Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অক্টোবর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’

Advertisement

Icon

অবিনাশ পাল

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় অক্টোবর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা বাঁকবদলের মাস হিসাবেও অক্টোবরকে বিবেচনা করা হয়। এ মাসে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা কার্যক্রম তীব্র আকার ধারণ করে। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসরদের ওপর সুনির্দিষ্ট আক্রমণ চালানো হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডের রূপরেখা এবং সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী মিলে ‘যৌথ বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করলেও এর মূল রণকৌশল ও ভিত্তি অক্টোবরেই চূড়ান্ত হয়। অন্যদিকে, বিশ্ব রাজনীতিতেও বাংলাদেশের পক্ষে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়।

১৩ অক্টোবর পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর আবদুল মোনায়েম খানকে মুক্তিযোদ্ধারা তার বনানীর নিজ বাসভবনে হত্যা করেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এ কারণে বাঙালিদের কাছে তিনি ছিলেন ঘৃণার পাত্র। ঢাকার বনানীতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেদ করে গেরিলা যোদ্ধা আনোয়ার (বীরপ্রতীক) ও মোজাম্মেল হক (বীরপ্রতীক) মোনায়েম খানকে গুলি করে হত্যা করেন। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেন মোনায়েম খানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত দুই কর্মচারী শাহজাহান ও মোখলেস।

মোনায়েম খানের হত্যার খবর প্রচার হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অনেক নেতা মুক্তিবাহিনীর ভয়ে সাবেক গভর্নরের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হননি। এ ঘটনার পর পাকিস্তান সরকারের ঊর্ধ্বতন বেসামরিক কর্মকর্তারাও মনোবল হারিয়ে ফেলেন, যা পরবর্তী সময়ে আর ফিরে আসেনি।

আগস্টে গঠিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’, যা বাঙালি নৌ কমান্ডারদের উদ্যোগে পরিচালিত হয়েছিল, পাকিস্তানি নৌযান ও বন্দরগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। দেশের অভ্যন্তরে ক্র্যাকডাউন এবং গেরিলা অপারেশনও তখন এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, পাকিস্তানি সেনারা তাদের ক্যাম্প ও বাঙ্কারের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছিল।

এসব ঘটনা একদিকে পাকিস্তান সরকারকে ব্যাপক চিন্তায় ফেলে দেয়, অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ মানুষও মুক্তিযুদ্ধে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত হয়। অক্টোবরের শেষদিকে রমজান শুরু হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে রমজান অত্যন্ত পবিত্র মাস; কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসাবে প্রচার করেছিল, সেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা রমজানজুড়ে বর্বরোচিত গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, লুটপাট ও ধর্ষণ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

চতুর্থ রমজানের দিন, ২৫ অক্টোবর, টাঙ্গাইলের নাগরপুরের গয়হাটা ইউনিয়নের বনগ্রামে লুটপাট ও ধর্ষণের পর পৈশাচিক গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। এ গণহত্যায় শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ ৫৭ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন। শতাধিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। একই দিন কুড়িগ্রামের রাজীবপুর থানার কোদালকাঠি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। এতে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী শহীদ হন। সিলেটের গোপালগঞ্জ থানার পশ্চিম আমুড়া ইউনিয়নের সুন্দিশাইলেও পৈশাচিক গণহত্যা চালিয়ে ২৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়।

এ ধরনের গণহত্যা ও নির্যাতন রমজানজুড়েই চলছিল। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের মুখোশ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যারা ধর্মের কথা বলে পাকিস্তানকে রক্ষার কথা বলেছিল, তারাই ইসলাম ধর্মের পবিত্র মাসে গণহত্যা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছিল। মানুষের কাছে তাদের দ্বিমুখী চরিত্র ক্রমেই প্রকাশ পেতে থাকে।

অক্টোবর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিত আক্রমণ তীব্রতর হতে থাকে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ে। এ সময় ধলাইয়ের যুদ্ধসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী সংঘর্ষে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শত্রুসেনাদের কোণঠাসা করে ফেলে। ২৮ অক্টোবর ধলাইয়ের যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে শহীদ হন হামিদুর রহমান। পরে তিনি বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত হন।

বৈশ্বিক জনমত গঠন ও কূটনৈতিক সাফল্যের দিক থেকেও অক্টোবর মাস ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১ অক্টোবর বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উত্থাপিত হয়। নিউইয়র্কের চার্চ সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত ও বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা আবু সাঈদ চৌধুরী প্রথম এ দাবি উত্থাপন করেন। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি এবং বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের অপসারণের দাবিও জানান।

৮ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়নের ছাত্র-শিক্ষকরা মস্কোয় এক প্রতিবাদ সমাবেশে পূর্ব বাংলায় গণহত্যা বন্ধ, শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের সমর্থন এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। সমাবেশে ছাত্র-শিক্ষকরা বলেন, ‘এখন বিশ্ববাসীর উচিত বাংলাদেশের বিষয়ে চোখ ফেরানো। পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা বাংলাদেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতেছে।’ এর আগের দিন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বাংলাদেশে গণহত্যা ও শরণার্থী শিবিরের চিত্র তুলে ধরা হয়।

জাতিসংঘের ২৬তম সাধারণ পরিষদে রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায় ১০০ দেশের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ইস্যুতে বক্তব্য দেন। তাদের মধ্যে ৫০টি দেশ বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। তারা বাংলাদেশ সমস্যার দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথাও তুলে ধরে। ভ্যাটিকানের পোপ জন পলের আহ্বানে অক্টোবরেই রোমের বিভিন্ন গির্জায় বাংলাদেশের জন্য বিশেষ প্রার্থনাসভার আয়োজন করা হয়। এসব সভায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য অর্থও সংগ্রহ করা হয়।

২২ অক্টোবর মুজিবনগর সরকারের নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাসী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বলা হয়, ‘স্বাধীনতা স্বীকার করে নেওয়াই একমাত্র রাজনৈতিক সমাধান। এ ছাড়া আমরা কোনো ধরনের আলোচনায় আসতে পারি না। পাকিস্তানকে মেনে নিতে হবে, এখন বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশ।’

২৪ অক্টোবর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব জনমত গঠনের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েকটি দেশ সফর করেন। তিনি বিশ্বনেতাদের বোঝাতে সক্ষম হন, বাংলাদেশের সংকট কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মানবিক বিপর্যয়। সফরের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে শ্রীমতী গান্ধীর বৈঠক। নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখলেও ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন আইনপ্রণেতা ও জনগণের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি ও তথ্য তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ ডিসেম্বরে বিজয় লাভ করলেও এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অক্টোবরে। এ মাসের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ দ্রুতই চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে নেয় মুক্তিযুদ্ধকে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে অক্টোবর ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের মাস।

(সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, The Daily Star, bdnews24, প্রথম আলো)

অবিনাশ পাল : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে

নিউইয়র্কের চিঠি অভিবাসীবান্ধব সিটিগুলোতেও নতুন আতঙ্ক

অভিবাসীবান্ধব সিটিগুলোতেও নতুন আতঙ্ক

অক্টোবর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’

অক্টোবর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম