সিইসির সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কিছু কথা
Advertisement
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের অনেক মিডিয়ার নিজস্ব ফেসবুক পাতা আছে। সেখানে মিডিয়াগুলো তাদের সংবাদগুলো শেয়ার করে। কোনো সংবাদের ব্যাপারে দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি জানার ক্ষেত্রে ফেসবুক পাতাগুলো আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। খুব আলোচিত কোনো বিষয় নিয়ে এ কারণেই আমি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ফেসবুক পাতায় মানুষের মন্তব্য পড়ি।
রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি) আয়োজিত ‘আরএফইডি টক উইথ কেএম নূরুল হুদা’ শিরোনামের সংবাদ সম্মেলনে জনাব হুদার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ভীষণ আলোচিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত সংবাদগুলোর নিচে মানুষের মন্তব্য পড়তে পড়তে মনে হলো, জনাব হুদা কি ধারণা করতে পারেন, তার এ সংবাদ সম্মেলনের নানা বক্তব্যের জবাবে মানুষ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ফেসবুকে?
২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ৫০টি সংসদীয় আসনে একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেখানে ৪৭টি আসনের মধ্যে নানা ধরনের অনিয়ম পেয়েছিল। আর এর মধ্যে ৩৩টিতে অর্থাৎ ৬৬ শতাংশ আসনে রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির অভিযোগ ছিল। টিআইবির বিরুদ্ধে সরকারের সব পর্যায় থেকে তীব্র আক্রমণাত্মক মেঠো বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যেটি হতে পারত সবচেয়ে সঠিক পদক্ষেপ অর্থাৎ টিআইবির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া, সেটি করা হয়নি সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন কারও পক্ষ থেকেই। টিআইবি তার রিপোর্ট প্রকাশের সময় স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, তারা যে গবেষণা করেছে, সেটার সমর্থনে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ তাদের কাছে আছে। বোধকরি এটাই কারণ, এটি নিয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার।
দেশে অতি আলোচিত রাতের ভোটের প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে জনাব হুদাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যার জবাবে তিনি বলেন, রাতের ভোট তিনি দেখেননি, এটা অভিযোগ আকারে এসেছে। এবং কেউ যেহেতু আদালতে গিয়ে এটা নিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেনি, তাই তার কিছু করার নেই। একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার অধীনে হওয়া একটি নির্বাচনে রাতের ভোট দেওয়া হচ্ছে এ অভিযোগ পাওয়ার পরও তিনি নিজ থেকে সেটার তদন্ত করবেন না। অভিযোগ পাওয়া দূরে থাকুক, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক এবং আইনি দায়িত্ব ছিল নিজ থেকেই নির্বাচনের পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখা এবং ন্যূনতম অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নির্বাচন স্থগিত করা উচিত হতো ন্যূনতম সততা থাকলে।
সিইসি তার এ সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সিইসি ড. শামসুল হুদা এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। এ দুজনকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করেছেন তিনি। শোনা যাক তার বয়ানে-
‘বদিউল আলম মজুমদার এই কমিশন নিয়ে অনেক কথা বলে ফেলেন। এটার একটা ইতিহাস আছে। এখানে যোগদানের পর থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। তাকে নিয়ে অনেক ঝামেলা, অনিয়ম। এক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, কাজ না করে টাকা দেওয়া, নির্বাচন কমিশনে সভায় অনিয়ম নিয়ে সিদ্ধান্ত আছে।’ বর্তমান ইসির সময়ে কাজ না পাওয়ায় ‘ক্ষুব্ধ হয়ে’ বদিউল এখন কমিশনের সমালোচনা করছেন বলে মন্তব্য করেন নূরুল হুদা।
তিনি বলেন, ‘দুই বছর আমার পেছনে ঘুর ঘুর করছেন। একা একা এসেছেন। খবর পেয়েছি প্রায় ১ কোটি টাকা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে। এ লোকের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করা যায় না, বিশ্বাস করা যায় না। উনি নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কোনো বিশেষজ্ঞ..., কাজ নেই। সংবাদ সম্মেলন করার বিশেষজ্ঞ উনি। আমাদের তো তার দরকার নেই।’
জনাব নূরুল হুদা এ রাষ্ট্রের অত্যন্ত সম্মানিত দুইজন নাগরিক সম্পর্কে প্রকাশ্যে অভিযোগ করলেন। এদের একজন, জনাব শামসুল হুদার নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়েকটি অংশগ্রণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে তার একটি অনুষ্ঠান করেছেন। আর আরেকজন জনাব বদিউল আলম মজুমদার এই দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব করে তোলার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন দীর্ঘ সময় ধরে।
মানি, এমন প্রোফাইলের মানুষ হলেই কেউ যে দুর্নীতি করতে পারেন না, তা নয়। কিন্তু নাগরিক হিসাবে আমাদের প্রশ্ন হলো, সিইসি এমন সম্মানিত নাগরিক দূরেই থাকুক, কারও বিরুদ্ধেই কোনো নথিপত্র ছাড়া এমন বায়বীয় অভিযোগ করতে পারেন? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সিইসি যদি তার দাবিকে সঠিক বলে মনে করেন, তাহলে এই কোটি টাকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেননি কেন?
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থসংশ্লিষ্ট গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ তুলে এর তদন্ত করতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছিলেন ৪২ জন নাগরিক। স্বাক্ষরকারী বিশিষ্ট নাগরিকদের একজন বদিউল আলম মজুমদার। এই নাগরিকরা কোনো বায়বীয় অভিযোগ ইসির বিরুদ্ধে করেননি। তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই তারা এ দাবি করেছিলেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পর্কে সিইসি আরও বলেন, ‘জবাবদিহি অবস্থানের মধ্যে আছি। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি আপনি নন। আপনি সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নন। কাগজ দিয়ে বই তৈরি করবেন এজন্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ কাজ করার কী দরকার। এসব ওয়েবসাইটে আছে। এ ঝালমুড়ি ঠোঙা বানানো ছাড়া কোনো কাজ নাই।’
প্রার্থীদের হলফনামার ভিত্তিতে যে প্রকাশনাটি সুজন করেছে সেটি আমি দেখেছি, বিস্তারিতভাবে পড়েছি। সিইসি বইটি সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তার পেছনে সম্ভাব্য দুটি ব্যাখ্যা থাকতে পারে। বইগুলোতে কী আছে, আদৌ দেখেননি তিনি। আরেকটি হচ্ছে তিনি বইগুলো দেখেছেন, কিন্তু ইচ্ছে করেই এমন তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেছেন। দুটোই খুব খারাপ চর্চার উদাহরণ। এ বইগুলোর ডেটা ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া নিশ্চয়ই। কিন্তু এগুলোতে বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের মধ্যে তুলনামূলক চিত্র এবং একাধিকবার হলফনামা দেওয়া প্রার্থীদের আগের এবং পরের হলফনামার তুলনামূলক বিচার আছে। এক পলক চোখ বোলালেই যে কেউ বুঝে যাওয়ার কথা কতটা পরিশ্রমসাধ্য কাজ এটি। যারা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করতে চান, জানতে চান তাদের জন্য এ কাজটি অমূল্য, কারণ এটা তাকে ওয়েবসাইট থেকে প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য নিয়ে সেটার ওপরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করা থেকে বাঁচিয়ে দেবে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল নিয়েও সুজনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। অতীতে নির্বাচন কমিশন এ তথ্য আপনা থেকেই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করত। কিন্তু বর্তমান কমিশন সেটা না করলে ড. মজুমদার তথ্য অধিকার আইনের অধীনে দরখাস্ত করে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে এগুলো সংগ্রহ করেন। এ তথ্য বিশ্লেষণ থেকেই বেরিয়ে আসে, গত জাতীয় নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, ১১৭৭টি কেন্দ্রে বিএনপি শূন্য ভোট পেয়েছে, এমনকি আওয়ামী লীগও দুটি সেন্টারে শূন্য ভোট পেয়েছে। এ ছাড়া ৫৬৮টি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ এবং একটি কেন্দ্রে বিএনপি প্রদত্ত ভোটের শতভাগ পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যকে এভাবে বিশ্লেষণ করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা নির্বাচনটি গতিপ্রকৃতি জনগণের সামনে যেমনি স্পষ্ট করেছে, তেমনি নিশ্চয়ই ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ করেছে সিইসিকে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় তথ্যের বিশ্লেষণ সংবলিত যে গ্রন্থটি দেখিয়ে সিইসি বিষোদগার করেছেন, তার ভূমিকাটিও কি পড়েছেন তিনি? গ্রন্থের ভূমিকায় দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এই কাজটির শুধু স্বীকৃতি দেননি, সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংস্কার, নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সংস্কার, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধীকরণ, ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্তকরণ, নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুজনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি দেন।
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার দীর্ঘদিন থেকে সিইসি এবং অপরাপর নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে নানা ইস্যুতে অভ্যন্তরীণভাবে এবং প্রকাশ্যেও দ্বিমত প্রকাশ করে আসছেন। সংবাদ সম্মেলনে সিইসি জনাব মাহবুব তালুকদার সম্পর্কেও বেশ কিছু কথা বলেছেন, যার মধ্যে এই কথাগুলো এই কলামের আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক-
মাহবুব তালুকদারকে একজন ‘রোগাক্রান্ত ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেন কেএম নূরুল হুদা। সিইসি বলেন, ‘তিনি (মাহবুব তালুকদার) কখনো আইসিইউতে, কখনো সিসিইউতে থাকেন। সিঙ্গাপুরে ট্রিটমেন্ট (চিকিৎসা) করেছেন, ভারতে ট্রিটমেন্ট করেছেন। বছরে প্রায় ৩০-৪০ লাখ টাকার ট্রিটমেন্ট করেন, এটি নির্বাচন কমিশন বহন করে থাকে।’
মাহবুব তালুকদারের সঙ্গে সিইসির দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য থাকতেই পারে। তার কাছে মনে হতেই পারে, মাহবুব তালুকদার মিডিয়ার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ইসি নিয়ে নানা রকম বিতর্কিত কথা বলে থাকেন। কিন্তু এখানে তার অসুস্থতা এবং চিকিৎসা ব্যয় (যা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই নেওয়া হয়েছে) নিয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক এবং একেবারে ব্যক্তি আক্রমণমূলক। একজন ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের অসুস্থতা নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা সিইসির তীব্র অসংবেদনশীলতাই প্রমাণ করে।
শুধু জাতীয় নির্বাচনই নয়, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মান এতটাই নিচে নেমেছে, বর্তমান কমিশনের অধীনে যেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি। তাদের এ নির্বাচন নিয়ে ছেলেখেলা ভেতর থেকে ক্রমাগত বাধা দিয়েছেন কমিশনার জনাব মাহবুব তালুকদার আর বাইরে থেকে ড. বদিউল আলম মজুমদার। সাম্প্রতিককালে সাবেক সিইসি ড. শামসুল হুদাও বর্তমান সিইসির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাই নূরুল হুদার তীব্র আক্রমণাত্মক, অসৌজন্যমূলক বক্তব্যগুলোর কারণ বুঝতে রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না নিশ্চয়ই।
ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট
