উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে
Advertisement
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অর্থনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হচ্ছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা। এটি অত্যন্ত কঠিন একটি লক্ষ্যমাত্রা, তবে অর্জন অযোগ্য নয়। অর্থাৎ এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে হবে এবং অর্থনীতির সবটুকু সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৫০১ বিলিয়ন ডলার। এর অর্থ হচ্ছে, ২০৩৪ সাল নাগাদ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরে দেশের জিডিপির আকার দ্বিগুণ করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে হলে প্রতিবছর গড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণ করাসহ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। যেনতেনভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং এর সুফল যাতে সমাজের প্রত্যেক নাগরিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করাকেই প্রকৃত উন্নয়ন বলা যেতে পারে। উন্নয়নের সুফল যদি সামান্য কিছু গোষ্ঠী বা মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তাহলে তাকে সুষম উন্নয়ন বলা যায় না।
২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা কঠিন চ্যালেঞ্জ বটে। তবে আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক, ২০২৬-এ বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে তা ইতিবাচক। সংস্থাটি বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির (জিডিপি) আকার হবে ৬৭৭ বিলিয়ন ডলার। সেই সময় বাংলাদেশ জিডিপির আকারের বিবেচনায় মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই সময় মালয়েশিয়ার জিডিপির আকার হবে ৬৭২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের এ প্রক্ষেপণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা করছে, তার সঙ্গে আইএমএফের প্রক্ষেপণের কিছুটা হলেও মিল আছে। বাংলাদেশ যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যায়, তাহলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়, তবে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে।
প্রথমেই আমাদের স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিনিয়োগের যে সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তা খুঁজে বের করে সঠিকভাবে কাজে লাগতে হবে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যভিত্তিক শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ এখনো শিল্পায়িত দেশে পরিণত হতে পারেনি। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় কোনো দেশই কৃষি বা সনাতন উৎপাদন পদ্ধতিতে নিয়োজিত থেকে তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে পারে না। কৃষি বা সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদিত পণ্য রূপান্তরের মাধ্যমে শিল্প খাতের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বৃহৎ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পে পরিণত করতে হবে।
বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের জনবহুল একটি দেশ। জনসংখ্যাকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে, যাতে তারা যে কোনো অবস্থায় প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে গড়ে ওঠে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে দেশের জনশক্তির উৎপাদনশীলতা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। প্রচলিত শিক্ষা কার্যক্রমে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলে একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। তারা নিজেরাই আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। দেশের অধিকাংশ নদ-নদী এখন শুকিয়ে গেছে। চর জেগে উঠেছে। এসব চরাঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠছে। তারা সনাতন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছে। উপযুক্ততা অনুযায়ী এসব নদীর চরে ছোট-বড় শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে।
দেশের এক-দশমাংশজুড়ে থাকা তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে ভাবতে হবে। স্বাধীনতার পরপরই তিন পার্বত্য জেলায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অসন্তোষ দেখা দেয়। সে সময় ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা হিসাবে শান্তিবাহিনী গঠিত হয়। তারা সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন অর্জনের জন্য সংগ্রাম শুরু করে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাবস্থায় সমতল ভূমির অনেক দরিদ্র পরিবারের জন্য তিন পার্বত্য জেলায় বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এ উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। পরবর্তীকালে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে আত্মসমর্পণকারীদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও সফল হয়নি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নতুন আরও কয়েকটি উপদল সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তা সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে যত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা ছিল না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত দরিদ্র। তারা জুম চাষ এবং ফলের বাগান বা এ ধরনের সনাতনী কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা চালাচ্ছে। এখন সময় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নতুন করে বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের। আমরা যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে অনুধাবন করতে পারব, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সমস্যার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক দুরবস্থা। পার্বত্য চট্টগ্রামের শিশু-কিশোরদের সামনে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্বপ্ন নেই। তারা স্বপ্ন দেখতে পারছে না। তারা জানে, বড় হয়ে তাদের কঠিন পরিশ্রমের ‘জুম চাষ’ করতে হবে। অথবা সশস্ত্র গ্রুপে যুক্ত হয়ে চাঁদাবাজি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। তাই তারা সেভাবেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বিস্তীর্ণ ভূমি কার্যত অনাবাদি রয়ে গেছে দিনের পর দিন। বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপনের মতো উপযোগী জমির অভাব রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সেই জমির অভাবকে পূরণ করতে পারে। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তারপর উপযুক্ততা বিবেচনা করে প্রতিটি পাহাড়কে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের আওতায় নিয়ে আসা যেতে পারে। প্রতিটি সরকারই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে রাজনৈতিকভাবে। কিন্তু এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়নি। তিন পার্বত্য জেলা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। কিন্তু একটি অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই সেই এলাকার উন্নয়ন হয় না, যদি সেই প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও রূপান্তরের মাধ্যমে অধিকতর উপযোগিতা সৃষ্টি করা না যায়।
২০২২ সালের জনসংখ্যা জরিপ মোতাবেক, তিন পার্বত্য জেলার মোট আয়তন ১৩ হাজার ১৯১ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের ১১ দশমিক ১৯ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলার মোট জনসংখ্যা ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৮১৫, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পাশাপাশি বৃহৎ শিল্প স্থাপনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের ফল উৎপাদিত হয়। কাজেই সেখানে বড় বড় ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা ও সমুদ্রবন্দর নিকটে থাকায় সেখানে শিল্প স্থাপন অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। সেখানে শিপ বিল্ডিং ও মেরামত কারখানা স্থাপনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। স্টিল ও রি-রোলিং মিল স্থাপিত হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প স্থাপন অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন প্রকল্প এবং টেক্সটাইল মিলসহ যে কোনো ধরনের শিল্পকারখানা স্থাপিত হতে পারে। প্রাকৃতিক অবস্থান ও ভৌগোলিক গঠনের কারণে তিন পার্বত্য জেলায় গ্যাসপ্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকার মানুষ স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত পরিশ্রমী। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে যে কোনো শিল্পে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে। জরুরি ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলায় কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করে তরুণদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। তিন পার্বত্য জেলাকে কেন্দ্র করে শিল্পায়নের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণ সমাজ নানা ধরনের হতাশায় ভুগছে। তারা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোনো আশার আলো দেখছে না। স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে তরুণদের জন্য যদি বিভিন্ন শিল্প প্রকল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া যায়, তাহলে তারা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। তারা ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হবে না। তারা নিজেরাই তাদের কর্মস্থলের (যে কারখানায় তারা কাজ করবে) নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে। দেশের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে উৎপাদন কার্যক্রমের বাইরে রেখে কখনোই দেশের সার্বিক ও সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
অনুলিখন : এম এ খালেক
