মূল সমস্যা নির্বাচনকালীন সরকার ও ইভিএমে
Advertisement
মুঈদ রহমান
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৩ সালের শেষদিকে অথবা ২০২৪ সালের প্রথমদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয় সেই লক্ষ্যে নতুন নির্বাচন কমিশন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১৩ মার্চ শিক্ষাবিদদের সঙ্গে প্রথম সংলাপ শুরু করেন সিইসি। দ্বিতীয় সংলাপটি ছিল সুশীলসমাজের সঙ্গে। সেটি অনুষ্ঠিত হয় গত ২২ মার্চ। পর্যায়ক্রমিক আলোচনার অংশ হিসাবে এ মাসের শেষদিকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপে বসার কথা রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে, সংলাপের তো কোনো প্রয়োজন নেই। তবে বাস্তবতা হলো, বিগত নির্বাচন কমিশন যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে মানুষের কাছে নির্বাচন কমিশন আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এ কথার সত্যতা পাওয়া যায় খোদ নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মুখ থেকে। প্রথম সংলাপ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘এটা সত্য, নির্বাচন কমিশনকে আরও আস্থা অর্জন করতে হবে।’ নতুন নির্বাচন কমিশন হারিয়ে যাওয়া আস্থাকে পুনরুদ্ধার করতে চায়। সেই লক্ষ্যেই সংলাপের আয়োজন। এখন প্রশ্ন হলো, এই সংলাপ থেকে নতুন কিছু পাওয়া যাবে কি, যা আমাদের অন্তরে আশা সৃষ্টি করতে পারে? সেটা সময়ই বলতে পারবে। তবে প্রথম দুটি সংলাপ থেকে যে আভাস পাওয়া গেছে, পরবর্তী সংলাপগুলো থেকেও যে অনুরূপ আভাস পাওয়া যাবে, এটা নিশ্চিত।
শিক্ষাবিদ ও সুশীলসমাজের সঙ্গে আলোচনার দুটি দিক আছে। প্রথমটি হলো, আলোচনা করার প্রতি আগ্রহ কতটা? সেটা হতাশাব্যঞ্জক। গত নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ এতটাই বিতর্কিত ছিল যে, বলা হয়ে থাকে গোটা নির্বাচনি ব্যবস্থাই তারা ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই নির্বাচনি ব্যবস্থাকে সামান্য আলোচনা করে পুনরুদ্ধার করা যাবে বলে মনে হয় না। আমন্ত্রিত ৩০ জন শিক্ষকের মধ্যে আলোচনা করতে এসেছিলেন মাত্র ১৩ জন। অংশগ্রহণকারীর হার ৪৩ শতাংশ। দ্বিতীয় দফায় সুশীলসমাজের ৩৯ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। উপস্থিত থেকে মতামত দিয়েছেন মাত্র ১৯ জন। এ দফায়ও অংশগ্রহণকারীর হার ৫০ শতাংশের কম। ফলপ্রসূ কোনো আলোচনার সম্ভাবনা থাকলে আমন্ত্রিতদের ৯০ শতাংশেরও বেশি উপস্থিত থাকতেন বলে ধারণা। দ্বিতীয় দিকটি হলো, যারা আলোচনা করেছেন, তাদের মতামতটা কী ছিল। মতামতের ভিন্নতা থাকলেও মূল দুটি প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রথমটি হলো-নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে। দ্বিতীয়টি হলো-ইভিএম পদ্ধতি থাকবে, কী থাকবে না।
প্রথম প্রশ্নটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এই চারটি সংসদ নির্বাচন অনষ্ঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুটি করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। নির্বাচন শেষে পরাজিত দল কিছু অনিয়মের অভিযোগ আনলেও সাধারণ ভোটাররা সন্তুষ্ট ছিলেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল দলীয় সরকারের অধীনে এবং বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের কাছে তা ছিল বিতর্কিত। তাই দলীয় সরকারে অধীনে নির্বাচন প্রশ্নের উর্ধ্বে উঠতে পারেনি। অনেকেই ভারতের উদাহরণ দেন, যেখানে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়ে থাকে এবং যথারীতি তা সুষ্ঠু হয়। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা আড়াল করা হয়। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারের কোনো ধরনের প্রভাব থাকে না। বিপরীতে আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারের সব ধরনের প্রভাব থাকে। গেল সাধারণ নির্বাচন এর বড় প্রমাণ।
সমস্যা হলো, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনি ব্যবস্থা চালু করার কোনো ক্ষমতা এই নির্বাচন কমিশনের নেই। তাই কারও কারও মত ছিল, নির্বাচনের চার মাস আগে ও দুই মাস পর পর্যন্ত সরকারি দলের ক্ষমতা খর্ব করতে হবে। এই ছয় মাস আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনসহ সবকিছুই নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রকৃত অর্থে এ থেকে কোনো সুফল পাওয়া যাবে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু আমার মনে হয় সবকিছুতেই ‘না’ বলার পরিবর্তে আলোচকরা নির্বাচন কমিশনকে কিছুটা স্পেস দিতে চেয়েছেন। কেননা সরকারি দল যে লক্ষ্য সামনে রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রচলন করেছে, সে উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হওয়ার কোনো সুযোগ কাউকে দেবে না এটাই স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি এসেছে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা সমীচীন হবে কিনা, তা নিয়ে। পদ্ধতিটির বিপক্ষেই জোরালো মত এসেছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় আমরা সাধারণত একটি গোপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যালট পেপারে মার্কার ওপর সিল দিয়ে ভাঁজ করে ব্যালট বাক্সে ফেলে দিই। এরকম সবার ‘ফেলে’ দেওয়া শেষ হলে, অর্থাৎ ভোটদান প্রক্রিয়া শেষ হলে নির্বাচন কর্মকর্তারা বিভিন্ন মার্কার এজেন্টদের সামনে সেই ভোট গণনা করে প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করে থাকেন। এতে সময়ক্ষেপণ হয় বেশি। ইভিএমের বেলায় অত কষ্টের বা সময়ক্ষেপণের প্রয়োজন হয় না। ভোটকেন্দ্রে নির্দিষ্ট বুথে ঢুকে মেশিনের একটা বোতামে চাপ দিলেই ভোটের কাজ শেষ। এতে প্রায় ৬৪টি মার্কায় ভোট দেওয়ার অপশন থাকে আর মেশিনটির ভোট ধারণক্ষমতা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। একটা ভোট দিতে ১৫ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না। প্রিজাইডিং অফিসার একটা বোতাম চাপলে মেশিন চালু হয়ে যাবে। কেউ ভোট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভোটটি গ্রহণ করে মেশিন বন্ধ হয়ে যাবে। কেউ দ্বিতীয়বার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন না। এমনকি এক মার্কায় ভোট দিতে গিয়ে ভুল করে অন্য মার্কার বোতাম চাপলেও মেশিন বা প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কিছুই করার থাকবে না। সেভাবেই গণনা হয়ে যাবে। এতে করে একটি কেন্দ্রের ফলাফল ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পেয়ে যাওয়ার কথা।
ইভিএম ব্যয়সাশ্রয়ীও বটে। ইভিএম ব্যবহার করলে নির্বাচন কমিশন ২০০ কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় করতে পারবে। একটি মেশিন দিয়ে পাঁচ-ছয়টি নির্বাচন করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার তো লাগবেই; কিন্তু তা ১২ ভোল্টের একটি ব্যাটারিতেই হয়ে যাবে। শুধু শহরে নয়, গ্রামগঞ্জেও ইভিএম ব্যবহারযোগ্য। কোনো ভোটারের ভোট নষ্ট হবে না এবং তা দশ বছর ধরে মেমোরিতে নিরাপদে থাকবে। আমার কথা শুনে কারও মনে হতেই পারে যে আমি ইভিএমের ফেরি করে বেড়াচ্ছি। সবই কি ভালো দিক? না, তা সত্য নয়, এর নেতিবাচক দিকও আছে।
দলীয় প্রভাব-বলয় থেকে মুক্ত না হতে পারলে মহাবিপদ! ভোটগ্রহণ হয়তো স্বাভাবিকভাবেই হলো; কিন্তু আগে থেকে প্রোগ্রামিং করা থাকলে চূড়ান্তভাবে ক্লোজ-বাটন চেপে কোনো একটি মার্কায় অতিরিক্ত ৩০০-৪০০ ভোট যোগ করা সম্ভব। এখানে সততার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা এদেশে নতুন কিছু নয়। সেক্ষেত্রে নির্বাচনি কর্মকর্তার স্বাক্ষর জোর করে আদায় করা হয়। সে রকম ঘটনা যদি ঘটে, অর্থাৎ কেন্দ্র যদি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত অবস্থায় যে কাজটি সমাধা করতে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে (সিল মারতে), সেটি ইভিএমের বেলায় লাগবে এক ঘণ্টারও কম। কিংবা নির্বাচন কর্মকর্তার স্মার্ট কার্ডের নকল তৈরি করেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা সম্ভব। ২০১০ সালের আগষ্টে একদল আইটি গবেষক ভারতের ভোটিং মেশিনকে জালিয়াতি প্রতিরোধে অক্ষম বলে মতামত দেন। এ বিষয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেন আডিডা, যুক্তরাষ্ট্রের পেনিসেলভিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাট ব্লেইজ এবং মাইক্রোসফ্ট বিশেষজ্ঞ জোস বেনালো ইভিএমের দুর্বলতার কথা জানান।
১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইভিএম পদ্ধতি প্রথম চালু হলেও ক্রমে তা বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে আইনগতভাবেই কানাডা, রাশিয়া, ফ্রান্স, জাপান, স্পেন, সুইডেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ বহু দেশে ইভিএমের ব্যবহার দেখা যায়। তবে গবেষকদের মতামত হলো, ৮৭ শতাংশ রাষ্ট্রই এর যথাযথ প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতানুযায়ী, এর জন্য মেশিন যতটা না দায়ী, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি দায়ী রাজনৈতিক উপাদানগুলো।
প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ অন্তত আজকের পৃথিবীতে নেই বলেই বিশ্বাস করি। কিন্তু এর প্রয়োগ কৌশলে ভিন্নতা থাকতেই পারে। নতুনকে খুব সহজে গ্রহণ করতে অনেকেই অপারগ-অক্ষম। আমজনতার নিত্যচর্চার কথা বিবেচনায় নিলে আমাদের দেশের মানুষের মানসিক স্তরটি বিবেচনায় নিতে হবে। এ ধরনের সমাজে অনেক ধরনের আতঙ্কের পরিচয় পাওয়া যায়।
অভিধানপ্রণেতারা ইংরেজি ‘চযড়নরধ’ শব্দের বাংলা করেছেন ‘আতঙ্ক’। নানা ধরনের আতঙ্কে ভোগা এখন মানুষের নিত্যদিনের স্বভাব। আরশোলার মতো নিরীহ একটা পতঙ্গ দেখেও অনেকে চিৎকার দিয়ে ওঠেন। মাকড়শা কিন্তু কাউকে আক্রমণ করার চিন্তা না করে বরং নিজের জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকে। সেই মাকড়শাকেও নাকি ৪৮ শতাংশ নারী এবং ১২ শতাংশ পুরুষ ভয় পায়। এই আতঙ্কের নাম ‘আরাকনোফোবিয়া’। অনেকে বিষধর সাপ নিয়ে পুতুল খেলা করেন এবং অনেকে সেই খেলা উপভোগও করেন। আবার একদল মানুষ আছেন, যারা ‘ঢোরা সাপ’ দেখলেও আঁতকে ওঠেন। এই আতঙ্কের নাম ‘অফিডিওফোবিয়া’। অনেকে উঁচু থেকে নিচুতে তাকাতে পারেন না। চার-পাঁচতলা উঁচু থেকে নিচের দিকে তাকালে বুক ধরফর করে, মাথা ঘুরায়, নাম তার ‘অ্যাক্রোফোবিয়া’। কুকুর দেখলে, বিশেষ করে কাছে থেকে, অনেকেই আতঙ্কিত হন। এই আতঙ্কের নাম ‘সিনোফোবিয়া’। এমনকি মানুষের ভিড় দেখলে অনেকের দম বেরিয়ে যায়, যার নাম ‘অ্যাগোরাফোবিয়া’। ‘জলাতঙ্ক’ বা ‘হাইড্রোফোবিয়া’ তো আমাদের অনেক পরিচিত। বিশ্বজুড়ে এরকম ১০০ রকমের ফোবিয়ার বর্ণনা অনায়াশেই দেওয়া যাবে। তেমনিভাবে যে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে জলবৎ করে দিয়েছে, তা নিয়েও মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক রয়েছে। অনেকেই স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতে ভয় পান-কী থেকে কী হয়ে যায়! বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন ‘টেকনোফোবিয়া’। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এ মুহূর্তে ইভিএম এক ধরনের টেকনোফোবিয়া-কোনটা চাপতে গিয়ে কোনটা চেপে ফেলব! এখানে আতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা।
সরকার, নির্বাচন কমিশন, ইভিএম-এই তিনকে আস্থায় নিয়ে আসতে সিইসি সক্ষম হবে কি? এ প্রশ্ন সবার।
মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
