্নত, আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার মূল চালিকাশক্তি কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রযুক্তি, মানবিক মূল্যবোধ ও দূরদর্শী দক্ষতায় সমৃদ্ধ এক সচেতন তরুণ প্রজন্ম। এ লক্ষ্য অর্জনে সনদের সংখ্যার পেছনে না ছুটে উচ্চশিক্ষার গুণগত রূপান্তর নিশ্চিত করাই হবে দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। সময় এসেছে ‘কতজন ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলো’ তা না ভেবে ‘কতজন বিশ্বমানের দক্ষ, নীতিবান ও দায়িত্বশীল নাগরিক আমরা গড়ে তুলতে পারলাম’। সনদের সংখ্যা নয়, শিক্ষার প্রমিত গুণগত মান, সার্বিক চর্চা এবং বাস্তব প্রয়োগেই হবে আগামীর টেকসই বাংলাদেশ গড়ার মূল মাপকাঠি।
মো. ওয়াকিলুর রহমান : সদস্য, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি); প্রফেসর, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
