কবরে শয্যা মিলবে তো?
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
কবরে শয্যা মিলবে তো?

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রখ্যাত লেখক আলবার্ট কাম্যুর জন্ম হয়েছিল আলজেরিয়ায় ১৯১৩ সালে। তিনি আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে লেখাপড়া করেন এবং পরে হলেন সাংবাদিক। এছাড়া তিনি তরুণদের নিয়ে নাটকের একটি দল সৃষ্টি করেছিলেন। তার প্রথমদিককার প্রবন্ধগুলো ‘The Wrong side and the Right side’ এবং ‘Nuptials’ গ্রন্থ দুটিতে সংকলিত হয়েছে। তরুণ কাম্যু প্যারিসে গেলেন, যেখানে তিনি Paris Soir নামে একটি সংবাদপত্রে কাজ করেছেন এবং তারপর আবার আলজিয়ার্সে ফিরে আসেন।

তার লেখা নাটক ক্যালিগুলা ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয়। তার লেখা প্রথম দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘The Outsider’ এবং দার্শনিক রচনার সংকলন ‘The ¸th of Sisyphus’. গ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হলো তার প্যারিসে ফিরে যাওয়ার পর। ১৯৪০ সালে জার্মানরা ফ্রান্স দখল করে নেয়। কাম্যু সেখানে প্রতিরোধ সংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রদান করেন। তার সম্পাদনা এবং লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল গোপন সংবাদপত্র Combat. এ পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য তিনি সহায়তা দিয়েছিলেন।

তিনি যুদ্ধের পর লেখালেখিতে নিয়োজিত হন এবং ‘The Plague’ (১৯৪৭), ‘The Just’ (১৯৪৯) এবং ‘The Fall’ (১৯৫৬) রচনা করেন। এসব গ্রন্থ তাকে আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি এনে দেয়। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে কাম্যু নতুন করে নাটকের কাজে জড়িয়ে পড়েন এবং বিখ্যাত ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনারের ‘Requiem for a Nun’ এবং দস্তয়ভস্কির ‘The Possessed’-এর নাট্যরূপ রচনা করেন।

তাকে ১৯৫৭ সালে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৬০-এ এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু ঘটে। তার শেষ উপন্যাসটি ছিল ‘The First Man’. মৃত্যুর সময় এটি অসম্পূর্ণ ছিল। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। প্রকাশ হওয়ামাত্রই এই উপন্যাসটি সর্বাধিক বিক্রি হয়। বইটি ব্যাপকভাবে যেমন সমালোচিত হয়েছে, তেমনই হয়েছে প্রশংসিত। ৩০টিরও অধিক দেশে বইটি অনূদিত হয় এবং প্রকাশিত হয়। কাম্যুর বেশির ভাগ বই পেঙ্গুইন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

আলবার্ট কাম্যুর ওপর পরিচিতিটি লেখা প্রয়োজন ছিল। এ থেকে নতুন প্রজন্মের পাঠকরা কাম্যুর লেখা বইগুলো খুঁজে দেখবেন এবং পড়ার চেষ্টা করবেন। আজ আমরা আলবার্ট কাম্যুর বিখ্যাত লেখা ‘The Plague’ থেকে কিছু প্রসঙ্গ উত্থাপন করে কোভিড-১৯ মহামারির রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া বোঝনোর চেষ্টা করব। মানব প্রজাতির ঊষালগ্ন থেকে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মরণঘাতী মহামারি হয়েছে।

এ মহামারিগুলো সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে। আমরা এখনো জানি না কোভিড-১৯ মহামারি পৃথিবীতে কত বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে। হয়তো এক সুপ্রভাতে শুনতে পাব কোভিড-১৯ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। অথবা সর্দি-কাশির মতো মৌসুমি রোগে পরিণত হয়েছে। এ মৌসুমি রোগটির তেজ হয়তো একটু বেশি হবে, যে কারণে অনেকে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো কোভিড-১৯-এর টিকা ভবিষ্যতেও অনেক মানুষ নেবে।

কোভিড-১৯ বিদ্যমান মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর অবশ্য এমন কোনো ক্ষমতা নেই যে এটি ভবন, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট আণবিক বোমার মতো ধ্বংসসাধন করতে পারে। তবে যে মানুষ সভ্যতা গড়ে, দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিসগুলো তৈরি করে, মানুষের জীবনকে আরামপ্রদ করতে পারে সেই মানুষকে অজ্ঞাত আততায়ীর মতো হত্যা করছে কোভিড-১৯। বর্তমান বিশ্বসভ্যতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বায়ন ও কানেকটিভিটি।

বিশ্বায়ন ও কানেকটিভিটি নব্বইয়ের দশক থেকে জোরদার করেছে বাজার উদারিকরণ, কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের বিমান থেকে শুরু করে বহুমাত্রিক যোগাযোগ। একটি দেশে যখন কোভিড-১৯ মহামারি আকারে ডানা বিস্তার করতে শুরু করল, তখন অনেকেই এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারেনি। এমনকি বিজ্ঞানীরাও বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেননি। এ রকম কোভিডে আক্রান্ত দেশ থেকে শত শত যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলে গেছে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে।

কোভিডে আক্রান্ত যাত্রীরা রোগটি ছড়িয়ে দিয়েছে দুনিয়ার দেশে দেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ভয়াবহ পরিস্থিতি লক্ষ করে ঘোষণা করল গ্লোবাল প্যান্ডেমিক। অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর সঙ্গে আরেকটি বৈশিষ্ট্যের কথাও বলতে পারত। সেটি হচ্ছে বিশ্বায়নের নিরাকরণ। বিশ্বায়ন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ওমর খৈয়ামের ভাষায় বলব, আসমানি সেই রাজদাবাড়ে চালায় যেমন চলছি তাই-মনে হচ্ছে সেই রাজদাবাড়ে মানবজাতির ওপর অসন্তুষ্ট। কেন জানি না। কোভিড-১৯ এর দাপটে বিমানের শত শত ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া একটি বড় রকমের ধাক্কা খেল।

এখনো বহু দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিমান যোগাযোগ এবং যাত্রীবাহী জাহাজ যোগাযোগ বন্ধ। অবশ্য এসব ঘটার আগেই বিশ্বায়নবিরোধী তৎপরতা শুরু করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি চীনের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করতে গিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য প্রবাহকে স্তব্ধ করে দিতে চাইলেন। We shall make America great again স্লোগানের অন্তরালে ছিল অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ এবং দর্শনটি ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদের দর্শন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট সুপ্রিমেসির মতো জাতিবিদ্বেষী ধ্যানধারণার ফলেই পুলিশ কর্তৃক ফ্লোয়েড হত্যার মতো বর্ণবিদ্বেষী ঘটনা ঘটতে পেরেছে।

১৯৯২ সালে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর জাপানি বংশোদ্ভূত বিখ্যাত মার্কিন অধ্যাপক ঘোষণা করেছিলেন, ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। পুঁজিবাদ এবং গণতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে মানবজাতি এক পরিবর্তনহীন সমাজব্যবস্থার মধ্যে আগামী অনন্তকাল বসবাস করবে। তিনি এ থিমটির ওপর নির্ভর করে যে গ্রন্থটি রচনা করলেন তার নাম হলো The End of History And the Last Man. এ অধ্যাপক মহাশয়ের নামটি বলা হয়নি। তিনি হলেন ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা। ফুকুইয়ামার ভবিষ্যদ্বাণী নিরর্থক প্রমাণিত হয়েছে।

ইউরোপের অনেক দেশ, যেগুলো উদার নীতিবাদ এবং সামাজিক গণতন্ত্রের জন্য বিখ্যাত, সেসব দেশে আজ উত্থান ঘটেছে অতি দক্ষিণপন্থি একধরনের রাজনীতি যা পরিচিতি পেয়েছে লোকোরঞ্জনবাদ হিসাবে। পৃথিবী এখন আবার উত্তাল হয়ে উঠেছে। প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরকে একযোগে কারা নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নিয়ে এক ধরনের ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ‘কোয়াড’ নামে চার জাতির একটি ঘোঁট দুনিয়াকে অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। লোকোরঞ্জনবাদীদের হাতে গণতান্ত্রিক ইউরোপের দেশগুলো যদি ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকেব না।

অধ্যাপক ফুকুইয়ামার ভবিষ্যদ্বাণী ভেস্তে যেতে চলেছে। এসবের সঙ্গে কোভিড-১৯ যুক্ত হয়ে জাত্যাভিমান ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদকে নব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। তাহলে গণতন্ত্রেরই বা রইল কী? এবং নিস্তরঙ্গ পুঁজিবাদেরই বা ভবিষ্যৎ কী? এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশদূষণ মানুষের রোগ-শোক এবং ভরণপোষণ প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন আনবে, সেই পরিবর্তনের ভার মানবজাতি আদৌ বহন করতে পারবে কি?

এবার আলবার্ট কাম্যুর ‘The Plague’ গ্রন্থটির প্রসঙ্গে আসা যাক। বইটির দার্শনিক অন্তঃসলিলা সম্পর্কে এর কভারে লেখা হয়েছে জনশূন্য শহর, যে শহর ধূলিধূসরিত হয়ে সাদা হয়ে গেছে, সমুদ্রের গন্ধে পরিপৃক্ত হয়ে গেছে এবং বাতাসের চিৎকারে উচ্চ ধ্বনিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। ওরানের শহরের লোকেরা মরণঘাতী প্লেগে আক্রান্ত। এ প্লেগ ছড়িয়েছে ইঁদুর থেকে এবং এরা এখন মানুষজনকে অতি দ্রুত ভয়ংকর মৃত্যুর শিকারে পরিণত করেছে।

যাদের ঘামঝরা গরমের মধ্যে কোয়ারেন্টিনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি এ মরণঘাতী রোগটি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। কেউ কেউ নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করছে। কেউ কেউ দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং প্রতিশোধ নিচ্ছে। এবং বীরত্বহীনসুলভ ড. রিউর মতো মুষ্টিমেয় কয়েকজন এ ভীতিকে না বলার জন্য দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

বইটি লেখা হয়েছিল ফ্রান্সে নাজি দখলদারিত্বের অবসানের পর। ‘The Plague’ গ্রন্থটির রয়েছে শক্তিশালী বাঁধুনি। এটা দৃশ্যত অনিয়ন্ত্রযোগ্য অনিষ্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আন্ত্রিক বর্ণনা। ‘The Plague’ গ্রন্থের তৃতীয অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্লেগের বন্দিরা একজোটে লড়াই করেছে যতটা তারা করতে পারত। আমরা যেমন দেখেছি র‌্যাম্বার্টের মতো মুষ্টিমেয় কয়েকজন কল্পনা করেছিল তারা স্বাধীন মানুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এখনো তাদের বাছাই করার সুযোগ আছে। কিন্তু সে মুহূর্তে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বাস্তবতা এমন ছিল যে প্লেগ সবকিছুকে ঢেকে ফেলেছে। ব্যক্তির নিয়তি বলতে যা বোঝায় তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। শুধু ছিল একটি যৌথ ইতিহাস। যার নাম প্লেগ, এ অনুভূতিতে সবার অংশিদারত্ব ছিল। এসব অনুভূতিতে সবচেয়ে বড়টি ছিল বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবাস।

এর জন্ম হয়েছিল ভয় ও বিদ্রোহ থেকে। এ কারণে বর্ণনাকারী সঠিক মনে করে যে, এ তাপ ও অসুস্থতার উচ্চ বিন্দুতে সাধারণ অবস্থা বর্ণনা করতে গেলে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলতে হয় আমাদের নাগরিক ভাইদের মধ্যে যারা এখনো জীবিত আছে তাদের সহিংসতার কথা, মৃতদের কবর দেওয়ার কথা এবং সঙ্গীহারা প্রেমিকদের কষ্টের কথা। সে বছর মাঝামাঝি সময়ে বাতাস উঠল এবং কয়েক দিন ধরে প্লেগে আক্রান্ত শহরগুলোর ওপর প্রবাহিত হলো। ওরানবাসীরা বিশেষ করে এ বাতাসকে ভয় করত। কারণ এ বাতাস কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতো না। যে উপত্যকায় শহরটি অবস্থিত সেখানে বাতাস রাস্তা থেকে সবকিছু পরিপূর্ণ শক্তিতে উড়িয়ে নিয়ে যায়। গত কয়েক মাসের মধ্যে এক ফোঁটা পানিও শহরটিতে প্রাণ সঞ্চার করেনি।

শহরটি এক ধরনের ধূসর রঙে আবৃত হয়ে গিয়েছিল এবং বাতাস প্রবাহিত হয়ে এ আবরণ চেঁছে ফেলেছিল। এভাবে ধুলো ও কাগজের মেঘ সৃষ্টি হয়। এ মেঘ নগণ্যসংখ্যক পথচারীর পা ঘিরে ফেলত। তারা রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলার চেষ্টা করেছে, সামনের দিকে ঝুঁকে থেকেছে এবং রুমাল কিংবা হাত দিয়ে মুখ ঢেকেছে। সন্ধ্যায় যেসব মানুষ আড্ডা দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ় করার চেষ্টা করত, আজকাল একটি আড্ডাই হয়তো শেষ আড্ডা, যেখানে অল্পসংখ্যক মানুষ মিলিত হতো এবং তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে যেত অথবা কোনো ক্যাফেতে প্রবেশ করত।

এভাবে কিছুদিন গোধূলিবেলা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় দ্রুত ঘনিয়ে আসত। রাস্তাগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ত এবং শুধু বাতাস তাদের নিরবচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে ধরত। বাতাসের ঝাঁকুনিতে সমুদ্রের গুল্মলতা এবং লবণ বাতাসে ঘুরে বেড়াত, যেমনটি সমুদ্রে সব সময় দৃশ্যমান নয়। এ জনশূন্য শহর, যে শহর ধূলিধূসরিত হয়ে সাদা হয়ে গেছে, সমুদ্রের গন্ধে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, বাতাসের চিৎকার উচ্চ হয়ে গেছে সেটি এমন এক সময় গুমড়ে উঠবে যা দেখে মনে হবে এটি একটি অভিশপ্ত দ্বীপ।

এখন পর্যন্ত প্লেগের ফলে বাইরের জেলাগুলোতে অনেক বেশি লোকের মৃত্যু ঘটেছে। কারণ সেই শহরগুলো জনাকীর্ণ এবং কেন্দ্রীয় শহরের তুলনায় কম সম্পদশালী। কিন্তু হঠাৎ করে দেখা গেল এই বিপরীতধর্মী শহরগুলো একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছে। কারণ মৃত্যু এখন ধনী ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও পৌঁছে গেছে।

বাসিন্দারা অভিযোগ করেছে বাতাস সংক্রমণকে বড় লোকদের বাড়িতেও পৌঁছে দিচ্ছে। যতকিছুই ঘটুক না কেন শহরের কেন্দ্র বুঝতে পেরেছে এবার তাদের পালা। রাতে দ্রুতগতিতে অ্যাম্বুলেন্সগুলো ছুটছে। অ্যাম্বুলেন্সের জানালার নিচ দিয়ে প্লেগ যেন অবিরত ছুটছে।

প্লেগের মতো মহামারি হলে কী হয়, সেটা জানা গেল আলবার্ট কাম্যুর বর্ণনা থেকে। ঢাকার গরিব লোকেরা বলতে চায় কোভিড-১৯ ধনীদের রোগ। এক ডাক্তার টিভিতে বললেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কোভিড-১৯ নেই বললেই চলে। তারা তো গাদাগাদি করে থাকে। কিন্তু সারা দিন রোদে সময় কাটায় বলে তাদের দেহে প্রচুর ভিটামিন ডি তৈরি হয়। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। একই কথা ঢাকা শহরের গরিবদের বেলায় প্রযোজ্য। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাই আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। কারণ তাদের দেহে রোদ স্পর্শ করে না। ঘরে থাকলে এয়ারকন্ডিশনের শীতলতা এবং পথে থাকলে গাড়ির এয়ারকন্ডিশনার।

প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা ভয়াবহ আজব রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। অন্যদিকে অ-সুচিন্তিত লকডাউনের ফলে গরিব মানুষগুলো বেকার হয়ে যাচ্ছে। তাদের খাওয়াবে কে? সরকারের প্রণোদনার টাকা এর জন্য যথেষ্ট নয়। এনবিআরও কর আদায় করতে পারছে না। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট অনিবার্য। দেখা যাচ্ছে বিত্তবানরা মরছে কোভিড-১৯-এ, আর গরিবরা মরার উপক্রম হয়েছে কাজ না পেয়ে। দুটিই তো মৃত্যু। দুটিই ভাই থেকে ভাইকে, ভাই থেকে বোনকে, বোন থেকে ভাইকে, স্ত্রী থেকে স্বামীকে, স্বামী থেকে স্ত্রীকে এবং পিতা থেকে সন্তানকে কেড়ে নিচ্ছে। হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই। রোগী ভর্তি করার বেড নেই। এসব দেখে মনে প্রশ্ন জাগছে, মরলে কবরে শয্যা পাওয়া যাবে তো?

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

কবরে শয্যা মিলবে তো?

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২২ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রখ্যাত লেখক আলবার্ট কাম্যুর জন্ম হয়েছিল আলজেরিয়ায় ১৯১৩ সালে। তিনি আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে লেখাপড়া করেন এবং পরে হলেন সাংবাদিক। এছাড়া তিনি তরুণদের নিয়ে নাটকের একটি দল সৃষ্টি করেছিলেন। তার প্রথমদিককার প্রবন্ধগুলো ‘The Wrong side and the Right side’ এবং ‘Nuptials’ গ্রন্থ দুটিতে সংকলিত হয়েছে। তরুণ কাম্যু প্যারিসে গেলেন, যেখানে তিনি Paris Soir নামে একটি সংবাদপত্রে কাজ করেছেন এবং তারপর আবার আলজিয়ার্সে ফিরে আসেন।

তার লেখা নাটক ক্যালিগুলা ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয়। তার লেখা প্রথম দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘The Outsider’ এবং দার্শনিক রচনার সংকলন ‘The ¸th of Sisyphus’. গ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হলো তার প্যারিসে ফিরে যাওয়ার পর। ১৯৪০ সালে জার্মানরা ফ্রান্স দখল করে নেয়। কাম্যু সেখানে প্রতিরোধ সংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রদান করেন। তার সম্পাদনা এবং লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল গোপন সংবাদপত্র Combat. এ পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য তিনি সহায়তা দিয়েছিলেন।

তিনি যুদ্ধের পর লেখালেখিতে নিয়োজিত হন এবং ‘The Plague’ (১৯৪৭), ‘The Just’ (১৯৪৯) এবং ‘The Fall’ (১৯৫৬) রচনা করেন। এসব গ্রন্থ তাকে আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি এনে দেয়। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে কাম্যু নতুন করে নাটকের কাজে জড়িয়ে পড়েন এবং বিখ্যাত ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনারের ‘Requiem for a Nun’ এবং দস্তয়ভস্কির ‘The Possessed’-এর নাট্যরূপ রচনা করেন।

তাকে ১৯৫৭ সালে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৬০-এ এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু ঘটে। তার শেষ উপন্যাসটি ছিল ‘The First Man’. মৃত্যুর সময় এটি অসম্পূর্ণ ছিল। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। প্রকাশ হওয়ামাত্রই এই উপন্যাসটি সর্বাধিক বিক্রি হয়। বইটি ব্যাপকভাবে যেমন সমালোচিত হয়েছে, তেমনই হয়েছে প্রশংসিত। ৩০টিরও অধিক দেশে বইটি অনূদিত হয় এবং প্রকাশিত হয়। কাম্যুর বেশির ভাগ বই পেঙ্গুইন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

আলবার্ট কাম্যুর ওপর পরিচিতিটি লেখা প্রয়োজন ছিল। এ থেকে নতুন প্রজন্মের পাঠকরা কাম্যুর লেখা বইগুলো খুঁজে দেখবেন এবং পড়ার চেষ্টা করবেন। আজ আমরা আলবার্ট কাম্যুর বিখ্যাত লেখা ‘The Plague’ থেকে কিছু প্রসঙ্গ উত্থাপন করে কোভিড-১৯ মহামারির রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া বোঝনোর চেষ্টা করব। মানব প্রজাতির ঊষালগ্ন থেকে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মরণঘাতী মহামারি হয়েছে।

এ মহামারিগুলো সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে। আমরা এখনো জানি না কোভিড-১৯ মহামারি পৃথিবীতে কত বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে। হয়তো এক সুপ্রভাতে শুনতে পাব কোভিড-১৯ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। অথবা সর্দি-কাশির মতো মৌসুমি রোগে পরিণত হয়েছে। এ মৌসুমি রোগটির তেজ হয়তো একটু বেশি হবে, যে কারণে অনেকে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো কোভিড-১৯-এর টিকা ভবিষ্যতেও অনেক মানুষ নেবে।

কোভিড-১৯ বিদ্যমান মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর অবশ্য এমন কোনো ক্ষমতা নেই যে এটি ভবন, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট আণবিক বোমার মতো ধ্বংসসাধন করতে পারে। তবে যে মানুষ সভ্যতা গড়ে, দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিসগুলো তৈরি করে, মানুষের জীবনকে আরামপ্রদ করতে পারে সেই মানুষকে অজ্ঞাত আততায়ীর মতো হত্যা করছে কোভিড-১৯। বর্তমান বিশ্বসভ্যতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বায়ন ও কানেকটিভিটি।

বিশ্বায়ন ও কানেকটিভিটি নব্বইয়ের দশক থেকে জোরদার করেছে বাজার উদারিকরণ, কমিউনিকেশন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের বিমান থেকে শুরু করে বহুমাত্রিক যোগাযোগ। একটি দেশে যখন কোভিড-১৯ মহামারি আকারে ডানা বিস্তার করতে শুরু করল, তখন অনেকেই এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারেনি। এমনকি বিজ্ঞানীরাও বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেননি। এ রকম কোভিডে আক্রান্ত দেশ থেকে শত শত যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলে গেছে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে।

কোভিডে আক্রান্ত যাত্রীরা রোগটি ছড়িয়ে দিয়েছে দুনিয়ার দেশে দেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ভয়াবহ পরিস্থিতি লক্ষ করে ঘোষণা করল গ্লোবাল প্যান্ডেমিক। অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর সঙ্গে আরেকটি বৈশিষ্ট্যের কথাও বলতে পারত। সেটি হচ্ছে বিশ্বায়নের নিরাকরণ। বিশ্বায়ন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ওমর খৈয়ামের ভাষায় বলব, আসমানি সেই রাজদাবাড়ে চালায় যেমন চলছি তাই-মনে হচ্ছে সেই রাজদাবাড়ে মানবজাতির ওপর অসন্তুষ্ট। কেন জানি না। কোভিড-১৯ এর দাপটে বিমানের শত শত ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া একটি বড় রকমের ধাক্কা খেল।

এখনো বহু দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিমান যোগাযোগ এবং যাত্রীবাহী জাহাজ যোগাযোগ বন্ধ। অবশ্য এসব ঘটার আগেই বিশ্বায়নবিরোধী তৎপরতা শুরু করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি চীনের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করতে গিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য প্রবাহকে স্তব্ধ করে দিতে চাইলেন। We shall make America great again স্লোগানের অন্তরালে ছিল অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ এবং দর্শনটি ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদের দর্শন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট সুপ্রিমেসির মতো জাতিবিদ্বেষী ধ্যানধারণার ফলেই পুলিশ কর্তৃক ফ্লোয়েড হত্যার মতো বর্ণবিদ্বেষী ঘটনা ঘটতে পেরেছে।

১৯৯২ সালে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর জাপানি বংশোদ্ভূত বিখ্যাত মার্কিন অধ্যাপক ঘোষণা করেছিলেন, ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। পুঁজিবাদ এবং গণতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে মানবজাতি এক পরিবর্তনহীন সমাজব্যবস্থার মধ্যে আগামী অনন্তকাল বসবাস করবে। তিনি এ থিমটির ওপর নির্ভর করে যে গ্রন্থটি রচনা করলেন তার নাম হলো The End of History And the Last Man. এ অধ্যাপক মহাশয়ের নামটি বলা হয়নি। তিনি হলেন ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা। ফুকুইয়ামার ভবিষ্যদ্বাণী নিরর্থক প্রমাণিত হয়েছে।

ইউরোপের অনেক দেশ, যেগুলো উদার নীতিবাদ এবং সামাজিক গণতন্ত্রের জন্য বিখ্যাত, সেসব দেশে আজ উত্থান ঘটেছে অতি দক্ষিণপন্থি একধরনের রাজনীতি যা পরিচিতি পেয়েছে লোকোরঞ্জনবাদ হিসাবে। পৃথিবী এখন আবার উত্তাল হয়ে উঠেছে। প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরকে একযোগে কারা নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নিয়ে এক ধরনের ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ‘কোয়াড’ নামে চার জাতির একটি ঘোঁট দুনিয়াকে অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। লোকোরঞ্জনবাদীদের হাতে গণতান্ত্রিক ইউরোপের দেশগুলো যদি ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকেব না।

অধ্যাপক ফুকুইয়ামার ভবিষ্যদ্বাণী ভেস্তে যেতে চলেছে। এসবের সঙ্গে কোভিড-১৯ যুক্ত হয়ে জাত্যাভিমান ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদকে নব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। তাহলে গণতন্ত্রেরই বা রইল কী? এবং নিস্তরঙ্গ পুঁজিবাদেরই বা ভবিষ্যৎ কী? এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশদূষণ মানুষের রোগ-শোক এবং ভরণপোষণ প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন আনবে, সেই পরিবর্তনের ভার মানবজাতি আদৌ বহন করতে পারবে কি?

এবার আলবার্ট কাম্যুর ‘The Plague’ গ্রন্থটির প্রসঙ্গে আসা যাক। বইটির দার্শনিক অন্তঃসলিলা সম্পর্কে এর কভারে লেখা হয়েছে জনশূন্য শহর, যে শহর ধূলিধূসরিত হয়ে সাদা হয়ে গেছে, সমুদ্রের গন্ধে পরিপৃক্ত হয়ে গেছে এবং বাতাসের চিৎকারে উচ্চ ধ্বনিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। ওরানের শহরের লোকেরা মরণঘাতী প্লেগে আক্রান্ত। এ প্লেগ ছড়িয়েছে ইঁদুর থেকে এবং এরা এখন মানুষজনকে অতি দ্রুত ভয়ংকর মৃত্যুর শিকারে পরিণত করেছে।

যাদের ঘামঝরা গরমের মধ্যে কোয়ারেন্টিনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি এ মরণঘাতী রোগটি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। কেউ কেউ নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করছে। কেউ কেউ দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং প্রতিশোধ নিচ্ছে। এবং বীরত্বহীনসুলভ ড. রিউর মতো মুষ্টিমেয় কয়েকজন এ ভীতিকে না বলার জন্য দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

বইটি লেখা হয়েছিল ফ্রান্সে নাজি দখলদারিত্বের অবসানের পর। ‘The Plague’ গ্রন্থটির রয়েছে শক্তিশালী বাঁধুনি। এটা দৃশ্যত অনিয়ন্ত্রযোগ্য অনিষ্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আন্ত্রিক বর্ণনা। ‘The Plague’ গ্রন্থের তৃতীয অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্লেগের বন্দিরা একজোটে লড়াই করেছে যতটা তারা করতে পারত। আমরা যেমন দেখেছি র‌্যাম্বার্টের মতো মুষ্টিমেয় কয়েকজন কল্পনা করেছিল তারা স্বাধীন মানুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এখনো তাদের বাছাই করার সুযোগ আছে। কিন্তু সে মুহূর্তে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বাস্তবতা এমন ছিল যে প্লেগ সবকিছুকে ঢেকে ফেলেছে। ব্যক্তির নিয়তি বলতে যা বোঝায় তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। শুধু ছিল একটি যৌথ ইতিহাস। যার নাম প্লেগ, এ অনুভূতিতে সবার অংশিদারত্ব ছিল। এসব অনুভূতিতে সবচেয়ে বড়টি ছিল বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবাস।

এর জন্ম হয়েছিল ভয় ও বিদ্রোহ থেকে। এ কারণে বর্ণনাকারী সঠিক মনে করে যে, এ তাপ ও অসুস্থতার উচ্চ বিন্দুতে সাধারণ অবস্থা বর্ণনা করতে গেলে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলতে হয় আমাদের নাগরিক ভাইদের মধ্যে যারা এখনো জীবিত আছে তাদের সহিংসতার কথা, মৃতদের কবর দেওয়ার কথা এবং সঙ্গীহারা প্রেমিকদের কষ্টের কথা। সে বছর মাঝামাঝি সময়ে বাতাস উঠল এবং কয়েক দিন ধরে প্লেগে আক্রান্ত শহরগুলোর ওপর প্রবাহিত হলো। ওরানবাসীরা বিশেষ করে এ বাতাসকে ভয় করত। কারণ এ বাতাস কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতো না। যে উপত্যকায় শহরটি অবস্থিত সেখানে বাতাস রাস্তা থেকে সবকিছু পরিপূর্ণ শক্তিতে উড়িয়ে নিয়ে যায়। গত কয়েক মাসের মধ্যে এক ফোঁটা পানিও শহরটিতে প্রাণ সঞ্চার করেনি।

শহরটি এক ধরনের ধূসর রঙে আবৃত হয়ে গিয়েছিল এবং বাতাস প্রবাহিত হয়ে এ আবরণ চেঁছে ফেলেছিল। এভাবে ধুলো ও কাগজের মেঘ সৃষ্টি হয়। এ মেঘ নগণ্যসংখ্যক পথচারীর পা ঘিরে ফেলত। তারা রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলার চেষ্টা করেছে, সামনের দিকে ঝুঁকে থেকেছে এবং রুমাল কিংবা হাত দিয়ে মুখ ঢেকেছে। সন্ধ্যায় যেসব মানুষ আড্ডা দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ় করার চেষ্টা করত, আজকাল একটি আড্ডাই হয়তো শেষ আড্ডা, যেখানে অল্পসংখ্যক মানুষ মিলিত হতো এবং তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে যেত অথবা কোনো ক্যাফেতে প্রবেশ করত।

এভাবে কিছুদিন গোধূলিবেলা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় দ্রুত ঘনিয়ে আসত। রাস্তাগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ত এবং শুধু বাতাস তাদের নিরবচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে ধরত। বাতাসের ঝাঁকুনিতে সমুদ্রের গুল্মলতা এবং লবণ বাতাসে ঘুরে বেড়াত, যেমনটি সমুদ্রে সব সময় দৃশ্যমান নয়। এ জনশূন্য শহর, যে শহর ধূলিধূসরিত হয়ে সাদা হয়ে গেছে, সমুদ্রের গন্ধে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, বাতাসের চিৎকার উচ্চ হয়ে গেছে সেটি এমন এক সময় গুমড়ে উঠবে যা দেখে মনে হবে এটি একটি অভিশপ্ত দ্বীপ।

এখন পর্যন্ত প্লেগের ফলে বাইরের জেলাগুলোতে অনেক বেশি লোকের মৃত্যু ঘটেছে। কারণ সেই শহরগুলো জনাকীর্ণ এবং কেন্দ্রীয় শহরের তুলনায় কম সম্পদশালী। কিন্তু হঠাৎ করে দেখা গেল এই বিপরীতধর্মী শহরগুলো একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছে। কারণ মৃত্যু এখন ধনী ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও পৌঁছে গেছে।

বাসিন্দারা অভিযোগ করেছে বাতাস সংক্রমণকে বড় লোকদের বাড়িতেও পৌঁছে দিচ্ছে। যতকিছুই ঘটুক না কেন শহরের কেন্দ্র বুঝতে পেরেছে এবার তাদের পালা। রাতে দ্রুতগতিতে অ্যাম্বুলেন্সগুলো ছুটছে। অ্যাম্বুলেন্সের জানালার নিচ দিয়ে প্লেগ যেন অবিরত ছুটছে।

প্লেগের মতো মহামারি হলে কী হয়, সেটা জানা গেল আলবার্ট কাম্যুর বর্ণনা থেকে। ঢাকার গরিব লোকেরা বলতে চায় কোভিড-১৯ ধনীদের রোগ। এক ডাক্তার টিভিতে বললেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কোভিড-১৯ নেই বললেই চলে। তারা তো গাদাগাদি করে থাকে। কিন্তু সারা দিন রোদে সময় কাটায় বলে তাদের দেহে প্রচুর ভিটামিন ডি তৈরি হয়। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। একই কথা ঢাকা শহরের গরিবদের বেলায় প্রযোজ্য। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাই আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। কারণ তাদের দেহে রোদ স্পর্শ করে না। ঘরে থাকলে এয়ারকন্ডিশনের শীতলতা এবং পথে থাকলে গাড়ির এয়ারকন্ডিশনার।

প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা ভয়াবহ আজব রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। অন্যদিকে অ-সুচিন্তিত লকডাউনের ফলে গরিব মানুষগুলো বেকার হয়ে যাচ্ছে। তাদের খাওয়াবে কে? সরকারের প্রণোদনার টাকা এর জন্য যথেষ্ট নয়। এনবিআরও কর আদায় করতে পারছে না। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট অনিবার্য। দেখা যাচ্ছে বিত্তবানরা মরছে কোভিড-১৯-এ, আর গরিবরা মরার উপক্রম হয়েছে কাজ না পেয়ে। দুটিই তো মৃত্যু। দুটিই ভাই থেকে ভাইকে, ভাই থেকে বোনকে, বোন থেকে ভাইকে, স্ত্রী থেকে স্বামীকে, স্বামী থেকে স্ত্রীকে এবং পিতা থেকে সন্তানকে কেড়ে নিচ্ছে। হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই। রোগী ভর্তি করার বেড নেই। এসব দেখে মনে প্রশ্ন জাগছে, মরলে কবরে শয্যা পাওয়া যাবে তো?

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন