নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
প্রতিকূল পরিবেশে কতটা অনুকূল হবে বাজেট?
Advertisement
ড. আর এম দেবনাথ
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অর্থ, রাজস্ব ও বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয় কতটুকু নৈপুণ্য অর্জন করেছে অথবা সাবালকত্ব অর্জন করেছে তার প্রমাণ মিলবে আগামী বাজেট প্রস্তাবে, যা জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে এ মাসের ৯ তারিখে। এতদিন গতানুগতিক বাজেট প্রণয়নে তারা ছিল অভ্যস্ত।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বর্তমান পদে আসীন হওয়ার পর তিনি বাজেটকে ‘ব্যবসায়ীবান্ধব’ বাজেটে পরিণত করেছেন। সুদ নীতিকে তাদের অনুকূলে সংশোধন করেছেন। সঞ্চয়পত্র বিক্রিকে নিরুৎসাহিত করেছেন। অপ্রদর্শিত টাকা প্রদর্শনের সুযোগ দিয়েছেন অল্প-স্বল্প করে। কর মওকুফ, কর অবকাশ, কর মুক্তি দিয়েছেন উদারহস্তে। সবই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাধীনতার পর এমন অবস্থা আর কখনো ছিল না।
করোনা আক্রান্ত অর্থনীতি দুই বছর পর যখন দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে যখন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছিল, ঠিক তখনই আমেরিকার উসকানিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। আজও তা চলছে। আমেরিকা রাশিয়ার ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন হচ্ছে জ্বালানি তেল, সয়াবিন ও গম রপ্তানির প্রধান দুই দেশ। তাদের এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
পরিবহণ ও জাহাজের ভাড়া বেড়েছে। তেলের সংকট শুরু হয়েছে। গমের প্রাপ্যতায় সৃষ্টি হয়েছে ভীষণ অনিশ্চয়তা। মূল্যস্ফীতি দেশে দেশে ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। যেসব দেশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, এমনকি যারা রাশিয়া ও ইউক্রেনের গম, তেল ও সয়াবিনের ওপর নির্ভরশীল, তারাও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
এ অবস্থার শিকার হয়েছে শ্রীলংকা। সেখানে মানুষের খাবার নেই, বিদ্যুৎ নেই, পরিবহণ চলে না, স্কুল-কলেজ বন্ধ কাগজের অভাবে, হাসপাতালে ওষুধের অভাব। প্রতিবেশী ভারত তাদের সাহায্য করছে। রেমিট্যান্স হ্রাস, ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন শিল্প, উচ্চতর আমদানি ব্যয়, সর্বোপরি স্বৈরাচারী শাসকরা সুন্দর দেশ শ্রীলংকাকে আচমকা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। পাকিস্তানের অবস্থাও একই। দুই দেশেই প্রধানমন্ত্রী পদে পরিবর্তন এসেছে।
এই আন্তর্জাতিক আবহে আমাদের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপিত হতে যাচ্ছে সপ্তাহখানেকের মধ্যে। ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতি সরকারি হিসাবেই ৭ শতাংশের কাছাকাছি। ভরা বোরো মৌসুমেও চালের দাম প্রতিদিন বাড়ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চালের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। সব জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। প্রতিদিন খবরের কাগজে এ সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সিলেটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, নেত্রকোনায় বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গম ও চাল আমদানির চেষ্টায় সরকার উদ্যোগী হয়েছে।
এরই মধ্যে খবরের কাগজে আগামী বাজেট সম্পর্কে নানা খবর ছাপা হচ্ছে। এসব খবর থেকে আসলে কোথায় কীভাবে কী ঘটবে তা বলা বড়ই মুশকিল। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেছেন, প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী ডলার সংগ্রহে নেমেছেন। পাঁচ হাজার ডলারের বেশি প্রেরণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ডকুমেন্ট দিতে হতো। এসব আর দিতে হবে না। বিদেশে যারা টাকা পাচার করেছেন, সেই টাকা/ডলার দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা যাচ্ছে।
রপ্তানিতে কম প্রবৃদ্ধি, আমদানি মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সে শ্লথগতি ডলারের রিজার্ভ হ্রাস করেছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ভোগ্যপণ্য, বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী, আসবাবপত্র ও ফলমূল আমদানিতে নানা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এসব আমদানিতে ঋণপত্রের মার্জিনের (এলসি মার্জিন) পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। ডলারের যে দাম বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে দিয়েছিল, তা তুলে নিয়ে এর দামকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এ পর্যন্ত সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৪০০ কোটি ডলার বাজারে ছেড়েছে। শেয়ারবাজারে পতন অব্যাহত আছে। বাজার থেকে কোনো কোনো গ্রুপ বেশি টাকা তুলে নিয়েছে।
এ অবস্থায় এবার কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন মাননীয় অর্থমন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। অবশ্য বড় দায়িত্ব অর্থমন্ত্রী মহোদয়েরই। বলা যায়, তার কৌশলগুলো কী, তা-ই নির্ধারণ করবে আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। পরিস্থিতি হচ্ছে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’। এটা করলে ওটা হবে না, ওটা করলে এটা হবে না। চারদিক থেকে শুধু পরস্পরবিরোধী সুপারিশ আসছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সব ধরনের কর কমাতে হবে। তাহলে প্রশ্ন, রাজস্ব আসবে কোত্থেকে? শত হোক বাজেট মানেই কার কাছ থেকে কর আদায় করা হবে, কার পেছনে তা খরচ করা হবে।
এবার এর অগ্রাধিকার নির্ণয় হবে এক কঠিন কাজ। তবে অবশ্যই প্রথম কাজ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। বাজার গরম; মানুষের, বিশেষ করে সাধারণ মানুষ, নিু আয়ের মানুষ, নির্ধারিত আয়ের মানুষের মাথা গরম। কী করে সংসার চলবে। ভোগ কমিয়ে আর কতদিন। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্যের ভোগ। এরই মধ্যে আসছে পবিত্র কুরবানির ঈদ। বন্যার আশঙ্কা আছে। সিলেট শহর ইতোমধ্যেই বন্যায় ডুবেছে। এখন ঘরে ঘরে, টেবিলে টেবিলে আলোচনার বিষয় দ্রব্যমূল্য। এ নিয়ে সব শ্রেণির মানুষ আতঙ্কিত। যুদ্ধের মেয়াদ যতই বাড়বে, ততই মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়বে।
অথচ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এক কঠিন কাজ, যদিও এখন পর্যন্ত দেশে মূল্যস্ফীতির হার অনেক দেশের তুলনায় কিছুটা কম। কিন্তু আশঙ্কার জন্ম হচ্ছে অন্যত্র। কথা উঠেছে পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির। দু’দিন পরপরই সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে এ সম্পর্কিত খবর। দাম বাড়ালে ভীষণ বিপদ। আবার না বাড়ালে করতে হবে ভর্তুকি বৃদ্ধি। এর ‘বাড়ি’ কোথায়-এই হচ্ছে মূল প্রশ্ন।
দেখা যাচ্ছে অর্থমন্ত্রীর সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। প্রথমে তো রয়েছে মূল্যস্ফীতি; দ্বিতীয়ত, ভর্তুকি। এখানেই শেষ নয়, তাকে আরও বিবেচনা করতে হবে বেশ কয়েকটি বিষয়। কী করে রাজস্ব বৃদ্ধি করা যায়, কীভাবে গরিব মানুষের প্রাণ রক্ষার জন্য সামাজিক নিরাপত্তার আওতা ও পরিমাণ বাড়ানো যায়। রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব। এরই সঙ্গে সম্পর্কিত হচ্ছে ডলারের মূল্যের বিষয়টি। এর মূল্য বাড়লে আমদানি খরচ বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে কাঁচামাল ব্যবহারকারী দেশীয় শিল্প। লাভবান হবে রপ্তানি খাত।
সবচেয়ে বড় কথা, ডলারের মূল্য বাড়লে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। আবার রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রশ্ন। এ ধরনের বিনিয়োগে চলছে স্থবিরতা। সরকার যতই বলছে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা, ততই বাড়ছে স্থবিরতা। অথচ এর সঙ্গে জড়িত কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি। কর্মস্থানের সঙ্গে জড়িত মানুষের আয়-রোজগারের বিষয়। এবারের বাজেট এদিক থেকে হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের আয় তুলনামূলকভাবে কমছে, যত না বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে না। বরং উলটো অনেকের চাকরি যাচ্ছে। কর্মী-শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক চাকরি নবায়ন করা হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে কর্মসংস্থান করা যায় এবং পুরোনো কাজকর্ম ঠিক রাখা যায়, তাও বিবেচ্য বিষয়।
এদিকে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে আরেকটি বড় সমস্যা হিসাবে দাঁড়াবে ব্যাংকের সুদের হার। তিনি ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগে জোয়ার আনার উদ্দেশ্যে ঋণের ওপর সুদের হার অতিরিক্ত হারে হ্রাস করেছেন। ঋণের ওপর সুদের হার করা হয় ৯ শতাংশ। অথচ আমরা বাজার অর্থনীতি অনুসরণ করছি। বাজার অর্থনীতিতে বাজারই ঠিক করবে সুদের হার কত হবে।
বলাই বাহুল্য, বাজার অর্থনীতির মূল জায়গায় হাত দিয়ে সুদের হার হ্রাস করা হয়। মোট উৎপাদন খরচে সুদের অবদান কত, তার কোনো হিসাব না নিয়েই তা করা হয়। এটা করতে গিয়ে ব্যাংকাররা আমানতের ওপর সুদের হার মাত্রাতিরিক্ত হারে হ্রাস করেছে। বর্তমানে সরকারি ব্যাংকই মেয়াদি আমানতে ৫, সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ দেয়। কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংক তো সুদই দিতে চায় না।
অথচ লাখ লাখ চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক, বেওয়া-বিধবা শ্রেণির মানুষের আয়ের প্রধান উৎস সুদ-আয়। শুধু ব্যাংক আমানতের ওপর নয়, সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের প্রশ্নও আছে। সরকার এসবে সুদ কমানোর পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। নানাভাবে সঞ্চয়কে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, সুদ খরচ বেড়ে যাচ্ছে-এই কথা বলে।
এবার কী ঘটতে পারে? সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা থাকলেও তা সর্বাংশে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। ব্যবসা বৃদ্ধি না হলে, মানুষের আয় না বাড়লে সরকার রাজস্ব বাড়াবে কিভাবে? কঠিন প্রশ্ন। ব্যবসায়ীরা করের হার কমাতে চান। মধ্যবিত্তের কর দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত। অতএব টাকা ধারের ব্যবস্থা করতে হবে-হয় বিদেশ থেকে, নয়তো দেশের ভেতরে। বিদেশি ঋণের মাত্রা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে।
ঋণের টাকা পরিশোধের ক্ষমতা সম্পর্কে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে। আবার দেশের ভেতরে আমানতের ওপর সুদের হার বাড়ছে না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ‘রেপো’র হার বাড়িয়েছে। ‘রেপো’ বাড়ানো মানে ব্যাংকগুলো এখন বেশি সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে। তাহলে তাদের ঋণের ওপর সুদের হার বাড়াতে হবে। এ অবস্থায় আমানতের ওপর সুদের হার কী হবে, তা অবশ্যই বিবেচ্য একটি বিষয় হবে। ‘সিনিয়র সিটিজেনদের’ জন্য কি আমানতের ওপর সুদের হার একটু বেশি করা হবে?
রয়েছে খরচ কমানোর প্রশ্ন। কী আর করা? আয় না বাড়াতে পারলে খরচ তো কমাতেই হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব? বেতন-ভাতা ব্যয় তো কমানো যাবে না। অতএব উপায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। আরেকটি হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে খরচ কমানো। অথবা মেগাপ্রকল্পে ধীরগতি আনা। এটি হলে ইট, বালু, সিমেন্ট, রড ও ইস্পাত শিল্পের প্রভূত ক্ষতি হবে। পরিণামে ভুগবে ব্যাংকগুলো। এসব শিল্প ব্যাংকঋণের টাকা ফেরত দিতে পারবে না।
মোট কথা, কঠিন এক সময়ের মুখোমুখি অর্থ মন্ত্রণালয়। খরচ কমানো, রাজস্ব বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, ভর্তুকি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, চালের সরবরাহ ঠিক রাখা, ডলারের দাম ঠিক রাখা, ব্যাংকগুলোর তারল্য ঠিক রাখা, রেমিট্যান্সের প্রবাহ ঠিক রাখা, সামাজিক নিরাপত্তায় খরচ বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় এবার বাজেট প্রণয়নকে জটিল করবে সন্দেহ নেই। দেখা যাক অর্থমন্ত্রী তার বুদ্ধি কোন দিকে খাটান।
ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
