Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশ : অনিন্দ্য অভ্যুদয়

Advertisement

Icon

মফিদুল হক

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ : অনিন্দ্য অভ্যুদয়

Advertisement

১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করে স্বাধীনতা, বাঙালির স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভূত হয় বাংলাদেশ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান, ভারতের মুসলমানদের এক জাতি হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের জন্য পৃথক আবাসভূমি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আদর্শ ছিল দ্বিজাতিতত্ত্ব, অর্থাৎ ভারতের মুসলমানরা ভারতীয় নয়, তারা নিজস্ব এক জাতি, হিন্দুদের থেকেও আলাদা এবং ভারতে হিন্দুরা এক জাতি ও মুসলমানরা আরেক জাতি, যদিও ভারতের হিন্দুরা তখন নিজেদের জাতি হিসাবে কল্পনা বা দাবি করেনি। তলিয়ে দেখলে ধর্মভিত্তিক এ জাতীয়তা ধোপে মোটেই টেকার নয়। ইসলাম পৃথিবীর এক প্রধান ধর্ম, এ ধর্মের মানুষ নানা দেশে নানা জাতীয়তায় বিস্তৃত, জাতি-পরিচয়ে বিভিন্নতা বিপুল, ভৌগোলিকভাবেও তেমনি, ভাষা-বর্ণ-গোত্র বিপুল ফারাক মেলে ধরে, ধর্মের ছায়াতলে তারা একত্র হয় সবার স্বকীয়তা ও বিশিষ্টতা বজায় রেখে। এখানেই ধর্মসত্তার মাহাত্ম্য, জাতিসত্তারও। সেক্ষেত্রে ধর্মের রাজনীতিকরণ তৈরি করে জটিলতা, সহজ সম্প্রীতিকে কঠোর বিভাজনে পরিণত করে, যা ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনে। মুসলিম জাতি হিসাবে কল্পিত জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জন্ম নিল নতুন এক রাষ্ট্র, যা সর্ব-নাগরিকের সম-অধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। দ্বিজাতিতত্ত্বের রাষ্ট্রের জনক হিসাবে অভিহিত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ বাস্তবতা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন, আর তাই নতুন রাষ্ট্রের সংবিধান পরিষদে উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেছিলেন যে, আজ থেকে এই রাষ্ট্রে কেউ মুসলমান বা হিন্দু বা খ্রিষ্টান থাকবে না, সবাই হয়ে উঠবে পাকিস্তানি। ধর্ম হবে যার যার, ঐক্যসূত্র হবে পাকিস্তানি পরিচয়। অর্থাৎ পাকিস্তানের নাগরিকের রাষ্ট্র পরিচয়ই মুখ্য, ধর্মপরিচয় রাষ্ট্রের কাছে গৌণ।

তবে পাকিস্তান তো সেই পথে এগোয়নি, দ্বিজাতিতত্ত্বের সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় ভৌগোলিকভাবে দুই পৃথক অংশ নিয়ে গড়া হলো একক রাষ্ট্র, হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অংশের মধ্যে ফারাক কেবল ভৌগোলিক ছিল না, ভাষা-জাতিসত্তা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, আচার-রীতি, পোশাক-আহার্য, উৎসব-পার্বণ সবই আলাদা। তার চেয়ে বড় কথা, পূর্ব-প্রদেশের এই বাঙালিরা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ দেশের রাজধানী পশ্চিমে, করাচিতে ক্ষমতার কেন্দ্র এবং সেখানে সরকারি সব সিদ্ধান্ত গ্রহণে পাঞ্জাবি ও ভারত থেকে আগত মোহাজেরদের প্রাধান্য। রাষ্ট্র যদি পরিচালিত হয় গণতান্ত্রিকভাবে, তবে বাঙালি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে, যদিও বাঙালিরা শুরু থেকেই অনেক ছাড় দিয়ে চলেছিল। কিন্তু পশ্চিমী শাসকগোষ্ঠী তাদের আধিপত্য পাকাপোক্ত করার আয়োজনেই লেগেছিল, খোদ জিন্নাহই হলেন এর উদ্গাতা, ধর্মের দোহাই দিয়ে বাঙালির ভাষার অধিকার অস্বীকার করা হলো, চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলো উর্দুকে, পাকিস্তান কার্যত পরিণত হলো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে-পূর্বের ওপর পশ্চিমি শাসন শোষণে।

এ অন্যায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র-কাঠামো ভেঙে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সহজ ছিল না, অন্যদিকে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্পও ছিল না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত দীর্ঘ অভিযাত্রা বাঙালির গর্বের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি এই অসাধ্য সাধন করেছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের সাম্প্রদায়িক ঔপনিবেশিক ধর্মভিত্তিক সামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসন-শোষণের নিগড় ভেঙে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয়।

পাকিস্তানি রাষ্ট্রসত্তা এবং এর ঔপনিবেশিক চরিত্র ছিন্নভিন্ন করে আবির্ভূত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, বরং জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি প্রকাশ করে। পাকিস্তান একদিকে ছিল জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র, অন্যদিকে বাস্তব বিচারে এই রাষ্ট্র রূপ নিয়েছিল কলোনিয়াল স্টেটের। পাকিস্তানের এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের কোনো বিধি-বিধান ছিল না, কিন্তু নিপীড়িত জাতির মুক্তির অধিকার এবং পদানত জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ লাভের বিষয়টি জাতিসংঘের আওতায় ১৯৭০ সালে অর্জন করেছিল অনুমোদন। সেই জটিল আন্তর্জাতিক বিন্যাসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সম্ভব করে তুলেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব। এক্ষেত্রে ১৯৭০ সালের নির্বাচন, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পক্ষে চূড়ান্ত রায় জনগণের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষার যে প্রকাশ ঘটিয়েছিল তা বাংলাদেশ সংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রাধিকারের কাতারভুক্ত হওয়ার পথ খুলে দিয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের এ সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, উপলব্ধি ও দূরদর্শিতা দ্বারা। এখানেই আমরা দেখি আন্তর্জাতিক পটভূমিকায় তার নেতৃত্বের তাৎপর্য। তিনি আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঘটালেন দিক-পরিবর্তন। ঔপনিবেশবাদের জের ঘুচিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর উদ্ভব যেসব জটিলতা আক্রান্ত ছিল সেই অসংগতি দূর করতে মানচিত্র নতুনভাবে আঁকার প্রয়োজন ছিল। সর্বক্ষেত্রে তা বাস্তবসম্মত না হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছিল একান্ত জরুরি। বাংলাদেশ ছিল এমন এক ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি, যা মোচন করল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব। এই প্রথম বিশ্ব সমাজ উপলব্ধি করল কোনো রাষ্ট্রভুক্ত জনগণের জাতীয় আত্ম-নিয়ন্ত্রাধিকারের সংগ্রামকে ঢালাওভাবে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ আখ্যা দেওয়া যায় না। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান ও আইনের আলোকে বাস্তবতার নিবিড় বিশ্লেষণ ও সেই মতো নীতিনির্ধারণ। তাই আমরা দেখি আশির দশকের পর, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন-পরবর্তীকালে বিশ্ব মানচিত্রে অনেক স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়, যা বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসাবে আখ্যায়িত হয়নি, বরং জাতির আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। এ পরিবর্তনের উদ্গাতা বাংলাদেশ, তবে বিপুল রক্তদানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আদায় করতে হয়েছে তার স্বাধীনতার স্বীকৃতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের তাৎপর্য সম্পর্কে ফরাসি মুক্তি-সংগ্রামী, লেখক-বুদ্ধিজীবী, স্পেনের প্রজাতান্ত্রিক সংগ্রামের যোদ্ধা, ফ্রান্সের সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আন্দ্রে ম্যালরের উক্তি দিয়ে আলোচনার সমাপ্তি টানা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের ঘোষণা প্রদান করে হই চই ফেলে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর আন্দ্রে ম্যালর বাংলাদেশে এসেছিলেন; ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ঘুরে পরে সাক্ষাৎ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে।

আন্দ্রে ম্যালর খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক, তার বক্তব্যে মেলে ইঙ্গিতময়তা; সেই ইঙ্গিতের বিচার নির্ভর করে পাঠকের ওপর। তিনি দ্য গল ও মুজিব সম্পর্কে বলেছিলেন যে, উভয়ে রূপান্তরিত হয়েছেন মিথে। তারপর বলেন, কল্পকথা তো মিলিয়ে যায় কিন্তু বেঁচে থাকে মিথ। তিনি বলেন, এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে ত্রিপিটকের এক কাহিনি। একদিন গৌতম বুদ্ধ শিষ্যদের নিয়ে পরিভ্রমণে বের হয়েছেন। আকাশে তখন এক দল সারস উড়ে চলেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। হঠাৎ সারস দল দিক পরিবর্তন করে উড়তে শুরু করল দক্ষিণ থেকে উত্তরে। শিষ্যরা তাকিয়ে দেখেন, গৌতম বুদ্ধের সর্বশরীর জ্বলজ্বল করছে, অর্থাৎ তিনি মোক্ষলাভ করেছেন।

পৌরাণিককালে সারসের দলের গতি পরিবর্তনের মতো বিশ শতকে ইতিহাসের গতিধারা পালটে দেওয়ার মুহূর্ত ছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়-কাল। সেই ঐতিহাসিক ক্ষণে জ্বলজ্বল করে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ।

মফিদুল হক : লেখক, প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

Advertisement

স্বাধীনতা

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

বিচারক নিয়োগে বাছাই : মেধা যাচাইয়ের যথার্থতাও জরুরি

দৃষ্টিপাত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম