Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

Advertisement

Icon

ড. গোলাম ছারোয়ার

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

ডেঙ্গুজ্বর হলো এডিস মশাবাহিত (এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপটাই) একটি তীব্র ভাইরাসজনিত রোগ এবং হাম মূলত রুবেলা বা রুবিওলা ভাইরাস নামক এক ধরনের প্যারামিক্সো ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। বর্তমানে এ দুটির সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। টিকা প্রদান, পরিষ্কার পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশনের মাধ্যমে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ ছড়ানো রোধ করা যায়। অকাল মৃত্যু কমানো যায়। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও তেমন কোনো সম্যক ধারণা নেই।

দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত চিত্রটি বর্তমানে একাধারে ব্যাপক সম্ভাবনা এবং গভীর কাঠামোগত ও জনবল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরকার স্বাস্থ্য বাজেটে বড় ধরনের সংস্কার ও জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এবং চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৩.১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগের কারণে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের মধ্যে উচ্চরক্তচাপ রয়েছে প্রথম স্থানে। এরপরই রয়েছে পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও হৃদরোগ। দেশের জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো চিকিৎসার খরচের বোঝা। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশই নাগরিকরা নিজেদের পকেট থেকে বহন করে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বোচ্চ। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ থাকলে তাদের চিকিৎসা খরচের তিন-চতুর্থাংশই চলে যায় ওষুধ কিনতে, যা দরিদ্র পরিবারগুলোকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এ নাজুক পরিস্থিতিতে যখন সংক্রামক রোগগুলো মহামারি পর্যায়ে চলে যায়, তখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর কোমরবিডিটি ব্যক্তিরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার এমনিই হু হু করে বেড়ে যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১.০১ শতাংশ (পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটে এটি ছিল মাত্র ০.৫৮ শতাংশ)। তবে এ বর্ধিত বাজেটের সঠিক বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও বড় শহরগুলোতে (যেমন ঢাকা) দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। তীব্র তাপপ্রবাহ এবং আকস্মিক বন্যা দেশে পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে শহরের নিুআয়ের মানুষ। এ চরম বাস্তবতায় এসব দুর্ভাগা মানুষ দুমুঠো খাবার জোগাতে একদিকে যেমন নিজেদের নিয়োজিত রাখছে, অন্যদিকে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগগুলোর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই চলছে।

এমনই এক সন্ধিক্ষণে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। সেপ্টেম্বরে রেকর্ডসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত এবং তিনশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় বড় আকারে টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হচ্ছে সরকারকে। মনে রাখতে হবে, সাধারণ ডেঙ্গু ভালো হয়ে গেলেও এটি অনেক সময় ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে রূপ নিতে পারে। এতে রক্তনালি থেকে রস বা রক্তক্ষরণ হতে পারে, যার ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকর হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা অতিরিক্ত কমে গিয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও শক তৈরি করে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন ধরন রয়েছে। একবার এক ধরনে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য ধরনে আক্রান্ত হলে জটিলতা ও ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হলো স্ত্রী এডিস মশা। এ মশা বাড়ির ভেতরে বা আশপাশের ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, এসি বা ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। বর্ষাকালে ও পরবর্তী সময়ে (বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত) আর্দ্রতা বেশি থাকায় এ মশার প্রজনন ও উপদ্রব বেড়ে যায়। এক জরিপে দেখা গেছে, এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির মশা ৯৫ শতাংশের ওপর শহরের প্রজনন স্থলগুলোতে বিদ্যমান এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার ৯৫ শতাংশের ওপর গ্রামের প্রজননস্থলগুলোতে দেখা যায়। যেহেতু দুই প্রজাতির মশাই ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে, সেহেতু গ্রামেও এডিস মশার প্রজননস্থল মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডেঙ্গু ভাইরাস এখন শহর ছেড়ে গ্রামেও সমান তালে রোগ সৃষ্টি করে চলেছে। তাই যেসব ব্যবস্থাপনা শহরে নেওয়া হতো, অন্ততপক্ষে তার সমান অথবা তার চেয়ে বেশি ব্যবস্থাপনা গ্রামে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সরকারের যেসব ইউনিট এ দায়িত্বে রয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগসহ লার্ভিসাইড এবং অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করে প্রতিটি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। হট স্পটগুলো চিহ্নিত করে সেখানে ক্রাশ প্রোগ্রাম জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা সরকারের একার দায়িত্ব নয়।

মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাস শহর থেকে গ্রামে বিস্তৃত হয়েছে আমাদের সবার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। ঠিক একইভাবে সবাইকে সমন্বিতভাবে কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই এডিস মশার ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট থ্রেশ হোল্ড লেভেলের নিচে আনতে হবে। তাহলেই সম্ভব হবে ডেঙ্গু ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণ। বাহক যদি নিয়ন্ত্রণে আসে, তাহলে ভাইরাসের আক্রমণও নিয়ন্ত্রণে আসবে। এসবের সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশা এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের মধ্যে জিনগত কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা, তার জন্য অবশ্যই হাইটেক ল্যাবরেটরিতে বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত টিমে গবেষণা কাজ পরিচালনা করতে হবে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্লেষণে দেশে একটি জনস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। যেখানে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণা একসঙ্গে সমানতালে চলবে। এ থেকে একদিকে যেমন শিক্ষিত জনস্বাস্থ্যবিদ বেরিয়ে আসবে, অন্যদিকে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগগুলোর প্রতিরোধে তারা রাখবেন অসামান্য অবদান। আসুন আমরা সবাই মিলে এমন একটি সুন্দর ও নিরাপদ বাসযোগ্য ভূমি গড়ে তুলি।

ড. গোলাম ছারোয়ার : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম