Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

Advertisement

Icon

ড. হাসান মাহমুদ

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে বেশকিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। ইসলামি রাজনীতি, ধর্মীয় পরিচয় এবং মুসলমানের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। কেউ এ পরিবর্তনকে ইসলামি রাজনীতির উত্থান হিসাবে দেখছেন, কেউ দেখছেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসাবে। কিন্তু এ বিতর্কে একটি প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত : রাজনীতির দৃশ্যমান পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের বয়ানও কি বদলেছে?

রাজনীতিতে কোন দল ক্ষমতায় আছে, কোন মতাদর্শের ভাষা বেশি শোনা যাচ্ছে, আর জাতির ইতিহাস ও পরিচয়ের অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে-এগুলো আলাদা বিষয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটতে পারে, নতুন দল ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা সামনে আসতে পারে; কিন্তু একই সঙ্গে জাতীয় ইতিহাসের প্রচলিত কাঠামোও অক্ষত থাকতে পারে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশকে বোঝার জন্য এ পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ভাষা, সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের নানা প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এসবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। প্রশ্নটি অন্য জায়গায় : এ জাতীয় পরিচয়ের বয়ানে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কতটা জায়গা পেয়েছে? তাদের ইতিহাস কি বৃহত্তর বাঙালি ইতিহাসের একটি অংশ হিসাবেই স্বীকৃতি পায়, নাকি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, ধর্মীয় সংস্কার এবং সামাজিক সংগ্রামও বাংলাদেশের ইতিহাস নির্মাণকারী শক্তি হিসাবে বিবেচিত হয়?

এ প্রশ্ন বোঝার জন্য জাতীয় স্মৃতির দিকে তাকানো যেতে পারে।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিচিত এক বিপ্লবী নারী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ স্মরণ করার যথেষ্ট কারণ আছে। তাকে স্মরণ করা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা অবান্তর; কিন্তু বাংলার ইতিহাসে আরও অনেকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করেছেন, সামাজিক সম্পর্ক বদলানোর চেষ্টা করেছেন এবং ক্ষমতাশালী শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিত জনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তাদের স্মৃতি জাতীয় পরিসরে কতটা জায়গা পেয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলা দরকার।

দুদু মিয়ার কথা ধরা যাক। উনিশ শতকে ফরায়েজি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা দুদু মিয়ার প্রকৃত নাম মুহসিনউদ্দিন আহমদ। তার পিতা হাজি শরীয়তুল্লাহর সূচনা করা আন্দোলনের নেতৃত্ব তিনি গ্রহণ করেন ১৮৪০ সালে। ফরায়েজি আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কারের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও দুদু মিয়ার নেতৃত্বে তা বাংলার কৃষক সমাজের সংগঠন এবং জমিদারি নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সঙ্গেও যুক্ত হয়।

দুদু মিয়ার ইতিহাস তাই শুধু ধর্মীয় সংস্কারের ইতিহাস নয়। এটি বাংলার কৃষকসমাজ, ঔপনিবেশিক শাসন এবং গ্রামীণ ক্ষমতার সম্পর্কের ইতিহাসও। বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় কীভাবে সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, ফরায়েজি আন্দোলন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

দুদু মিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একেবারে অনুপস্থিত নন। তার সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে, ইতিহাসের বইয়েও তার উল্লেখ রয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জাতীয় স্মৃতি, জনপরিসরের স্মারক এবং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক স্বীকৃতিতে তার অবস্থান কতটা দৃশ্যমান?

এখানে তুলনাটি প্রীতিলতার স্বীকৃতিকে প্রশ্ন করার জন্য নয়; দুদু মিয়ার মতো ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি কেন একই মাত্রায় বিস্তৃত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য। দুজনের রাজনৈতিক প্রকল্প এক ছিল না; কিন্তু জাতীয় ইতিহাসে কার অবদান কোন ভাষায় স্বীকৃতি পায়, কোন সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির ইতিহাসের অংশ হিসাবে দেখা হয়, আর কোন সংগ্রামকে সীমিত ধর্মীয় বা সামাজিক পরিসরে আটকে রাখা হয়-এসবই প্রশ্ন বোঝার জন্য এ তুলনাটা গুরুত্বপূর্ণ।

দুদু মিয়ার মতো ব্যক্তিত্বের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলার মুসলমান কেবল একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠী ছিলেন না। তারা ছিলেন কৃষক, সংগঠক, সংস্কারক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের নির্মাতা। তাদের ইতিহাসকে প্রান্তিক করে রাখলে বাংলার সামাজিক ইতিহাসও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তখন হয় বৃহত্তর বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে মিশে যায়, নয়তো তাকে আলাদা করে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। দুই ক্ষেত্রেই তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ভূমিকা বোঝার সুযোগ সংকুচিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গ্রাফিতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটিও এ প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। একটি নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে রাষ্ট্রের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কিন্তু ঘটনাটিকে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা যায়। রবীন্দ্রনাথের মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মর্যাদা রক্ষা এবং বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ইতিহাসকে স্বীকৃতি দেওয়া পরস্পরবিরোধী কোনো কাজ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় কি তার সব ঐতিহাসিক ধারাকে ধারণ করার মতো বিস্তৃত হয়ে উঠেছে?

এ আলোচনাকে ইসলামপন্থি বনাম ধর্মনিরপেক্ষ-এ পরিচিত দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ করলে মূল প্রশ্নটি হারিয়ে যাবে। ইসলামি রাজনীতির দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি মানেই পুরোনো সাংস্কৃতিক বয়ানের অবসান নয়। আবার বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি থাকলেই বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস যথাযথভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, এমনও নয়। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটলেও ইতিহাসের অর্থ নির্ধারণে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান, পাঠ্যক্রম, স্মারক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।

এ কারণেই জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তনকে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। এ পরিবর্তন আমাদের অতীতকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে কিনা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ইতিহাসের কোন অধ্যায়গুলো সামনে আনা হবে, কাদের স্মরণ করা হবে, কোন সামাজিক আন্দোলনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হবে-এসব প্রশ্নও নতুন করে তোলা দরকার।

বাঙালি মুসলমানকে আমরা কীভাবে বুঝি এবং কীভাবে তাদের ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করি, সেটিই এখানে কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। তাদের কি কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হবে? নাকি তাদের কৃষক আন্দোলন, ধর্মীয় সংস্কার, সামাজিক সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক চিন্তাকে এ ভূখণ্ডের ইতিহাস নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখা হবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু অতীতের ঘটনা নতুন করে পড়লেই চলবে না; অতীতকে দেখার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিও পরীক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিতে হবে না, প্রীতিলতার অবদানকে ছোট করতে হবে না কিংবা একটি ঐতিহ্যের জায়গায় আরেকটি ঐতিহ্য বসাতে হবে না। বরং প্রচলিত ইতিহাসের ভেতরে আর কাদের অভিজ্ঞতা অনুপস্থিত বা কম দৃশ্যমান, তা খুঁজে দেখতে হবে। বাংলার মুসলমানের কৃষক আন্দোলন, ধর্মীয় সংস্কার, সামাজিক সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চিন্তাকে জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে স্বীকৃতি দিতে পারলে বাংলাদেশের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে।

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা বদলেছে, রাজনৈতিক শক্তির বিন্যাসও বদলাচ্ছে। কিন্তু এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের প্রচলিত বয়ান কতটা বদলাবে, তা এখনো খোলা প্রশ্ন। একটি অভ্যুত্থান নিজে থেকে অতীতের ব্যাখ্যা বদলে দেয় না। সেই কাজের জন্য দরকার ইতিহাসের পরিচিত চরিত্রদের পাশাপাশি কম আলোচিত মানুষদেরও নতুন করে দেখা। কারণ জাতির ইতিহাস কেবল অতীতের বিবরণ নয়; কারা জাতীয় স্মৃতির অংশ হবেন, সেই সিদ্ধান্তের মধ্যেও বর্তমানের ক্ষমতার সম্পর্ক কাজ করে।

তাই প্রশ্নটি থেকেই যায় : জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতি বদলেছে; কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের বয়ান বদলাতে শুরু করবে কবে?

ড. হাসান মাহমুদ : সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কাতার

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

অন্যমত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম