ইউক্রেন সংকটের জন্য কে কতটা দায়ী
Advertisement
মেজর রেজাউল করিম, ইবি (অব.)
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যারা পুতিনকে মহামানব বানাতে চান তাদের বলছি-মানবাধিকার ইস্যুতে পুতিনের তুলনা জর্জ বুশ এবং হিটলারের সঙ্গে করা যায়। আবার যারা রাশিয়া তথা পুতিনের দোষারোপ করে আমেরিকার তাঁবেদারি করছেন, তাদের পেছনের ইতিহাস জানতে হবে।
আপনারা কি কিউবা মিসাইল ক্রাইসিসের কথা ভুলে গেছেন? যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে কিউবায় রাশিয়ার পারমাণবিক মিসাইল মোতায়েন করা হয়েছিল এবং আমেরিকা তৎক্ষণাৎ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল তা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে।
তাই বলছি, রাশিয়ার পারমাণবিক মিসাইল মোতায়েনের কারণে যদি যুক্তরাষ্ট্র কিউবা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে ইউক্রেনের প্রতি রাশিয়ার এমন ভূমিকার জন্য অন্ততপক্ষে আমেরিকার তো কোনো পালটা প্রতিক্রিয়া দেখানোর যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
কিউবার মিসাইল ক্রাইসিসের কারণ ও পরিণতি সম্পর্কে ভালো করে জানুন; বিশেষ করে জানুন কিউবা ইস্যুতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট কী করেছিল? কীভাবে ন্যাটো তৈরি হলো? কেন ওয়ারশ প্যাক্ট তৈরি হলো, আবার কেন ভেঙে গেল? ওয়ারশ প্যাক্ট বিলুপ্ত হওয়া সত্ত্বেও কেন ন্যাটো থেকে গেল? সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার ক্ষোভের কারণ কতটুকু যুক্তিযুক্ত? এসব ভালো করেন জানুন।
আবার কিছু লোক ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দেশপ্রেমিক বানাতে উঠেপড়ে লেগেছেন; তাদের প্রতি অনুরোধ-একটু বিস্তারিত জানুন! আপনারা পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা দেখে ভাবছেন জেলেনস্কি একজন মহাবীর, মহান দেশপ্রেমিক ও সাহসী প্রেসিডেন্ট; তাই তাদের জানা উচিত, জেলেনস্কি একদম পেশাদার অভিনেতার চেয়েও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একজন পাকা অভিনেতা! তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং তাদের ইশারাতেই এতদিন ধরে তিনি সবকিছু করে আসছেন।
অফশোর অ্যাকাউন্টে অবৈধ টাকা রাখার দায়ে তার দুর্নীতি নিয়ে প্যানডোরা পেপারস-এ ২০২১ সালেই তার নাম এসেছে। তিনি ধর্মবিশ্বাসে ইহুদি; তাই ইসরাইলের অতি ঘনিষ্ঠ পাপেট যা অনেকেই জানেনা। তিনি ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী।
আপনাদের আরও জানতে হবে-রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ বা চতুর্মুখী হামলা দেখে অনেকেই পুতিনকে দায়ী করছেন এবং ইউক্রেনের এ ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য আপনারা যতটা না ভ্লাদিমির পুতিনকে দায়ী করে যাচ্ছেন, তার চেয়েও অনেক বেশি দায়ী, ভলোদিমির জেলেনস্কি।
লাটভিয়া, ইস্তোনিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশকে ইতোমধ্যে ন্যাটোভুক্ত করা হয়েছে, যা এক সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই এভাবে একে একে রাশিয়ার সীমান্তের পাশের দেশগুলো যদি ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত হয়ে রাশিয়ার হুমকি হয়ে দাঁড়াতে চায়, তাহলে রাশিয়ার কি চুপ করে বসে থাকা উচিত? তারা যদি রাশিয়ার দিকে মিসাইল তাক করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কি তা রাশিয়ার জন্য হুমকি বা ‘Threat to State Security’ বলে গণ্য হবে না? ইরাক, আফগানিস্তান ও কিউবাকে হুমকি মনে করে আমেরিকা যদি ‘Threat to own State’ অথবা ‘War on Terror’-এর নামে হামলা করতে পারে, তাহলে রাশিয়ার দোষ কোথায়? এখানে ‘ইউক্রেন ক্রাইসিস’ সৃষ্টিকারীও আমেরিকা এবং উসকানিদাতাও আমেরিকা, বাকি সবাই আমেরিকার সাজানো মাঠের খেলার পুতুল। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমেরিকা ইরাক-ইরান ইস্যুতে কী করেছিল? আমেরিকা ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র (WMD) বা ‘রাসায়নিক অস্ত্রের মজুত আছে’ এ মিথ্যা অজুহাত দিয়ে ইরাকে হামলা করেছিল, চিন্তা করে দেখুন তো তখন রাশিয়ার ভূমিকা ছিল?
আরও একটি কথা। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, আইইইউ কর্তৃক এসব নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু ভাবছেন। তাদের বলছি, মনে রাখবেন, রাশিয়া বাংলাদেশের মতো একটি ছোট দেশ নয়! অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞা অথবা পরিবহণ নিষেধাজ্ঞা একটি ছোট দেশের জন্য যে ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করবে তা রাশিয়ার মতো একটি বিশাল পারমাণবিক শক্তিধর দেশের জন্য তৈরি করতে পারবে না এবং এ নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে শুধু রাশিয়া একাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং জার্মানির মতো অনেক ইউরোপিয়ান দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষ করে যারা তেল, গ্যাসের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং রাশিয়াতে যাদের বিনিয়োগ আছে। রাশিয়াকে হালকাভাবে নিলে ভুল হবে-মনে রাখতে হবে রাশিয়া শুধু একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ নয়, চায়নার মতো একটি উদীয়মান সুপার-পাওয়ার রাশিয়ার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং এ চায়নার সঙ্গেই আমেরিকার দীর্ঘদিনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব রয়েছে; আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি কথা আছে ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু হয়’।
রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে যদি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি, তাহলে দেখতে পাই-বাংলাদেশের জনগণের একটি অংশ রাশিয়ার পক্ষে; আবার একটি অংশ মানবতার নামে ইউক্রেনের পক্ষে, আবার কিছু মানুষ ইউক্রেনের বিপক্ষে; কারণ তারা আমেরিকার বিপক্ষে অথচ খেয়াল করে দেখুন-এ মানুষগুলোই আফগানিস্তান ইস্যুতে আমেরিকার পক্ষে ছিল এবং রাশিয়ার বিপক্ষে ছিল। এ মুহূর্তে আবার আমাদের অনেকেই রাশিয়ার পক্ষে থাকার কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিশেষ কিছু মানুষের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশন। এত কিছুর মধ্যে তো ধর্ম আছেই, সঙ্গে আছে ইসরাইল তথা ইহুদিদের প্রতি মুসলমানদের ঘৃণা। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এ যুদ্ধের কৌশলগত দিকগুলোর সঙ্গে খুব সহজে হিসাব মেলাতে পারবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত পটভূমি বা ইতিহাস ভালো করে জানতে না পারবেন।
যাহোক, কম-বেশি সারা বিশ্বেই এ যুদ্ধের প্রভাব পড়বে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশও বাদ যাবে না। বাংলাদেশে যে খাদ্য আমদানি করা হয় তার অধিকাংশ আসে ব্রাজিল, রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে; তাই বাংলাদেশের খাদ্যের বাজারে বিশেষ করে আটা-ময়দার দাম বাড়ার আশংকা অনেক বেশি।
মেজর রেজা উল করিম, ইবি (অব.) : নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
