Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্য দেশে দাম কমে, এদেশে বাড়ে কেন?

Advertisement

Icon

মো. সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অন্য দেশে দাম কমে, এদেশে বাড়ে কেন?

Advertisement

চলতি বাজার ব্যবস্থাপনায় ‘সিন্ডিকেট’ কথাটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। পণ্যের দাম বাড়াতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করার কৌশল হিসাবে সিন্ডিকেট কাজ করে থাকে। এটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কিংবা শ্রেণির মানুষ কর্তৃক পুরো জাতিকে জিম্মি করার প্রক্রিয়া। বিশেষভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অধিক লাভের প্রবণতা থেকেই সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া দেখা যায়, পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অধিক লাভের পাঁয়তারা করে থাকে। ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার এ প্রবণতায় সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্যবসায়ীরা মূলত জনগণকে টার্গেট করেই অধিক লাভের উদ্দেশ্যে সিন্ডিকেট করে থাকে। এ সিন্ডিকেট ব্যবস্থাপনার প্রভাব পড়ে সর্বত্র। বিশেষ করে মানুষের মধ্যে শৃঙ্খল ভাঙার প্রবণতা দেখা যায় এবং অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে অনেকেই। তাছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রবণতাও দেখা দেয়। এক্ষেত্রে অনেকেই আবার ইন্ধন জুগিয়ে সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব বৃদ্ধির চেষ্টাও করে থাকে। দেখেশুনে মনে হয়, ব্যবসায়ীরা সরকারকে নিজেদের বশীভূত করার লক্ষ্যেই বাজার ব্যবস্থাপনার সিন্ডিকেট করে থাকে। অথচ ব্যবসায়ীদের উচিত ছিল জনগণকে সেবা প্রদানের মানসে কাজ করা। অন্যান্য দেশে দেখা যায়, কোনো উৎসব বা আয়োজনকে কেন্দ্র করে জনগণের জন্য ব্যবসায়ীরা প্রণোদনার ঘোষণা দেন। কিন্তু আমাদের দেশে উৎসব কিংবা আয়োজনে পণ্য মজুত করে কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে উলটো জনগণকে জিম্মি করে রাখে ব্যবসায়ীরা। এতে এক ধরনের বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সাধারণ মানুষকে বিপাকে পড়তে হয়।

পবিত্র রমজান সামনে রেখে দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ পত্রিকার খবরে জানা যায়, ২০২৩ সালের রমজান ও ঈদ উৎসব সামনে রেখে বিশ্বের অনেক দেশে দাম কমানোর হিড়িক পড়েছিল। উৎসবে যেন সাধারণ মানুষের কষ্ট না হয়, সেজন্য বিশ্বব্যাপী রেকর্ড মূল্যস্ফীতির মাঝেও ইবাদত-বন্দেগির মাসটিতে মুসলমানদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়ীরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দশ হাজারের বেশি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ দাম কমিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। মূল্যছাড়ের সাইনবোর্ডে সয়লাব সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুপারশপগুলো। ক্রেতাদের কে কত বেশি মূল্যছাড় দিতে পারে, তা নিয়ে যেন রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশটির বড় বড় চেইনশপ। কাতারে চাল, ডাল, আটা, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ৯০০ পণ্যের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ঈদ পর্যন্ত এ সুবিধা ভোগ করেছেন ক্রেতারা। কাতারে শুধু দাম কমিয়েই ক্ষান্ত হয়নি কর্তৃপক্ষ। বাজার পর্যায়ে দাম ও পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতেও তৎপর থেকেছে প্রশাসন। ত্যাগ আর আত্মশুদ্ধির মাস ঘিরে মূল্যছাড়ের কার্যক্রম শুরু হয় সৌদির ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। সুপারশপ, শপিংমলগুলোতে পণ্যভেদে ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমানোর ঘোষণা আসে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে। এমনকি কর্মীদের কর্মঘণ্টার ওপরও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয় বিশেষ সুবিধা। ইবাদত-বন্দেগির মাসে এমন সুবিধা ভোগ করেন মালয়েশিয়া, কুয়েত, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশের মুসলমানরা। মূল্যছাড়ের হিড়িক পড়ে কুয়েত, ওমানসহ আরও অনেক দেশে। পশ্চিমা দেশগুলোও পিছিয়ে থাকেনি। সেসব দেশেও পড়ে পবিত্র রমজানের প্রভাব। রেকর্ড মূল্যস্ফীতির মধ্যেও যুক্তরাজ্যের সুপারশপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বিভিন্ন মাত্রার ছাড় দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডার ছোট-বড় সুপারশপ, বেকারি আর রেস্টুরেন্টও। চলতি বছরও বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়ীরা আগের বছরের ধারাবাহিকতায় সাধারণ মানুষকে স্বস্তি প্রদানের জন্য কাজ করবে, এটা নিশ্চিত।

শাবান মাস আসার পর থেকেই দেশে দেশে শুরু হয়েছে রমজানের প্রস্তুতি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়েই খাদ্যদ্রব্যের দাম চড়া। এর মধ্যেও রোজাদারদের অর্থকষ্ট লাঘবের মাধ্যমে সওয়াবের আশায় মূল্যছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছেন বিক্রেতারা। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার এমন নজির ব্যবসায়ীদের মধ্যে থাকা উচিত। আবার ব্যবসায়ীদের দুঃসময়ে ভোক্তারা পাশে দাঁড়ায়, এমন নজিরও আমরা দেখি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে জনগণের প্রতি আন্তরিকতার ঘাটতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আমরা আশা করি, এদেশের ব্যবসায়ীদের মাঝেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাটি তৈরি হোক।

বাংলাদেশে রমজান ও ঈদ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে কোনো সংকট নেই। কিন্তু কিছু অসাধু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বাড়তি মুনাফা পেতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রমজানে বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মনিটরিংয়ের ওপর জোর দিয়েছে। নিয়মিত নজরদারি করা সম্ভব হলে পণ্য ন্যায্য দামে সরবরাহ করতে বাধ্য হবে ব্যবসায়ীরা। যারা ইচ্ছা করে পণ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তাদের দ্রুততার সঙ্গে চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। এতে অবৈধ ও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীরা সঠিক পথে ব্যবসা করতে উদ্যোগী হবে।

সবশেষ কথা হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের উচিত হবে জনগণের খাদেম হিসাবে দায়িত্ব পালন করা এবং এ কাজটি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এলে দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে এবং ব্যবসায়ী ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন ও মিথস্ক্রিয়া পরিলক্ষিত হবে।

মো. সাখাওয়াত হোসেন : সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

Advertisement

বাজার

Advertisement

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম