Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নদী বাঁচাও, বন্যা ঠেকাও

Advertisement

Icon

ড. মো. কামরুজ্জামান

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নদী বাঁচাও, বন্যা ঠেকাও

Advertisement

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৪০৫টি নদী, যদিও এর সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভিন্নতা আছে।

দেশের বৃহৎ নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, গোমতী, কর্ণফুলী ইত্যাদি। দেশের আন্তর্জাতিক নদীর সংখ্যা ৫৭। এর মধ্যে ৫৪টির মিলনস্থল ভারত। আর তিনটির মিয়ানমার।

সমাজ গঠনে নদীর ভূমিকা প্রাচীনকাল থেকেই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। নদী মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। নদ-নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে মানবসভ্যতার ইতিহাস। সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে নদীকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু বাংলাদেশ আজ ‘নদীমাতৃক’ পরিচয় হারিয়ে ফেলতে বসেছে।

দেশের ১৫৮টি নদী সংকুচিত হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। প্রমত্তা পদ্মা, মেঘনা আর যমুনার মাঝখানে এখন শোভা পাচ্ছে বাড়িঘর। নদীগুলোর মাঝখানে জেগে ওঠা বালুচরে কৃষকরা শুরু করেছে কৃষির আবাদ। বিগত পঞ্চাশ বছরে দূষণ ও দখলের ফলে নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এ দখল ও দূষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী ভরাট।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগের নাম হলো সিলেট। নদী গবেষকদের মতে, সিলেটের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন দিয়ে প্রবাহিত নদীর সংখ্যা দুই শতাধিক, যেগুলোর উৎসমুখ হলো ভারত। পাহাড়ি ঢল বেয়ে সৃষ্ট পানি প্রবাহই হলো এসব নদী। প্রতিবছর এ পাহাড়ি ঢল বয়ে আনে লাখ লাখ টন বালি ও মাটি। বয়ে আসা এ বালি ও মাটি সিলেট বিভাগের এসব নদ-নদী ও হাওড়-বাঁওড়কে ভরাট করে দিয়েছে।

এই বালি ও মাটি শুধু নদ-নদীর তলদেশকেই নয়, বরং এর উৎসমুখও ভরাট করে দিয়েছে। ভারতের মণিপুর রাজ্যের পাহাড়ে মাও সাংসাং থেকে উৎপন্ন একটি নদীর নাম বরাক। এটি সিলেটের জকিগঞ্জের অমলসীদ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা দুই শাখায় প্রবাহিত হয়েছে। সেখানে দীর্ঘ এক যুগ ধরে সুরমার প্রবেশমুখ ভরাট হয়ে চলেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বরাকের পানির ৭৫ শতাংশ কুশিয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতির কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সুরমা নদী। ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার জায়গার মধ্যে সুরমায় চর জেগেছে অন্তত ২০টি। এসব চর পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপে উঁচু টিলায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে আবাদি জমি থাকলেও পানির অভাবে কৃষকরা ফসল ফলাতে পারছেন না।

এ কারণে আবাদি জমিগুলোও এখন অনাবাদি হয়ে পড়ছে। যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সুরমা নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীভাঙন। ফলে তীরবর্তী মানুষ নানা দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের সঙ্গে সমানভাবে ক্ষতিসাধনে লিপ্ত রয়েছে অবৈধ দখলদাররা। তারা রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে নদী ভরাট করেছে। সেখানে তারা বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিধারাকে ব্যাহত করেছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক চরিত্রকে নষ্ট করেছে। অবৈধভাবে পাথর ও কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক গতিধারাকে ধ্বংস করেছে।

শিল্প-কারখানার বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলে নদীর পানি নষ্ট করেছে। শহরগুলোতে প্রবহমান খালগুলোর গতিধারাকে রুদ্ধ করেছে। ফলে নদী ও খালগুলো তাদের স্বাভাবিক গতিপথ ও নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি নদী ও খালগুলো ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে দুকূল ভেসে লোকালয়ে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অসময়ে বারবার দেশবাসী বন্যার কবলে পড়ে সীমাহীন ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সামগ্রিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের অনেক ভাটি অঞ্চল যখন পুড়ছে তীব্র দাবদাহে, তখন সিলেট ভাসছে পানিতে। সেখানে বিরাজ করছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। এর আগে গত এপ্রিলে বন্যায় তলিয়ে যায় সিলেটসহ আশপাশের হাওড় এলাকার ফসল। এক মাস না যেতেই সিলেটে আবারও দেখা দিয়েছে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা।

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বৃহত্তর সিলেটবাসী মোট তিনবার বন্যার কবলে পড়ল। তৃতীয়বারের বন্যা স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় রূপ নিয়েছে। তলিয়ে গেছে প্রায় পুরো সিলেট ও সুনামগঞ্জ। এ দুই জেলার একতলা ভবনের বেশিরভাগই এখন পানির নিচে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষ বন্যার কবলে পতিত হয়েছে।

এ লেখা যখন তৈরি করছি, তখন বিভাগীয় শহর সিলেট থেকে বিভিন্ন উপজেলা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সুনামগঞ্জের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। সবকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া না গেলেও দুই জেলার কৃষি অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জেলার ৪ লাখ মুরগি ও ২ লাখ গরু পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

১২২ বছরে সিলেটবাসী এমন বন্যা কখনো দেখেনি। বন্যাকবলিত এলাকা থেকে যখন পানি কমতে শুরু করবে, ক্ষতির খতিয়ানটি তখন প্রকাশ পেতে থাকবে। আর ক্ষতির এ খতিয়ানটি হবে অনেক দীর্ঘ। এ অবস্থায় বিশেষ করে নিু-আয়ের মানুষ পড়বে চরম বিপাকে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হিসাব অনুযায়ী, সিলেটে পুকুর-দিঘি মিলে তিন শতাধিক জলাশয় ছিল। এর দুই-তৃতীয়াংশই ভরাট হয়ে গেছে। অনেক জলাশয় ভরাট করে এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল, যা ‘ছড়া’ নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে।

এসব ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না। এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ছড়াগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। জানা যায়, নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৩টি বড় খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ কিলোমিটার।

দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব খালের দুপাশ দখল করে রেখেছে। অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করেছে ওই প্রভাবশালী দখলদাররা। এ ছাড়া নগরীর উপশহর এলাকার হাওড় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক এলাকা। জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় নগরের পানি ধারণের ক্ষমতা কমে গেছে। তাই সামান্য বৃষ্টি হলেই এখন নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আর ঢল নামলে বন্যায় প্লাবিত হয়।

তাই বন্যা প্রতিরোধে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। সীমান্তে সব নদীর উৎসমুখ খননের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। যৌথ নদী কমিশনে বিষয়টি জরুরিভাবে উত্থাপন করা প্রয়োজন। সুরমাকে দূষণ থেকে বাঁচাতে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা জরুরি।

নদীকে দূষণমুক্ত রাখা নাগরিক জীবনের সাংবিধানিক মৌলিক কর্তব্য। পৃথিবীতে চিরাচরিতকাল থেকেই নদীর তীরে মৎস্যজীবীদের বসবাস। দৈনন্দিন মাছ শিকার তাদের প্রধান জীবিকা। ইতিহাসের পাতায় মিসরকে তাই নীল নদের দান বলা হয়। সিন্ধু নদের তীরে গড়ে উঠেছে সিন্ধু সভ্যতা। ধরণীর বুকে নদী চিরকাল বয়ে যাবে আপন ধারায়। নদীর সঙ্গে মানুষের দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে প্রাচীনকাল থেকেই।

কিন্তু মানবসৃষ্ট অপরাধের কারণে প্রাকৃতিক নদীগুলো দিন-দিন হারিয়ে ফেলছে তার নাব্যতা। নির্বিচারে বন ধ্বংসের কারণে পাহাড়ের মাটি আগের মতো বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারছে না। ফলে শুকনো মৌসুমে নদী ও খালগুলো শূন্য হয়ে যায়। পার্বত্য অঞ্চলের নদীগুলো খরার প্রকোপে পানিহীনতায় ভুগতে থাকে। বন ধ্বংসের ফলে নদী ও খাল পানি ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে চির সবুজের বাংলাদেশ মরুভূমির দেশে পরিণত হচ্ছে। দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

বাংলাদেশ সবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লিখিয়েছে। লক্ষ্য এখন উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়া। উন্নত রাষ্ট্রের একটি নমুনা হলো সিঙ্গাপুর, যে দেশের একজন সাধারণ মানুষ নদী ভরাট হওয়ার ভয়ে চকলেটের একটি খোসা তাদের নদীতে ফেলে না। আর সেখানে আমাদের দেশের ‘দেশপ্রেমিক’ ক্ষমতাবানরা দখল করছে নদী! তাতে নিক্ষেপ করছে ময়লা আবর্জনা! নদীগুলো পরিণত হয়েছে আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিনে!

দেশের কর্ণধার বলে বিবেচিত এসব মানুষ নদী ও খাল ভরাট করে তাতে নির্মাণ করছে বহুতল ভবন! তাদের কারণেই আজ জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। সিলেটের বন্যা অনেকাংশে তাদের এই দুষ্ট চরিত্রেরই ফসল। এ অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত ‘ভিশন প্রকল্প ২০৪১’-এর বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে।

সচেতন মহলের প্রশ্ন, কিছু দখলদারের হাতে নদী ও খালই যখন নিরাপদ নয়, সেখানে একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিরাপদ হতে পারে? সেক্ষেত্রে উন্নত রাষ্ট্রের কল্পনা দুঃসাধ্য ব্যাপার। উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চাই পরিকল্পিত নগরায়ণ। আমরা চাই জলাবদ্ধতামুক্ত সুন্দর নগরী, শহর ও গ্রাম। আর এ লক্ষ্যে প্রয়োজন নদী ও খাল দখলমুক্ত একটি নিরাপদ জনপদ।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

Advertisement

বন্যা

Advertisement

আরও পড়ুন

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

ধূসর রাষ্ট্রের কাছে এক বিষণ্ন শালিকের গান

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

প্রাণহানির দায় কি শুধুই চালকের

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

মৃত গাদ্দাফি আজও বিভক্ত লিবিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম