শাটডাউন হতে হবে প্রকৃতই কঠোর
Advertisement
এ কে এম শাহনাওয়াজ
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবার শুরু হয়েছে সীমান্তবর্তী জেলা থেকে। অধিক সংক্রামক বলে বিবেচিত ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টা ভাইরাস ছড়াতে শুরু করেছে। আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি ভাষ্যে এসব জেলায় করোনার ঢেউ ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা তেমন কার্যকর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনাসহ সীমান্তবর্তী অনেক জেলা।
এই ভয়ংকর ঢেউ ধেয়ে আসছে রাজধানীর দিকে। রোগীর চাপে প্রায় সব হাসপাতাল সংকটাপন্ন। এত কিছুর পরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে চেতনা জাগ্রত হয়নি। সীমান্তবর্তী জেলা থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত বড় সংখ্যক মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা নেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকার সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের করোনা ঠেকানোর কাগুজে নির্দেশনামা, যা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।
এসব কারণেই সম্ভবত অনন্যোপায় হয়ে দেশজুড়ে ‘কঠোর’ লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এবার এর নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘শাটডাউন’। হয়তো কোনো তাৎপর্যগত ব্যাপার আছে। একটু ঝুঁকি নিয়েই বলছি, সাধারণ মানুষকে বোধহয় এবারেও ঘরে তেমনভাবে আটকে রাখা যাবে না। যদি আমার আশঙ্কা ঠিক না হয়, তবে এর চেয়ে ভালো খবর আর কিছু হতে পারে না। এই আশঙ্কার কারণ সম্পর্কে পরে কথা বলব। তবে এটুকু বলা যায়, বরাবরের মতো এবারও সরকারি ভাষ্যে অদূরদর্শিতা ও অদক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। দুদিন হাতে রেখেই বলা হলো ২৮ জুন সকাল থেকে কঠিন শাটডাউন শুরু হবে।
খুব প্রয়োজন না হলে কেউ ঘর থেকে বেরোবে না। তখন চাকরিজীবীরা হায় হায় করতে লাগল। একে তো ক্লোজিং মাস, তার ওপর মাস গেলে বেতন হবে। শাটডাউন ২৮ তারিখে হলে হবে মহাসংকট। একদিন পর এই চিন্তাটা বিধায়কদের মাথায় এলো। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের বরাত দিয়ে অদ্ভুত ঘোষণা টিভি স্ক্রলে দেখতে পেলাম। ২৮ তারিখ থেকে শাটডাউন শুরু হবে, তবে ১ জুলাই থেকে কঠোরভাবে শাটডাউন পালিত হবে। এমন সরকারি দ্বিধা বিভ্রান্ত মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করবে।
এমন হঠাৎ করে দ্বিধাগ্রস্ত সিদ্ধান্ত দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও পারঙ্গম। আমরা অবাক হয়েছি এক সপ্তাহ আগে যখন মৃত্যু ও সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী, তখনই এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের তারিখ দেওয়া হলো। এমন সমন্বয়হীন ঘোষণা হয়তো ভেতরে তোলপাড় তুলেছে, তাই মন্ত্রিপরিষদ আগের ঘোষণা স্থগিত করে দিল। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের কোন ঘোষণাকে মানুষ বিশ্বাস করবে!
চিন্তার ক্ষেত্রে, কার্যক্ষেত্রে এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা, সততা ও দক্ষতার অভাব থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছা কঠিন। গত বছর মার্চের পর বৈশ্বিক মহামারি আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিমানবন্দরের পথ ধরেই তা ছড়িয়েছিল। কিন্তু বিমানবন্দরের এবং স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রতিরক্ষাব্যূহ রচনা করতে পারেনি। মানছি তখন কঠিন বিপর্যয় সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অতটা সতর্ক হওয়া যায়নি। তারপর তো দিনে দিনে আমরা কঠিন বাস্তবতার পথ পাড়ি দিচ্ছি। ঘনবসতির এদেশে করোনা সংক্রমণ কতটা মারাত্মক হতে পারে, কোটি কোটি মানুষের মধ্যে সে বোধটিই যেন তৈরি হয়নি।
এমন অবস্থায় প্রয়োজনে বল প্রয়োগে হলেও বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে হয়। শুরুর দিকে তবু কিছুটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ছিল। এলাকাভিত্তিক লকডাউন দেওয়া হতো। শতভাগ না হলেও অনেকটা সফল ছিল সে সময়ের লকডাউন। এমন পরিস্থিতিতে লকডাউন কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক ছিল প্রান্তিক মানুষ-বিশেষ করে খেটে খাওয়া দিনমজুর-শ্রমিকদের খাদ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া। গত বছর সরকারিভাবে চাল বিতরণের কার্যক্রম ছিল।
কিন্তু এর ভেতরেও চুরি-দুর্নীতি ঢুকে যায়। এভাবে দরিদ্র-অসহায় মানুষকে আস্থায় রাখা যায়নি। সে পর্বে বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু বছরব্যাপী তা তো সম্ভব নয়। সুতরাং দায়িত্ব সব সরকারের ওপরই বর্তায়।
গত ঈদের আগ থেকে ঈদযাত্রার স্রোত ঠেকাতে এবং কিছুদিন আগে সীমান্তবর্তী জেলার সংক্রমণ কমাতে লকডাউন দেওয়া হলো। রাজধানী থেকে এসব জেলাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হলো। ঈদযাত্রার সময় সরকারের বিধি প্রয়োগের দুর্বলতায় তা ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছিল এবং তা সংক্রমণ বাড়াতে আরও ভূমিকা রেখেছিল বলে সাধারণের বিশ্বাস। পরে লকডাউনকে কপি-পেস্ট করতে দেখলাম। আমরা বুঝে পাই না প্রশাসন আর নীতিনির্ধারকরা এভাবে খেই হারিয়ে ফেলেন কেমন করে!
আমরা আমাদের কলামে গত দেড় বছর ধরে বারবার বলার চেষ্টা করেছি, এদেশের সাধারণ মানুষের যে মানসিক গড়ন তাতে শুধু সংক্রমণের ভয় দেখিয়ে তাদের ঘরে আটকে রাখা যাবে না। প্রয়োজনে কারফিউ দশা সৃষ্টি করতে হবে। নানা কারণে পুলিশভীতি এখন আর মানুষের মধ্যে নেই। আমরা লিখেছিলাম প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নামাতে হবে। তবে তার আগে কষ্টে থাকা মানুষের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু এ পথে সরকারি বিধায়করা হাঁটেননি। শেষ পর্যন্ত ফলাফল শূন্যই হয়েছে।
অর্থনীতি গতিশীল রাখার জন্য শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত সবই সচল করে দেওয়ার পর বেপরোয়া সাধারণ মানুষের মনে হয়েছে করোনা তেমন ভয়ংকর কিছু না। আরও কিছু রটনা আছে। যেমন-‘গরিবের করোনা হয় না’, ‘আল্লাহ জীবন দিয়েছেন-আল্লাহই নিয়ে যাবেন’; ‘সুতরাং মাস্ক পরে কী হবে’! এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে করোনা থেকে আত্মরক্ষা, পরিবারকে রক্ষা এবং দেশকে রক্ষা করার জন্য কঠোরভাবে মানুষকে গৃহবন্দি করা, স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করা সরকারেরই দায়িত্ব। কিন্তু নিকট অতীতে সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের দুর্বলতা করোনা বিস্তারকে আরও গতিশীল করেছে।
গত ঈদযাত্রার কথাই বলি, শুধু গণপরিবহণ বন্ধ রেখে আর সব যানবাহন চলাচল বাধাহীন করে প্রশাসন অমার্জনীয় অন্যায় করেছে বলেই আমাদের মনে হয়েছে। আমরা মনে করি, শহরের প্রান্তিক মানুষের ঘরে খাবার নিশ্চিত করে সব ধরনের যানবাহন ও মানুষের অবাধ চলাচলকে প্রতিহত করতে পারলে অনেকটা সাফল্য পাওয়া যেত। কিন্তু তা না করে শুধু গণপরিবহণ বন্ধ করায় সামাজিক দূরত্ব কোনোভাবেই বজায় রাখা গেল না। বরঞ্চ শহরের করোনা গ্রামে ছড়াল। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকার পরও একই ভুল করা হলো। ঢাকা থেকে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ‘কঠোর বিধি’ জারি হলো।
আবারও বন্ধ হলো গণপরিবহণ। কয়েক মাস আগের চিত্রই পেলাম। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ ছাড়া সব পরিবহণ চলতে লাগল। অটো, সিএনজি অটোরিক্সা, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, ট্রাক সব কিছুতে গাদাগাদি করে মানুষের চলাচলে কোনো বাধা থাকল না। আবারও মনে হলো গণপরিবহণ খোলা থাকলে তবু একটুখানি হলেও স্বাস্থ্যবিধি মানা যেত। এ কারণেই বলছি দুদিন আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও একই দৃশ্যপটের অবতারণা হলো কেমন করে! আসলে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি না থাকলে এভাবে ‘সবাই রাজার দেশ’ হয়ে যায়। মধ্য থেকে কষ্ট, ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হলো সাধারণ মানুষ।
আর্থিক লাভের মুখ দেখল সচল সব যানের মালিক, ড্রাইভার আর রাস্তার নিয়ন্ত্রণে থাকা পুলিশ। মানুষের কষ্ট নিবারণ করার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। আমার মেয়ে গত ২৬ জুন অমন দুর্ভোগের ভুক্তভোগী হয়েছিল। সেখান থেকে একটি চিত্র পাওয়া যায়। ওরা বিকাল সাড়ে পাঁচটায় শাহবাগ থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে রওয়ানা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের উদ্দেশে। গাবতলী থেকে জ্যামে পড়ল। গাবতলী ব্রিজ পার হয়েছে আধা ঘণ্টার বেশি সময়ে। আমিনবাজারে এসে আটকা পড়ল শত শত গাড়ি। তিন ঘণ্টা ঠায় আমিনবাজারে।
আমার মেয়ের অভিব্যক্তি, যেভাবে মানুষের ঢল ছুটছিল তাতে আমাদের মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা মনে হচ্ছিল। ওরা তিন ঘণ্টা গাড়িতে বসে বিপন্নবোধ করছিল, আর ভাবছিল বাসে আটকে পড়া মানুষদের কষ্ট। হাজার সংস্কারের পরও যেমন এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের জলজট কাটানো যায় না, তেমনি হাজার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো স্বাভাবিক রাখার ক্ষমতা কেউ ধারণ করেন না।
এসব কারণে করোনা সংক্রমণের বৃদ্ধি ঠেকাতে এবারের দেশব্যাপী শাটডাউন জারি দেখেও আমরা হতাশা কাটাতে পারছি না। যদিও প্রশাসন জানিয়েছে শাটডাউন কার্যকর করতে এবার প্রশাসন কঠোর হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নামবে। আশার কথা নানা সমালোচনার পর মন্ত্রিপরিষদ জানিয়েছে পণ্যবাহী গাড়ি ছাড়া সব যানবাহন বন্ধ থাকবে। এখন তা কার্যকর রাখতে পারলে ভালো। যদিও গতবারের মতো হুট করে নয়, কয়েকদিন আগেই জানানো হয়েছে দেশজুড়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা। শাটডাউন শুনে স্রোতের মতো চলা মানুষের টিভি সাক্ষাৎকার শুনলাম।
তাদের একই কথা, তারা দিনমজুর-কর্মহীন হয়ে বাঁচবেন কেমন করে? তাই গ্রামে ছুটছেন। অর্থাৎ এই মানুষদের কাছে সরকার পক্ষ আশ্বাস বাণী নিয়ে যায়নি যে সরকার ঘরে খাবার পৌঁছে দেবে। এ কারণেই আমরা আশঙ্কা করছি, এই শাটডাউন বা লকডাউনও হয়তো তেমনভাবে সফল হবে না। এই সত্যটি মানতে হবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কোনো কঠোরতা দিয়েই মানুষকে ঘরে বন্দি রাখা সম্ভব হবে না।
সরকার যা পারছে করছে, করবে। কিন্তু করোনার এই মহাসংকটে দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। আমি মনে করি দেশের নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী, আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রী, মসজিদের ইমাম-সবাই মানুষকে সচেতন করার জন্য ভূমিকা রাখতে পারেন।
মুশকিল হলো দেশে এখন আর তেমন সাংস্কৃতিক সংগঠন নেই, যার কর্মীরা জনকল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ সবাইকেই যেন হীনবল করে ফেলেছে। ছাত্রছাত্রীরা এখন দেশের নানা অংশে ছড়িয়ে আছে। ওরা সংগঠিত হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেদের সুরক্ষিত করে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। মানতে হবে নিজে ভালো থাকলেই ভালো থাকা যাবে না। সবাইকে নিয়েই ভালো থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতই টিকা নেই না কেন মাস্ক পরার চেয়ে বড় টিকা আর কিছু নেই। নাক-মুখ দিয়েই যদি ভাইরাসের জীবাণু ঢুকতে না পারে তাহলে এর সাধ্য নেই কাউকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই সবাইকে মাস্ক পরতে বাধ্য করতে হবে। এখন রাস্তায় বেরোলে লক্ষ করি কজন মাস্ক পরেছেন। দোকানপাটের কর্মচারী, মাছ-সবজি বিক্রেতা, রিকশা ও গাড়ির চালক এবং সাধারণ মানুষ অনেকেই মাস্ক পরছেন না। আবার অনেকের মাস্ক থাকলেও তা গলায় ঝুলছে। যেন মনে হয় করোনার জীবাণু গলা দিয়ে ঢুকবে। এসব বাস্তবতায় সমগ্র দেশবাসীর স্বার্থে প্রশাসনের উচিত হবে শাটডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মানাতে কঠোরতা অবলম্বন করা।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
