Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

খোলা জানালা

মোদির আসন্ন সফর আমাদের আশাবাদী করে

Advertisement

Icon

তারেক শামসুর রেহমান

প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মোদির আসন্ন সফর আমাদের আশাবাদী করে

Advertisement

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে আসছেন ২৬ মার্চ। তবে এবার তার সফরের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী, বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসবে যোগ দেবেন এবং গোপালগঞ্জের মাতুয়া সম্প্রদায়ের একটি মন্দির পরিদর্শন করবেন। ফলে তার এবারের সফর কিছুটা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষ্যে ঢাকায় তার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটি বড় পাওয়া।

একইসঙ্গে ‘মুজিব শতবার্ষিকী’তে তার উপস্থিতি প্রমাণ করবে ভারতের জনগণ বঙ্গবন্ধুকে কতটা শ্রদ্ধার চোখে দেখে। মোদি গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। তখন কাশিয়ানীতে ওই মন্দিরে তার যাওয়ার কথা। যদিও এখন অব্দি তা নিশ্চিত করা যায়নি। ২০১৫ সালে মোদি যখন ঢাকা সফর করেন, তখন তিনি এ মন্দিরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাননি। বলা ভালো, ১৮১২ সালে কাশিয়ানীতে জন্ম নেওয়া হরিচাঁদ ঠাকুর মাতুয়াবাদের জন্ম দেন, যা পরে বিস্তৃত হয় তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে। মাতুয়া সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বিশেষ সম্প্রদায়, যারা হরিচাঁদ ঠাকুরকে তাদের দেবতা মান্য করে।

কিন্তু মোদির ঢাকা সফর নিয়ে একটি পক্ষ তার সফরের বিরোধিতা করছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ বলছে, ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের দায় ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদির ওপরে পড়ে এবং সেজন্য তারা বাংলাদেশের সুর্বণজয়ন্তী বা মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে তাকে এ দেশে স্বাগত জানাবেন না। একইসঙ্গে বাংলাদেশের বেশকিছু বামপন্থি সংগঠন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে জোর আপত্তি জানিয়ে বলছে, ‘শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে খুশি করার জন্য নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর তাদের কাছে কাম্য নয়।’ আবার ’৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ঢাকায় মোদিবিরোধী বিক্ষোভ প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

হেফাজতে ইসলামের এ ধরনের বক্তব্য ভারতে ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য একটা ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। এ অঞ্চলে ইসলামের ইতিহাস শত বছরের পুরোনো। এ ইসলাম জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না। শান্তিপ্রিয় ইসলামের অনুসারী এ দেশের মানুষ। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের নেতারা যে উগ্রভাষায় কথা বলেন, হুমকি দেন, তা সনাতন ইসলামের ধারাকে সমর্থন করে না। মোদির রাজনীতির ব্যাপারে এ দেশের অনেকেরই আপত্তি থাকতে পারে। ভারতের অনেক স্থানে মুসলমানরা নিগৃহীত হচ্ছেন, এটা সত্য। তবে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। সেদেশের জনগণ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। এক্ষেত্রে আমাদের বলার কিছু নেই। ভারতে মুসলমান নিগ্রহের ব্যাপারে অন্য কোনো মুসলিম দেশে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে আমার চোখে ধরা পড়েনি। এমনকি পাকিস্তানেও তেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। সুতরাং হেফাজতে ইসলামের বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত। মোদি আমাদের মেহমান। স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের উচিত তাকে যথাযথ সম্মান দেখানো।

‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস’ বা এনআরসি এবং ‘সিটিজেনস অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ বা সিএএ নিয়ে কথা উঠেছে। এনআরসি ও সিএএ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই এবং বাংলাদেশ কোনো মন্তব্যও করতে পারে না। বাংলাদেশের ক্ষমতাবান জনৈক মন্ত্রীর একটি উক্তি (যারা বাংলাদেশি তাদের ফেরত নেওয়া হবে) মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। তবে আশার কথা, বাংলাদেশে তথাকথিত ভারতীয় বাঙালি নাগরিকদের, যারা মুসলমান তাদের ‘পুশইন’ করা হয়নি। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২৭ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন শুরু হচ্ছে। আর আসামে শুরু হচ্ছে ২ মে। পশ্চিমবঙ্গ আর আসামে মুসলমান ভোটাররা একটি ফ্যাক্টর। এ কারণে এনআরসি ও সিএএ’র বিষয়টি সেখানে যে আলোচনায় থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি সমাধানের অপেক্ষায় আছে। এর আগে নরেন্দ্র মোদি একবার ঢাকা ঘুরে গেছেন (২০১৫)। তিনি তার পররাষ্ট্রনীতিতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে গুরুত্ব দেন। তার ‘নেইবারহুড ফার্¯¡’ পলিসির কারণে ভারতের সঙ্গে তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সম্পর্ক আরও উন্নত হয়েছে। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে মালদ্বীপ, নেপাল কিংবা শ্রীলংকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করতে পারি। মিয়ানমারের সঙ্গেও ভারত সম্পর্ক উন্নত করেছে।

ভারতের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশকে যে কত বেশি গুরুত্ব দেন, তার বড় প্রমাণ বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে

মোদির ঢাকা সফর।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর। করোনাকালে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এ বৈঠকের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত অতিক্রম করছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ৫০তম বছরেও পা রেখেছে বাংলাদেশ। ভার্চুয়াল বৈঠকের পর যে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তাতে ভারত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদন এবং সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার আশ্বাস আবারও দিয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের মধ্যে যে আঞ্চলিক সড়ক হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ যুক্ত হতে চায়। এ ধরনের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ভার্চুয়াল বৈঠকের আগে সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যেসব বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল তার মধ্যে রয়েছে-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সিইও ফোরাম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হাইড্রোকার্বন বিষয়ে সহযোগিতা, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হাতি সংরক্ষণ বিষয়ে সহযোগিতা, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল জাদুঘর ও ভারতীয় জাতীয় জাদুঘরের মধ্যে সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ও বরিশাল সুয়্যারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টসংক্রান্ত সহযোগিতা চুক্তি। পরে দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল সামিটে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া নীলফামারীর চিলাহাটি সীমান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গের হলদিবাড়ি পর্যন্ত রেল যোগাযোগ উদ্বোধন করা হয়। দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ভারতের ডাক বিভাগের একটি স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত ও বঙ্গবন্ধু-বাপুজি ডিজিটাল এক্সিবিশনের উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর (২০১৭) কিংবা নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর (২০১৫) এবং পরে ভার্চুয়াল বৈঠকেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি হয়নি; সমস্যাটা ভারতের। এর সমাধান ভারতকেই করতে হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। যেমন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা। সাফটা চুক্তিতে বেশ কয়েকটি পণ্যের ব্যাপারে শুল্ক হ্রাসের কথা বলা হলেও তা কার্যকর হয়নি। ইতোমধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে যে ৫১৩টি পণ্যের ছাড় দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ৩৫০টি পণ্য বাংলাদেশের পক্ষে রপ্তানি করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যের শুল্কহার কমিয়েছে। ১৯৯৩-৯৪ সালে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্কহার ধার্য ছিল ৩০০ শতাংশ। ১৯৯৪-৯৫ সালে তা কমিয়ে আনা হয় ৬০ শতাংশে। এখন শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশে। দুদেশের মধ্যকার বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধায় জাহাজযোগে ভারতীয় পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। নেপালে ত্রিদেশীয় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ভারত এটি করছে দ্বিপাক্ষিকভাবে (ভারত-নেপাল)। শুষ্ক মৌসুমের জন্য বাংলাদেশ (রাজবাড়ীর পাংশা থেকে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত) একটি জলাধার নির্মাণ করতে চায় (গঙ্গা ব্যারাজ), সেক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন। গত ১৬ মার্চ (২০২১) নয়াদিল্লিতে সচিব পর্যায়ে একটি সভা হয়েছে। সেখানে ছয়টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে বলে যুগান্তর আমাদের জানিয়েছে (মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমার)। বলা হয়েছে, তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বস্তুত এ ‘গুরুত্ব’ দেওয়া কিংবা অন্য ছয়টি নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি আলোচনার চেয়ে আমাদের বেশি প্রয়োজন তিস্তার পানিবণ্টন।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে ভারতের ব্যাপারে একটা ‘মিশ্র’ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। হেফাজত এটাকে ইস্যু করে ফায়দা নিতে চায়। মোদি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবেন। তার ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বাংলাদেশের সঙ্গে বিরাজমান সমস্যার সমাধানের ওপর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তার অংশগ্রহণ নিশ্চয়ই সমস্যাগুলো সমাধানের একটা পথ খুলে দেবে।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

Advertisement

মোদি

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম