Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বন্যার্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিন

Advertisement

Icon

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বন্যার্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিন

Advertisement

এ বছর বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ইতোমধ্যে পরপর তিনবার বন্যা ও পাহাড়ি ঢল হয়ে গেল। অল্প সময়ের ব্যবধানে এত ঘন ঘন বন্যা মোকাবিলা করার জন্য সেখানকার মানুষ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বিশেষ করে তৃতীয়বারের বন্যার পানির প্রবল স্রোত ও আক্রোশ এত বেশি ছিল, তা দেখে অনেকে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। জীবন বাঁচাতে ডুবে যাওয়া বসতবাড়ি ও সহায়-সম্বল ছেড়ে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে ভেলা, নৌকা, ট্রলার, দূরের কোনো উঁচু দালান, রাস্তার ধারে অথবা আশ্রয় শিবিরে।

অন্যান্যবার বন্যা হলে দু’তিন দিন পরে পানি নেমে যেত। তখন বন্যার্তরা নিজ নিজ বসতভিটায় ফিরে গিয়ে নতুনভাবে গুছিয়ে নিয়ে জীবন-জীবিকা শুরু করত। কিন্তু এবারের বন্যার তাণ্ডব, বিস্তার ও স্থায়িত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকায় পানি নামতে থাকার গতি খুবই ধীর প্রকৃতির। বন্যা শুরু হওয়ার সাত-দশদিন পরও কোথাও কোথাও পানি সরে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। গ্রামাঞ্চলে কারও কারও বসতবাড়ির ঘরের চালের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল প্রবল স্রোত। সবকিছু ভেঙেচুরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেকের। পানি নামার পর নিজেদের বাড়িঘরের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে। প্রলয়ংকরী বন্যার পর এলাকায় ফিরে বিধ্বস্ত ও শূন্যভিটা দেখে অনেকে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। সামনের দিনগুলোতে কী করবেন, কী খাবেন, সন্তানদের নিয়ে কীভাবে দিনাতিপাত করবেন-সেই চিন্তায় অধীর হয়ে উঠছেন তারা।

বন্যায় কী নষ্ট হয়নি তাদের? নষ্ট হয়ে যাওয়া বাস্তুভিটা ও সহায়-সম্বলের মধ্যে চারদিকে শুধু কষ্ট খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। সিলেটে ৮০ শতাংশ এলাকা এবং সুনামগঞ্জে ৯০ শতাংশ এলাকা ৭ থেকে ১০ দিন ধরে পানির নিচে ডুবে ছিল। এতে যে চরম ক্ষতি হয়েছে, সেটি মানুষ আগে মোটেও কল্পনা করেনি। বন্যার পর চারদিকে শুধু হাহাকার শব্দ যেন সেখানকার গৃহহারাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়ে পরিহাস করছে।

বিধ্বস্ত ভিটায় ফিরে প্রথমেই দেখছেন, তাদের খাবার পানির উৎসটি অকেজো বা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সুপেয় পানির উৎস টিউবওয়েলটি কাদা, বালুতে ডুবে নষ্ট। যাদের বাড়িতে পাইপলাইনের পানি সরবরাহ ছিল, সেগুলোতে বন্যার দূষিত পানি ঢুকে গেছে, লিকেজ হয়েছে অথবা ভেঙে গেছে। জলাবদ্ধতায় সেগুলো মেরামত বা নতুন করে সংযোজন করার অবস্থায় নেই অনেক দুর্গত পরিবার। দূরবর্তী স্থান থেকে অতিকষ্টে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে অনেককে। বন্যার আগে অনেকে পাহাড়ি ঝরনার পরিষ্কার পানি ব্যবহার করতেন। এখন জমে থাকা বন্যার ময়লা পানি নিত্যসঙ্গী হয়ে পড়েছে। এসব নোংরা পানি দিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম সারার ফলে পেটের অসুখ শুরু হয়েছে অনেক পরিবারে। এভাবে ডায়রিয়া, ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, জ্বর, আমাশয় ও কলেরার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সেটি অনেক ভয়ংকর হতে পারে। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় খাবার পানির উৎস ঠিকভাবে কাজ না করলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এর পরের বড় কষ্ট হলো দ্রুত যোগাযোগ করার উপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ চালু হলেও রাস্তাগুলো ভেঙে যাওয়ায় চলাচলের গতি থমকে গেছে উপদ্রুত এলাকায়। মূল রাস্তায় তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি সংস্কারের মাধ্যমে কিছু গর্ত মেরামত করে গাড়ি চলাচল করলেও পাড়া-মহল্লা ও বিশেষ করে গ্রামীণ রাস্তাগুলোর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এখনো। সুনামগঞ্জ জেলায় আড়াই হাজার কিমি. সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে। দুই শতাধিক ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে ফুটো হয়ে গেছে বলে সংবাদ হয়েছে।

কিছু দূর পরপর বড় বড় গর্ত, খানাখন্দক সৃষ্টি হওয়ায় হেঁটে চলতে গিয়ে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হচ্ছে সুনামগঞ্জের ছাতক, গোয়াইনঘাট, দিরাই, শাল্লা, সিলেটের আখালিয়া, জকিগঞ্জ, নেত্রকোনার কেন্দুয়া, নিকলী এমনকি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, চিলমারী, জোড়গাছবাজার, উলিপুরের থেতরাই ইত্যাদি এলাকার পল্লি জনপদগুলোতে। এসব এলাকার অটোরিকশচালকরা পড়েছেন মহাবিপাকে। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে তাদের দৈনিক আয় কমে যাওয়ায় পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে চরম কষ্টে রয়েছেন তারা। জরুরি পণ্য পরিবহণ ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে।

সিলেট এলাকায় এমনিতেই শাকসবজির দাম বেশি। বন্যায় সবজির আবাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবং রাস্তা নষ্ট থাকায় কোনো কোনো এলাকায় শাকসবজির চরম আকাল দেখা দিয়েছে। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এক হিসাবমতে, শুধু সিলেট অঞ্চলে আট কোটি টাকার মাছের পোনা ভেসে গেছে। আমন ধানের বীজতলা ও চারা নষ্ট হওয়ায় এবার আমন ধানের ফলন হ্রাস পাওয়ার ব্যাপক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্যার পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্গম পাহাড়ি ও পল্লি অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষক কাজের উপায় হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছেন। তাদের অনেকের সামান্য জমি। সেখানে বন্যায় পলিমাটি পড়ার নামে জমেছে বালুর পাহাড়। যেসব প্রান্তিক কৃষক ও বেকার যুবক ঋণের টাকায় অন্যের পুকুর লিজ নিয়েছেন অথবা জমিতে বর্গা আবাদ শুরু করেছেন, তারা ঋণের কিস্তি শোধ দেওয়ার সময় বিপদের আশঙ্কা করছেন। ব্যাংকের ঋণ তারা শোধ দেবেন কীভাবে, এ নিয়ে তাদের চরম মানসিক যাতনা শুরু হয়েছে।

বসতভিটার সঙ্গে যাদের ঘরবাড়ি কিছু অবশিষ্ট আছে, তাদের আসবাবপত্র, তৈজসপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। উপদ্রুত এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকায় এ বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠান নিয়ে এখনো চরম বিপাকে রয়েছেন কর্তৃপক্ষ। পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃ পুনঃ বন্যায় মানুষের মন ভেঙে গেছে। বিশেষ করে ভয়ংকর আগ্রাসী বন্যার রূপ তাদের কাছে একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। তাই এটি মোকাবেলা করতে গিয়ে তারা চরম অসহায় ও ভীত হয়ে পড়েছে। এবারের বন্যায় আমাদের দেশে ২৬ জুন পর্যন্ত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতের আসামে মৃত্যু হয়েছে ১৬৭ জনের। সেখানে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল। আসামে বন্যার পর ভয়াবহ জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে ভয়ের আরেকটি কারণ হলো-চেরাপুঞ্জিতে এ বছর আরও বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। সামনে ঘোর বর্ষাকাল। সেসময় চেরাপুঞ্জিতে আবারও অতিবৃষ্টি হলে সিলেটে ভরা বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি কই?

দুর্নীতির পর দুর্যোগ আমাদের সব অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে তোলে। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের আয়বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখে। দুর্যোগের পর ত্রাণ চুরির মহোৎসব আমাদের সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য সৃষ্টির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই এদিকটিতে সতর্ক হওয়া জরুরি। ঘরহারা বন্যার্তদের ত্রাণ নয়; সেনাবাহিনীর মাধ্যমে গৃহনির্মাণসামগ্রী কিনে অথবা ঘর তুলে দিন। ফসলহারা প্রান্তিক কৃষকদের বাঁচাতে ঋণ মওকুফ করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দান করুন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী বিনামূল্যে চিকিৎসা, বইপুস্তক, পুষ্টিকর শিশু খাদ্য প্রদান করুন। উপদ্রুত এলাকায় বন্যার পানি না সরতেই দেশে করোনার চতুর্থ ধাপের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য অসুখের জন্য জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি করোনার ওমিক্রন ধরনের সংক্রমণ ঠেকাতে আশু তৎপরতা জোরদার করুন। আমাদের আনন্দের মাঝে সম্প্রতি সম্বলহারা ও সীমাহীন কষ্টের মধ্যে থাকা বানভাসিরা কেমন আছে, তা একটু স্মরণ করা উচিত। এ দুঃসময়ে তাদের জন্য প্রাণ খুলে সাহায্যের হাত প্রসারিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব বটে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

[email protected]

Advertisement

বন্যার্তদের

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম