নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
নতুন সরকার কি পারবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে?
Advertisement
ড. আর এম দেবনাথ
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাত পোহালেই সংসদ নির্বাচন। ভীষণ শীতে সারা দেশ আক্রান্ত। শীতকালে আমাদের জীবন হয়ে পড়ে কিছুটা স্থবির। রোগ-শোক বৃদ্ধি পায়। মানুষের কাজকর্মের গতি রোধ হয়। আমরা কিছুটা ‘সচল’ থাকার জন্য গান-বাজনা, উৎসব অনুষ্ঠান, মেলা, কীর্তন ইত্যাদির ব্যবস্থা করি। চাঙা থাকার চেষ্টা করি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যথারীতি এসব চলছে। সবে কৃষক আমন ঘরে তুলেছেন, বোরো লাগিয়েছেন। পাট উঠছে। সবজি, শাক ইত্যাদির ফলন প্রচুর। শীতের মাছ বাজারে উঠতে শুরু করেছে। গোল আলু অকাল বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছিল। নষ্ট হয়েছিল রবিশস্য, সরিষা, কলাই ইত্যাদি ফসল। কৃষক আবার এসব সবজি লাগিয়েছেন। এসব কাজ চলছে, সেই সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের ধুমধাম। ঢাকা শহরের ব্যবসায় মন্দা। আমার কলার দোকানদার দোকান বন্ধ করে এলাকায় চলে গেছে নির্বাচনের কাজ করতে, ঘর তুলতে।
দোকানদার, মাছওয়ালা, সবজিওয়ালা-সবাই বলছে, ঢাকা আস্তে আস্তে শূন্য হতে চলছে। সবাই ঢাকা ছেড়ে ‘দেশে’ যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজন নির্বাচনে আছে। যদিও একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তবু প্রচারণা কিছু কম দেখা যায়নি। সরকারি দলের প্রচারণা বেশ ভালোই চলেছে। হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসা ভালো জমে উঠেছিল। সকাল বেলা নাশতা, দুপুরের খাবার দলীয় কর্মীরা যথারীতি পেয়েছে। কাগজ, কলম, কালি ইত্যাদির ব্যবসাও জমেছিল। গেঞ্জি ইত্যাদি পেয়েছে কর্মীরা। প্রার্থীর ছবিসহ গেঞ্জি কর্মীদের গায়ে দেখা গেছে। গ্রামে-গঞ্জে ‘ক্যাশ’ গেছে কর্মীদের খরচ মেটাতে। গ্রামের খাবারের ব্যবসা ভালো হয়েছে; কিন্তু ঢাকা শহরের ব্যবসায় মন্দা। সব ব্যবসায়ীর মুখেই এক কথা, এমনকি রিকশাওয়ালার ব্যবসাতেও মন্দা। শীত এর আরেকটা কারণ। মানুষ পারতপক্ষে ঘর থেকে বের হয় না।
আশা করা হচ্ছে, ভালোয় ভালোয় নির্বাচন হয়ে যাবে। ফলাফলও মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে অচিরেই আমরা নতুন একটি সরকার পাব। মানুষের মনে এখন প্রশ্ন, কেমন হবে সেই নতুন মন্ত্রিসভা? পুরোনো ব্যবসায়ী-শিল্পপতির প্রাধান্য বজায় রেখেই কি মন্ত্রিসভা হবে, নাকি নতুন মুখে ভরে উঠবে? কারা হবেন অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী? এসবেই আমার ঔৎসুক্য বেশি। কারণ তারাই চালাবেন অর্থনীতি। বিগত পাঁচ বছর অর্থবিষয়ক, বাণিজ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলো চলেছে অর্থনীতির উলটো দিকে। সুদনীতি, ডলারের স্থির মূল্য অর্থনীতিকে ফেলে দিয়েছে বিপদে। মূল্যস্ফীতি ছিল চরমে। নানা সংকটে নিমজ্জিত অর্থনীতি। এ প্রেক্ষাপটে নতুন মন্ত্রিসভা কি আমাদের আশার আলো দেখাবে? মন্ত্রীদের নাম শুনে মানুষ আশান্বিত হতে পারবে? একটা প্রশংসাযোগ্য, পরিচ্ছন্ন কেবিনেট কি আমরা পাব? এসব প্রশ্ন এখন জনমনে।
আমরা কেউ জানি না আগামী মন্ত্রিসভার সদস্য কে কে হবেন। তবে ২০২৪ সাল এবং পরবর্তী চার বছরের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে জানি। ক্ষমতাসীন দল বিগত ১৫ বছর যে স্টাইলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলে দেশে পরিবর্তন এনেছে, আগামী বছরগুলো আর এমন হবে না। নানা সংকট, অস্থিতিশীলতা, অস্থিরতা, যুদ্ধ, অশান্তি বিশ্বের দেশে দেশে। বিশ্ব এক নতুন আর্থিক কাঠামোর দ্বারপ্রান্তে। আমেরিকার একক নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। উদীয়মান শক্তি চীন, ভারত। রয়েছে রাশিয়া। এছাড়া আছে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ। সব দেশেই চলছে পরিবর্তন, বিবর্তন। চলছে ডলার সংকট, সাপ্লাই সংকট। বেকারত্ব আছে। উৎপাদন পরিস্থিতি ভালো নয়। এখন অবশ্য কিছুদিন ধরে দ্রব্যমূল্য কিছুটা স্বাভাবিক। তেলের মূল্যও স্থিতিশীল। বৈশ্বিক এ প্রেক্ষাপটে আমাদের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নতুন সরকার কীভাবে এসব সংকট মোকাবিলা করবে-এ নিয়ে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, অর্থনীতিবিদরা নানা পরামর্শ দিতে শুরু করেছেন। হয়তো আরও কিছুদিন দিতে থাকবেন। তবে আমার মনে হয় পরামর্শের আর বাকি নেই। আমাদের করণীয় কী, চ্যালেঞ্জগুলো কী, অবশ্যকর্তব্য কী-সেসব মোটামুটি এখন জানা। এসব নিয়ে বেশি কিছু আলোচনার নেই। যা লক্ষণীয় তা হচ্ছে, আগামী সরকারের হাতে সময় নেই বেশি। সাধারণত নতুন সরকার বছরখানেক একটা অবকাশ পায়। এবার তা হওয়ার নয়। কারণ কতগুলো সমস্যায় আমাদের হাত পুড়ে যাচ্ছে। এর সমাধান দরকার এখনই। যেমন মূল্যস্ফীতি। রয়েছে আরও সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ। এ মুহূর্তে চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার ঠিক রাখা, আমদানি সংকোচন, বড় বড় খরচ বন্ধকরণ, রাজস্ব বৃদ্ধি, বাজেটে কাটছাঁট, সুদ খরচ বৃদ্ধি না করা, বৈদেশিক ঋণে সাবধানতা, অর্থ পাচার, দুর্নীতি রোধ, সিন্ডিকেট দমন, বৈষম্য কমানো, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দৃঢ়করণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি ইত্যাদি। পাশাপাশি রয়েছে আরও অনেক ছোট ছোট কিন্তু অবশ্যকরণীয় কাজ।
প্রথম কাজটি অবশ্যই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, যার কথা দেখলাম ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ঘোষণাপত্রেও স্থান পেয়েছে। আশা করা হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বর-জানুয়ারির দিকে কিছুটা কমবে। কারণ তখন খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে। ধান-চালের দাম, শাক-সবজি, মাছের দাম কমবে। কিন্তু বছরের শুরুতেই দেখা যাচ্ছে, তা হচ্ছে না। প্রতিটি পণ্যের দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী। অতএব, কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তা এক বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে এটা চিন্তার বিষয় আরেক কারণে। পাকিস্তান বাদে এ অঞ্চলের সবার মূল্যস্ফীতির হার কম। আমরাই শুধু বেশি। এর কারণ কী? আমাদের হাতে রয়েছে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, বাণিজ্যিনীতি। কোনটাতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি? এক্ষেত্রে প্রথম চ্যালেঞ্জ মুদ্রানীতি। দেখা যাচ্ছে সবারই মত-সুদের হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। একইভাবে ডলারের মূল্যও বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এই হচ্ছে পণ্ডিতদের বক্তব্য। একই কথা ‘পরিত্রাণদাতা’ আইএমএফের। সরকার দেখা যাচ্ছে এতে রাজি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক চায় ধীরে ধীরে ডলারের দাম বাড়াতে, বাজারমুখী করতে। প্রশ্ন, ধীরে ধীরেই হোক, আর একেবারেই হোক, ডলারের দাম যদি বাড়ে, দ্রব্যমূল্য কমানো হবে কীভাবে? আমরা ‘চিনি, তেল’ সবই আমদানি করি। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে ডলারের দাম বাড়লে দ্রব্যমূল্য কমবে কীভাবে? আবার আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়লে দেশীয় পণ্য বসে থাকবে? এই হচ্ছে প্রথম চ্যালেঞ্জ। এর ওষুধ কী?
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ রাজস্বনীতি। আমাদের রাজস্ব বাড়াতে হবে, শুল্ক বাড়াতে হবে, ভ্যাট বাড়াতে হবে, সাপ্লিমেন্টরি শুল্ক বাড়াতে হবে, আয়কর বাড়াতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাও আবার আধা আধা মুদ্রানীতি। সুদহার কিছুটা বাজারের হাতে, কিছুটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘কারিগরির’ হাতে-এসব আধমরা মুদ্রানীতিতে কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে? তাহলে রাজস্বনীতি কী করবে? ট্যারিফ কমিয়ে, করহার কমিয়ে অনেক পণ্যের দাম কমানো যায়। এখন প্রশ্ন, সরকারের পক্ষে কি ট্যারিফ কমানো, করহার কমানো সম্ভব? এমনিতেই সরকারের রাজস্ব কম। রাজস্বের অভাবে বহু প্রয়োজনীয় খরচ সরকার করতে পারছে না। এর পরও কী করে সরকার করহার কমাবে? আরেকটা অস্ত্র আছে। আর সেটি হচ্ছে ‘ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার’ কমানো। এর অর্থ কী? সরকার কর ছাড়, কর অব্যাহতি, হ্রাসকৃত হারে কর ধার্য ইত্যাদি আকারে কোটি কোটি টাকা শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে সুবিধা দেয়। একে ‘কর ভর্তুকি’ও বলা যায়। এই নীতি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তবে কি এ খাত সংস্কার করে এর থেকে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব? বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ এর সঙ্গে জড়িত ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প। আরও পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়, এর সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাত রয়েছে শিল্প সংরক্ষণের প্রশ্ন। তবে তাও প্রশ্নবিদ্ধ। এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা হবে? পারবে কি সরকার রাজস্বনীতি সংস্কার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে?
হাতে রইল বাণিজ্যনীতি। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি নিয়ন্ত্রণ। সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মুদ্রানীতির মাধ্যমেই করছে। এখানে যে চ্যালেঞ্জ তা হচ্ছে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখা। পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, গুদামজাতকরণ/স্টক, বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিয়েছে। এর প্রধান শত্রু ‘সিন্ডিকেট’। নির্বাচনের আগে সরকারের বাণিজ্য, বস্ত্র, খাদ্য, শিল্প, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা আমাদের বারবার বলেছেন ‘সিন্ডিকেটের’ অত্যাচারের কথা। ‘সিন্ডিকেট’ সর্বনাশ করছে, কোটি কোটি টাকা লুট করছে তারা বাজার থেকে। এসব অভিযোগ মন্ত্রীদের ছিল। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে-এটাও তারা বলেছেন। মনে হয়েছে, সরকার ও মন্ত্রীরা তাদের কাছে অসহায়; যে কারণে কার্যত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হতে আমরা দেখিনি। তারা সরকারের ‘বন্ধু শক্তি’ হিসাবে টাকা কামিয়ে নিয়েছেন। ‘বাঙালির পুঁজি গঠন’ আর কী! এখন প্রশ্ন, নতুন সরকারের কাছে এই সিন্ডিকেট হবে বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাকে দমন করা কি সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে? নাকি আগের বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিই বহাল থাকবে? বাজারের অত্যাচার থেকে মানুষকে বাঁচাতে হলে খোলাবাজার নীতি-চাল, ডাল, তেল সস্তায় সারা বছর সরবরাহ করার ব্যবস্থা চালু রাখা হবে আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এক কোটি পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রতিদিন দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ছে হাজার হাজার লোক। রাজস্ব সংকটের মধ্যেই আবার বাড়াতে হবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এটাও বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারি দল নিজেই মূল্যস্ফীতিকে এক নম্বর চ্যালেঞ্জ বলে চিহ্নিত করেছে। তাই এ চ্যালেঞ্জের বিভিন্ন দিক তুলে ধরলাম। দেখা যাক নতুন সরকার তা কীভাবে মোকাবিলা করে।
ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
