Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং আমরা

Advertisement

Icon

ড. মিজানুর রহমান

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং আমরা

Advertisement

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল গত বছরের মার্চে। এই এক বছরের কিছু বেশি সময়ে ভাইরাসটিতে প্রাণ গেছে সাড়ে ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাশ্চাত্যের দেশগুলোর তুলনায় মৃত্যুর এ সংখ্যাটি হয়তো খুব বেশি নয়। বাইরে থেকে এটি কেবল একটি সংখ্যা হলেও প্রতিটি মৃত্যু মানেই একেকটি পরিবারের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নেরও মৃত্যু। যে পরিবারটি তার প্রিয়জনকে হারায় তার বাইরে আমরা ক’জনই বা এ সত্যটি উপলব্ধি করতে পারি?

করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা নিয়ে আমাদের যে সচেতনতার অভাব, আমরা যে কতটা উদাসীন সেটি বোঝার জন্য বড় কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই, জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকালেই সেটি স্পষ্ট বোঝা যায়। এ উদাসীনতা কোনোভাবেই মানুষের অজ্ঞতা থেকে নয়। সংবাদপত্র কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সহজলভ্যতার জন্য যে কোনো খবর এখন মুহূর্তেই শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এ ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? এর একটি কারণ হতে পারে মানুষের নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস। অন্য একটি কারণ হতে পারে করোনাভাইরাস নিয়ে ধর্মীয় ও নিজস্ব অপব্যাখ্যা। আর কোনো গবেষণার ফল নিয়ে অপব্যাখ্যা হলে তার ফলাফল হয় আরও ভয়াবহ।

সম্প্রতি বিখ্যাত মেডিকেল সাময়িকী ‘দ্য ল্যানস্যাটে’ প্রকাশিত একটি গবেষণা নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এক ধরনের কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এটি কোনো মৌলিক গবেষণা নয়। বরং এটি বাতাসের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা নিবন্ধের ওপর মন্তব্য নিবন্ধ। ওই নিবন্ধে করোনাভাইরাস যে বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় তার পক্ষে দশটি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। এ নিবন্ধে বিজ্ঞানীরা তাদের নিজেদের নতুন কোনো আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করেননি, বরং আগে আবিষ্কৃত বিষয়গুলো রেফারেন্স হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। তারপরও এ মন্তব্য নিবন্ধটি সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, এর মূল বক্তব্যটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এর একটি ভয়াবহ প্রভাব এ দেশের মানুষের চিন্তাভাবনায়ও যে পড়েছে সেটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সাধারণ মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, মাস্ক পরে বা ঘরে থেকে কোনো লাভ নেই, বরং বাইরে গিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়া অনেক ভালো। অথচ নিবন্ধটিতে এ ধরনের কোনো বক্তব্য নেই। বরং মাস্ক যে পরতেই হবে এবং নিয়ম মেনে সঠিকভাবেই পরতে হবে তার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে। আরও একটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে-যেন ঘরের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আরও একটু খোলাখুলি আলোচনা করা যেতে পারে।

করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় এ ধারণাটি প্রথম সামনে এনেছিলেন অস্ট্রেলিয়া ও চীনের দুজন বিজ্ঞানী; যা ১০ এপ্রিল ২০২০ তারিখে ‘এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর আরও অনেক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত বছরের জুলাইয়ে ৩২ দেশের ২৩৯ জন বিজ্ঞানী সম্মিলিতভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করেছিল যে, করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং সংস্থাটি যেন সে অনুযায়ী নির্দেশনা জারি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেদিন বিষয়টি মেনে নিলেও বায়ুবাহিত রোগে সৃষ্ট মহামারি মোকাবিলায় যে ধরনের নির্দেশনা প্রদান করার কথা, সেটি ব্যাপকভাবে প্রচারে ব্যর্থ হয় এবং সামাজিক দূরত্ব, হাত ধোয়া ও মাস্ক পরাসহ কিছু স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়-ব্যাপারটি আসলে কী? শুরু থেকেই মানুষের মধ্যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির বা বহনকারীর হাঁচি অথবা কাশির মধ্যে যে ড্রপলেট বা ক্ষুদ্র পানিকণা থাকে তার মাধ্যমে ছড়ায়। কাজেই আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির ড্রপলেট যাতে কোনো সুস্থ ব্যক্তির নাক, মুখ ও চোখে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সামাজিক দূরত্ব (১ মিটার) আর মাস্ক পরার নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। করোনাভাইরাস বাতাসে ছড়ায়-এর মাধ্যমে যে নতুন তথ্যটি যুক্ত করা হয়েছে তা হলো হাঁচি, কাশি ছাড়াও করোনাভাইরাস আক্রান্ত বা বহনকারী ব্যক্তি যখন কথা বলে এবং নিঃশ্বাস ফেলে, এর মাধ্যমেও ভাইরাসটি অন্য মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। কারণ কথা বলা এবং নিঃশ্বাস ফেলার সময় অতি ক্ষুদ্র পানিকণা (৫ মাইক্রন থেকে কম) বের হয়, যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় ‘অ্যারোসল’। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যারোসল বাতাসে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ভেসে থাকতে পারে, যাতে করোনাভাইরাস অন্তত তিন ঘণ্টা সংক্রমণ করার ক্ষমতা ধরে রাখে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস বহনকারী অ্যারোসল বাতাসের মাধ্যমে অন্তত দশ মিটার দূরে স্থানান্তরিত হতে পারে। সহজ করে বললে এর অর্থ দাঁড়ায়-করোনাভাইরাস বহনকারী ব্যক্তি হাঁচি, কাশি না দিলেও তার কথা বলা ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমে অন্যকে আক্রান্ত করতে পারে। বায়ু চলাচলবিহীন আবদ্ধ একটি কক্ষে সংক্রমণের এ ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাই দ্য ল্যানস্যাটের নিবন্ধে নিয়মিত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, মাস্ক ব্যবহার না করে ঘর থেকে বের হয়ে মুক্ত বায়ু সেবনের কথা কোথাও বলা হয়নি।

দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সময় কিছু ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ এ মহামারি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। প্রথমত, সঠিক মানের মাস্ক ব্যবহার করা। সম্প্রতি মানুষের মধ্যে মাস্ক ব্যবহার করার প্রবণতা কিছুটা হলেও বেড়েছে। প্রশ্ন হলো, এ মাস্কগুলো কি করোনাভাইরাস থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বৈজ্ঞানিক উপায়ে এবং সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ করে তৈরি করা হয়েছে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না। দেশে এখন অতি নিম্নমানের ও নকল মাস্কের ছড়াছড়ি, যেগুলো অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে পাওয়া যায়। করোনার মতো ভয়াবহ মহামারি মোকাবিলায় এ ধরনের নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী কতটা কার্যকর? দ্বিতীয়ত, সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করা। বায়ুবাহিত হওয়ার ফলে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না এসেও যেহেতু সুস্থ ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই এমনভাবে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে যেন সেটি ঢিলেঢালা না হয়। তৃতীয়ত, সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত ও উচ্ছ্বসিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে বিয়ে, জন্মদিন কিংবা বিবাহবার্ষিকীর মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সচিত্র বর্ণনা। এর মাধ্যমে অন্তত এটি নিশ্চিত করে বলা যায়, এ মহামারিতেও এসব সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়নি। উল্লেখ্য, এ সামাজিক অনুষ্ঠানের প্রায় সবই হয়ে থাকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কমিউনিটি সেন্টার বা সম্মেলন কেন্দ্রে। যেগুলো করোনা সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। প্রশ্ন হতে পারে, যারা অসুস্থ তারা তো আর সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় না, তাহলে সংক্রমণ হবে কী করে? এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে যত করোনা সংক্রমণ হয়েছে তার প্রায় ৬০ শতাংশ হয়েছে এসিমটোমেটিক অর্থাৎ উপসর্গহীন করোনাভাইরাস বহনকারী ব্যক্তির মাধ্যমে। কাজেই, আবদ্ধ বায়ু চলাচলবিহীন এসব স্থানে অনুষ্ঠিত সামাজিক অনুষ্ঠান দেশের করোনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে। জীবিকার জন্য বের হওয়া আর সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, কোনোভাবেই সমানভাবে মূল্যায়নের সুযোগ নেই। আমরা একটু সচেতন হলেই এ ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান বর্জন করতে পারি। শুধু তাই নয়, অনলাইনে ঘরে বসে কেনাকাটা করার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় আমরা শপিংমলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানও এড়িয়ে চলতে পারি।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথেষ্ট দূরদর্শিতার প্রয়োজন। সরকারের বহুমুখী তৎপরতায় দেশের করোনা পরিস্থিতি এখনো পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে কী হবে তা ধারণা করা খুবই কঠিন। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শেষ হলে আরও বড় আকারে আসতে পারে তৃতীয় ঢেউ, যা পাশ্চাত্য দেশগুলোয় ইতোমধ্যেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সরকার কি সেটি মোকাবিলায় প্রস্তুত? এরই মধ্যে অক্সিজেন ও আইসিইউ সংকটে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নিজের প্রিয়জনকে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে অসংখ্য মানুষ। শেষ পর্যন্ত এদের অনেককেই অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি মাথায় রেখে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হলে এ মৃত্যুর হার হয়তো অনেকটাই কমানো যেত। মহামারির দ্বিতীয়, তৃতীয় ঢেউ বলতে যে কিছু বিষয় আছে সেটি কি এ দেশের নীতিনির্ধারকরা জানতেন না?

তারপরও আমরা আশাবাদী হতে চাই। করোনা মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ যখন একটি নির্ভরযোগ্য টিকা পাওয়ার প্রতীক্ষায় ছিল, টিকা আবিষ্কারের আগেই যেখানে উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অগ্রিম বুকিং করে রেখেছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হয়ে আমরা সময়মতো টিকা পাব সেটি ছিল কেবলই কল্পনা মাত্র। সত্য হলো, আমরা যথাসময়েই টিকা পেয়েছি, যখন পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশই টিকা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, দেশে এ টিকা গ্রহণের কার্যকারিতার প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। সদ্য প্রকাশ হওয়া এক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, যা আমাদের মধ্যে আরও আশার সঞ্চার করছে। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমরা একদিন একটি করোনামুক্ত নতুন পৃথিবী পাব, এটাই প্রত্যাশা।

ড. মিজানুর রহমান : অধ্যাপক, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Advertisement

করোনা

Advertisement

আরও পড়ুন

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

নিউইয়র্কের চিঠি অভিবাসীবান্ধব সিটিগুলোতেও নতুন আতঙ্ক

অভিবাসীবান্ধব সিটিগুলোতেও নতুন আতঙ্ক

অক্টোবর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’

অক্টোবর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম