শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন অর্থহীন
আবু হেনা রাজ্জাকী
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতিহাসের এক নির্মম বাস্তবতা হলো, অনেক জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানুষের শ্রম, বঞ্চনা ও দুর্ভোগের ওপর। যে সমৃদ্ধি একসময় জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ইতিহাসের নির্মোহ বিচারে তার অন্তর্নিহিত অন্যায় ও অমানবিকতা প্রকাশিত হয়েছে। তখন রাষ্ট্রকে অতীতের অন্যায়ের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করতে হয়েছে। কিন্তু যে অন্যায় সংঘটিত হওয়ার সময় প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল, শতাব্দী পরে তার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে কি সেই ক্ষতি পূরণ করা যায়? ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা অতীতের ভুল স্বীকারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বর্তমানের অন্যায় চিহ্নিত করে সময় থাকতে তার প্রতিকার নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ব্রিটেনের দাস ব্যবসার নির্মম ইতিহাস এবং তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তিনি দাস প্রথাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত টমাস ক্লার্কসনের মানবিক আহ্বান স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ক্লার্কসনের বক্তব্যের মর্মার্থ ছিল, দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ দুঃখের যে পেয়ালা পান করছে, সেই পেয়ালা তাদের হাতে তুলে দিয়েছি আমরাই। এটি শুধু সহানুভূতির প্রকাশ ছিল না; বরং অন্যায়ের সুবিধাভোগীদের নিজেদের নৈতিক দায় স্বীকার করার এক সাহসী আহ্বান।
ক্লার্কসনের আহ্বানে ম্যানচেস্টারের হাজার হাজার মানুষ দাস ব্যবসা বিলোপের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। অথচ ইতিহাসের পরিহাস হলো, সেই ম্যানচেস্টারের তুলাশিল্পের সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছিল বহুলাংশে দাসশ্রমে উৎপাদিত তুলার ওপর নির্ভর করে। ব্রিটেন যেমন দাস ব্যবসা বিলোপে নেতৃত্ব দিয়েছে, তেমনি একসময় মানুষ কেনাবেচার নিষ্ঠুর ব্যবসা থেকেও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে। আবার ১৮৬২ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ চলাকালে ম্যানচেস্টারের তুলাশ্রমিকরা নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের ঝুঁকি সত্ত্বেও দাসপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের নৈতিক সাহসের প্রশংসা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। ইতিহাসের এ ঘটনা প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবিক ন্যায়বিচারকে স্থান দেওয়াই প্রকৃত সভ্যতার পরিচয়।
ব্রিটেনের এ ইতিহাস বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। লাখ লাখ শ্রমিক, বিশেষত নারী শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে। তাদের শ্রমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, অথচ এই সমৃদ্ধির প্রধান কারিগরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। যাদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের নিজেদের জীবন যদি অভাব ও অনিশ্চয়তায় কাটে, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা ন্যায়সংগত?
একজন শ্রমিক প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেও যদি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে না পারেন, তাহলে তার মজুরিকে শুধু আইনগত বৈধতার ভিত্তিতে ন্যায়সংগত বলা যায় না। ন্যূনতম মজুরির উদ্দেশ্য শুধু শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখা নয়; বরং তার মানবিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা। শ্রমিককে উৎপাদনের উপকরণ নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের সমৃদ্ধির অপরিহার্য অংশীদার হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।
এখানে শিল্পমালিকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে তারা যে মুনাফা অর্জন করেন, তার একটি যুক্তিসংগত অংশ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগ করা উচিত। শুধু মজুরি ও উৎসবভাতা প্রদানের মধ্যে শ্রমিককল্যাণ সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন, চিকিৎসাকেন্দ্র, স্বাস্থ্যবিমা, সন্তানদের জন্য মানসম্মত বিদ্যালয়, বৃত্তি এবং উচ্চশিক্ষায় সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব উদ্যোগকে অনুগ্রহ নয়, শ্রমিকের অবদানের ন্যায্য স্বীকৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে মালিকদের সম্মিলিত উদ্যোগে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়নকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের সন্তানদের অগ্রাধিকারভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষায়িত কর্মী হিসাবে গড়ে উঠবে। একইসঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল পাবে। এতে শ্রমিকের পরিবার যেমন উপকৃত হবে, তেমনি শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়বে।
এ ধরনের দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক কল্যাণমূলক উদ্যোগ শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের ভিত্তি পরিবর্তন করতে পারে। শ্রমিক যখন উপলব্ধি করবেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক শুধু তার শ্রম থেকে মুনাফা অর্জন করছেন না, বরং তার পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণেও আন্তরিকভাবে অংশ নিচ্ছেন, তখন মালিকের প্রতি তার আস্থা, শ্রদ্ধা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে। প্রতিষ্ঠানকে তিনি শুধু জীবিকার উৎস নয়, নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করবেন। এ পারস্পরিক আস্থা শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে। তবে কল্যাণমূলক সুবিধা কখনো ন্যায্য মজুরি ও আইনগত অধিকারের বিকল্প হতে পারে না।
অন্যদিকে শিল্পমালিকদের বাস্তব সমস্যাও উপেক্ষা করা যায় না। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, দুর্বল অবকাঠামো, দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শিল্প পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে। তাই সব শিল্পমালিককে শোষক হিসাবে চিহ্নিত করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি ব্যবসায়িক সংকটের অজুহাতে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিককল্যাণে পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে কোনো পক্ষের প্রতিনিধি নয়, নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তাদাতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন এবং ২০ অনুচ্ছেদে কর্মের মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য না হলেও রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নির্দেশনা।
সরকারকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিল্পমালিকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিকের যৌক্তিক দাবি দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি আন্দোলনের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগও সমর্থনযোগ্য নয়। উভয় ক্ষেত্রেই আইন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
ব্রিটেনের দাস ব্যবসার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের বর্তমান শ্রম সম্পর্ককে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আড়ালে মানবিক বঞ্চনা উপেক্ষা করার বিপদ সম্পর্কে ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। আজকের অন্যায়ের প্রতিকার না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনুশোচনার অপেক্ষায় থাকা কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
পরিশেষে মনে রাখতে হবে, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রপ্তানি আয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কিংবা মালিকদের সম্পদের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি হলো, শ্রমজীবী মানুষ কতটা মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন এবং তাদের সন্তানরা কতটা উন্নত ভবিষ্যতের সুযোগ পাচ্ছেন। যে সমৃদ্ধির সুফল শ্রমিকের ঘরে পৌঁছায় না, সেই সমৃদ্ধি অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান হতে পারে, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচারের সাফল্য হতে পারে না। আজকের অবহেলা যেন আগামী দিনের জাতীয় অনুশোচনার কারণ না হয়-সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র, শিল্পমালিক ও সমাজকে এখনই গ্রহণ করতে হবে।
আবু হেনা রাজ্জাকী : সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
