ঢাকা : এক নগরের দীর্ঘশ্বাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাত গভীর হলে পৃথিবীর অনেক শহর ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু ঢাকা ঘুমায় না। তার চোখের নিচে জমে থাকা কালি নিয়ে, মাথার ওপর কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার ভার নিয়ে, সে জেগে থাকে। রাত দুইটায়ও কোনো না কোনো হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজে, কোনো না কোনো বাস টার্মিনালে দূরগ্রাম থেকে মানুষ নেমে আসে, কোনো না কোনো তরুণ চাকরির স্বপ্ন নিয়ে ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঢাকা যেন এক ক্লান্ত জননী, যার কোলে আশ্রয় নিতে চায় সমগ্র দেশ। কিন্তু সব আশ্রয়ও একসময় ভারে নুয়ে পড়ে। আজকের ঢাকা ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের মানচিত্র যদি এক জীবন্ত দেহ হয়, তবে ঢাকাকে নিঃসন্দেহে তার হৃৎপিণ্ড বলা যায়। অথচ সমস্যা হলো, ধীরে ধীরে হৃৎপিণ্ডের ভেতরেই শরীরের সব অঙ্গ এসে জড়ো হয়েছে। চোখও এখানে, ফুসফুসও এখানে, হাত-পাও এখানে, এমনকি রক্তপ্রবাহও যেন এখানে এসে আটকে গেছে। ফলে দেশ যত বেড়েছে, ঢাকা তার চেয়েও দ্রুত বেড়েছে।
একসময় গ্রামের কোনো মেধাবী ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাইলে ঢাকায় এসেছে। তারপর চাকরির জন্য থেকেছে। বিয়ে করেছে। সন্তান হয়েছে। সেই সন্তানও আবার ঢাকার মানুষ হয়েছে। এভাবে অসংখ্য মানুষের জীবনের নদী এসে মিশেছে একটিমাত্র মোহনায়।
কখনো কখনো বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়ালে মনে হয়, নদীটি হয়তো ঢাকার চেয়েও বেশি জ্ঞানী। কারণ নদী জানে, সব জল এক জায়গায় জমলে বন্যা হয়। শুধু মানুষই সে শিক্ষা বারবার ভুলে যায়।
দেশের বড় বড় মন্ত্রণালয় ঢাকায়। মহাপরিচালকদের কার্যালয় ঢাকায়। করপোরেট সদর দপ্তর ঢাকায়। সেরা হাসপাতাল ঢাকায়। জাতীয় প্রতিষ্ঠান ঢাকায়। বড় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ঢাকায়। যেন রাষ্ট্রের সব স্নায়ুতন্ত্র এসে একটি মাত্র শহরে আশ্রয় নিয়েছে। ফলে রংপুরের যুবক, সুনামগঞ্জের কৃষকের ছেলে, বরিশালের মেয়েটি কিংবা পঞ্চগড়ের স্বপ্নবাজ তরুণী, সবাইকে শেষ পর্যন্ত একদিন ঢাকার পথেই হাঁটতে হয়। শুধু জীবিকার জন্য নয়, কখনো চিকিৎসার জন্য, কখনো উচ্চশিক্ষার জন্য, কখনো একটি সাধারণ সরকারি কাজের জন্যও। তখন মনে হয়, বাংলাদেশ যেন একটি গাছ, যার সব ফল-ফুল এক ডালে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু প্রকৃতি কখনো এমন ভারসাম্যহীনতা পছন্দ করে না। তাই প্রশ্ন জাগে, দেশের সব প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই ঢাকাতেই থাকতে হবে? চট্টগ্রাম কি শুধু বন্দরনগরী হয়েই থাকবে? সিলেট কি শুধু প্রবাসীদের শহর? রাজশাহী কি শুধু আমের রাজ্য? খুলনা কি শুধু নদীর স্মৃতি বহন করবে? কেন একটি দেশের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যাবে না?
জাপানে শুধু টোকিও নেই। জার্মানিতে শুধু বার্লিন নেই। অস্ট্রেলিয়ায় শুধু সিডনি নেই। অসংখ্য উন্নত দেশ বুঝেছে, রাজধানীকে বাঁচাতে হলে ক্ষমতা ভাগ করে দিতে হয়। যেখানে শুধু রাজধানী বড় হয়, সেখানে একসময় রাজধানীই নিজের বোঝা বইতে পারে না। ঢাকার আজকের যানজট শুধু রাস্তার সংকট নয়, এটি একটি রাষ্ট্রকাঠামোর গল্প। প্রতিদিন রাস্তায় সারি সারি গাড়ি যেন আমাদের বলে, ‘তোমরা দেশের সব পথ একটি শহরে এনে মিলিয়েছ; আজ সেই পথগুলোই তোমাদের থামিয়ে দিয়েছে।’ সকালবেলার ঢাকা দেখলে মনে হয় শহরটি যেন হাঁপাচ্ছে। মানুষ দৌড়াচ্ছে। গাড়ি দৌড়াচ্ছে। লিফট দৌড়াচ্ছে। সময় দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও যেন গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
একসময় এ শহরে খাল ছিল, জলাভূমি ছিল, গাছের ছায়া ছিল। বর্ষার পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি পড়ত। এখন কংক্রিটের বন বেড়েছে, অথচ প্রকৃতির রাজত্ব সংকুচিত হয়েছে। ঢাকা আজ অনেকটা এমন এক কবিতার মতো, যেখান থেকে ধীরে ধীরে ছন্দগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তবু মানুষ আসছে। কেননা আশারও নিজস্ব ভৌগোলিক কেন্দ্র থাকে। আর বাংলাদেশের কোটি মানুষের কাছে সেই কেন্দ্রের নাম ঢাকা।
কিন্তু বিশ বা ত্রিশ বছর পরে? চোখ বন্ধ করলে আমি দুটি ঢাকা দেখতে পাই। প্রথমটি ভয়ের। দ্বিতীয়টি স্বপ্নের। ভয়ের ঢাকা কংক্রিটের আরও উঁচু পর্বতে ঢেকে গেছে। আকাশ দেখা যায় ফাঁকফোকর দিয়ে। গ্রীষ্ম আরও উষ্ণ। বর্ষা আরও অনিয়মিত। মানুষ আরও বেশি। জল আরও কম। খোলা মাঠ প্রায় বিলুপ্ত। সকালবেলায় শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে কোনো কদমগাছ দেখে না। শালিক পাখি দেখে না। খালের জল দেখে না। দেখে শুধু উঁচু প্রাচীর আর বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড। অফিসে যেতে দুই ঘণ্টা লাগে। ফিরতে তিন ঘণ্টা। জীবনের বড় একটি অংশ রাস্তাতেই ফুরিয়ে যায়। বৃদ্ধেরা জানালার পাশে বসে নাতিদের গল্প শোনায়, ‘এক সময় ঢাকা এত ভিড় ছিল না। আমরা সাইকেল চালিয়ে রমনা পার হয়ে যেতাম।’ নাতিরা অবাক হয়ে শোনে, যেন রূপকথার গল্প।
এ ঢাকা ধনী হতে পারে, কিন্তু সুখী নয়। এ ঢাকা বড় হতে পারে, কিন্তু মানবিক নয়। কিন্তু অন্য একটি ছবিও সম্ভব। সেখানে বাংলাদেশ একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্ষমতা ছড়িয়ে দিয়েছে। সুযোগ ভাগ করে দিয়েছে। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের রাজধানী হয়েছে। রাজশাহী জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র হয়েছে। খুলনা শিল্প ও সমুদ্র অর্থনীতির কেন্দ্র হয়েছে। সিলেট প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের শহরে পরিণত হয়েছে। বরিশাল নদীকেন্দ্রিক উন্নয়নের মডেল হয়েছে। ময়মনসিংহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নতুন কেন্দ্র হয়েছে।
তখন আর দেশের প্রতিটি স্বপ্নকে ঢাকায় এসে দাঁড়াতে হয় না। যুবকরা নিজ শহরেই ভবিষ্যৎ খুঁজে পায়। মায়েরা সন্তানের চিকিৎসার জন্য ঢাকার হাসপাতালে ছুটতে বাধ্য হয় না। একটি চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয় না। ঢাকা তখনো রাজধানী, কিন্তু আর একা নয়। এক বিশাল বটগাছের মতো সে ছায়া দেয়, কিন্তু চারপাশে আরও বৃক্ষ জন্মাতে দেয়।
সেদিনের ঢাকায় হয়তো আধুনিক মেট্রোরেল থাকবে, নদীপথ পুনর্জীবিত হবে, পুরোনো খাল ফিরে আসবে। ছাদের পর ছাদে বাগান হবে। শিশুরা কংক্রিটের খাঁচায় নয়, সবুজের ভেতর বড় হবে। বুড়িগঙ্গার জল হয়তো আবার আকাশের রং ধারণ করবে। হাতিরঝিলের পাড়ে সন্ধ্যা নেমে এলে প্রেমিক-প্রেমিকারা জলের দিকে তাকাবে, আর দূরে আলোগুলো নক্ষত্রের মতো ঝিলমিল করবে। সে ঢাকা শুধু শহর হবে না, একটি সভ্যতার প্রতীক হবে।
কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ কোনো অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে আসবে না। ইটের পর ইট গেঁথে যেমন ভবন ওঠে, তেমনি সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত নিয়ে শহর গড়ে ওঠে। আজ আমরা যে অবহেলা করি, তা-ই আগামী দিনের সংকট হয়ে ফিরে আসে। আজ আমরা যে দূরদর্শিতা দেখাই, তা-ই আগামী দিনের আশ্রয় হয়।
ঢাকার ভবিষ্যৎ আসলে ঢাকার হাতে নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কারণ একটি দেশের রাজধানী তখনই সুস্থ থাকে, যখন দেশের অন্য শহরগুলোও শক্তিশালী হয়। সব নদী যদি একটি নদীতে মিশে যায়, তবে নদীটি একদিন উন্মত্ত হয়ে ওঠে। সব আলো যদি এক প্রদীপে জ্বলে, তবে প্রদীপটি একসময় নিভে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। সব স্বপ্ন যদি এক শহরে এসে জমা হয়, তবে সেই শহরের বুকে একদিন অসহনীয় চাপ তৈরি হয়।
রাতের ঢাকা যখন ছাদের ওপর থেকে দেখি, অসংখ্য আলোর বিন্দু দূরে দূরে জ্বলতে থাকে। মনে হয় এ যেন কোনো নগর নয়, কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার নক্ষত্রমালা। প্রতিটি আলো একটি গল্প। একটি সংগ্রাম। একটি অসমাপ্ত প্রার্থনা। কিন্তু সেই আলোগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস। সেই দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায় না শুধু ব্যস্ত মানুষ। শুনতে পায় বুড়িগঙ্গা। শুনতে পায় বালু নদী। শুনতে পায় হারিয়ে যাওয়া খালগুলো। আর হয়তো শুনতে পায় ঢাকা নিজেও। ঢাকা যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বলছে, ‘আমাকে আরও বড় কোরো না, আমাকে আরও সুন্দর করো। আমাকে আরও ভারী কোরো না, আমাকে আরও মানবিক করো। আমাকে একা রেখো না, আমার বোঝা দেশের অন্য শহরগুলোর সঙ্গে ভাগ করে দাও।’
যেদিন আমরা সেই আহ্বান শুনতে শিখব, সেদিনই ঢাকা সত্যিকার অর্থে ভবিষ্যতের পথে হাঁটবে। আর তখন বিশ বা ত্রিশ বছর পরের ঢাকা শুধু অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, মানুষের মুখের শান্ত হাসিতে, শিশুর মুক্ত শ্বাসে, নদীর স্বচ্ছ জলে এবং শহরের কোমল মানবিকতায় নিজের সাফল্যের গল্প লিখবে। তখন ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী হবে না; সে হবে বাংলাদেশের আত্মার সবচেয়ে সুন্দর প্রতিচ্ছবি।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
