Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাজেট ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নিন

Advertisement

Icon

মুঈদ রহমান

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নিন

ফাইল ছবি

Advertisement

দেশে করোনা সংক্রমণের পর থেকে অর্থনীতির সূচকগুলোতে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন দেখা গেছে। সাধারণভাবে কোনো দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগ বা মহামারিতে অর্থনীতির সূচকগুলো কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়ে। তবে তা নিতান্তই স্বল্প সময়ের জন্য। কিন্তু ২০২০ সালে প্রায় বছরজুড়ে করোনার আক্রমণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে; ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

করোনা-পরবর্তী সময়ে প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে গতির অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। যেমন করোনাকালে ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল অস্বাভাবিক। ২০১৯ সালের জুলাই-নভেম্বরের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৫৮ শতাংশ। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে একই সময়ে অর্থনীতি ছিল ব্যাপক কর্মমুখর। এ সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি না বেড়ে ৫১ শতাংশ কমে গেছে।

ব্যাংকগুলোতে আমানত যখন কমার কথা তখন বেড়েছে, যখন বাড়ার কথা তখন কমেছে। এ অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য হলো, ‘করোনা মহামারির কারণে শুরুতে সবকিছু স্থবির থাকায় অর্থনীতির সব সূচকেই নেতিবাচক চিত্র দেখা দেয়। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সবকিছুতেই চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে এখন সূচকগুলোও লাফিয়ে বাড়ছে। এর মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে। কিন্তু তদারকি রাখতে হবে যাতে কোনো নেতিবাচক দিকে এ উল্লম্ফন ব্যবহৃত না হয়।

এ সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।’ আমরাও চাই কোনো অস্বাভাবিকতার সুযোগ যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে পরিচালিত না হয়। অর্থনৈতিক সূচকগুলোর গতি-প্রকৃতির ওপর কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

করোনার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকায় ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ারই কথা। গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ কমেছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ। এ বছর সে অবস্থা থাকার কথা নয়। তাই চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৮২ দশমিক ১৯ শতাংশ। করোনা-পরবর্তী সময়ে ঋণের এ চাহিদা বৃদ্ধিকে সংশ্লিষ্টরা অস্বাভাবিক বলছেন। কারণ স্বাভাবিক সময়ে এ প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। করোনাকালে সরকারি ঋণ প্রবাহ কমেছিল ৭০ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি বছর বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। এর কারণ হলো, সরকারি ঋণের প্রবাহ বড় বড় প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। করোনাকালে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ গতি হারায়। ফলে সরকারি ঋণ প্রবাহের গতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যায়। কিন্তু চলতি বছর পুরো মাত্রায় প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় ঋণ প্রবাহে গতি ফিরেছে। তবে তাও অস্বাভাবিক।

স্বাভাবিক সময়ে সরকারি ঋণের প্রবাহ যদি বাড়ে তবে তা ৮ থেকে ২৫ শতাংশ। আবার যখন কমে তখন তা ২ থেকে ১২ শতাংশ। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বেড়েছে ৫৯ শতাংশ আর কমেছিল ৭০ শতাংশ। বেসরকারি ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ার হার স্বাভাবিক হলেও বেড়ে যাওয়ার হার অস্বাভাবিক। গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ঋণ প্রবাহ কমেছিল ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রবাহ বেড়েছে ৯২ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি ঋণ সংশ্লিষ্টদের মত হলো, করোনার কারণে ২০২০ সালে সবার মাঝে আতঙ্ক ছিল, যে কারণে বেসরকারি খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। পণ্যের কেনাবেচাও ছিল কম, রপ্তানি ছিল স্থবির। চলতি অর্থবছরে করোনার সংক্রমণ থাকলেও মানুষ আর ঘরে বসে নেই। বেসরকারি খাতও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তাই ঋণের চাহিদা বেড়েছে।

একদিকে বেসরকারি ঋণের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ বিষয়ে একটু বাজেট ব্যবস্থাপনার দিকে ফিরে যেতে চাই। সরকার প্রতিবছর তার আয়-ব্যয়ের একটি প্রস্তাবনা সংসদে উপস্থাপন করে সবার সম্মতিতে তা সংসদে অনুমোদন করিয়ে নেয়। কোনো ব্যক্তিরও বাজেট থাকে। তবে ব্যক্তি বাজেটের সঙ্গে সরকারি বাজেটের মৌলিক পার্থক্য আছে। ব্যক্তি ব্যয় করে তার আয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। আর সরকার প্রথমে ব্যয়ের কথা ভাবে, তারপর আয়ের কথা।

যদি সরকারি ব্যয় ও আয় সমান থাকে তাহলে তাকে সুষম বাজেট বলে; যদি ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি হয় তাহলে তাকে উদ্বৃত্ত বাজেট বলে, আর ব্যয়ের চেয়ে আয় কম হলে তাকে ঘাটতি বাজেট বলে। সাধারণত অর্থনীতি খুব ভালো অবস্থায় থাকলে সুষম বাজেট করা হয়। কিন্তু যদি অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়, তাহলে উদ্দীপনার স্বার্থে তাকে ঘাটতি বাজেটের দিকে পক্ষ নিতে হয়। এক সময় ঘাটতি বাজেটকে ক্ষতিকর বলে ধরে নেওয়া হতো। তবে এখন অনেক অর্থনীতিবিদই মনে করেন, আমাদের মতো অর্থনীতির জন্য ঘাটতি বাজেটই কার্যকর ও উপযুক্ত। এ ঘাটতির কারণে অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবহারের ওপর চাপ থাকে এবং অর্থনীতিতে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। তবে তার পরিমাণ সীমাহীন নয়। এর একটা মাত্রা থাকা উচিত এবং তা জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এ অতিরিক্ত ব্যয়ের ঘাটতি পূরণের অর্থ আসে কোথা থেকে? এক্ষেত্রে সরকার দুটি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে।

এটি হলো বিদেশি সংস্থা বা দেশ থেকে। এটি তুলনামূলকভাবে ভালো উৎস। কারণ এতে সুদের হার কম থাকে এবং পরিশোধের সময়ও বেশি পাওয়া যায়। অপরটি হলো অভ্যন্তরীণ ঋণ। সরকার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রেজারি বিল-বন্ড বিক্রির মাধ্যমে এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরাসরি জনগণের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। ব্যাংক ঋণও পরোক্ষভাবে জনগণের কাছ থেকেই নেওয়া হয়। এ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বছর বছর বেড়েই চলেছে। ২০২১ সালের শেষদিনে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৫ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরাসরি জনগণের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা, আর ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রায় এক দশক আগে ২০১০ সালে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণের মোট পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ৫ বছর পর ২০১৫ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ২১ হাজার ৯২৩ কোট টাকায়। তার পরের ৫ বছরে ২০২০ সালে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকায়। তারপর গত ১ বছরে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ বেড়ে এর মোট অঙ্ক ৬ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

চলতি অর্থবছরের সরকার ঘোষিত বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কেটি টাকা। এ বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়ার কথা ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়ার কথা ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত খেকে ৩৭ হাজার ১ কোটি টাকা। কিন্তু সরকারের যে ধরনের ব্যয় প্রবণতা তাতে করে বছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ অনেকখানি বেড়ে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

দিন দিন যদি ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং তা পূরণের স্বার্থে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়, তাহলে তা নিশ্চিতভাবেই বেসরকারি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলবে। বেসরকারি খাতে বর্তমানে ঋণের যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে তার জোগানে সংকট তৈরি হতে পারে। সরকারকে তার ঋণভার লাঘবের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কর আহরণে দক্ষতা বাড়াতে হবে, দূর করতে হবে সব অনিয়ম। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ৯ শতাংশেরও কম।

ডেনমার্কে সর্বোচ্চ ৪৬ শতাংশ এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গড় কর-জিডিপি অনুপাত ২১ শতাংশ। আমরা বিত্তহীনদের কাছ থেকে যতটা দক্ষতার সঙ্গে পরোক্ষ কর আদায় করতে পারি, বিত্তবানদের কাছ থেকে ততটা দক্ষতায় প্রত্যক্ষ কর আদায় করতে পারছি না। এর কার্যকারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তা করা না গেলে সরকারি ঋণের পুরো দায় জনগণের ওপর গিয়ে পড়বে। তাছাড়া ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ পথ অবলম্বন করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গত অর্থবছরেও ঋণের সুদ বাবদ সরকারকে ৬৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এত সুদের দায় জনগণ বহন করতে অক্ষম।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

বাজেট ঘাটতি উদ্যোগ

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

ইতিহাসের বয়ান বদলাবে কবে

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

উচ্চশিক্ষায় সংখ্যা নয়, গুণগত মানই মুখ্য

অন্যমত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

ফ্যাসিস্ট সরকারের ঋণের বোঝাই অর্থনীতিকে স্থবির করেছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম