নষ্ট রাজনীতিমুক্ত হোক উচ্চ শিক্ষাঙ্গন
Advertisement
এ কে এম শাহনাওয়াজ
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কয়েক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করার চিন্তা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। বিধান সভায় পাশ হওয়া এ বিলে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং কাজে ব্যর্থতার দায়ে উপাচার্যকে অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। আমাদের সিনেট-সিন্ডিকেটের মতো পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে কোর্ট কাউন্সিল। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এ কাউন্সিলে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে একটি অধ্যাদেশ জারি করে বলা হয়েছে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির কারণে শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে।
রাজনীতির থাবা আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষাকে যখন কঠিন সংকটে ফেলে দিয়েছে, তখই প্রতিবেশী দেশের এমন ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ আমাদের আশাবাদী করে তুলেছিল। এ ধারার পদক্ষেপ আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনুপ্রাণিত করলে বন্দিত্ব দশা থেকে আমরা নিশ্চয় মুক্তি পাব। আমি যতদূর খবর রাখি, তাতে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমাদের মতো অতটা নষ্ট করে দেয়নি। তারপরও এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে পারছিলেন না কেউ। শেষ পর্যন্ত মমতা সরকার এ অসাধ্যটি সাধন করেছিল।
১৯৯০-৯৩ সালের কথা বলছি। এর অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়ে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আর এই দুষ্টগ্রহ উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে একটি স্খলন স্পষ্ট করে। সে সময় আমি কাছে থেকে দেখেছি ক্যাম্পাস রাজনীতি অনেকটা শোভন পর্যায়ে ছিল পশ্চিমবঙ্গে। এ সময় আমি গবেষণার কাজে কলকাতায় অবস্থান করছিলাম। একদিনের কথা আমি ভুলতে পারব না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছি। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই কেমন যেন ভিন্ন আবহ চোখে পড়ল। ক্যাম্পাস যেন একটু বেশি সুনসান। না, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ নয়। ক্লাস চলছে। মানুষজনেরও চলাফেরা আছে। তারপরও যেন ভিন্নরকম নীরবতা। আরেকটু এগিয়ে লাইব্রেরির কাছাকাছি একটি খোলা চত্বরের কাছে গেলে রহস্য উন্মোচিত হলো। কয়েকজন তরুণ-তরুণী কয়েকটি চেয়ার পেতে বসেছে। সামনে একটি টেবিল। ওপরে কিছু কাগজপত্র। ওদের পাশেই একটি বড় প্লাকার্ড টানানো আছে। ওখানে চোখ বুলিয়ে বুঝলাম আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন। প্লাকার্ডে প্যানেল পরিচিতি রয়েছে। ভোটার ছাত্রছাত্রীরা ওদের কাছ থেকে ভোটার নম্বর ইত্যাদি জানার সহযোগিতা নিচ্ছে। আমি এবার কল্পনা করলাম আমার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ধরে নিচ্ছি ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে। স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ থাকছে না সেদিন। বিভিন্ন দলের মহড়া চলছে। প্রতিপক্ষের ওপর হামলার আশঙ্কা হচ্ছে। কেউ আশঙ্কা করছেন ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের। কয়েক প্লাটুন পুলিশের সতর্ক অবস্থান।
এখন তো রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধা বিচার করতে গিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভুলতেই বসেছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন করার কথা। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া তো আমাদের জানা। আমি পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, সেখানে শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শগত মতভেদ আছে; কিন্তু তার কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার মতো সংকট তারা সাধারণত সৃষ্টি করেন না। অন্তত গত শতকের নব্বইয়ের দশকে কলকাতা শহরকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতি থাকলেও ছাত্র সংঘাতের কথা তেমন শুনিনি। পরবর্তী দেড় যুগে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে জাতীয় রাজনীতির কুপ্রভাব পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পড়েছে, তবে আমরা যতটা বখে গেছি, তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। তারপরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের অভিভাবক ও সুশীল সমাজ। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অবশ্য এক শ্রেণির রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ মমতা সরকারের এ বিল পাশকে বাঁকা চোখে দেখছেন। তারা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে তিন দশকের বাম শাসনে বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিস্ট দলগুলোর যে প্রভাব তৈরি হয়েছিল, তার মূল উৎপাটনই মমতার এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, এ আইন রাজনীতির প্রভাবমুক্ত উচ্চশিক্ষার পরিবেশকে যে পরিশুদ্ধ করবে, এ ব্যাপারে মুক্তচিন্তার মানুষ নিঃসন্দেহ।
স্বাধীনতা-পূর্ব ছাত্র রাজনীতির গৌরবজনক ঐতিহ্যের কথা আমরা বলি। তখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। একটি পরাধীন দেশে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই চলছে। ব্যক্তিগত লাভের প্রশ্ন তখন ছাত্রদের কাছে অজানা ছিল। তারুণ্যের উদ্দীপনায় দেশাত্মবোধ তাদের তাড়িত করত। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করাকে মহত্তম কাজ মনে করত। দলীয় নেতৃত্বের হুকুমবরদার হওয়ার মতো শিক্ষক রাজনীতির ধারণাও তখন তৈরি হয়নি। উপাচার্য পদলোভীদের রাজনৈতিক ঘোঁট পাকাতে হয়, তেমন বাস্তবতার জন্ম হয়নি। তাই উপাচার্য পদটি তখন ছিল অতি সম্মানের। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োজিত উপাচার্য মহোদয়দের আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন ছিল না। পাণ্ডিত্যের বিভায় তারা প্রত্যেকেই ছিলেন উজ্জ্বল। এখনকার মতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তারা প্রতিদিন নতুন বিতর্কের জন্ম দিতেন না। পাশাপাশি শিক্ষা গবেষণায় সিদ্ধ শিক্ষকরা ডিনসহ নানা একাডেমিক-প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে তেমন অস্বস্তি চোখে পড়ত না। এসব কিছুর যোগফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান তেমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাশ হলে উচ্চশিক্ষা অঙ্গনের সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবার পুরো গণতান্ত্রিক হলো। কিন্তু যে দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের অপব্যবহার রয়েছে, সেদেশে গণতন্ত্র নিজস্ব রূপ নিয়ে কখনো দাঁড়াতে পারে না। জাতীয় রাজনীতি কঠিন দলতন্ত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে এদেশে ক্ষমতার রাজনীতির দৌড়ে এগিয়ে থাকা দলগুলো জনগণের রাজনীতি প্রায় ভুলতে বসল। এসব দলের পরিচালকরা গণতন্ত্রের স্লোগানে মাঠ কাঁপালেন; কিন্তু আচরণে লাঞ্ছিত করতে লাগলেন গণতন্ত্রকে। নিজ নিজ দলীয় শক্তি কুক্ষিগত করতে দলের নীতিনির্ধারকদের শ্যেনদৃষ্টি পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে। সুবিধাবাদীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পেশিশক্তির খোঁজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে। আইয়ুব খানও অভিন্ন উদ্দেশ্যে এনএসএফ গঠন করেছিলেন। কিন্তু অধিকার আদায়ের আন্দোলনে উদ্বেলিত ছাত্রদের সামনে কিছুটা নৈরাজ্য সৃষ্টি ছাড়া এনএসএফ শাসকদের উদ্দেশ্য তেমন সফল করতে পারেনি।
স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ এর ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখাতে পারেনি। বলা যায় সে সময়ের নেতৃত্ব গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শপথ ভুলে দলীয় সংকীর্ণতায় স্বার্থপর হতে থাকে। এরই কুপ্রভাব পড়ে রাজনীতিতে এবং অতঃপর ছাত্র রাজনীতিতে। আওয়ামী ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগে বিভাজিত হয়ে খুনোখুনির রাজনীতির বিকাশ ঘটানো হলো ক্যাম্পাসে। পরে ছাত্রদল ও ছাত্রসমাজ অভিন্ন অঘটনের নায়ক হতে লাগল। ক্ষমতার বলয় তৈরি করতে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার ঘরানায় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে লাগল। এভাবে আদর্শ থেকে কক্ষচ্যুত হতে লাগল ছাত্ররাজনীতি। ছাত্রকল্যাণ ও শিক্ষা সংক্রান্ত দাবি ক্রমে ছাত্ররাজনীতির স্লোগান থেকে অপসৃত হতে লাগল। দলীয় রাজনীতি ও দলীয় নেতা-নেত্রীর বন্দনা হলো এ পর্বের ছাত্র রাজনীতির আদর্শ। এভাবে রাজনৈতিক দলের হাতিয়ারে পরিণত হতে লাগল ছাত্ররাজনীতি। এ বাস্তবতায় মেধাবী ও আদর্শবাদী ছাত্ররা স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেধাবীদের অন্ধকার পথ চেনানো সম্পন্ন করা হলো। এমনি করে দলীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধি এবং প্রতিপক্ষকে পেশিশক্তি দিয়ে ঘায়েল করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার সমর্থিত ছাত্রনেতা ও কর্মীদের মাথায় চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসের কণ্টক মুকুট পরিয়ে দিল। স্বাভাবিকভাবেই এমন বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবেই।
একই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষকদের মধ্যে দলীয় রাজনীতি কদর্যভাবে জায়গা করে নিল। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্ত হওয়া কল্যাণকর হতে পারত, যদি রাজনীতিসংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা শিক্ষকের মর্যাদা ও অহংকারকে সবার ওপরে স্থান দিতেন। তারা যদি রাজনৈতিক নেতাদের আজ্ঞাবহ না ভেবে নিজেদের ভাবতে পারতেন দলের গাইড ফিলোসোফার হিসাবে, তাহলে শিক্ষক রাজনীতি কল্যাণ বয়ে আনত।
অপূর্ণ গণতন্ত্রের দেশে গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ বিকৃত হতে বাধ্য। রাজনীতিকরা বিকৃত করার পথ তৈরি করে দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতির স্খলন ঘটতে লাগল উপাচার্য নিয়োগ পদ্ধতি থেকে। উপাচার্য প্যানেল নির্বাচিত হয় সিনেটরদের ভোট থেকে। ফলে সব দল নানা উপায়ে নিজ নিজ সমর্থক সিনেটর তৈরি করতে থাকে। এদিক থেকে সরকারি দল একটু এগিয়ে থাকে। আমলা আর সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে কয়েকজন সদস্য হন। তারা আসেন সরকারের ইচ্ছায়। এ বাস্তবতায় মুক্তচিন্তায় উপাচার্য নিয়োগ হয়ে ওঠে না। অধ্যাদেশভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আর তিনি তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সিদ্ধান্ত দেন। এ ব্যবস্থায় উপাচার্য নিয়োগে দলীয়করণ সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যখন এমন ভয়ংকর বাস্তবতা বিরাজ করছে, তখন উচ্চশিক্ষাকে এর সম্ভ্রমের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা থাকবেই। এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিল পাশ আমাদের উৎসাহিত করে তুলেছে। শিক্ষক রাজনীতি চর্চা করবেন তার মুক্ত চেতনা থেকে। দলীয় আজ্ঞাবহ হয়ে নয়। দেশের বৃহত্তর কল্যাণ চিন্তায় এ অবস্থায় ফিরে আসতে হলে প্রয়োজন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তি। আমরা প্রত্যাশা করব, কোভিড ঝড়ের পর নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় সচল হলে সব পক্ষ আলোকিত পথে হাঁটার শপথ নেবেন। নষ্ট রাজনীতির অক্টোপাস মুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনবেন মুক্ত পরিবেশ।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
