‘নো মাস্ক, নো মুভমেন্ট’ আইন প্রণয়ন জরুরি
Advertisement
ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২০ সালের ১৮ মার্চ করোনাভাইরাসে প্রথম ব্যক্তির মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। ঠিক এক বছর পর ১৮ মার্চ ২০২১-এ গত তিন মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে করোনা আক্রান্তের মাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনগণের অসচেতনতাকেই কারণ হিসাবে মনে করছে।
লক্ষ করা যাচ্ছে, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষের সংকোচ-দ্বিধাহীনভাবে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। আগে আক্রান্তদের মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তিদের লক্ষ করা গেলেও এখন তরুণদের আক্রান্ত হতে লক্ষ করা যাচ্ছে।
গণমাধ্যমের সূত্রে সবাই জেনেছেন যে, করোনার ‘ইউকে স্ট্রেইন’ বাংলাদেশে ঢুকে গেছে। ইংল্যান্ডে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণ হিসাবে করোনার পরিবর্তিত রূপ, যাকে B 1. 1. 7 স্ট্রেইন বা ‘ইউকে স্ট্রেইন’ বলা হচ্ছে। এটি বিদ্যমান করোনার স্ট্রেইনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সংক্রামক ও ক্ষতিকারক। এখন ‘ইউকে স্ট্রেইন’ বা অন্য যে কোনো নতুন স্ট্রেইন অথবা আবহাওয়াজনিত কারণে সংক্রমণের হার বাড়িয়ে দিয়েছে কিনা, তা সায়েন্টিফিক ডেটা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
একটি সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার জন্য দায়ী অণুজীবের জীবনগতি ও ডিএনএ পরিবর্তনের হারকে সব সময় পরিলক্ষণ করতে হবে। এ ধরনের পরিলক্ষণের জন্য প্রয়োজন জিনোম সিকোয়েন্স। যদি বাংলাদেশে নতুন স্ট্রেইন অথবা ইউকে স্ট্রেইনের জিনোম সিকোয়েন্সের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আমাদের দেশে যারা দক্ষ মাইক্রোবায়োলজিস্ট রয়েছেন; তারা এ মহামারি প্রতিরোধ যুদ্ধে সহায়তা করতে পারেন।
তবে একটি নমুনা থেকে নতুন স্ট্রেইনের জিনোম সিকোয়েন্স করতে প্রায় দশ দিনের মতো সময় লেগে যায়। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করোনা আক্রান্ত লাখ লাখ নমুনা থেকে জিনোম সিকোয়েন্সিং অনেক সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হয়ে যাবে।
সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন বারবার উঁকি দিচ্ছে- ‘করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও মাস্ক পরতে হবে কেন?’ এর সহজ উত্তর হতে পারে, করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পর ভাইরাসের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে। কেউ ভ্যাকসিন নেওয়ার কয়েকদিন আগে অথবা ১০ দিনের মধ্যে করোনাভাইরাসের মুখোমুখি হন, তবে তার পূর্ণমাত্রায় রোগ দেখা দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে ও সেটি অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ভাইরাস আমাদের শ্বাসতন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের পথে আক্রমণ করে, যেখানে ভাইরাসটি মোকাবিলা করার মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা শুধু ৪৫ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। যারা করোনা থেকে মুক্তি লাভ করেছেন ও ভ্যাকসিন নিয়েছেন, তাদের শুধু রক্তনালিতে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকে। তাই ভ্যাকসিনকৃত ব্যক্তিদের শ্বাস বা পরিপাকনালিতে ভাইরাস প্রবেশ করলে তা অতি সহজেই উৎপাদিত হয় এবং সেটি অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ভাইরাস যখন শুধু রক্তনালিতে প্রবেশ করে, তখনই তা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং নিষ্ক্রিয় হতে পারে। তাই মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই। তবে বাংলাদেশে ১১৮টি সেন্টারে পিসিআর টেস্টের সুযোগ রয়েছে, যেখানে ‘ট্রিপল জিনসার্স কোভ-২ পিসিআর কিট’ দ্বারা অতি অল্প সময়ে স্ক্রিনিং করা সম্ভব।
স্ক্রিনিং-এর পর যাদের মধ্যে করোনাভাইরাসের ‘ইউকে স্ট্রেইন’ পাওয়া যাবে, তাদের নমুনা থেকে ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করে ভাইরাসের গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। পরে এসব রোগীর কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আইসোলেশনে রাখা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
শুধু ভ্যাকসিন বা জিনোম সিকোয়েন্সিং করোনা সংক্রমণ রোধ করতে পারবে তা কিন্তু নয়। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রয়োজন সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, কিছুক্ষণ পরপর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা, সুষম খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা করা।
মাস্ক পরিধানে সবাইকে আরও বদ্ধপরিকর হতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে দেশের সর্বত্রই একটা উদাসীন বা পাত্তা না দেওয়ার ভাব লক্ষণীয়। চলার পথে রাস্তাঘাটে ২০ জন ব্যক্তির দিকে খেয়াল করলে ৪ থেকে ৫ জনের মুখে মাস্ক লক্ষ করা যায়। বলা যায়, শতকরা প্রায় ৮০ জন মাস্ক পরিধান করে না। বিষয়টি উদ্বেগের।
এ কথা নিয়মিতভাবে বলা হচ্ছে, মাস্ক ইউকে স্ট্রেইনসহ যে কোনো স্ট্রেইনকে প্রতিরোধ করতে পারে। মাস্ক পরিধান ছাড়া কোনো মানুষ যাতে ঘরের বাইরে যেতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ চালু করে।
বর্তমানে এর পরিধি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তাই এখনই ‘নো মাস্ক, নো মুভমেন্ট’ আইন প্রণয়ন ও তা প্রচার জরুরি। বলতে গেলে বর্তমানে কোনো হাসপাতালেই বেড খালি নেই। মহামারি ছড়িয়ে পড়লে এখন তা সামলানো অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
বাইরে বের হলে নিজে থেকে মাস্ক পরিধান অত্যাবশকীয় অভ্যাসে পরিণত করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। ভ্যাকসিন প্রদানের পরপরই লক্ষ করা গেছে, মানুষের মধ্যে করোনা ভীতি একেবারেই উঠে গেছে। অথচ এখনো করোনাভাইরাসে প্রায় প্রতিদিন দশের অধিক প্রাণ হারাচ্ছে। এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার কমানোর জন্য সঠিক চেষ্ট ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যকর।
কিন্তু আজ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত কোনো রোগী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পাননি। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার মাধ্যমে যদি রোগীকে ভেন্টিলেটরের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো, তাহলে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ অকালে মারা যেত না। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির এ সময়ে প্রতিটি মানুষের ব্রিদিং এক্সারসাইজ এবং অ্যারোবিক এক্সারসাইজ করে নিজের শরীরকে আরও রোগ প্রতিরোধক্ষম করে তোলাও একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসাবে পরিগণিত হবে।
ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ : গবেষক ও অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; কোষাধ্যক্ষ (প্রেষণে), পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
