সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অসামাজিক কাজ!
jugantor
আশেপাশে চারপাশে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অসামাজিক কাজ!

  চপল বাশার  

১২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালের দুর্যোগের মধ্যে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এ সম্পর্কে গণমাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যেও চলছে আলোচনা। ঘটনাটি হলো বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে নারী পাচার। প্রতারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে এক তরুণীকে দেশের বাইরে পাচার করেছিল সংঘবদ্ধ একটি অপরাধী চক্র। মেয়েটিকে ভারতের বেঙ্গালুরুতে প্রায় তিন মাস আটক রাখা হয়। সেখানে আটক বাংলাদেশের অন্য অনেক তরুণীর মতো সেও নির্যাতনের শিকার হয়।

গত মাসে কৌশলে সে পালিয়ে দেশে ফিরে আসে। একই সময় পাচার হওয়া অন্য এক নারীর ওপর চালানো নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়ে যায় এবং তা গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকার তেজগাঁও থানায় নারী পাচারের ঘটনা নিয়ে একটি মামলা করা হয়। মামলার তদন্তে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। ঢাকা থেকে পুলিশ বেঙ্গালুরুর পুলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখানেও তারা অভিযানে নামে এবং ভিডিওতে প্রদর্শিত বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীকে উদ্ধার করে। সেখানে পাচারকারী চক্রের ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ঝিনাইদহ ও যশোরের সীমান্ত এলাকা থেকে পাচারকারী চক্রের মূল হোতাসহ চারজনকে গ্রেফতার করে। আটক পাচারকারীদের স্বীকারোক্তি থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানায়, যশোর অঞ্চলের ওই অপরাধী চক্র গত আট বছরে প্রায় দেড় হাজার নারীকে প্রতারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে ভারতে পাচার করেছে। হতভাগ্য ওই নারীরা বেঙ্গালুরুসহ সেদেশের বিভিন্ন স্থানে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। একটি মেয়ে সাহস করে কৌশলে পালিয়ে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সবকিছু জানানোর ফলে পাচারকারী একটি চক্র চিহ্নিত হয় এবং তাদের কিছু সদস্য ধরাও পড়ে। কিন্তু এ ধরনের অপরাধী চক্র কি দেশে একটাই? নিঃসন্দেহে বলা যায়, এমন চক্র দেশে আরও রয়েছে এবং তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় সক্রিয়।

পাচারকারী চক্র অল্পবয়সি মেয়ে অথবা তরুণীদের টার্গেট করে এবং তাদের বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখায়। দরিদ্র অথবা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের অনেকেই প্রলুব্ধ হয়ে এদের ফাঁদে পা দেয় এবং পাচার হয়ে যায়। তারা বুঝতেও পারে না যে তাদের পাচার করা হচ্ছে। বিদেশে গিয়ে যখন বুঝতে পারে, তখন আর ফেরার উপায় থাকে না। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কখনো কোনো ঘটনা প্রকাশ পায়, পাচারকারীও ধরা পড়ে। পাচারের শিকার নারী হয়তো উদ্ধার পায়, সংবাদপত্রে খবরও ছাপা হয়। তারপর সবাই ভুলে যায়। নারী পাচার চলতেই থাকে।

সম্প্রতি নারী পাচারের যে ঘটনাটি প্রকাশ পেয়েছে, তা থেকে জানা গেল অপরাধী চক্র এখন অভিনব কায়দায় তাদের দুষ্কর্ম চালাচ্ছে। তেজগাঁও থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তে পুলিশ নারী পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবু নামে একজনকে শনাক্ত করেছে। ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপ ‘টিকটক’ ব্যবহার করে নারীদের প্রতারণা করত বলেই তার নাম হয়েছে টিকটক হৃদয় বাবু। মেয়েদের সে টিকটক অ্যাপের ভিডিওতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানাত, এর জন্য টাকাও দিত। এতে আকৃষ্ট হয়ে অনেক মেয়ে তার ফাঁদে পা দিয়েছে। এরপর প্রলোভন দেওয়া হতো- প্রতিবেশী দেশে নিয়ে তাদের ভালো চাকরি দেওয়া হবে, তাদের অর্থ উপার্জন হবে, তারা আরামে থাকবে।

যেসব নারী এই লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হতো, তাদের বৈধ অথবা অবৈধ পথে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে ভারতে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের পাঠানো হয়েছে বেঙ্গালুরু, চেন্নাই এবং দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য বড় শহরে। পাচার করা মেয়েদের সেদেশে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে অনৈতিক কাজ করাতে বাধ্য করা হয়েছে, না করলে নির্যাতন। বেশ কয়েক বছর ধরে এভাবে টিকটক বাবু ও তার এদেশীয় সহযোগীরা নারী পাচার চালিয়ে গেছে বিনা বাধায় এবং প্রচুর টাকা পেয়েছে। প্রতিবেশী দেশেও অপরাধী চক্র রয়েছে, যারা টিকটক বাবুদের সহযোগিতা করেছে। দুই দেশের অপরাধী চক্র মিলে সিন্ডিকেট করে এই জঘন্য অপরাধ চালিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

টিকটক বাবুসহ নারী পাচারকারী চক্রটি চিহ্নিত হয়েছে এবং তাদের কয়েকজন ধরাও পড়েছে। টিকটক বাবুকে আটক করেছে বেঙ্গালুরু পুলিশ। তাদের কর্মকাণ্ড থেকে জানা যায় তারা কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করেছে এতদিন। স্মার্টফোন এখন সহজলভ্য। কমদামি, বেশিদামি স্মার্টফোন সবখানেই পাওয়া যায়। এ যন্ত্র দিয়ে টিকটক অ্যাপের সদস্য হওয়া কঠিন কিছু নয়। এটি সামাজিক মাধ্যমের তালিকাতেই পড়ে। কিন্তু অপব্যবহারের ফলে টিকটক হয়ে গেছে অসামাজিক। তরুণ-তরুণীরা প্রলুব্ধ হয়ে টিকটকের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কুচক্রীদের ফাঁদে পড়ে। টিকটকের মতো অ্যাপ সমাজে অপরাধ প্রবণতাও বাড়াচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা গত ৫ জুন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘টিকটক-লাইকিসহ বিতর্কিত অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে।’ কথাটি তিনি ঠিকই বলেছেন, তবে সময় কিন্তু এখন আসেনি, অনেক আগেই এসেছে। এতদিন কেন নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেটিই প্রশ্ন। টিকটক বাবু চক্রের অপকর্মের খবর গণমাধ্যমে এসেছে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে। টিকটক অ্যাপ কিন্তু এখনো চলছে অবাধে, নিষিদ্ধ হয়নি।

শুধু টিকটক-লাইকি নয়, ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমেও প্রায়ই অশালীন-আপত্তিকর বিষয়বস্তু প্রচার হয়, যা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বিব্রত করে। সামাজিক মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে কী প্রচারিত হচ্ছে, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর রাখা উচিত। অনলাইনে লেখাপড়া করার জন্য অভিভাবকরা সন্তানদের স্মার্টফোন কিনে দেন। সন্তানরা স্মার্টফোনের সদ্ব্যবহার করছে কিনা সেদিকে লক্ষ রাখাও অভিভাবকদের কর্তব্য। এক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে অযথা কড়াকড়ি নয়, তাদের বোঝাতে হবে কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। অভিভাবক ও সন্তানদের মধ্যে দূরত্ব যতটা সম্ভব কমিয়ে এনে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাহলে সন্তান অভিভাবকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, বিপথে যাবে না।

কথা হচ্ছিল নারী পাচার নিয়ে। নারী ও শিশু পাচার তথা মানব পাচার মারাত্মক অপরাধ। দেশে এ সম্পর্কে আইন রয়েছে, কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। তাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে সক্রিয় থাকতে হবে নারী ও শিশু পাচার রোধে। সীমান্ত অঞ্চল ও দেশের ভেতরেও কঠোর নজরদারি থাকতে হবে যাতে নারী পাচারকারী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যায়। কঠোর আইন ও আইনের সঠিক প্রয়োগ নারী পাচারের মতো জঘন্য অপরাধকে অবশ্যই নিরুৎসাহিত করবে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন থাকতে হবে যাতে আমাদের মেয়েরা পাচারকারীর কবলে না পড়ে। মেয়েদের অভিভাবক, আত্মীয়, বন্ধুদের সতর্ক থাকতে হবে পাচারকারী সম্পর্কে। সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ সমস্যা সম্পর্কে প্রচার- প্রোপাগান্ডা চালাতে হবে যাতে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে ওঠে নারী পাচারের বিপক্ষে। তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কেও সজাগ থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

আরেকটি কথা। বাংলাদেশ থেকে নারী পাচার হয় প্রধানত ভারতে, কারণ ভারত আমাদের সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী এবং একটি বিরাট রাষ্ট্র। পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশেও নারী পাচারের খবর শোনা যায়। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ, তাই নারী পাচার রোধে দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ সহযোগিতা হতে পারে। এ বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে যথেষ্ট কার্যকর সহযোগিতা চুক্তি থাকা প্রয়োজন। হয়তো এ ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক আছে, কিন্তু থাকলেও তা এখন কতটা কার্যকর সে ধারণা আমার নেই।

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি-বিএসএফ) প্রধানরা বছরে একবার বৈঠকে বসেন সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য। সেখানে অন্য সব বিষয়ের মধ্যে মানব পাচার তথা নারী-শিশু পাচারের মতো সমস্যাও আলোচিত হয় বলে ধরে নিতে পারি। মানব পাচার বন্ধ করতে উভয়পক্ষ যদি সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, সেই সঙ্গে দুই দেশের সরকার এ সমস্যা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করে, তাহলে নারী পাচারের মতো অপরাধ স্থায়ীভাবে দমন করা অবশ্যই সম্ভব।

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

আশেপাশে চারপাশে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অসামাজিক কাজ!

 চপল বাশার 
১২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালের দুর্যোগের মধ্যে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এ সম্পর্কে গণমাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যেও চলছে আলোচনা। ঘটনাটি হলো বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে নারী পাচার। প্রতারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে এক তরুণীকে দেশের বাইরে পাচার করেছিল সংঘবদ্ধ একটি অপরাধী চক্র। মেয়েটিকে ভারতের বেঙ্গালুরুতে প্রায় তিন মাস আটক রাখা হয়। সেখানে আটক বাংলাদেশের অন্য অনেক তরুণীর মতো সেও নির্যাতনের শিকার হয়।

গত মাসে কৌশলে সে পালিয়ে দেশে ফিরে আসে। একই সময় পাচার হওয়া অন্য এক নারীর ওপর চালানো নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়ে যায় এবং তা গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকার তেজগাঁও থানায় নারী পাচারের ঘটনা নিয়ে একটি মামলা করা হয়। মামলার তদন্তে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। ঢাকা থেকে পুলিশ বেঙ্গালুরুর পুলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখানেও তারা অভিযানে নামে এবং ভিডিওতে প্রদর্শিত বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীকে উদ্ধার করে। সেখানে পাচারকারী চক্রের ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ঝিনাইদহ ও যশোরের সীমান্ত এলাকা থেকে পাচারকারী চক্রের মূল হোতাসহ চারজনকে গ্রেফতার করে। আটক পাচারকারীদের স্বীকারোক্তি থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানায়, যশোর অঞ্চলের ওই অপরাধী চক্র গত আট বছরে প্রায় দেড় হাজার নারীকে প্রতারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে ভারতে পাচার করেছে। হতভাগ্য ওই নারীরা বেঙ্গালুরুসহ সেদেশের বিভিন্ন স্থানে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। একটি মেয়ে সাহস করে কৌশলে পালিয়ে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সবকিছু জানানোর ফলে পাচারকারী একটি চক্র চিহ্নিত হয় এবং তাদের কিছু সদস্য ধরাও পড়ে। কিন্তু এ ধরনের অপরাধী চক্র কি দেশে একটাই? নিঃসন্দেহে বলা যায়, এমন চক্র দেশে আরও রয়েছে এবং তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় সক্রিয়।

পাচারকারী চক্র অল্পবয়সি মেয়ে অথবা তরুণীদের টার্গেট করে এবং তাদের বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখায়। দরিদ্র অথবা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের অনেকেই প্রলুব্ধ হয়ে এদের ফাঁদে পা দেয় এবং পাচার হয়ে যায়। তারা বুঝতেও পারে না যে তাদের পাচার করা হচ্ছে। বিদেশে গিয়ে যখন বুঝতে পারে, তখন আর ফেরার উপায় থাকে না। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কখনো কোনো ঘটনা প্রকাশ পায়, পাচারকারীও ধরা পড়ে। পাচারের শিকার নারী হয়তো উদ্ধার পায়, সংবাদপত্রে খবরও ছাপা হয়। তারপর সবাই ভুলে যায়। নারী পাচার চলতেই থাকে।

সম্প্রতি নারী পাচারের যে ঘটনাটি প্রকাশ পেয়েছে, তা থেকে জানা গেল অপরাধী চক্র এখন অভিনব কায়দায় তাদের দুষ্কর্ম চালাচ্ছে। তেজগাঁও থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তে পুলিশ নারী পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবু নামে একজনকে শনাক্ত করেছে। ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপ ‘টিকটক’ ব্যবহার করে নারীদের প্রতারণা করত বলেই তার নাম হয়েছে টিকটক হৃদয় বাবু। মেয়েদের সে টিকটক অ্যাপের ভিডিওতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানাত, এর জন্য টাকাও দিত। এতে আকৃষ্ট হয়ে অনেক মেয়ে তার ফাঁদে পা দিয়েছে। এরপর প্রলোভন দেওয়া হতো- প্রতিবেশী দেশে নিয়ে তাদের ভালো চাকরি দেওয়া হবে, তাদের অর্থ উপার্জন হবে, তারা আরামে থাকবে।

যেসব নারী এই লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হতো, তাদের বৈধ অথবা অবৈধ পথে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে ভারতে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের পাঠানো হয়েছে বেঙ্গালুরু, চেন্নাই এবং দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য বড় শহরে। পাচার করা মেয়েদের সেদেশে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে অনৈতিক কাজ করাতে বাধ্য করা হয়েছে, না করলে নির্যাতন। বেশ কয়েক বছর ধরে এভাবে টিকটক বাবু ও তার এদেশীয় সহযোগীরা নারী পাচার চালিয়ে গেছে বিনা বাধায় এবং প্রচুর টাকা পেয়েছে। প্রতিবেশী দেশেও অপরাধী চক্র রয়েছে, যারা টিকটক বাবুদের সহযোগিতা করেছে। দুই দেশের অপরাধী চক্র মিলে সিন্ডিকেট করে এই জঘন্য অপরাধ চালিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

টিকটক বাবুসহ নারী পাচারকারী চক্রটি চিহ্নিত হয়েছে এবং তাদের কয়েকজন ধরাও পড়েছে। টিকটক বাবুকে আটক করেছে বেঙ্গালুরু পুলিশ। তাদের কর্মকাণ্ড থেকে জানা যায় তারা কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করেছে এতদিন। স্মার্টফোন এখন সহজলভ্য। কমদামি, বেশিদামি স্মার্টফোন সবখানেই পাওয়া যায়। এ যন্ত্র দিয়ে টিকটক অ্যাপের সদস্য হওয়া কঠিন কিছু নয়। এটি সামাজিক মাধ্যমের তালিকাতেই পড়ে। কিন্তু অপব্যবহারের ফলে টিকটক হয়ে গেছে অসামাজিক। তরুণ-তরুণীরা প্রলুব্ধ হয়ে টিকটকের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কুচক্রীদের ফাঁদে পড়ে। টিকটকের মতো অ্যাপ সমাজে অপরাধ প্রবণতাও বাড়াচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা গত ৫ জুন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘টিকটক-লাইকিসহ বিতর্কিত অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে।’ কথাটি তিনি ঠিকই বলেছেন, তবে সময় কিন্তু এখন আসেনি, অনেক আগেই এসেছে। এতদিন কেন নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেটিই প্রশ্ন। টিকটক বাবু চক্রের অপকর্মের খবর গণমাধ্যমে এসেছে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে। টিকটক অ্যাপ কিন্তু এখনো চলছে অবাধে, নিষিদ্ধ হয়নি।

শুধু টিকটক-লাইকি নয়, ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমেও প্রায়ই অশালীন-আপত্তিকর বিষয়বস্তু প্রচার হয়, যা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বিব্রত করে। সামাজিক মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে কী প্রচারিত হচ্ছে, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর রাখা উচিত। অনলাইনে লেখাপড়া করার জন্য অভিভাবকরা সন্তানদের স্মার্টফোন কিনে দেন। সন্তানরা স্মার্টফোনের সদ্ব্যবহার করছে কিনা সেদিকে লক্ষ রাখাও অভিভাবকদের কর্তব্য। এক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে অযথা কড়াকড়ি নয়, তাদের বোঝাতে হবে কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। অভিভাবক ও সন্তানদের মধ্যে দূরত্ব যতটা সম্ভব কমিয়ে এনে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাহলে সন্তান অভিভাবকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, বিপথে যাবে না।

কথা হচ্ছিল নারী পাচার নিয়ে। নারী ও শিশু পাচার তথা মানব পাচার মারাত্মক অপরাধ। দেশে এ সম্পর্কে আইন রয়েছে, কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। তাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে সক্রিয় থাকতে হবে নারী ও শিশু পাচার রোধে। সীমান্ত অঞ্চল ও দেশের ভেতরেও কঠোর নজরদারি থাকতে হবে যাতে নারী পাচারকারী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যায়। কঠোর আইন ও আইনের সঠিক প্রয়োগ নারী পাচারের মতো জঘন্য অপরাধকে অবশ্যই নিরুৎসাহিত করবে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন থাকতে হবে যাতে আমাদের মেয়েরা পাচারকারীর কবলে না পড়ে। মেয়েদের অভিভাবক, আত্মীয়, বন্ধুদের সতর্ক থাকতে হবে পাচারকারী সম্পর্কে। সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ সমস্যা সম্পর্কে প্রচার- প্রোপাগান্ডা চালাতে হবে যাতে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে ওঠে নারী পাচারের বিপক্ষে। তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কেও সজাগ থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

আরেকটি কথা। বাংলাদেশ থেকে নারী পাচার হয় প্রধানত ভারতে, কারণ ভারত আমাদের সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী এবং একটি বিরাট রাষ্ট্র। পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশেও নারী পাচারের খবর শোনা যায়। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ, তাই নারী পাচার রোধে দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ সহযোগিতা হতে পারে। এ বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে যথেষ্ট কার্যকর সহযোগিতা চুক্তি থাকা প্রয়োজন। হয়তো এ ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক আছে, কিন্তু থাকলেও তা এখন কতটা কার্যকর সে ধারণা আমার নেই।

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি-বিএসএফ) প্রধানরা বছরে একবার বৈঠকে বসেন সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য। সেখানে অন্য সব বিষয়ের মধ্যে মানব পাচার তথা নারী-শিশু পাচারের মতো সমস্যাও আলোচিত হয় বলে ধরে নিতে পারি। মানব পাচার বন্ধ করতে উভয়পক্ষ যদি সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, সেই সঙ্গে দুই দেশের সরকার এ সমস্যা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করে, তাহলে নারী পাচারের মতো অপরাধ স্থায়ীভাবে দমন করা অবশ্যই সম্ভব।

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন