অর্থনীতির বড় সমস্যা বৈষম্য
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
অর্থনীতির বড় সমস্যা বৈষম্য

  ড. আর এম দেবনাথ  

১৪ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোন দিকে যাই? সয়াবিন তেলের বাজারে শান্তি নেই, আবার পেঁয়াজের বাজারেও শান্তি নেই। যুদ্ধ করছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। সয়াবিন তেল রপ্তানি বন্ধ করেছে আর্জেন্টিনা; পাম অয়েল রপ্তানি বন্ধ করেছে ইন্দোনেশিয়া। অতএব সয়াবিন আর পাম অয়েলের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে। এদিকে বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ করেছে পেঁয়াজের। অথচ বাজারে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি। দুই দিকেই অশান্তি।

অধিকন্তু অশান্তি সৃষ্টি করলেন ‘দেশপ্রেমিক’ সয়াবিন ব্যবসায়ীরা। সরকারের সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তারা বাজার থেকে হঠাৎ সয়াবিন উধাও করে দিলেন। তারপর সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম একতরফাভাবে বাড়ালেন। বাণিজ্যমন্ত্রী হতাশা প্রকাশ করলেন। করারই কথা, সয়াবিন ব্যবসায়ীরা তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও বিরাট ব্যবসায়ী। ফল হচ্ছে, সয়াবিন তেলের দাম দুই দফা বৃদ্ধি। উধাও করার ফলস্বরূপ যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তার বোঝাও সাধারণ মানুষের ওপর।

অথচ কাগজে কত হিসাব। মাসিক চাহিদা কত, মাসিক আমদানি কত, দেশে কত তেল ক্রাশ হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কত? ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যা মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিক করার জন্য। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, ‘দেশপ্রেমিক’ সয়াবিন ও পাম অয়েল ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে সমানে তেল বেরোচ্ছে। লুকানো তেল এখন প্রশাসন খুঁজে খুঁজে বের করছে। জরিমানা করছে দায়ী ব্যবসায়ীদের। কী জরিমানা? কয়েক হাজার টাকার জরিমানা।

খুবই হাস্যকর বিচার! সারা দেশকে কতিপয় ব্যবসায়ী জিম্মি করল, বাজার থেকে তেল উধাও করে লুটে নিল শত শত কোটি টাকা-এর জন্য জরিমানা মাত্র কয়েক হাজার টাকা! অথচ কেমন অবৈধ কাজ তারা করেছে। একটি কাগজে দেখলাম, রাজশাহীর গুদামেই পাওয়া গেছে ৯২ হাজার লিটার ভোজ্যতেল। কুষ্টিয়ায় পাওয়া গেছে ৪০ হাজার লিটার। এর জন্য শাস্তি কী? পাঁচ ব্যবসায়ী আটক, তিন ব্যবসায়ীর ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা! ভাবা যায় এত বড় অপরাধের পর এই বিচার! দুদিন পর আটক ব্যবসায়ীরা মুক্ত হবে। এমনও হতে পারে, দেখা যাবে তারা বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সভা করবেন। এসবই ঘটে হতভাগা দেশে।

প্রতিবছর একশ্রেণির ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, মিল মালিক বিভিন্ন পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়। একে বলা যায় ‘নন-ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট’-বিনা পুঁজিতে ‘ক্যাপিটাল’ বৃদ্ধি। তা বুঝলাম। তাদের এই অতিরিক্ত, মহা-অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কি তারা কোনো ট্যাক্স, আয়কর দেন? মোটেই না। আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে বন্দি করদাতা হচ্ছেন চাকরিজীবীরা।

বড় বড় করদাতার তালিকায় কজন ব্যবসায়ী, বড় ব্যবসায়ী আছেন? বিরল ঘটনা। অথচ স্বাভাবিক মুনাফা, ফুকুটের মুনাফায় তারা দিন দিন বড় হচ্ছেন। সরকারের ‘বন্ধু’ হচ্ছেন। প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছেন। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, তারাই ‘সংসদে’ গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছেন। মাঝে-মাঝেই রাজনীতিকরা হতাশা প্রকাশ করছেন যে, রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই। শিল্প, বাণিজ্য, পাট, অর্থ-সবকিছুই এখন বড় বড় ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে। এদিকে সাধারণ মানুষের অবস্থা কিন্তু ভালো নেই।

সাধারণ মানুষের সামনে ভালো ভালো খবর যেমন আছে, তেমনি খবর আছে বড় বড় অস্বস্তির, অশান্তির। এ মুহূর্তের ভালো খবর সরকার দিচ্ছে জিডিপির ওপর। সামনে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট। এটি মে মাস। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই বাজেট উঠবে সংসদে। ইত্যবসরে বর্তমান অর্থবছরের (২০২১-২২) হিসাব সরকার দিতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ২৮২৪ ডলার। গেল অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

এই সুখবর দিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেছেন, ‘এটা ঠিক যে সব মানুষের আয় সমানভাবে বাড়ছে না। বৈষম্য বাড়ছে। মাথাপিছু আয়ের এটি গড়ের হিসাব। ... তবে এখন মানুষ খালি পায়ে থাকে না। প্রত্যেকের হাতে মোবাইল আছে, গায়ে জামা আছে। এগুলোই প্রমাণ করে মাথাপিছু আয় বাড়ছে।’ শুধু এসব যুক্তি নয়, আরও অনেক যুক্তি দিয়ে ড. আলম প্রবৃদ্ধির হারকে যৌক্তিক করার প্রয়াস পেয়েছেন। দৃশ্যত এসব যে ঘটছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যারা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন তাদের কথাও আমলে নিতে হবে, যাতে দুই ধরনের মূল্যায়নের মধ্যে একটা ‘গোল্ডেন মিল’ পাওয়া যায়।

যারা অর্থনীতি নিয়ে হরহামেশা কথা বলেন, তাদের কারও কারও মতে, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির চিত্রটি ঠিক আছে। গতবারের চেয়ে ভালো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন সংখ্যা নিয়ে। ‘৭ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির খবর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।’ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি শিল্প খাতে কি সত্যিই এত প্রবৃদ্ধি হয়েছে? এদিকে কেউ কেউ বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, এডিপি বাস্তবায়নে মন্থরতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি চিত্র এবং জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ করে প্রবৃদ্ধির হারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। এসব বুঝলাম।

আমার কাছে মূল প্রশ্ন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি নিয়ে। তিনি স্পষ্টভাবেই বলছেন, ‘সব মানুষের আয় সমভাবে বাড়ছে না। বৈষম্য বাড়ছে। মাথাপিছু আয় এটা গড়ের হিসাব।’ এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি সবার আয় বাড়ত, তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তা কম হতো। ভাবতে হতো অন্যান্য বিষয় নিয়ে। কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে, আয় সমভাবে বাড়ছে না। বিপরীতে আবার মূল্যস্ফীতি ঘটছে। প্রতিবছর নিয়মিত জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। ইদানীং আবার মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি। সেই অনুপাতে মানুষের দৈনন্দিন আয় বাড়ছে না। বলা হয় কাজের লোক পাওয়া যায় না। খুবই সত্য কথা। কিন্তু এটি অর্ধসত্য কথা কিনা তাও ভাবার বিষয়।

বছরের প্রতিদিন কাজ থাকে না। আবার সারা দেশের অবস্থা একরকম নয়। গরিব অঞ্চলগুলোর অবস্থা নিশ্চয়ই অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় খারাপ। খারাপ বলেই উত্তরাঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে রংপুর ও দিনাজপুরের মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ ঢাকামুখী। ইদানীং ঢাকায় রাজশাহীর লোকও দেখা যায়। এতে বোঝা যায় দেশের সর্বত্র সমভাবে কাজ নেই। সমভাবে রোজগারের ব্যবস্থা নেই। যদি আয়-রোজগারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ত, তাহলে মানুষ পুষিয়ে নিতে পারত।

এখন মুশকিল হচ্ছে, সরকার প্রবৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির খবর যেভাবে প্রচার করে সেভাবে মজুরি, বেতন বৃদ্ধির কথা বলে না। যদি মূল্যবৃদ্ধি/মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আমরা মজুরি/বেতনের পরিসংখ্যানটা পেতাম, তাহলে তুলনা করতে পারতাম প্রকৃত অবস্থাটা কী। দৃশ্যত পরিস্থিতি আশাপ্রদ মনে হয় না। এটা বোঝা যায় টিসিবির ট্রাকসেলের লাইন দেখে।

এখন টিসিবির পণ্য কেনার জন্য যে লাইন হয় তাতে এমন লোকও দেখা যায়, যাদের সাধারণভাবে লাইন দিয়ে পণ্য কেনার কথা নয়। বোঝা যায়, তারা গরিব মানুষ নয়, নয় অতি দরিদ্রও। মধ্যবিত্ত ও নিুমধ্যবিত্তও লাইনে দাঁড়াচ্ছে। এ থেকে আঁচ করা যায়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের মতো নেই। ধরা যাক একজন পলিশওয়ালার কথা। ঈদের সময় সে কাজ পেয়েছে কিছু। কিন্তু ঈদ-পরবর্তীকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তার কোনো কাজ নেই। এটা আমি এক পলিশওয়ালার কাছ থেকে শুনেছি।

মুশকিল হচ্ছে, এরা দিন আনে দিন খায়। সঞ্চয় নেই যে কর্মহীন অবস্থায় কয়েকদিন সংসার চালাবে। এই যে ছদ্ম বেকারত্ব, এর সঙ্গে বেকারত্ব মেলালে সমস্যাটা বড় হয়। আবার আগে বেসরকারি খাত যেভাবে বেতনভাতা দিত, এখন তা তারা দেয় না। পদোন্নতি ও নানা ভাতার সুযোগও তারা কমিয়ে ফেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং, মার্কেটিং ও ম্যানেজমেন্টের এমবিএরা আগে যে বেতনে বেসরকারি খাতে ঢুকত, এখন তা পায় না। কিন্তু মূল্যস্ফীতির তো কোনো লাগাম নেই।

এমনকি সরকারি ব্যাংকও সরকারের কথা শোনে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথা শোনে না। সর্বনিু ছয় শতাংশ নয়, আমানতে সুদ দেওয়ার কথা মূল্যস্ফীতির সমান। অথচ মূল্যস্ফীতি ছয় শতাংশের উপরে উঠলেও তারা সুদ দেয় ছয় শতাংশেরও কম। তার মানে কী? মানে হচ্ছে, মানুষের আয়-রোজগার বাড়ছে না। সমভাবে, সব সময় বাড়ছে না। চাকরির সুযোগ খুবই কম বাড়ছে। এ অবস্থায় মানুষের ভোগান্তি বাড়ছেই। তবু সান্ত্বনা নেওয়া যেত, যদি মূল্যস্ফীতির হার আজকের দিনের পর্যায়ের থাকত।

না, তা হওয়ার নয়। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির হার থাকে সহ্যসীমার উপরে। এখন আবার যুদ্ধের উৎপাত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বলি কেন, বস্তুত এ যুদ্ধ রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়া ও আমেরিকার। এর শেষ কবে তা জানে অস্ত্রবাজ দেশগুলো, অস্ত্র বিক্রেতারা। কিন্তু ইত্যবসরে মরণ তো সাধারণ মানুষের। আমাদের বেলায়ও তা-ই।

প্রতি সপ্তাহে ডলারের দাম বাড়ছে। কমছে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ। ডলারের ওপর চাপ ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ দেখলাম, ১০ তারিখে ডলারের বিনিময়ে হার নির্ধারিত হয়েছে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সায়। এটা এযাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ১৪ দিনে দুই দফা ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘কার্ব মার্কেটে’ অবশ্য ডলারের দাম অনেক বেশি। ডলারের দাম বাড়লে আমাদের অসুবিধা কী? লাভ রপ্তানিকারকদের এবং প্রবাসীদের।

কিন্তু তারা সংখ্যায় কত? দেশের আমজনতা ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনিতেই আয় সমভাবে, সবসময় বাড়ে না-বিপরীতে কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়েই। ইদানীং বেশি বাড়ছে খাদ্যদ্রব্য-চাল, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজের দাম। এ অবস্থায় যদি ডলারের দাম বাড়ে, বস্তুত যা বাড়ছেই, তাহলে বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়বে। কারণ আমাদের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর। প্রায় সব জিনিসই আমাদের আমদানি করতে হয়।

বহু অপ্রয়োজনীয় বিলাসী পণ্যও আমাদের ব্যবসায়ীরা আমদানি করে। তারা ‘জাঙ্ক’ জিনিসপত্রও আমদানি করে বাজারজাত করে। এমনকি আমাদের খাদ্যশস্যও আমদানি করতে হয়। চাল সেভাবে নয়, গম তো বটেই। ৫০-৭০ লাখ টন বছরে আমদানি করতে হয়। এখন এসবের দাম বাড়তির দিকে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বেশি। জাহাজ ভাড়া বেশি। অন্যান্য খরচ বেশি। উপরন্তু ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যবসায়ী ভাইদের রয়েছে ক্ষুধা, অফুরন্ত ক্ষুধা।

সবকিছুর কারণে আমদানির পরিমাণ আমাদের এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। অথচ রপ্তানির পরিমাণ এর ধারেকাছেও নয়। এ দুইয়ের ঘাটতি কিছুটা মেটে রেমিট্যান্স দিয়ে। কিন্তু ইদানীংকালে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও সীমিত। এসব কারণে ডলারের ওপর প্রচণ্ড চাপ। বাড়ছে দাম। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঘনঘন ডলারের বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। আমদানির ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হচ্ছে।

প্রসাধনসামগ্রী, বিলাসী পণ্যসহ অনেক পণ্যের আমদানির পরিমাণ হ্রাসের জন্য নানা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে, হচ্ছে। দামি গাড়ি ও নিত্যব্যবহার্য পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এখন থেকে ‘মার্জিন’ দিতে হবে ৭৫ শতাংশ। একে বলে ‘এলসি (ঋণপত্র) মার্জিন’। শিশুখাদ্য, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, ওষুধ, কৃষি ও রপ্তানিমুখী শিল্প ছাড়া সব আমদানিতে ‘এলসি মার্জিন’ হবে ৫০ শতাংশ। এসব করা হচ্ছে জরুরিভিত্তিতে।

হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশের রপ্তানি জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। অথচ ২০২১-২২-এর একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। বিশাল ঘাটতি এখন বাণিজ্যে। এটা কিছুটা পূরণ করে রেমিট্যান্স। কিন্তু আলোচ্য সময়ে রেমিট্যান্সও হ্রাস পেয়েছে ১৮ শতাংশ। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাবদ আলোচ্য সময়ে আয় হয়েছে ৫ হাজার ১৯২ কোটি ডলার। বিপরীতে আমদানি খরচ হচ্ছে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলার। এতে বাণিজ্য ঘাটতি এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতির মুখোমুখি আমরা। অবশ্যম্ভাবীভাবে আমরা আরও মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি। রোজগার কম। অবস্থা কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

অর্থনীতির বড় সমস্যা বৈষম্য

 ড. আর এম দেবনাথ 
১৪ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোন দিকে যাই? সয়াবিন তেলের বাজারে শান্তি নেই, আবার পেঁয়াজের বাজারেও শান্তি নেই। যুদ্ধ করছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। সয়াবিন তেল রপ্তানি বন্ধ করেছে আর্জেন্টিনা; পাম অয়েল রপ্তানি বন্ধ করেছে ইন্দোনেশিয়া। অতএব সয়াবিন আর পাম অয়েলের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে। এদিকে বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ করেছে পেঁয়াজের। অথচ বাজারে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি। দুই দিকেই অশান্তি।

অধিকন্তু অশান্তি সৃষ্টি করলেন ‘দেশপ্রেমিক’ সয়াবিন ব্যবসায়ীরা। সরকারের সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তারা বাজার থেকে হঠাৎ সয়াবিন উধাও করে দিলেন। তারপর সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম একতরফাভাবে বাড়ালেন। বাণিজ্যমন্ত্রী হতাশা প্রকাশ করলেন। করারই কথা, সয়াবিন ব্যবসায়ীরা তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও বিরাট ব্যবসায়ী। ফল হচ্ছে, সয়াবিন তেলের দাম দুই দফা বৃদ্ধি। উধাও করার ফলস্বরূপ যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তার বোঝাও সাধারণ মানুষের ওপর।

অথচ কাগজে কত হিসাব। মাসিক চাহিদা কত, মাসিক আমদানি কত, দেশে কত তেল ক্রাশ হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কত? ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যা মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিক করার জন্য। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, ‘দেশপ্রেমিক’ সয়াবিন ও পাম অয়েল ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে সমানে তেল বেরোচ্ছে। লুকানো তেল এখন প্রশাসন খুঁজে খুঁজে বের করছে। জরিমানা করছে দায়ী ব্যবসায়ীদের। কী জরিমানা? কয়েক হাজার টাকার জরিমানা।

খুবই হাস্যকর বিচার! সারা দেশকে কতিপয় ব্যবসায়ী জিম্মি করল, বাজার থেকে তেল উধাও করে লুটে নিল শত শত কোটি টাকা-এর জন্য জরিমানা মাত্র কয়েক হাজার টাকা! অথচ কেমন অবৈধ কাজ তারা করেছে। একটি কাগজে দেখলাম, রাজশাহীর গুদামেই পাওয়া গেছে ৯২ হাজার লিটার ভোজ্যতেল। কুষ্টিয়ায় পাওয়া গেছে ৪০ হাজার লিটার। এর জন্য শাস্তি কী? পাঁচ ব্যবসায়ী আটক, তিন ব্যবসায়ীর ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা! ভাবা যায় এত বড় অপরাধের পর এই বিচার! দুদিন পর আটক ব্যবসায়ীরা মুক্ত হবে। এমনও হতে পারে, দেখা যাবে তারা বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সভা করবেন। এসবই ঘটে হতভাগা দেশে।

প্রতিবছর একশ্রেণির ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, মিল মালিক বিভিন্ন পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়। একে বলা যায় ‘নন-ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট’-বিনা পুঁজিতে ‘ক্যাপিটাল’ বৃদ্ধি। তা বুঝলাম। তাদের এই অতিরিক্ত, মহা-অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কি তারা কোনো ট্যাক্স, আয়কর দেন? মোটেই না। আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে বন্দি করদাতা হচ্ছেন চাকরিজীবীরা।

বড় বড় করদাতার তালিকায় কজন ব্যবসায়ী, বড় ব্যবসায়ী আছেন? বিরল ঘটনা। অথচ স্বাভাবিক মুনাফা, ফুকুটের মুনাফায় তারা দিন দিন বড় হচ্ছেন। সরকারের ‘বন্ধু’ হচ্ছেন। প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছেন। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, তারাই ‘সংসদে’ গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছেন। মাঝে-মাঝেই রাজনীতিকরা হতাশা প্রকাশ করছেন যে, রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই। শিল্প, বাণিজ্য, পাট, অর্থ-সবকিছুই এখন বড় বড় ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে। এদিকে সাধারণ মানুষের অবস্থা কিন্তু ভালো নেই।

সাধারণ মানুষের সামনে ভালো ভালো খবর যেমন আছে, তেমনি খবর আছে বড় বড় অস্বস্তির, অশান্তির। এ মুহূর্তের ভালো খবর সরকার দিচ্ছে জিডিপির ওপর। সামনে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট। এটি মে মাস। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই বাজেট উঠবে সংসদে। ইত্যবসরে বর্তমান অর্থবছরের (২০২১-২২) হিসাব সরকার দিতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ২৮২৪ ডলার। গেল অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

এই সুখবর দিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেছেন, ‘এটা ঠিক যে সব মানুষের আয় সমানভাবে বাড়ছে না। বৈষম্য বাড়ছে। মাথাপিছু আয়ের এটি গড়ের হিসাব। ... তবে এখন মানুষ খালি পায়ে থাকে না। প্রত্যেকের হাতে মোবাইল আছে, গায়ে জামা আছে। এগুলোই প্রমাণ করে মাথাপিছু আয় বাড়ছে।’ শুধু এসব যুক্তি নয়, আরও অনেক যুক্তি দিয়ে ড. আলম প্রবৃদ্ধির হারকে যৌক্তিক করার প্রয়াস পেয়েছেন। দৃশ্যত এসব যে ঘটছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যারা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন তাদের কথাও আমলে নিতে হবে, যাতে দুই ধরনের মূল্যায়নের মধ্যে একটা ‘গোল্ডেন মিল’ পাওয়া যায়।

যারা অর্থনীতি নিয়ে হরহামেশা কথা বলেন, তাদের কারও কারও মতে, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির চিত্রটি ঠিক আছে। গতবারের চেয়ে ভালো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন সংখ্যা নিয়ে। ‘৭ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির খবর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।’ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি শিল্প খাতে কি সত্যিই এত প্রবৃদ্ধি হয়েছে? এদিকে কেউ কেউ বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, এডিপি বাস্তবায়নে মন্থরতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি চিত্র এবং জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ করে প্রবৃদ্ধির হারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। এসব বুঝলাম।

আমার কাছে মূল প্রশ্ন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি নিয়ে। তিনি স্পষ্টভাবেই বলছেন, ‘সব মানুষের আয় সমভাবে বাড়ছে না। বৈষম্য বাড়ছে। মাথাপিছু আয় এটা গড়ের হিসাব।’ এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি সবার আয় বাড়ত, তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তা কম হতো। ভাবতে হতো অন্যান্য বিষয় নিয়ে। কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে, আয় সমভাবে বাড়ছে না। বিপরীতে আবার মূল্যস্ফীতি ঘটছে। প্রতিবছর নিয়মিত জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। ইদানীং আবার মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি। সেই অনুপাতে মানুষের দৈনন্দিন আয় বাড়ছে না। বলা হয় কাজের লোক পাওয়া যায় না। খুবই সত্য কথা। কিন্তু এটি অর্ধসত্য কথা কিনা তাও ভাবার বিষয়।

বছরের প্রতিদিন কাজ থাকে না। আবার সারা দেশের অবস্থা একরকম নয়। গরিব অঞ্চলগুলোর অবস্থা নিশ্চয়ই অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় খারাপ। খারাপ বলেই উত্তরাঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে রংপুর ও দিনাজপুরের মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ ঢাকামুখী। ইদানীং ঢাকায় রাজশাহীর লোকও দেখা যায়। এতে বোঝা যায় দেশের সর্বত্র সমভাবে কাজ নেই। সমভাবে রোজগারের ব্যবস্থা নেই। যদি আয়-রোজগারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ত, তাহলে মানুষ পুষিয়ে নিতে পারত।

এখন মুশকিল হচ্ছে, সরকার প্রবৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির খবর যেভাবে প্রচার করে সেভাবে মজুরি, বেতন বৃদ্ধির কথা বলে না। যদি মূল্যবৃদ্ধি/মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আমরা মজুরি/বেতনের পরিসংখ্যানটা পেতাম, তাহলে তুলনা করতে পারতাম প্রকৃত অবস্থাটা কী। দৃশ্যত পরিস্থিতি আশাপ্রদ মনে হয় না। এটা বোঝা যায় টিসিবির ট্রাকসেলের লাইন দেখে।

এখন টিসিবির পণ্য কেনার জন্য যে লাইন হয় তাতে এমন লোকও দেখা যায়, যাদের সাধারণভাবে লাইন দিয়ে পণ্য কেনার কথা নয়। বোঝা যায়, তারা গরিব মানুষ নয়, নয় অতি দরিদ্রও। মধ্যবিত্ত ও নিুমধ্যবিত্তও লাইনে দাঁড়াচ্ছে। এ থেকে আঁচ করা যায়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের মতো নেই। ধরা যাক একজন পলিশওয়ালার কথা। ঈদের সময় সে কাজ পেয়েছে কিছু। কিন্তু ঈদ-পরবর্তীকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তার কোনো কাজ নেই। এটা আমি এক পলিশওয়ালার কাছ থেকে শুনেছি।

মুশকিল হচ্ছে, এরা দিন আনে দিন খায়। সঞ্চয় নেই যে কর্মহীন অবস্থায় কয়েকদিন সংসার চালাবে। এই যে ছদ্ম বেকারত্ব, এর সঙ্গে বেকারত্ব মেলালে সমস্যাটা বড় হয়। আবার আগে বেসরকারি খাত যেভাবে বেতনভাতা দিত, এখন তা তারা দেয় না। পদোন্নতি ও নানা ভাতার সুযোগও তারা কমিয়ে ফেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং, মার্কেটিং ও ম্যানেজমেন্টের এমবিএরা আগে যে বেতনে বেসরকারি খাতে ঢুকত, এখন তা পায় না। কিন্তু মূল্যস্ফীতির তো কোনো লাগাম নেই।

এমনকি সরকারি ব্যাংকও সরকারের কথা শোনে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথা শোনে না। সর্বনিু ছয় শতাংশ নয়, আমানতে সুদ দেওয়ার কথা মূল্যস্ফীতির সমান। অথচ মূল্যস্ফীতি ছয় শতাংশের উপরে উঠলেও তারা সুদ দেয় ছয় শতাংশেরও কম। তার মানে কী? মানে হচ্ছে, মানুষের আয়-রোজগার বাড়ছে না। সমভাবে, সব সময় বাড়ছে না। চাকরির সুযোগ খুবই কম বাড়ছে। এ অবস্থায় মানুষের ভোগান্তি বাড়ছেই। তবু সান্ত্বনা নেওয়া যেত, যদি মূল্যস্ফীতির হার আজকের দিনের পর্যায়ের থাকত।

না, তা হওয়ার নয়। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির হার থাকে সহ্যসীমার উপরে। এখন আবার যুদ্ধের উৎপাত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বলি কেন, বস্তুত এ যুদ্ধ রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়া ও আমেরিকার। এর শেষ কবে তা জানে অস্ত্রবাজ দেশগুলো, অস্ত্র বিক্রেতারা। কিন্তু ইত্যবসরে মরণ তো সাধারণ মানুষের। আমাদের বেলায়ও তা-ই।

প্রতি সপ্তাহে ডলারের দাম বাড়ছে। কমছে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ। ডলারের ওপর চাপ ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ দেখলাম, ১০ তারিখে ডলারের বিনিময়ে হার নির্ধারিত হয়েছে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সায়। এটা এযাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ১৪ দিনে দুই দফা ডলারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘কার্ব মার্কেটে’ অবশ্য ডলারের দাম অনেক বেশি। ডলারের দাম বাড়লে আমাদের অসুবিধা কী? লাভ রপ্তানিকারকদের এবং প্রবাসীদের।

কিন্তু তারা সংখ্যায় কত? দেশের আমজনতা ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনিতেই আয় সমভাবে, সবসময় বাড়ে না-বিপরীতে কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়েই। ইদানীং বেশি বাড়ছে খাদ্যদ্রব্য-চাল, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজের দাম। এ অবস্থায় যদি ডলারের দাম বাড়ে, বস্তুত যা বাড়ছেই, তাহলে বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়বে। কারণ আমাদের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর। প্রায় সব জিনিসই আমাদের আমদানি করতে হয়।

বহু অপ্রয়োজনীয় বিলাসী পণ্যও আমাদের ব্যবসায়ীরা আমদানি করে। তারা ‘জাঙ্ক’ জিনিসপত্রও আমদানি করে বাজারজাত করে। এমনকি আমাদের খাদ্যশস্যও আমদানি করতে হয়। চাল সেভাবে নয়, গম তো বটেই। ৫০-৭০ লাখ টন বছরে আমদানি করতে হয়। এখন এসবের দাম বাড়তির দিকে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বেশি। জাহাজ ভাড়া বেশি। অন্যান্য খরচ বেশি। উপরন্তু ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যবসায়ী ভাইদের রয়েছে ক্ষুধা, অফুরন্ত ক্ষুধা।

সবকিছুর কারণে আমদানির পরিমাণ আমাদের এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। অথচ রপ্তানির পরিমাণ এর ধারেকাছেও নয়। এ দুইয়ের ঘাটতি কিছুটা মেটে রেমিট্যান্স দিয়ে। কিন্তু ইদানীংকালে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও সীমিত। এসব কারণে ডলারের ওপর প্রচণ্ড চাপ। বাড়ছে দাম। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঘনঘন ডলারের বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। আমদানির ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হচ্ছে।

প্রসাধনসামগ্রী, বিলাসী পণ্যসহ অনেক পণ্যের আমদানির পরিমাণ হ্রাসের জন্য নানা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে, হচ্ছে। দামি গাড়ি ও নিত্যব্যবহার্য পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এখন থেকে ‘মার্জিন’ দিতে হবে ৭৫ শতাংশ। একে বলে ‘এলসি (ঋণপত্র) মার্জিন’। শিশুখাদ্য, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, ওষুধ, কৃষি ও রপ্তানিমুখী শিল্প ছাড়া সব আমদানিতে ‘এলসি মার্জিন’ হবে ৫০ শতাংশ। এসব করা হচ্ছে জরুরিভিত্তিতে।

হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশের রপ্তানি জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। অথচ ২০২১-২২-এর একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। বিশাল ঘাটতি এখন বাণিজ্যে। এটা কিছুটা পূরণ করে রেমিট্যান্স। কিন্তু আলোচ্য সময়ে রেমিট্যান্সও হ্রাস পেয়েছে ১৮ শতাংশ। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাবদ আলোচ্য সময়ে আয় হয়েছে ৫ হাজার ১৯২ কোটি ডলার। বিপরীতে আমদানি খরচ হচ্ছে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলার। এতে বাণিজ্য ঘাটতি এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতির মুখোমুখি আমরা। অবশ্যম্ভাবীভাবে আমরা আরও মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি। রোজগার কম। অবস্থা কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন