Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

Advertisement

Icon

মোদাসসের হোসেন খান

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক সহযোগিতা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয়। কিন্তু সেই সহযোগিতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের কোনো অধিকার সৃষ্টি করে না। আন্তর্জাতিক আইনে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র সব রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা সমান। বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু অধীনতা কিংবা আধিপত্য নয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং এর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের অধিকারকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিঃশর্ত সম্মান জানানো উচিত।

ভারতীয় হাইকমিশনারের অস্বাভাবিক তৎপরতা ও জনমনে ক্ষোভ

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বিভিন্ন মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঘন ঘন সাক্ষাৎ এবং প্রকাশ্য বক্তব্য নিয়ে দেশের সচেতন মহলের একাংশে উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি প্রদানের ঘটনাও ঘটেছে। বিদেশি কূটনীতিকের স্বাভাবিক যোগাযোগ অবশ্যই বৈধ; কিন্তু এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক কার্যক্রম কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার ওপর অযাচিত প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা থাকলে তা হবে অগ্রহণযোগ্য। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ব্যাখ্যা দাবি করা সরকারের দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিধি ও শিষ্টাচার লঙ্ঘনের প্রশ্ন

১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি কূটনীতিকদের স্বাগতিক দেশের আইন ও বিধিবিধান মেনে চলা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা সম্মত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার বিধানও রয়েছে। বিশেষত সশস্ত্রবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদেশি প্রতিনিধিদের যোগাযোগে যথাযথ অনুমোদন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। বাংলাদেশ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, কূটনৈতিক সুবিধার আড়ালে যেন কোনো বিদেশি রাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন

ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-অনুরোধভুক্ত অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করতে হবে। ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও প্রতিকারও জরুরি। পাশাপাশি গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত চুক্তিগুলো সমতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। অতীতের কোনো সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাংলাদেশের স্থায়ী জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি প্রমাণিত হলে তা আইনানুগভাবে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি করণীয়

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে ভারতীয় হাইকমিশনারের বিতর্কিত বক্তব্য ও সাক্ষাৎগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং প্রযোজ্য কূটনৈতিক বিধির আলোকে পর্যালোচনা করা। সরকারি পর্যায়ে বিদেশি কূটনীতিকদের সাক্ষাতের জন্য সুস্পষ্ট প্রটোকল, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সীমা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও লিখিত ব্যাখ্যা দাবি করতে হবে। একইসঙ্গে নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের উদ্বেগ জানিয়ে প্রত্যর্পণ এবং অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। গুরুতর ও অব্যাহত হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ভিয়েনা কনভেনশনের ৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণার অধিকারও বাংলাদেশ সংরক্ষণ করে।

ভারতের প্রতি সুস্পষ্ট বার্তা ও জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন

ভারতকে উপলব্ধি করতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু কর্তৃত্ব মেনে নেবে না। বাংলাদেশের সরকার, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, সামরিক নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের অধিকার একান্তভাবেই বাংলাদেশের। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কিংবা কৌশলগত অসন্তুষ্টির কারণে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হতে পারে না। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় সরকার, রাজনৈতিক দল, সশস্ত্রবাহিনী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আবেগ নয়, তথ্যপ্রমাণ, আন্তর্জাতিক আইন ও দৃঢ় কূটনীতির মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু কারও অনুগত রাষ্ট্র নয়। বন্ধুত্ব হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে-আধিপত্য কিংবা অধীনতার ভিত্তিতে নয়।

লে. কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান (অব.) বীর প্রতীক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সামরিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম