দুশ্চিন্তার মাঝেও সুসংবাদ আছে
Advertisement
একেএম শামসুদ্দিন
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারি পদ বা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপি কিংবা নেতা-নেত্রীদের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্ম করা আমাদের দেশে এক দীর্ঘ লালিত নিয়ম বা অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
দেশব্যাপী ব্যাপক দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দাপট ও গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় আসীন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বিরূপ আচরণে দেশের মানুষের যেন নাভিশ্বাস অবস্থা। বর্তমান সরকারের এবার নিয়ে তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালীন কিছু নেতাকর্মী ও তাদের আশ্রিত মানুষের সিরিজ কুকর্মে দেশবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে দু-চারজনের নাম তো নেওয়া যেতেই পারে। এসব ব্যক্তি হলেন, ক্যাসিনো সম্রাট, ক্ষমতার সর্বমহলে বিচরণকারী সাহেদ, টেন্ডারবাজ জিকে শামীম ও এক সময়ের বিনোদন বিতরণকারী সুন্দরী যুব মহিলা লীগের সাবেক নেত্রী পাপিয়া। এমনিতেই ক্ষমতার বৃত্তে থাকা মানুষের দাপটে অতিষ্ঠ দেশবাসী; তার ওপর এসব ক্ষমতাবান মানুষের আত্মীয়-পরিজনদের দাপটও যদি যোগ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের আত্মীয় কাহিনি অবশ্য নতুন কিছু নয়।
সম্প্রতি রেলমন্ত্রীর আত্মীয়ের বহুল সমালোচিত কাহিনি নতুন সংযোজন মাত্র। রেলমন্ত্রী প্রথমে ঘটনার নায়কদের নিজের আত্মীয় বলে অস্বীকার করলেও নানাবিধ চাপের মুখে তাদের আত্মীয় হিসাবে কবুল করে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ঘটনা কী ঘটেছিল তা এখানে নতুন করে নাইবা উল্লেখ করলাম। তবে ঘটনা-উত্তর মন্ত্রীর ধারাবাহিক বক্তব্য বা বিবৃতি সবার নজর কেড়েছে। তিনি সাংবাদিকদের সামনে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণে ৩ যাত্রীকে নিজের আত্মীয় হিসাবে মেনে নিতে সরাসরি অস্বীকার করেন। কথিত এ আত্মীয়দের জরিমানা আদায়ের জেরে টিটিই শফিকুল ইসলামের বরখাস্ত হওয়ার ঘটনার পেছনে যে তার স্ত্রীর সম্পৃক্ততা আছে, সে কথাও রেলমন্ত্রী প্রথমে অস্বীকার করেছিলেন।
কিন্তু মুশকিল হলো, রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর মামাতো বোন ও বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণকারী ৩ যাত্রীর একজন ইমরুল কায়েস প্রান্তর মাতা ইয়াসমিন আক্তার নিপা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে মোবাইল ফোনে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, রেলমন্ত্রীর স্ত্রী শাম্মী আক্তার মনি প্রথমে টিটিই শফিকুলকে মোবাইলে কল করেন।
শফিকুল মিসেস শাম্মীর কল রিসিভ করে কথা না বলায় তিনি প্রচণ্ড রেগে যান। তারপর তিনি পাকশী বিভাগীয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিনকে ফোন করে শফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ‘টিটিইকে সাসপেন্ড করতে হবে, কারণ তিনি আমাকে অবমাননা করেছেন।’
শুধু তাই নয়, সত্য গোপন করে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণকারী যাত্রীদের নিজের আত্মীয় হিসাবে মন্ত্রী যে অস্বীকার করেছিলেন, সে বিষয়টিও ইয়াসমিন আক্তার নিপা ফাঁস করে দিয়েছেন! তিনি বেসরকারি টেলিভিশনকে জানান, ঘটনার পরদিন মন্ত্রী ফোন করে মিডিয়ার সামনে কথিত যাত্রীদের আত্মীয় পরিচয় অস্বীকার করার জন্য ইয়াসমিন আক্তার নিপার কাছে দুঃখ প্রকাশও করেছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ঘটনায় স্ত্রী ও তার আত্মীয়দের সংশ্লিষ্টতার কথা ধামাচাপা দিতে গিয়ে মন্ত্রী মহোদয় কী অর্জন করলেন? এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে রেলমন্ত্রী প্রথমেই যদি সব কিছু স্বীকার করে উদ্ভূত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বক্তব্য দিতেন, তাহলে কী ক্ষতি হতো?
তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এ ঘটনায় তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের জড়িত করে সংবাদ পরিবেশনের জন্য গণমাধ্যমকে দোষারোপ করে নিজেকেই বিব্রত করেছেন। মন্ত্রী টিটিই শফিকুলের দৃঢ় ও সাহসী ভূমিকার প্রশংসা না করে স্ত্রীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজ অবস্থান থেকে সরে গিয়ে তিনি নিজেকেই হেয় করলেন।
তবুও ভালো, মন্ত্রীর বোধোদয় হয়েছে। ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশের জন্য তিনি সাধুবাদ পেতেই পারেন। সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরও টিটিই শফিকুলের বরখাস্তের ঘটনায় রেলের কর্মচারীদের ভেতর ভীষণ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। পরে বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার ও টিটিই শফিকুলের কাজে যোগদানের মধ্য দিয়ে আপাতত কর্মচারীদের ক্ষোভের অবসান হলেও সবাই তদন্ত কমিটির রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছেন।
মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, টিটিই শফিকুলের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা না চেয়ে তাড়াহুড়া করে বরখাস্ত করা আইনসম্মত হয়নি। এজন্য ডিভিশন কর্মকর্তাকেও শোকজ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়, মন্ত্রীর স্ত্রীর কথাতেই টিটিই শফিকুলকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, তাহলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষায় আছেন।
মন্ত্রী-এমপিদের স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনদের এহেন দাপট দেখানো বা অবাঞ্ছিত ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও এমন অনেক ঘটনার উদাহরণ টানা যেতে পারে। তবে এমন ঘটনায় জড়িত থাকার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে কোনো উদাহরণ নেই। শেষ পর্যন্ত শাস্তি ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বলে আমরা দেখে এসেছি।
এ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। তবে আমরা আশাবাদী তদন্ত সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে। তদন্তে প্রকৃত দোষী চিহ্নিত হবেন। আমরা আশা করি, এ তদন্ত রিপোর্ট অতীতের মতো হারিয়ে না গিয়ে জনসম্মুখে প্রকাশও হবে। কারণ দেশবাসী সবাই চান সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক, সত্যের জয় হোক।
টিটিই শফিকুল ইসলামের প্রশংসা করতে হয়। তিনি তার ওপর অর্পিত কর্তব্য সাহসের সঙ্গেই পালন করেছেন। তারপরও বলব, অন্যায়ভাবে সাময়িক বরখাস্ত করে শফিকুলকে যে মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে তার কী হবে? মন্ত্রী মহোদয় কি সে কথা বিবেচনায় এনেছেন?
এভাবে এর আগেও এমন অনেক সৎ, কর্মঠ ও একনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ভুক্তভোগী হতে হয়েছে, তার উদাহরণও আছে অনেক। এ মুহূর্তে জনপ্রিয় সেই পুলিশ কর্মকর্তা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সহকারী পুলিশ সুপার জুয়েল রানার কথা স্মরণ করা যায়, তিনি কুমিল্লা-দাউদকান্দি সার্কেল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার পরও কিছু সত্য কথা বলার কারণে তাকে শাস্তিস্বরূপ সিলেটে বদলি করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চৌদ্দগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ভোট ইস্যুতে তার একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়েছিল।
তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘আপনি নৌকা পেয়েছেন বলেই চেয়ারম্যান হয়ে যাবেন বিষয়টি এমন নয়। আমি যেখানে ডিউটি করেছি নৌকা পেয়েছে ২৫১ ভোট। কিন্তু নৌকার প্রার্থী বলতে পারেননি ভোট সুষ্ঠু হয়নি। শুধু নৌকা নিয়ে এলেই, টাকাপয়সা থাকলেই, বড় বড় নেতার আত্মীয়স্বজন হলে নির্বাচনে জয়লাভ করা যাবে না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ভোটকেন্দ্র অনেকে দখল করতে আসেন, চোর ধর্মের কথা শোনে না। আমাদের অস্ত্র রেডি আছে, অর্ডার আছে, আইন লঙ্ঘন হচ্ছে। আমরা কি বসে থেকে ফিডার খাব? গুলি করব, আমাদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না।’
আমাদের দেশে এখন যে স্টাইলে নির্বাচন কন্ডাক্ট করা হয় সে পরিপ্রেক্ষিতে তার এই বক্তব্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটা সতর্কতামূলক বার্তা বৈকি। প্রার্থী ও সাধারণ ভোটাররা তার এই বক্তব্যকে সমর্থন দিয়েছিলেন। সহকারী এই পুলিশ সুপার তার দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার গোমতী নদীতে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসবাদ, ডাকাতি বন্ধ করে নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করেছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তিনি। ইভটিজিং ও মহাসড়কে ডাকাতি রোধে জুয়েল রানা প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পুলিশের ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। শ্রেষ্ঠ জনবান্ধব কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছিলেন জুয়েল রানা।
এ প্রসঙ্গে আরও একজনের নাম উল্লেখ করা যায়। তিনি হলেন রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন। তিনি রেল মন্ত্রণালয়ে যোগদানের আগে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরে কর্মরতকালে নিজের অবস্থানে থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া নানা প্রতিষ্ঠানকে বিচারের মুখোমুখি করিয়েছিলেন। খাদ্যে ভেজাল রোধে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের চেহারা বদলে দিয়েছিলেন। মাহবুব কবির মিলন রেল মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়ে রেলকে ঢেলে সাজাচ্ছিলেন, টিকিট কালোবাজারি বন্ধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, রেলের অচলাবস্থা কাটানো, সিন্ডিকেট ভাঙা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয়ে নজর দিতে চেয়েছিলেন।
তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করে ঘোষণা করেছিলেন, মাত্র দশজন সৎ কর্মকর্তা নিয়ে একটা টিম গড়ে দেওয়া হোক তাকে, যে কোনো মন্ত্রণালয়ের, যে কোনো অধিদপ্তরের অচলাবস্থা কাটিয়ে, সিন্ডিকেট ভেঙে কাজের পরিবেশ তৈরি করবেন তিনি। তার এই ভালো চিন্তা ও সততার পুরস্কার হিসাবে তিনি পেলেন বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি হিসাবে বদলির আদেশ। মাহবুব কবির মিলন কী অপরাধ করেছিলেন? চুরি করেছিলেন? ঘুস নিয়েছিলেন? না অন্যায়ভাবে নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে কাউকে অন্যায্য সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন? এর কোনো জবাব নেই।
এসব ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সামনে স্বতঃসিদ্ধের মতো সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বাক্যটি তা হলো, ‘ভালো মানুষের ভাত নেই’। ভালো মানুষগুলো আর ভালো নেই। ভালো নেই আমাদের বাংলাদেশ। সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি ‘রাজনীতি’ যখন দূষিত হয়ে পড়ে, রাজনীতি থেকে ভালো মানুষ যখন নির্বাসিত হয়, তখন দেশ আর দেশ থাকে না, দেশের মানুষ আর ভালো থাকতে পারে না। আমাদের বর্তমান অবস্থাও হয়েছে তা-ই।
সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা নেই, আইনের শাসনের অভাব, বাকস্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা, দুর্নীতি, লুটপাট এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনিশ্চয়তা এক অস্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি করে আছে। এর মধ্যে টিটিই শফিকুল ইসলাম, এএসপি জুয়েল রানা ও অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলনের মতো মানুষ যখন জ্বলে ওঠেন, তখন আমরা আশান্বিত হই। এত পঙ্কিলতা ও অনিশ্চয়তার মাঝেও ভালো মানুষের অস্তিত্ব আছে। মাঝে মধ্যেই তারা জানান দেন। বুক ভরা নিশ্বাস নিয়ে তখন অপেক্ষা করি-চারদিকের রাহাজানি, দুর্বৃত্তায়ন ও অপরাজনীতির অবসান ঘটিয়ে ভোরের নতুন সূর্য বুঝি ওই উঠল!
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা
