স্বদেশ ভাবনা
চালের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে যা করা দরকার
Advertisement
আবদুল লতিফ মণ্ডল
প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকার চলতি আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী সরকার ৮ লাখ টন ধান ও সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে ধান ও চালের পরিমাণ যথাক্রমে ৩ লাখ এবং ৫ লাখ টন।
সরকার কেজিপ্রতি ২৭ টাকা দরে ধান কিনবে কৃষকের কাছ থেকে, আর চালকল মালিকদের কাছ থেকে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা দামে কিনবে চাল। এবার ধান ও চালের কেজিপ্রতি মূল্য গত আমন মৌসুমের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে এক টাকা ও তিন টাকা বাড়ানো হলেও তা গত বোরো মৌসুমে নির্ধারিত প্রতি কেজি বোরো ধান ও চালের সমান। ঘোষণা মোতাবেক ৭ নভেম্বর আমন ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়ে তা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
এবারের আমন সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক. ধানচাষিদের স্বার্থরক্ষা হবে কি না; খ. সংগ্রহ অভিযান সফল এবং সরকারি মজুত বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে কি না; গ. চালের আকাশছোঁয়া দাম হ্রাস পেয়ে ভোক্তার জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে কি না।
সরকার দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করে আসছে। ধান ও চাল সংগ্রহের পেছনে যেসব উদ্দেশ্য নিহিত থাকে সেগুলো হলো-ক. ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখা, যাতে ধানচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, ন্যায্যমূল্য পান এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহিত হন; খ. সরকারি গুদামে চালের নিরাপত্তা মজুত গড়ে তোলা; গ. বাজারে চালের দাম বাড়লে সরকারি মজুত থেকে খোলাবাজারে (ওএমএস) ও ন্যায্যমূল্যের দোকানে চাল বিক্রির মাধ্যমে দাম স্থিতিশীল রাখা; ঘ. সরকারের লক্ষ্যমুখী খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।
একাধিক কারণে এবার অভ্যন্তরীণ আমন সংগ্রহ অভিযানে ধানচাষিদের স্বার্থরক্ষার সম্ভাবনা কম। প্রথমত, সরকার যে পরিমাণ আমন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ, কমবেশি ৫ শতাংশ। এমনকি তা গত আমন মৌসুমে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। গত আমন মৌসুমে ১০ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যার মধ্যে ধান ও চালের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬ লাখ টন ৪ লাখ টন। এবার ধান ও চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ৮ লাখ টন। আর ধানচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা গত আমন মৌসুমের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী ধানচাষিদের স্বার্থে তাদের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে বেশি পরিমাণ ধান কেনার কথা একাধিকবার বললেও বাস্তবে ঘটছে এর বিপরীত ঘটনা। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে ধানচাষিদের কমবেশি ৮০ ভাগই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন। তারা ধারদেনা করে ফসল ফলান।
তাদের সংসারে নানা অভাব-অনটন লেগেই থাকে। ফলে ধান কাটার পরপরই বহুকষ্টে ফলানো ফসল বিক্রি করতে বাজারে নিতে হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, মৌসুমের শুরুতে সরকারের ধান কেনার কার্যক্রম সারা দেশে চালু না হওয়ায় গরিব ধানচাষিরা তাদের ফসল সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে চালকল মালিকদের সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না।
এ কারণে ধানচাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তৃতীয়ত, ধানচাষিদের কাছ থেকে সংগ্রহতব্য ধানের কেজিপ্রতি দাম এক টাকা বাড়ানো হলেও চালকল মালিকদের কাছ থেকে সংগ্রহতব্য চালের দাম কেজিতে বাড়ানো হয়েছে তিন টাকা। এটা কোন ভিত্তিতে করা হয়েছে এর কোনো ব্যাখ্যা সরকার দিয়েছে বলে জানা নেই। সংগ্রহতব্য ধানের দাম নির্ধারণে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলকে প্রভাবিত করার মতো শক্তিশালী সংগঠন ধানচাষিদের নেই। অন্যদিকে অত্যন্ত শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে চালকল মালিকদের। তাই ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে মূল্য নির্ধারণে চালকল মালিকদের প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে মনে করা অযৌক্তিক হবে না। এতে ধানচাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
চলতি আমন সংগ্রহ অভিযানে ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা কম। কারণ, গরিব ধানচাষিরা তাদের অভাব-অনটনের কারণে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করলেও মাঝারি ও বড় চাষিরা তাদের ধান বিক্রি না করে মজুত করে রাখবেন। মৌসুমে তারা সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি না করায় বাজারে ধানের সরবরাহ কমে যাবে। ফলে বেড়ে যাবে ধানের দাম। সরকার ধানের সংগ্রহ মূল্য না বাড়ালে পূরণ হবে না ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা। মৌসুম শেষে শহুরে মানুষ এবং গ্রামের হতদরিদ্র ও চাষবাসের সঙ্গে জড়িত নয় এমন মানুষের সঙ্গে চাল ক্রেতার সারিতে যোগ দেবেন প্রান্তিক ও ভূমিহীন ধানচাষিরাও। বেড়ে যাবে চালের চাহিদা। ধানের দাম বাড়ায় চুক্তিবদ্ধ চালকল মালিকরা নির্ধারিত দরে সরকারের কাছে চাল সরবরাহে আগ্রহী নাও হতে পারেন।
তারা চালের মূল্য বাড়াতে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার ইতোমধ্যে ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়েছে। এতে বাড়বে বিদ্যুতের দাম। চাল তৈরির খরচ বাড়ার যুক্তিতে চালকল মালিকরা সরকারের কাছে চাল সরবরাহের মূল্যবৃদ্ধির দাবি করতে পারেন। সরকার দাবি না মানলে তারা চুক্তিমূল্যে চাল সরবরাহে গড়িমসি করবেন। এ রকম অনেক নজির রয়েছে। উপর্যুক্ত কারণে চালকল মালিকদের কাছ থেকে সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের মতো চাল না পাওয়ার আশঙ্কা বেশি। এতে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানোর দুটি উৎস হলো অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও আমদানি। গত অর্থবছরে উপর্যুপরি বন্যায় আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমন চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে, যা শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নয়, বরং এর আগের বছরের তুলনায় ৭ লাখ টন কম। উৎপাদন হ্রাস এবং বাজারে ধানের দাম সরকার নির্ধারিত ধানের দামের তুলনায় বেশি হওয়ায় ধানচাষিরা সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহী হননি। আর ধানের দাম বেশি হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে চালকল মালিকরা সরকারকে চুক্তি মোতাবেক চাল সরবরাহে পিছিয়ে থাকেন। ফলে মাত্র ৮৩ হাজার ২০০ টন চাল সংগ্রহ সম্ভব হয়। এদিকে সরকার দেরিতে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এবং ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারের চালের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেওয়ায় চালের আমদানি শুল্ক বহুলাংশে হ্রাস করেও বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি। এ কারণে সরকারি গুদামে চালের মজুত এক যুগের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে আসে। এর সুযোগ নেয় চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা। দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ৫০ টাকায় পৌঁছে। আর মাঝারি ও সরু চালের দামে বল্গাহীন ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বর্তমানে (৭ নভেম্বর) সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য মজুতের মোট পরিমাণ ১৫.৪৭ লাখ টন, যার মধ্যে চাল, ধান ও গমের পরিমাণ যথাক্রমে ১৩.২৭, ০.০৩ এবং ২.১৭ লাখ টন। সরকারের খাদ্যভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, স্ট্যাটিউটরি রেশনিং এবং গ্রামের ৫০ লাখ দুস্থ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণে সরকারি কর্মসূচির জন্য এ মজুত যথেষ্ট নয়। তাই আমন ধান-চাল সংগ্রহের মাধ্যমে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুতের পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য, যদিও এ উদ্দেশ্য পূরণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল নয়।
এই যখন অবস্থা, তখন বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক এক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত সেপ্টেম্বরে ১২৯ দশমিক ২ পয়েন্ট সূচক বেড়ে অক্টোবরে দাঁড়িয়েছে ১৩৩ দশমিক ২ পয়েন্টে। গত মে মাসেও এ মূল্যসূচক ছিল ১২৭ দশমিক ১ পয়েন্ট। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বৈশ্বিক উৎপাদন স্বল্পতা এবং জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। চাল, গম, ভোজ্যতেলের মতো খাদ্যপণ্য আমদানিতে এখন বাংলাদেশকে অধিক অর্থ ব্যয় করতে হবে। এতে বিশেষ করে চাপ পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।
আর যে বিষয়টি শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হলো, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নতুন করে শুরু হওয়া। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ইউরোপ আবারও করোনা মহামারির কেন্দ্র হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নতুন করে শুরু হওয়ায় চীন সরকার জনগণের প্রতি খাদ্যপণ্য মজুত করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। ভারতে নতুন করে করোনাভাইরাসের আক্রমণ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে করোনার নতুন সংক্রমণ বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শীতের আগমনে দেশে আবারও করোনাভাইরাস যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার এবং মাস্ক ব্যবহারের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দেখা যাচ্ছে যখনই আবার শীতকাল আসছে, পৃথিবীর সব দেশেই কিন্তু আবার করোনাভাইরাস দেখা দিচ্ছে। ইউএসএ, ইংল্যান্ড বা ইউরোপের দেশগুলোয় এর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজেই বাংলাদেশের সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য আমি অনুরোধ করছি।’
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে এখন যা করণীয় তা হলো, আমন সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে সার্বিক প্রচেষ্টা নেওয়া। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যতটা সম্ভব চালের সরকারি মজুত বাড়াতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রয়োজনে সরকারি-বেসরকারি খাতে চাল আমদানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের উৎসাহ জোগাতে তাদের সার্বিক সহযোগিতা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালে যখন অন্যসব খাত ধরাশায়ী হয়ে পড়েছিল, তখন কৃষি খাত ও কৃষকরাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। অভ্যন্তরীণ আমন সংগ্রহের ফলে দেশে চালের দাম কমার সম্ভাবনা প্রায় না থাকায় নিু আয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক
