Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বিজয় দিবসে প্রত্যয়ী বাংলাদেশ

Advertisement

Icon

ড. আতিউর রহমান

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিজয় দিবসে প্রত্যয়ী বাংলাদেশ

Advertisement

করোনাজনিত অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার আগেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাভাব বিরাজ করছে তার জের বাংলাদেশেও পড়েছে।

দেশের ভেতরেও কারও কারও দায়িত্বহীন অপপ্রচারে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই এসেছে বাংলাদেশের ৫২তম বিজয় দিবস। তবে এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ আশাবাদীই থাকছেন। সংকট মোকাবিলার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে আমরা উদ্যাপন করছি ভিন্ন এক বিজয় দিবস।

আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এর বিকল্প নেই। সরকার ও দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি সামাল দিতে নানারকম সুবিবেচনাভিত্তিক উদ্যোগ নিচ্ছে। এর কিছু কিছু সুফল দেখতে পাচ্ছি। সামনে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগে বাজারভিত্তিক সমাধানের দিকে হাঁটাই কাম্য।

বাংলাদেশের জন্য সুখবর হলো, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন কৌশলের ফলে দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো গেছে। তাই অধিকাংশ দেশের তুলনায় আমরা এ দুর্যোগ মোকাবিলায় ভালো করছি, এবং সামনেও ভালো করব বলে ধারণা করা যায়।

করোনাকালেই আমরা এর প্রমাণ পেয়েছি। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের যোগ্যতার বিচারেও বাংলাদেশ রয়েছে ভালো অবস্থানে। তাই বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মতো সংস্থার প্রক্ষেপণেও বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক ভালো বলা হচ্ছে।

বিদ্যমান সংকট নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। অংশীজনেরা যেন এ সংকটকালে সদাসতর্ক থাকেন, তা নিশ্চিত করতে এমন আলোচনার দরকারও আছে। তবে একই সঙ্গে আমাদের সম্ভাবনা ও শক্তির জায়গাগুলোও বারবার সামনে নিয়ে আসা দরকার। তাতে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ভরসার জায়গা তৈরি হবে। মনে রাখতে হবে, এ ভরসা আমাদের বড় সামাজিক পুঁজি।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাপে থাকা অবস্থাতেও তাই ভুলে গেলে চলবে না যে, এ সংকট কাটিয়ে এগোতে পারলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের পথে অনেকখানি এগিয়ে যাবে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা বিসিজি তাদের নভেম্বর ২০২২-এর প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, প্রবৃদ্ধি যদি ৫ শতাংশেও ধরে রাখা যায়, তাহলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকবে (বর্তমানে ৪১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

অন্যদিকে আমরা দেখছি, সবচেয়ে রক্ষণশীল প্রক্ষেপণেও এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কাজেই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রবৃদ্ধির গতি বছর দুয়েক আগে যে নাটকীয় মাত্রায় বাড়ছিল, সে পর্যায়ে না গিয়েও আমরা অল্প সময়ের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি পেতে পারি। বিসিজি তাদের ওই প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের এ অসামান্য অর্জনে আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে ব্যক্তিখাত।

দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যক্তিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫৬ শতাংশই তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সামাজিক প্রভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে থাকে। অর্থাৎ এ ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি গতিময় হওয়ার পাশাপাশি এর সুফলও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাবে। ফলে উন্নয়নের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র অটুট থাকবে আগামী দশকগুলোতেও।

গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকার ধারাবাহিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশল নিয়ে এগিয়ে গেছে এবং একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে বলেই আজকে এমন সম্ভাবনা তৈরি করা গেছে। এ সময়ে সরকারের সময়োচিত নীতি গ্রহণ আর সর্বোচ্চ সদিচ্ছা নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের সুফল খালি চোখেই দৃশ্যমান। গত দুই দশকে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে।

এতে জিডিপিতে কৃষির অংশ কমেছে। তবে কৃষি উৎপাদন কিন্তু বেড়েছে। তাই বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেছে। বিগত দশকটিতে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ২৬.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১.৫৭ শতাংশ হয়েছে। বিনিয়োগ বর্ধিষ্ণু থাকায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হলেও বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান হয়েছে। মাথাপিছু আয় ২,৮০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মোট রপ্তানি প্রথমবারের মতো ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রবৃদ্ধির যে পথরেখা ধরে এগিয়েছে, বাংলাদেশও সে পথের পথিক হয়ে উঠবে।

ফলে ২০২৬-এর মধ্যেই আমাদের মাথাপিছু আয় ৪,০০০ ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে। আর এ প্রবৃদ্ধি হবে ভোগ-নির্ভর। অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব বাজারই আমাদের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে। এখনই জিডিপির ৭৩ শতাংশ আসছে ভোগ থেকে। ২০২৬-এর মধ্যে এর সঙ্গে আরও ১২ শতাংশ যোগ হতে পারে। আর ২০৩০ নাগাদ আমরা হব বিশ্বের নবম বৃহত্তম ‘কনজ্যুমার মার্কেট’। ১১ শতাংশ নাগরিক উঠে আসবেন নিু আয় শ্রেণি থেকে, আর এর ফলে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ থাকবেন মধ্যম আয় শ্রেণিতে। এমন সম্ভাবনাময় কনজ্যুমার মার্কেটে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে খুব বেশি বেগ পাওয়ার কথা নয়।

এটা খুবই পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে একদিকে ভূ-রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরেও আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। বিদ্যমান বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে আমাদের প্রবৃদ্ধির চাকা আগের তুলনায় কম গতিশীল থাকবে অন্তত কিছুকাল। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, এখন প্রবৃদ্ধি নয় বরং সামষ্টিক অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়াই প্রধান কাজ।

কাজেই প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম গতিশীল রেখে হলেও চলমান মন্দাবস্থার প্রভাব থেকে বৃহত্তর জনগণ, বিশেষ করে নগর-দরিদ্রদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের পরিধি এবং এর আওতায় দেওয়া সহায়তার পরিমাণ-এ দুইই বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যে কার্ডের মাধ্যমে চাল বিতরণ, টিসিবির ট্রাক সেলের মতো যে উদ্যোগগুলো মানুষকে কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সফলতার মুখ দেখেছে, সেগুলোর পাশাপাশি নতুন নতুন উদ্ভাবনী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। কোনগুলো বেশি কার্যকর হতে পারে, তা আমাদের করে করেই শিখতে হবে। আর কৃষি এবং এমএসএমই’র দিকে বাড়তি নীতি-মনোযোগের কোনো বিকল্প নেই।

কৃষি করোনাকালেও আমাদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করেছে। আগামীতেও করবে। অন্যদিকে এমএসএমই খাত আমাদের উদ্যোক্তাদের বিকশিত করার পাশাপাশি বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং দেশজ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ধারা ধরে রাখতেও ইতোমধ্যে নেওয়া ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে আরও বলশালী করতে হবে। প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা বাড়াতে হবে।

আর রপ্তানির তালিকায় আরএমজির পাশাপাশি আরও নতুন নতুন পণ্য যোগ করতে হবে। একইসঙ্গে রপ্তানির নতুন নতুন বাজারও খুঁজে বের করতে হবে। সর্বোপরি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আমাদের কর-জিডিপির অনুপাত (বর্তমানে ১০ শতাংশের কম) আর ৫ শতাংশ বাড়াতেই হবে। এজন্য ডিজিটাইজেশনসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বাড়াতে দরকারি সব পদক্ষেপ যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা চাই।

আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এ চ্যালেঞ্জগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতাও যে আমাদের ভেতরে আছে-তাও মনে রাখতে হবে। আমাদের এ সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থেকেই আগামীর পথনকশা দাঁড় করাতে হবে। নিজেদের এ সক্ষমতার বিষয়ে আরও প্রত্যয়ী হতে বারবার ফিরে তাকাতে হবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের দিকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর অসম্ভব সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমরা বিশ্বের বুকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছি।

আমাদের সেই অবিশ্বাস্য নান্দনিক অভিযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আজও আমাদের মনে ও মননে একইভাবে জাগরূক আছেন। আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই এগোচ্ছি। তাই ৫২তম বিজয় দিবসে এসে বহু বাধা ডিঙিয়ে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি অনুভব করতে পারছি। আমাদের এ সার্বজনীন অভিযাত্রা আরও গতিময় হোক, আরও গণমুখী হোক-এ প্রত্যাশায়।

ড. আতিউর রহমান : অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

Advertisement

বিজয় দিবস

Advertisement

আরও পড়ুন

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

নিউইয়র্কের চিঠি বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ

বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু

সাক্ষাৎকার প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম