ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন এবং ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
সানিয়া ফয়সাল আল-হোসাইনি
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি জনসমর্থনে ভাটার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ নানা ইস্যুর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং এই দুই দেশসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে এর নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। এখন প্রশ্ন হলো, এ ফলাফল ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সম্ভাবনা এবং কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কৌশলগত সুবিধাকে কতটা প্রভাবিত করবে? আর যুদ্ধ অব্যাহত রাখা বা এর ভবিষ্যৎ গতিপথের ক্ষেত্রেই বা এর অর্থ কী দাঁড়ায়?
১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই ইরানের প্রতি নিজের চরম শত্রুতা কখনো গোপন রাখেননি নেতানিয়াহু। ১৯৯২ সালে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আশঙ্কা নিয়ে সতর্কবার্তা দেন, যা পরের বছর তার লেখা ‘আ প্লেস অ্যামং দ্য নেশনস’ বইতেও উল্লেখ করেন। একই বছর ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’ পত্রিকায় ‘দ্য গ্রেট ডেঞ্জার’ শিরোনামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান। ১৯৯৫ সালে নিজের ‘ফাইটিং টেররিজম’ বইতেও ইরান ইস্যুতে তিনি একই অবস্থান তুলে ধরেন। তখন থেকেই মার্কিন সহায়তা নিয়ে কিংবা ওয়াশিংটনকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে ইরানকে নিশানা বানানো এবং দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার প্রকাশ্য চেষ্টা চালিয়ে আসছে ইসরাইল।
‘ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’-এর এক জরিপ অনুযায়ী, মার্চের শুরুর দিকে ইসরাইলের ৯৩ শতাংশ ইহুদি নাগরিক ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় সমর্থন জানায়। এরপর জুনে ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর আরেক জরিপে দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারককে ইসরাইলের স্বার্থের পরিপন্থি বলে মনে করে।
কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প। জুন মাসে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজ্যুলিউশন’ (যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব) পাশ হয়। এতে বলা হয়, কংগ্রেস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন না দিলে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত থেকে মার্কিন বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে। তবে এ প্রস্তাব আইনগতভাবে মানার বাধ্যবাধকতা নিয়ে আপত্তি তোলে হোয়াইট হাউজ।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হাত থেকে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণই ছিনিয়ে নেয় ডেমোক্র্যাটরা। এই ফলাফল বিশেষ করে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপর বড় আঘাত এবং তার নীতিগুলোর বিরুদ্ধে ভোটারদের সরাসরি অনাস্থা প্রকাশ করে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেক ভোটারই জানান, তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। মূলত ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিই যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
নিঃসন্দেহে উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের অর্থ হলো কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরোধী দলের হাতে চলে যাবে। এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল খাটানোর সুযোগ সীমিত করার পাশাপাশি তার প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি আরও জোরদার করবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার হাত থেকে চলে যাবে। প্রেসিডেন্টকে নীতি বদলাতে বাধ্য করার চেয়ে প্রশাসনের প্রস্তাবগুলো আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ক্ষমতা বেশি। তাছাড়া নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই এ পরিবর্তনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব পড়বে না। নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে আগামী ৩ জানুয়ারি এবং ততদিন পর্যন্ত বর্তমান কংগ্রেসই ক্ষমতায় বহাল থাকবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশাসনকে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারবে। একইসঙ্গে তারা বলপ্রয়োগের অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানাতে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ওপর আইনি ও আর্থিক বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা চালাতে পারবে। তবে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে প্রেসিডেন্টের ওপর আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপ দিতে হলে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। আর প্রেসিডেন্ট তাতে ভেটো দিলে কোরাম থাকা সাপেক্ষে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে সেই ভেটো বাতিল করতে হবে। অবশ্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই প্রশাসনের চাওয়া অতিরিক্ত তহবিলের অনুমোদন আটকে দিতে পারে কংগ্রেস। কিন্তু তহবিল ব্যবহারের ওপর নতুন কোনো আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করতে গেলে সেই একই আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য ভেটোর মুখোমুখি হতে হবে।
২০০৬ সালের নির্বাচনে উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর জর্জ ডব্লিউ বুশের অভিজ্ঞতা এই রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। ২০০২ সালে পাশ হওয়া সামরিক বলপ্রয়োগের অনুমোদনের ওপর ভর করে ২০০৭ সালের শুরুর দিকে ইরাকে অতিরিক্ত ২০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন বুশ। কংগ্রেস যখন ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমার সঙ্গে যুদ্ধের তহবিল ছাড়ের শর্ত জুড়ে দেয়, তখন বুশ ওই বিলে ভেটো দেন এবং প্রতিনিধি পরিষদ তা বাতিল করতে ব্যর্থ হয়। এভাবে আইনসভায় বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বুশ যুদ্ধ চালিয়ে যান এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করেন। একইভাবে ২০১৫ সালের শুরুতে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরও বারাক ওবামা নিজের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখেন। ২০১৫ সালের ফেরুয়ারিতে ওবামার চাওয়া নতুন অনুমোদন কংগ্রেসে পাস না হলেও ২০০১ ও ২০০২ সালের সামরিক বলপ্রয়োগের অনুমোদনের ওপর ভিত্তি করেই তিনি ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যান। পাশাপাশি তিনি ইরান পারমাণবিক চুক্তির কাজও এগিয়ে নেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা তাদের বিরোধিতাকে এমন কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞায় রূপ দিতে পারেনি যা চুক্তিটির বাস্তবায়ন ঠেকাতে পারে।
এমনকি যুদ্ধের প্রশ্নেও-কংগ্রেসের হাতে যুদ্ধ ঘোষণার সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও-সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপ শুরু করার ক্ষমতা রাখেন। অবশ্য এর আইনি সীমারেখা নিয়ে সরকারের এই দুই অঙ্গের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ১৯৯৯ সালে কসোভোয় বিল ক্লিনটনের আমলে বলপ্রয়োগের বিষয়ে কংগ্রেসের সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান চলে। ২০১১ সালে লিবিয়ায় বলপ্রয়োগের অনুমোদন-সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও ওবামা প্রশাসন অভিযান অব্যাহত রাখে। সে সময় ওবামা প্রশাসন যুক্তি দেয় যে, লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত অংশগ্রহণ এমন কোনো ‘সক্রিয় যুদ্ধের’ পর্যায়ে পড়ে না, যার জন্য ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশনের নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে অভিযান বন্ধ করতে হবে। যদিও প্রশাসনের এই ব্যাখ্যার তীব্র বিরোধিতা করেন কংগ্রেস সদস্যরা। এসব নজির প্রমাণ করে যে, কংগ্রেসের অনুমোদন না থাকা কিংবা এক কক্ষে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অর্থই বাস্তবে সামরিক অভিযান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
অতীতের এসব নজিরের ভিত্তিতে বলাই যায়, ইসরাইলি নেতৃত্ব যদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ট্রাম্পও তেমনটি চান, তবে নেসেট ও মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের ফলাফল মানেই ইরান যুদ্ধের অবসান নয়।
কংগ্রেসের এ ক্ষমতার পালাবদল হয়তো রাজনৈতিক চাপ এবং আইনি ও আর্থিক বিধিনিষেধ বাড়াবে, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্তে রূপ নেবে না। ফলে নির্বাচনের এ ফলাফল যুদ্ধ পুরোপুরি থামানোর চেয়ে বরং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয়, পরিধি, স্থায়িত্ব এবং শর্তাবলির ওপরই বেশি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে নিজেদের নির্বাচনি বিজয়কে বিরোধী শক্তিগুলো কতটা কার্যকর বিধিনিষেধে রূপ দিতে পারে তার ওপর; এবং একইসঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয়ভার বহনে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সক্ষমতার ওপর।
* মিডল ইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তর : পরম ওয়াজেদ শিকদার
সানিয়া ফয়সাল আল- হোসাইনি : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, আরব-আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়, ফিলিস্তিন। তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করেছেন।
