Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ব্যাংক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব

Advertisement

Icon

এম এ খালেক

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব

Advertisement

গত বছর করোনাকালীন লকডাউনের ফলে বিভিন্ন দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের (সিএম) জন্য করোনাকালীন ঋণদান কার্যক্রম হাতে নেয়।

কিন্তু সেই ঋণদান কার্যক্রম সফল হয়নি। ভারতে প্রায় ছয় কোটি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প আছে। এর মধ্যে মাত্র এক কোটির মতো শিল্পব্যাংক ঋণ পেয়ে থাকে। অবশিষ্ট পাঁচ কোটি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এখনো গ্রামীণ মহাজন, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে। করোনাকালীন ছাড়াও এসব ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প মালিকরা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সমর্থন পান না।

এ নিয়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগের অন্ত নেই। তারা বলছেন, ব্যাংকগুলো ইচ্ছা করেই তাদের ঋণ দিচ্ছে না। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকারদের বক্তব্য হচ্ছে, তারা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ঋণদানের ব্যাপারে আগ্রহী; কিন্তু ঋণ পাওয়ার জন্য যেসব কাগজপত্র ও ডকুমেন্ট প্রয়োজন হয় তা তারা দিতে পারেন না।

এমনকি তাদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার অভাব এবং উদ্যমহীনতাও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসাবে কাজ করছে। অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারই বাজার সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকে না।

বাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকলে সেই উদ্যোক্তার পক্ষে পণ্য উৎপাদন করে সঠিক পদ্ধতিতে বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংকের সঙ্গে আগে থেকেই ভালো সম্পর্ক বা যোগাযোগ থাকে না।

তারা ঋণ নিতে আসেন উৎপাদন শুরু করার ঠিক আগ মুহূর্তে। ফলে ব্যাংকারদের পক্ষে তাদের জন্য তেমন কিছুই করার থাকে না। তারা শেষ সময়ে ঋণের জন্য ছোটাছুটি করে বলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও অনেক সময় প্রশ্ন দেখা দেয়।

ভারত একটি বিশাল দেশ। তাদের অর্থনৈতিক এবং শিল্পভিত্তি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু তারপরও তাদের সামাজিক ব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং নীতিমালা অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ঋণদানের জন্য উপযোগী নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যাপক অবদান রাখলেও তাদের অবস্থা ভারতের চেয়ে মোটেও ভালো নয়।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তাদের অবদান জিডিপির প্রায় ৮৭ শতাংশের মতো। অর্থাৎ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবদান দৃশ্যমান বা রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত না হলেও তারা আনুষ্ঠানিক জিডিপির প্রায় সমান অবদান রাখছেন।

তাদের অবদান জিডিপিতে যুক্ত হলে মোট জিডিপির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেত। এ বিশাল খাতটি প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদের যদি প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদান কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা যেত, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও অনেক বেশি গতিশীল হতো।

ট্রেডিশনাল ব্যাংকিং সিস্টেম শুধু যে ভারতেই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈরী আচরণ করছে তা নয়। বাংলাদেশেও ঠিক একই অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের ব্যাংকব্যবস্থা অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে মোটেও উদার নয়। তারা নানা অজুহাতে এদের ঋণদান থেকে বিরত থাকছেন।

করোনাকালীন অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মালিকরা। কিন্তু তারা প্রত্যাশিত মাত্রায় আর্থিক সহযোগিতা পাননি। বাংলাদেশ ব্যাংক সিডিউল ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসএমই খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকা অতিক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। এ বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মালিকরা ঋণ নিতে পারেননি।

গত বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসএমই খাতের সংজ্ঞায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো শিল্পকে যুক্ত করে এসএমই সেক্টরের নতুন নামকরণ করা হয়েছে কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই)। আশা করা হয়েছিল, এ পরিবর্তনের ফলে কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো শিল্পোদ্যোক্তারা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদের সভায় এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণদানের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও কুটির ও অতিক্ষুদ্র শিল্পমালিকরা ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না।

সিএমএসএমই খাতের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণের বেশিরভাগই নিয়ে নিচ্ছেন মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজের মালিকরা। ২০১৬ সালের শিল্পনীতিতে মিডিয়াম ইন্ডাস্ট্রিকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তাতে তারা প্রায় বৃহৎ শিল্পর পর্যায়ে পড়ে। এসএমই খাতের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণের বেশিরভাগই এদের কবজায় চলে যাচ্ছে। কারণ তাদের সঙ্গে ব্যাংকের ভালো সম্পর্কে রয়েছে। এ ছাড়া তারা অনেক সময় মিডিয়াম ইন্ডাস্ট্রির নামে ঋণ মঞ্জুর করে তা বৃহৎ শিল্পে ব্যবহার করছেন।

অধিকাংশ বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তার অনেকগুলো করে মিডিয়াম ইন্ডাস্ট্রি থাকে। ব্যাংক ঋণদানের ক্ষেত্রে যেসব ডকুমেন্ট ও কাগজপত্র চায়, নতুন উদ্যোক্তাদের পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হয় না। সিএমএসএমই খাতে ঋণদানের ক্ষেত্রে ঝামেলা বড় শিল্পে ঋণদানের মতোই। কাজেই ব্যাংকারদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র শিল্পের চেয়ে বড় শিল্পে ঋণদানের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী।

অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের একটি বড় অংশজুড়ে আছেন নারী উদ্যোক্তারা। কিন্তু নারী উদ্যোক্তারা ব্যাংকের চাহিদাকৃত জামানত প্রদানে ব্যর্থ হন। ফলে তারা ব্যাংক ঋণের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হন না। অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে মোটেও অবহিত থাকেন না। তারা ঋণ আবেদন কীভাবে করতে হয়, কোথায় গেলে ঋণ পাওয়া যাবে এসব তথ্য জানেন না। কাজেই তারা ঋণ পান না। বাধ্য হয়ে তারা গ্রামীণ মহাজন, এনজিও এবং অন্যান্য সূত্র থেকে ঋণ আহরণে বাধ্য হচ্ছেন।

দেশের অর্থনীতি কার্যত দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ওপর নির্ভর করে। কাজেই এদের জন্য সত্যিকার অর্থে কিছু করার সময় এসেছে। এদের আর বেশিদিন গ্রামীণ মহাজন ও এনজিওগুলোর করুণার ওপর নির্ভর করে রাখা যায় না। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে এদের জন্য কিছু করতে চায় তাহলে এসএমই সেক্টরের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনতে হবে। কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো শিল্পকে কোনোভাবেই এসএমই সেক্টরের সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না। কারণ এসএমই সেক্টরের সঙ্গে কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রি সেক্টরের চরিত্রগত কোনো মিল নেই। বরং কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো শিল্পকে আলাদা করে একটি নতুন সেক্টর খোলা যেতে পারে, যার নাম হবে কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজ (সিঅ্যান্ডএম)। এদের জন্য জামানতবিহীন তুলনামূলক স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এদের অনুকূলে সিকিউরিটি গ্যারান্টি (ঋণের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা) দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো শিল্পোদ্যোক্তাদের অনুকূলে ঋণ নিরাপত্তা দেবে। ব্যাংকগুলো সেই গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ প্রদান করবে।

বর্তমানে যেভাবে সিএমএসএমই খাতকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে সেটা কচ্ছপ ও খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতার মতোই অবাস্তব একটি ব্যবস্থা। মিডিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ এবং কটেজ বা মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজকে কখনোই একই পাল্লায় পরিমাপ করা ঠিক হবে না। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রভূত অবদান রাখতে সক্ষম।

এ খাতে কর্মসংস্থানের চমৎকার সুযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে কুটির ও মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিতে উৎপাদিত হয় এমন পণ্য বিদেশ থেকে আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। স্থানীয় বাজারে তাদের সংরক্ষিত রাখতে হবে।

যারা এখন বেকার অবস্থায় আছেন তাদের তুলনামূলক স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণ দানের ব্যবস্থা করা হলে অচিরেই তারা উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে উঠতে পারবেন। এ ছাড়া করোনাকালীন যারা বিদেশ থেকে কর্মচ্যুত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

তাদের জন্য ঋণদানের ব্যবস্থা করা হলে তারা খুব সহজেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে নিতে পারবেন। কারণ তারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন কাজে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত।

কাজেই তারা সামান্য আর্থিক সহযোগিতা পেলেই আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। আগামীতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পই হবে দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

 

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

Advertisement

ব্যাংক.

Advertisement

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকার প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

ঢাকার ওপর চাপ কমাতে পরিকল্পিত উপশহর : একটি প্রস্তাব

ঢাকার ওপর চাপ কমাতে পরিকল্পিত উপশহর : একটি প্রস্তাব

বৈষম্য কত গভীর হলে আমাদের চোখে পড়ে

বৈষম্য কত গভীর হলে আমাদের চোখে পড়ে

স্বাস্থ্য খাতে কী ঝুঁকি তৈরি করছে এআই

স্বাস্থ্য খাতে কী ঝুঁকি তৈরি করছে এআই

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম