যার কাজ তারই সাজে
jugantor
যার কাজ তারই সাজে

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

১৪ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা-নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, দেশে তা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হওয়ারই কথা, দেশে নানা রকম প্রভাবশালী গ্রুপ তৈরি হয়েছে যারা নানা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য, বাড়ানোর জন্য ক্রমাগত তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে যাচ্ছে। যার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিও তৈরি হতে দেখছি আমরা।

সারা দেশে সরকার ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে পঞ্চাশটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সংস্কৃতি কেন্দ্র পরিচালনা নীতিমালা ২০২১ অনুসারে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে অবস্থান অনুযায়ী মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রধান হবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসক। তারাই মসজিদ পরিচালনা করবেন এবং তারাই মসজিদের জনবল নিয়োগ দেবেন।

কিন্তু সরকারের এ সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের। তাদের বক্তব্য, যেহেতু মসজিদগুলো তৈরি করেছেন তারা এবং সারা দেশে যেহেতু ইমাম প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে মসজিদভিত্তিক অনেক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত, তাই এগুলোর পরিচালনা এবং লোকবল নিয়োগের দায়িত্ব তাদের হাতেই থাকা উচিত ছিল।

এবার মসজিদগুলোর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার ‘যুদ্ধে’ নেমেছেন সংসদ সদস্যরা। কয়েক দিন আগে ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি স্থানীয় সংসদ সদস্যদের পরামর্শ নিয়ে ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এ সুপারিশের কারণ, তাদের ভাষায় মডেল মসজিদগুলো যাতে ‘ধর্মীয় উগ্রবাদের’ কেন্দ্র না হয়। প্রকাশ্যভাবে যে কারণের কথা তারা বলেছেন, অন্যান্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের আচরণ দেখলে আমরা বুঝব আসল কারণ আদতে সেটি নয়।

দেখে নেওয়া যাক আরেকটি ঘটনা। সাম্প্রতিককালে প্রায় প্রতিটি সংসদ অধিবেশনে কোনো না কোনো সংসদ সদস্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে এমপিদের ফিরিয়ে আনার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ফিরিয়ে আনার কথা এ জন্য হচ্ছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এসব কমিটিতে সংসদ সদস্যদের থাকা অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তারপর তাদের কমিটিগুলো থেকে অপসারণ করা হয়।

কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই তারা এটা মেনে নিতে পারেননি, ক্রমাগত চাপ তৈরি করে যাচ্ছেন সরকারের ওপর। অথচ এ সিদ্ধান্ত কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না, দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। অপছন্দ হলেও সেটি তাদের মেনে নিতে হবে। রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি এ অনাস্থা এবং অসম্মান দেখানো নিশ্চিতভাবেই কোনো ভালো লক্ষণ নয়।

এ কয়েকটি সাম্প্রতিক উদাহরণ, এরপর এ প্রশ্ন আমরা করতেই চাই, সংসদ সদস্যদের কাজ আসলে কী? সংসদ যেহেতু রাষ্ট্রের আইন পরিষদ, তাই সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন। প্রতিটি আইনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সেগুলোর সংশোধনী বা পরিবর্তনের জন্য ভূমিকা রাখা তাদের প্রাথমিক কাজ।

এ ছাড়াও সংসদ রাষ্ট্রীয় প্রতিটি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি এবং কর্মকাণ্ডের আলোচনার জায়গা। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জায়গা। যেহেতু মন্ত্রিসভার সদস্য ছাড়া আর সব সংসদ সদস্যই (সরকারি দলের অন্য সদস্যরাও) বেসরকারি সদস্য, তাই তারা সরকারের সব পদক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন, জবাবদিহি চাইবেন। এভাবেই একটি সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের এ মূল কাজটি করার ক্ষেত্রে আছে সীমাহীন অনীহা। বাংলাদেশের সংসদের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত বিরতিতে রিপোর্ট প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে একাদশ সংসদ নিয়ে তাদের আংশিক মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছে। দেখা যাক, সংসদের মূল কাজ অর্থাৎ আইন প্রণয়নে আমাদের সংসদ কতটা ব্যস্ত থাকে।

একাদশ সংসদের পাঁচটি অধিবেশনে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে ৯ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে। অথচ ২০১৯ সালে ভারতের লোকসভায় এ হার ছিল ৪৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিল উত্থাপন এবং বিলের ওপর সদস্যদের আলোচনা ও মন্ত্রীর বক্তব্যসহ একটি বিল পাশ করতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গড়ে প্রায় ৩২ মিনিট সময় ব্যয় হয়েছে, যেখানে ভারতের লোকসভায় প্রতিটি বিল পাশে গড়ে প্রায় ১৮৬ মিনিট ব্যয় হয়েছে।

অর্থাৎ একটি আইন পাশে ভারতে ব্যয় হয়েছে আমাদের ছয় গুণ সময়। সে কারণেই দেখা যায়, কোনো আইনে যদি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়, সেটি বিরাম চিহ্ন এবং দু-একটি শব্দের বানান বা শব্দ পরিবর্তনের বেশি তেমন কিছু নয়।

এ ছাড়াও সংসদে কোরাম পূর্ণ হতে যে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ সদস্যের উপস্থিতি লাগে, সেটিও সময়মতো হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। যার ফলে অধিবেশন শুরু হতে দেরি হয়। অধিবেশন শুরু হতে এ দেরির কারণে বিরাট অংকের আর্থিক ক্ষতিও হয়। টিআইবি’র রিপোর্ট আমাদের সেটাও জানায়। অর্থাৎ এটা খুব স্পষ্ট, আমাদের দেশের সংসদ সদস্যরা সংসদে থাকতে খুব একটা আগ্রহী নন। কোনোক্রমে একবার নির্বাচিত হতে পারলে এরপর তারা ব্যস্ত থাকেন নানা কাজে, যেটা তাদের মূল কাজের একেবারেই উলটো, তাই ক্ষতিকর।

কী নিয়ে সংসদ সদস্যরা আগ্রহী, তার ছোট নমুনা শুরুতেই দেওয়া হয়েছে। এবার জেনে নেওয়া যাক, তাদের আরও কিছু আগ্রহের জায়গা। এর মধ্যে কিছু একেবারে আইনগতভাবেই তাদের এখতিয়ারে দেওয়া হয়েছে।

জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী দুটি স্থানীয় সরকার প্রশাসনেই স্থানীয় সংসদ সদস্য উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ অধিকার দেওয়া হয়েছে তাদের আইনিভাবেই। শুধু উপদেষ্টা হওয়া নয়, উপজেলা আইনের ২৫ ধারায় তাদের এমনভাবে ক্ষমতায়িত করা হয়েছে যে, তাদের বাদ দিয়ে উপজেলা পরিষদ কোনোভাবেই চলতে পারে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা কমিটিসহ মাঠ প্রশাসনের আরও কয়েকটি কমিটির উপদেষ্টা থাকেন তারা।

টিআর, কাবিখা-কাবিটাসহ বিভিন্ন সামাজিক বেষ্টনীমূলক কর্মসূচিও নির্ধারিত হয় তাদের পছন্দ অনুযায়ী; তাদের নামে নির্দিষ্ট বরাদ্দ আসে। এসব খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ পেতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিতে পারেন তারা। এ ছাড়াও নানা প্রকল্প অনুমোদন করার জন্য ডিও লেটার দেওয়ার ক্ষমতাও আছে তাদের। ডিও দিতে পারেন সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি কিংবা বদলিরও।

এ ছাড়াও নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার সব উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে আর্থিক উপার্জনের অভিযোগও আছে অনেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষমতা-কর্তৃত্ব পাওয়ার জন্য কিংবা ধরে রাখার জন্য, আবার কেউ কেউ অনৈতিক উপার্জনের জন্য স্থানীয়ভাবে নিজ নিজ সংসদীয় আসনের এলাকাতেই তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখেন।

ওদিকে আমাদের প্রচলিত সিস্টেমে যেহেতু কোনো সংসদ সদস্য তার এলাকার জন্য কী করেছেন, পরবর্তী নির্বাচনের মনোনয়ন পাওয়া এবং নির্বাচনি প্রচারণার সময় সেসব নিয়ে তুমুল প্রচারণা চালানো হয়, তাই সংসদ সদস্যদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে এলাকা।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের সংসদ তার প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। এ অনুচ্ছেদটিকে সংশোধন না করা পর্যন্ত সেটি হবেও না। কিন্তু তার মানে এটাও নয়, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিবিদরা তাদের মূল কাজ বাদ দিয়ে ব্যস্ত থাকবেন এমন সব কাজে যেটা কোনোভাবেই তাদের দায়িত্ব না।

সংসদ সদস্যরা যেসব কাজ করছেন তাদের এলাকায়, সেগুলো মূলত স্থানীয় সরকারের কাজ। সংসদ সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দাপটে বাংলাদেশের নির্বাচিত স্থানীয় সরকার তার দায়িত্ব পালনে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়। অথচ আমরা যদি সংবিধান ন্যূনতম মানতাম তাহলে ৫৯ এবং ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় শাসন হতে পারত আমাদের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ।

আমি বিশ্বাস করি, উপরে উল্লিখিত যেসব ক্ষেত্রে আইন এবং পদ্ধতিগতভাবেই সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা আছে, সেগুলো থেকে দ্রুত তাদের বাদ দেওয়া উচিত। এটা সংসদ এবং স্থানীয় সরকার উভয়ের জন্যই কল্যাণকর হবে। আমাদের এখন সময় হয়েছে এ আলাপ তোলার যে, কে সংসদ সদস্য হবেন আর কে হবেন বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের প্রধান। এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কারোর মতো প্রশাসনিক কাজে কারও আগ্রহ থাকতেই পারে।

সেক্ষেত্রে তার পক্ষে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করাই শ্রেয় হবে। কোনো এমপি যদি তার মূল দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংসদীয় এলাকার কাজেই আগ্রহী না হন, তাহলে ভবিষ্যতে তাকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে ভাবতে হবে। সংসদ সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি আরেকজন যোগ্য, আগ্রহী মানুষের জন্য অবরুদ্ধ করতে দেওয়া যায় না।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

যার কাজ তারই সাজে

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
১৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা-নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, দেশে তা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হওয়ারই কথা, দেশে নানা রকম প্রভাবশালী গ্রুপ তৈরি হয়েছে যারা নানা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য, বাড়ানোর জন্য ক্রমাগত তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে যাচ্ছে। যার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিও তৈরি হতে দেখছি আমরা।

সারা দেশে সরকার ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে পঞ্চাশটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সংস্কৃতি কেন্দ্র পরিচালনা নীতিমালা ২০২১ অনুসারে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে অবস্থান অনুযায়ী মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রধান হবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসক। তারাই মসজিদ পরিচালনা করবেন এবং তারাই মসজিদের জনবল নিয়োগ দেবেন।

কিন্তু সরকারের এ সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের। তাদের বক্তব্য, যেহেতু মসজিদগুলো তৈরি করেছেন তারা এবং সারা দেশে যেহেতু ইমাম প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে মসজিদভিত্তিক অনেক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত, তাই এগুলোর পরিচালনা এবং লোকবল নিয়োগের দায়িত্ব তাদের হাতেই থাকা উচিত ছিল।

এবার মসজিদগুলোর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার ‘যুদ্ধে’ নেমেছেন সংসদ সদস্যরা। কয়েক দিন আগে ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি স্থানীয় সংসদ সদস্যদের পরামর্শ নিয়ে ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এ সুপারিশের কারণ, তাদের ভাষায় মডেল মসজিদগুলো যাতে ‘ধর্মীয় উগ্রবাদের’ কেন্দ্র না হয়। প্রকাশ্যভাবে যে কারণের কথা তারা বলেছেন, অন্যান্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের আচরণ দেখলে আমরা বুঝব আসল কারণ আদতে সেটি নয়।

দেখে নেওয়া যাক আরেকটি ঘটনা। সাম্প্রতিককালে প্রায় প্রতিটি সংসদ অধিবেশনে কোনো না কোনো সংসদ সদস্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে এমপিদের ফিরিয়ে আনার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ফিরিয়ে আনার কথা এ জন্য হচ্ছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এসব কমিটিতে সংসদ সদস্যদের থাকা অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তারপর তাদের কমিটিগুলো থেকে অপসারণ করা হয়।

কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই তারা এটা মেনে নিতে পারেননি, ক্রমাগত চাপ তৈরি করে যাচ্ছেন সরকারের ওপর। অথচ এ সিদ্ধান্ত কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না, দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। অপছন্দ হলেও সেটি তাদের মেনে নিতে হবে। রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি এ অনাস্থা এবং অসম্মান দেখানো নিশ্চিতভাবেই কোনো ভালো লক্ষণ নয়।

এ কয়েকটি সাম্প্রতিক উদাহরণ, এরপর এ প্রশ্ন আমরা করতেই চাই, সংসদ সদস্যদের কাজ আসলে কী? সংসদ যেহেতু রাষ্ট্রের আইন পরিষদ, তাই সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন। প্রতিটি আইনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সেগুলোর সংশোধনী বা পরিবর্তনের জন্য ভূমিকা রাখা তাদের প্রাথমিক কাজ।

এ ছাড়াও সংসদ রাষ্ট্রীয় প্রতিটি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি এবং কর্মকাণ্ডের আলোচনার জায়গা। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জায়গা। যেহেতু মন্ত্রিসভার সদস্য ছাড়া আর সব সংসদ সদস্যই (সরকারি দলের অন্য সদস্যরাও) বেসরকারি সদস্য, তাই তারা সরকারের সব পদক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন, জবাবদিহি চাইবেন। এভাবেই একটি সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের এ মূল কাজটি করার ক্ষেত্রে আছে সীমাহীন অনীহা। বাংলাদেশের সংসদের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত বিরতিতে রিপোর্ট প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে একাদশ সংসদ নিয়ে তাদের আংশিক মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছে। দেখা যাক, সংসদের মূল কাজ অর্থাৎ আইন প্রণয়নে আমাদের সংসদ কতটা ব্যস্ত থাকে।

একাদশ সংসদের পাঁচটি অধিবেশনে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে ৯ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে। অথচ ২০১৯ সালে ভারতের লোকসভায় এ হার ছিল ৪৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিল উত্থাপন এবং বিলের ওপর সদস্যদের আলোচনা ও মন্ত্রীর বক্তব্যসহ একটি বিল পাশ করতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গড়ে প্রায় ৩২ মিনিট সময় ব্যয় হয়েছে, যেখানে ভারতের লোকসভায় প্রতিটি বিল পাশে গড়ে প্রায় ১৮৬ মিনিট ব্যয় হয়েছে।

অর্থাৎ একটি আইন পাশে ভারতে ব্যয় হয়েছে আমাদের ছয় গুণ সময়। সে কারণেই দেখা যায়, কোনো আইনে যদি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়, সেটি বিরাম চিহ্ন এবং দু-একটি শব্দের বানান বা শব্দ পরিবর্তনের বেশি তেমন কিছু নয়।

এ ছাড়াও সংসদে কোরাম পূর্ণ হতে যে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ সদস্যের উপস্থিতি লাগে, সেটিও সময়মতো হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। যার ফলে অধিবেশন শুরু হতে দেরি হয়। অধিবেশন শুরু হতে এ দেরির কারণে বিরাট অংকের আর্থিক ক্ষতিও হয়। টিআইবি’র রিপোর্ট আমাদের সেটাও জানায়। অর্থাৎ এটা খুব স্পষ্ট, আমাদের দেশের সংসদ সদস্যরা সংসদে থাকতে খুব একটা আগ্রহী নন। কোনোক্রমে একবার নির্বাচিত হতে পারলে এরপর তারা ব্যস্ত থাকেন নানা কাজে, যেটা তাদের মূল কাজের একেবারেই উলটো, তাই ক্ষতিকর।

কী নিয়ে সংসদ সদস্যরা আগ্রহী, তার ছোট নমুনা শুরুতেই দেওয়া হয়েছে। এবার জেনে নেওয়া যাক, তাদের আরও কিছু আগ্রহের জায়গা। এর মধ্যে কিছু একেবারে আইনগতভাবেই তাদের এখতিয়ারে দেওয়া হয়েছে।

জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী দুটি স্থানীয় সরকার প্রশাসনেই স্থানীয় সংসদ সদস্য উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ অধিকার দেওয়া হয়েছে তাদের আইনিভাবেই। শুধু উপদেষ্টা হওয়া নয়, উপজেলা আইনের ২৫ ধারায় তাদের এমনভাবে ক্ষমতায়িত করা হয়েছে যে, তাদের বাদ দিয়ে উপজেলা পরিষদ কোনোভাবেই চলতে পারে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা কমিটিসহ মাঠ প্রশাসনের আরও কয়েকটি কমিটির উপদেষ্টা থাকেন তারা।

টিআর, কাবিখা-কাবিটাসহ বিভিন্ন সামাজিক বেষ্টনীমূলক কর্মসূচিও নির্ধারিত হয় তাদের পছন্দ অনুযায়ী; তাদের নামে নির্দিষ্ট বরাদ্দ আসে। এসব খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ পেতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিতে পারেন তারা। এ ছাড়াও নানা প্রকল্প অনুমোদন করার জন্য ডিও লেটার দেওয়ার ক্ষমতাও আছে তাদের। ডিও দিতে পারেন সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি কিংবা বদলিরও।

এ ছাড়াও নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার সব উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে আর্থিক উপার্জনের অভিযোগও আছে অনেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষমতা-কর্তৃত্ব পাওয়ার জন্য কিংবা ধরে রাখার জন্য, আবার কেউ কেউ অনৈতিক উপার্জনের জন্য স্থানীয়ভাবে নিজ নিজ সংসদীয় আসনের এলাকাতেই তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখেন।

ওদিকে আমাদের প্রচলিত সিস্টেমে যেহেতু কোনো সংসদ সদস্য তার এলাকার জন্য কী করেছেন, পরবর্তী নির্বাচনের মনোনয়ন পাওয়া এবং নির্বাচনি প্রচারণার সময় সেসব নিয়ে তুমুল প্রচারণা চালানো হয়, তাই সংসদ সদস্যদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে এলাকা।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের সংসদ তার প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। এ অনুচ্ছেদটিকে সংশোধন না করা পর্যন্ত সেটি হবেও না। কিন্তু তার মানে এটাও নয়, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিবিদরা তাদের মূল কাজ বাদ দিয়ে ব্যস্ত থাকবেন এমন সব কাজে যেটা কোনোভাবেই তাদের দায়িত্ব না।

সংসদ সদস্যরা যেসব কাজ করছেন তাদের এলাকায়, সেগুলো মূলত স্থানীয় সরকারের কাজ। সংসদ সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দাপটে বাংলাদেশের নির্বাচিত স্থানীয় সরকার তার দায়িত্ব পালনে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়। অথচ আমরা যদি সংবিধান ন্যূনতম মানতাম তাহলে ৫৯ এবং ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় শাসন হতে পারত আমাদের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ।

আমি বিশ্বাস করি, উপরে উল্লিখিত যেসব ক্ষেত্রে আইন এবং পদ্ধতিগতভাবেই সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা আছে, সেগুলো থেকে দ্রুত তাদের বাদ দেওয়া উচিত। এটা সংসদ এবং স্থানীয় সরকার উভয়ের জন্যই কল্যাণকর হবে। আমাদের এখন সময় হয়েছে এ আলাপ তোলার যে, কে সংসদ সদস্য হবেন আর কে হবেন বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের প্রধান। এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কারোর মতো প্রশাসনিক কাজে কারও আগ্রহ থাকতেই পারে।

সেক্ষেত্রে তার পক্ষে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করাই শ্রেয় হবে। কোনো এমপি যদি তার মূল দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংসদীয় এলাকার কাজেই আগ্রহী না হন, তাহলে ভবিষ্যতে তাকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে ভাবতে হবে। সংসদ সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি আরেকজন যোগ্য, আগ্রহী মানুষের জন্য অবরুদ্ধ করতে দেওয়া যায় না।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন