Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ভালো করার সুযোগ আছে কি?

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ভালো করার সুযোগ আছে কি?

Advertisement

আমাদের অর্থনীতির অনেকটাই নির্ভরশীল ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্কেটের ওপর। ভারত ও চীনে আমাদের মালপত্র খুব একটা যায় না। রাশিয়াতেও খুব সামান্য পণ্য রপ্তানি হয়। বরং চায়না এবং ভারত থেকে পণ্য রপ্তানির চেয়ে আমদানি করতে হয় বেশি।

ভারতে আমাদের পণ্য রপ্তানি হয় মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার। অথচ ভারত আমাদের দেশে পণ্য বিক্রি করে ১৪ বিলিয়ন ডলার। ভারতের মতো চীনেও আমাদের পণ্য রপ্তানিতে বৈষম্য রয়েছে। চীন আমাদের থেকে পণ্য নেওয়ার চেয়ে রপ্তানি করে অনেক বেশি। এ বৈষম্য কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে আমাদের রিজার্ভের ওপর একটা টান পড়ছে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতির ওপর একটা বিপর্যয় নেমে আসার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাজার ধরতে হবে। অবশ্য ইদানীং কিছু পণ্য জাপানেও যাচ্ছে। তবে জাপানের বাজার আমরা কতটা ধরে রাখতে পারব, সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কেননা পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে জাপানও অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মেলাবে এবং এটাই স্বাভাবিক।

আরেকটি বিষয় নিয়েও আমাদের যথেষ্ট দুশ্চিন্তা রয়েছে, সেটা হচ্ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। গত এক বছর থেকে অন্যান্য পণ্যের মূল্যস্ফীতির চেয়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মানে ফুড আইটেমবেইজড পণ্যগুলোর দাম খুব দ্রুত বাড়ছে। যার ফলে নিুমধ্যবিত্ত এবং গরিব লোকদের খাদ্যপণ্য ক্রয়সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। নিুবিত্ত ও গরিব লোকদের খাদ্য তালিকা থেকে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যাচ্ছে।

যেটি দেশের জন্য কখনোই সুখকর হতে পারে না। দেশের ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি, যেটা সাড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশে রয়েছে, সেটাকে যদি সাড়ে ৭ বা ৮ শতাংশেও আনতে পারে, তাহলে সেটা হবে দেশের জন্য একটা বিরাট অর্জন। অবশ্য সেটা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কন্ট্রাকশনারি মানি উইথড্র করে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করছে। এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের রেট বাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছু কিনতে হলে বেশি দরে কিনতে হবে, যাতে করে টাকার প্রবাহ না বাড়ে।

টাকার প্রবাহ যদি কমে যায়, তাহলে বিনিয়োগও কমবে। সেই সঙ্গে ভোগও কমবে। তাহলে দেশের ইকোনমি মোটামুটি একটা স্লো-ডাউনের দিকে চলে যাবে। মন্দাক্রান্ত যদি না-ও হয়, সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার, যেটা দুই বছর আগে হয়েছিল, সেখান থেকে সেটা সাড়ে ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ চেষ্টাও সফল হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ, এটা নির্ভর করছে দেশের এফডিআই (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) এবং বিদেশি নিষেধাজ্ঞার ওপর।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, সেটা হচ্ছে অর্থ পাচার। বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে আমাদের ডলারের রেমিট্যান্স প্রবাহ কম হয়েছে এবং বিনিময় হারও বিপক্ষে চলে গেছে। আমাদের অর্থনীতির চাঙা ভাবকে ম্লান করে দেওয়ার বড় একটা কারণ হলো অর্থ পাচার। এটি বন্ধ না করতে পারলে আমরা বেশি দূর এগোতে পারব না। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এটি বন্ধ হবে না। ব্যাংক লুট, দুর্নীতি বা সহজ ব্যবসা থেকে সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে বিপুল পরিমাণ অর্থ কিছু লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

এসব লোকই তাদের হাতে থাকা কেন্দ্রীভূত এসব অর্থ বিদেশে পাচার করছে। অর্থাৎ অবৈধ পথে অর্জিত এসব অর্থ তাদের হাতে বা অ্যাকাউন্টে যখন যায়, তখন তারা সে অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে ইনফরমাল মার্কেট বা হুন্ডি মার্কেটের মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করে দেয়। এ ব্যাপারে তাদের সাহায্য করে পাচারকারী হুন্ডি প্রতিনিধিরা, যে কারণে আমাদের রেমিট্যান্স গ্রোথ যেখানে আরও ওপরে থাকার কথা, সেটি সেখানে না থেকে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে; যার ফলে দেশের রিজার্ভ থমকে আছে, এগোতে পারছে না।

তবে এ সবকিছুতেই আশার আলো দেখা যেত, যদি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতো; কিন্তু সেটি হয়নি। কারণ, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে সংজ্ঞা, সে সংজ্ঞার আওতায় এ নির্বাচন হয়নি। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলা যায় না। একটা গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের পাশাপাশি অন্যান্য দলের অংশগ্রহণ জরুরি। যেটি এ নির্বাচনে হয়নি। একটা গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানে হলো বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

সেটা এ নির্বাচনে অনুপস্থিত ছিল। বিশ্বের অন্যতম দুই শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে মন্তব্য করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের এক বিবৃতিতে জাতীয় নির্বাচনে প্রধান সব রাজনৈতিক দল অংশ না নেওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধী দলের হাজার হাজার সদস্যকে গ্রেফতার এবং নির্বাচনের দিন অনিয়মের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে তারা বলছেন, এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। সুতরাং, এ নির্বাচনকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচনই বলা যায়।

দেশে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন হলে বিদেশিদের পাঠানো এফডিআই (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) বাড়ত। ফলে দেশের অর্থনীতিতে একটা চাঙা ভাব আশা করা যেত। দেশে রাজনৈতিক বিভেদ ও অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসত। ফলে দেশে সামাজিক অস্থিরতার চিত্রও অনেকটা পালটে যেত। সামাজিক বিশৃঙ্খলা থাকত না, যার ফলে আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতিরও অনেকটা উন্নতি হতো।

একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দ্বারা যদি একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকত, তাহলে সরকারের ক্ষমতার বিভিন্ন ছত্রছায়ায় থেকে সুযোগ-সুবিধা নেওয়া লোকেরা, যারা আড়ালে থাকছে, জবাবদিহি হচ্ছে না, তাদের জবাবদিহি হয়ে যেত। এখন তো তাদের জবাবদিহি হবে না। কারণ তারা নিজেরাই তাদের অবৈধ গোপন আয়ের বিশাল অংশ নির্বাচনে ব্যয় করেছে, যা আইনত করা যায় না। শুধু তাই নয়, তাদের অনেকেই নির্বাচনের মাধ্যমে এমপিও বনে গেছেন। অনেকে আরও বড় দায়িত্বও পেয়ে গেছেন। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

অর্থনীতি

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম