Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

অর্থ-সম্পদের এত ছড়াছড়ি!

Advertisement

Icon

এ কে এম শাহনাওয়াজ

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থ-সম্পদের এত ছড়াছড়ি!

Advertisement

ছোটবেলায় গল্প শুনেছিলাম লোকমান হেকিমের। বিদেশ থেকে এ সুবিখ্যাত হেকিম এসেছিলেন পূর্ব বাংলায়। এখানে পা দিয়েই ঠায় দাঁড়িয়ে পড়লেন হেকিম সাহেব। বললেন, আমি পা ফেলব কোথায়! এ দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে ঔষধি গাছ। এমন সোনাফলা মাটি কোথাও দেখেননি।

একজন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আমি প্রায়ই বলি, বাংলার ইতিহাস পুরোটাই নতুন করে লিখতে হবে। দীর্ঘকাল এ দেশে প্রত্নতত্ত্ব চর্চা না হওয়ায় এবং প্রাচীন ও মধ্যযুগে সমকালীন ইতিহাস গ্রন্থ লিখিত না হওয়ায় দুর্বল সূত্রের ওপর ভিত্তি করে বাংলার ইতিহাস লিখতে হয়েছে। তাই রাজনৈতিক ইতিহাসের গণ্ডিতেই আটকে ছিলাম আমরা।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস অধরা থেকে গেছে অনেককাল। এখন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উৎখননের মধ্য দিয়ে যেসব তথ্য আসছে তাতে বোঝা যায়, ইতিহাস নতুনভাবেই উপস্থাপিত হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এখন প্রত্নতাত্ত্বিকের দৃষ্টিতে মাঠে নেমেই লোকমান হেকিমের মতো আমরাও ভাবছি এ দেশের পরতে পরতে রয়েছে সোনালি অতীত। শুধু উন্মোচনের অপেক্ষায়।

অনেকদিন ধরেই আমাদের দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা চাউর হয়ে আছে। বছরখানেক আগের কথা। আমার এক আত্মীয়র মেয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম। বর কী করেন প্রশ্ন করতেই পাশে দাঁড়ানো এক যুবক বললেন তিনি এলাকার যুবনেতা।

সঙ্গে সঙ্গে আমার আত্মীয়টি কেমন বিব্রত হয়ে পড়লেন। তাড়াতাড়ি বললেন, তেমন না, রাজনীতির সঙ্গে সামান্য যোগাযোগ রয়েছে। আসলে জামাইবাবাজি ঠিকাদারি ব্যবসা করে। আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো আছে। আমার মনে হল রাজনীতি করা বিষয়টি যেন লজ্জার। তাই মেয়ের বাবা ঢাকতে চাইলেন।

পাশাপাশি বছর পাঁচেক আগের স্মৃতি মনে পড়ল। আমার এক আত্মীয় উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা অর্থাৎ বড় আমলা। অবসরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। রাজনীতির সঙ্গে এই পরিবার যুক্ত আছে। তিনিও গুছিয়ে নিচ্ছেন। অবসরে নির্বাচন করার সুপ্ত ইচ্ছে আছে তার।

মাশআল্লাহ অবসরের আগেই প্রচুর অর্থবিত্ত করেছেন। তার বড় মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। গর্ব করে বলছেন অমুক জেলার অমুক দলের বড় নেতা তার হবু বেয়াই। আসলে শ্রেণি অবস্থান থেকে প্রত্যেকের মানসিকতা তৈরি হয়।

সমাজ জীবনে এসব দেখে দেখে এখন সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত। প্রতিদিনের জীবনে মানুষ দেখে প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের তুষ্ট না করে কোনো কাজ সম্পাদন সম্ভব হয় না। এদের মধ্যে যে শুদ্ধ ধারার মানুষ নেই তেমন নয়।

কিন্তু সংখ্যা বিচারে তারা এত কম, সমাজ জীবনে এর বড় প্রভাব পড়ে না। আবার মানুষের নজর এড়ায় না যে, প্রশাসনের বড় দুর্নীতিবাজরা আজদাহা হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক প্রশ্রয়েই। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সখ্য থাকে বড় বড় ব্যবসায়ী আর আমলাদের। ত্রিমুখী যোগসাজশে সম্পদের পাহাড় গড়েন একেকজন।

নামে-বেনামে বড় বড় ঋণ মঞ্জুর করিয়ে নেন। ঋণখেলাপি হয়ে ব্যাংকের বারোটা বাজান। বড় নেতাদের প্রশ্রয়ে এলাকার ছোট নেতারা বুক ফুলিয়ে মাস্তানি করে। চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির একচ্ছত্র নবাব হয়ে পড়ে। অস্ত্র উঁচিয়ে সন্ত্রাস করে। এখন তো উন্মোচিতই জুয়া। মাদকসহ হেন অপকীর্তি নেই, যা রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া হয় না।

ভালো লাগল টিভিতে দেখলাম যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অন্যায়কারী যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও দৃঢ়তাই প্রকাশ পেয়েছে।

এর পরদিন সম্ভবত পুরান ঢাকায় র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করে। দুই আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির সিন্দুক ভেঙে পাঁচ কোটি টাকা এবং প্রচুর স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে।

সেই বিভিন্ন ক্লাব ক্যাসিনোতে শতকোটি টাকা উদ্ধার থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার টাকা উদ্ধারের পর মনে হতেই পারে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে, অল্প কয়েকটি জায়গায়, ছোট ও মাঝারি রাজনৈতিক নেতা নামধারী সন্ত্রাসীদের অধিকারে থাকা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাওয়া ধারণা করতে সাহায্য করে অভিন্ন সংস্কৃতির কারণে দেশজুড়ে রাজনীতির তকমাধারী হাজার হাজার ছোট-বড় মাঝারি নেতা-সন্ত্রাসীদের দখলে না জানি কত হাজার কোটি টাকা ছড়িয়ে আছে!

বাংলাদেশ আজ যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, এই অবৈধ অর্থচর্চা না থাকলে আমরা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের চিত্র তৈরি করতে কতটা নির্ভার থাকতাম।

শুধু সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান নয়- সামাজিক ন্যায়বিচার না থাকলে এবং বৈষম্য কমাতে না পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বর্তমান অভিযান পরিচালনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ফিরেছে ঠিকই, আবার এই গুঞ্জনও চলছে, বলির পাঁঠা হল কি এসব সন্ত্রাসী?

এদের গডফাদাররা শেষ পর্যন্ত অধরা থেকেই যাবে। আবার সরকারের যে কোনো ভালো দেখতে পায় না তেমন বিএনপি নেতা-মানসিকতার মানুষ এর মধ্যে সরকারের আইওয়াশ দেখতে পাবে। তবে আমরা মনে করি, সরকার যদি নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকতে পারে এবং নিরপেক্ষভাবে শুদ্ধি অভিযান চালাতে পারে তাহলে জনগণকে অবশ্যই পাশে পাবে।

তবে সামাজিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যেমন ইংল্যান্ডের কয়েকটি অঞ্চলের স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নানা অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে কথা হল। জানলাম ওরা বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধায় শিক্ষকদের এগিয়ে রাখে। আমরা যাদের আমলা বলি তেমন সরকারি কর্মকর্তারা একটু পেছনের সারিতে থাকেন।

বেতন এবং ট্যাক্স কর্তনের পর এসব দেশে কর্মকর্তাদের সেভিংস বলতে তেমন কিছু থাকে না। অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষ জানে আমলাদের অনেককেই রাজনীতির হাতিয়ার মনে করেন ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা।

নির্বাচন ঘনিয়ে এলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের কথা বিবেচনায় না রেখেই এ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগকারী আমলাদের সুযোগ-সুবিধা জ্যামিতিক হারে বাড়াতে থাকে সরকার।

অন্য পেশার অনেকে সম্মানে আর বেতন কাঠামোয় অনেক এগিয়ে থাকলেও সরকার প্রদত্ত নানা সুযোগ-সুবিধার বিচারে বিশাল বৈষম্যের শিকার হন। এসব নীতি সামাজিক ভারসাম্য দুর্বল করে দেয়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে ক্ষমতার ব্যবহার সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাস ও দুর্নীতির প্রশ্রয় ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা বিএনপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ সবাই দিয়েছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন শাসন ক্ষমতায় থাকায় এবং চ্যালেঞ্জ রাখার মতো কোনো সবল বিরোধী দল না থাকায় লোভী নেতাকর্মীরা অনেক প্রবল হয়েছে।

তাই এদের শুদ্ধ করতে সুপথে ফিরিয়ে আনতে দলের সৎ নেতাদের ভূমিকা রাখা সহজ নয়। আর যেহেতু স্বাধীনভাবে বা স্তর বিন্যস্ত করে ক্ষমতা প্রয়োগের তেমন কোনো ধাপ তৈরি হয়নি, তাই সব সিদ্ধান্তের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়।

এ কারণে যত তাড়াতাড়ি অন্যায়ের প্রতিরোধ করা কাম্য, তত শিগগির হয় না। তবুও ভালো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ অনুধাবন করতে পারেন এবং প্রয়োজনে শক্ত ভূমিকা রাখতে জানেন। এবার জুয়া-সূত্রে যে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মহাভারতের সন্ধান পাওয়া গেছে তা সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের কারণে।

কিন্তু শঙ্কা হচ্ছে, দেশে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস রন্ধ্রে রন্ধ্রে, একে কলুষমুক্ত করা একজন প্রধানমন্ত্রী এবং তার কয়েকজন শুদ্ধ মনের সহযোগীর পক্ষে অনেকটাই কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। তাদের পাশে থাকা প্রয়োজন সৎ মানসিকতার এবং দেশপ্রেমিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।

কারণ আমরা জানলাম রাজধানীর বুকে একাধিক ক্লাবে কোনো বাধা ছাড়াই নানা ঘাটে বখরা দিয়ে এবং রাজনৈতিক পরিচয় ও শক্তি কাজে লাগিয়ে এতদিন কোটি কোটি টাকার ক্যাসিনো ব্যবসা চালাতে পেরেছে সন্ত্রাসীরা। বিস্ময়ের সঙ্গে জানলাম এ চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ নগরবাসীর পিলা চমকে দিয়ে মোটরসাইকেল বহর নিয়ে অতি ভিআইপির বেশে সাইরেন বাজিয়ে চলাফেরা করত। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি।

এদের রাজনৈতিক গুরুরাও সংযত করেনি। অর্থাৎ হাজার অন্যায় করেও প্রকাশ্যে সিনাটান করে চলার সার্টিফিকেট তারা পেয়ে গিয়েছিল। এসব বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না গ্রেফতার হওয়া আর হুলিয়া পাওয়া সন্ত্রাসী নেতাদের শাস্তির আওতায় আনলেই সব শুদ্ধ হয়ে যাবে। যারা এ সন্ত্রাসীদের নির্মাণ করেন তাদের সংযত না করলে আবার এই বিষাক্ত বীজ থেকে দূষিত চারার অঙ্কুরোদগম হবে।

এ তো গেল জুয়ার আড্ডা বন্ধ করতে গিয়ে কেউটে বেরিয়ে আসার কাহিনী। রাজনৈতিক শক্তি কাজে লাগিয়ে দেশজুড়ে আরও নানা রকম অন্যায়ভাবে অর্থ-সম্পদ গ্রাস করার বাহিনীর অভাব নেই।

আমার তো শঙ্কা হয় এসব শুদ্ধ করতে গিয়ে হয়তো কম্বল উজাড় হতে পারে। এমন ঝুঁকি সৎ সরকারপ্রধান নিতে পারলেও চলমান চরিত্রের রাজনীতি নিতে পারবে কি না এটি একটি বড় প্রশ্ন হতে পারে।

কিন্তু এ সত্যটি মানতে হবে, নিজ দলের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান আমাদের দেশের জন্য একটি অভিনব, সাহসী এবং অভিনন্দনযোগ্য কাজ। এতে সাধারণ মানুষের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি প্রত্যাশার জায়গাটি অনেক বেড়ে গেছে।

সবাই গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সরকার হঠাৎ এখান থেকে যদি ফিরে আসে তবে আহত হবে কোটি কোটি মানুষ। বিশ্বাসের জায়গাটি নষ্ট হয়ে যাবে।

বিরোধী দলের গৎবাঁধা বক্তব্যের মতো তারাও বলবে এসব রাজনৈতিক আইওয়াশ। কোনো কোনো সন্ত্রাসী-রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে হিসেবের বনিবনা হয়নি বলে তাদের ওপর খড়গহস্ত হয়েছে। দুদিন পর আবার সে তিমিরেই হারিয়ে যাবে।

আমরা এমন নেতিবাচক ভাবনায় থাকতে চাই না। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার শুদ্ধমনের সহযোগীদের ওপর আস্থা রাখতে চাই। বিশেষ জোয়ারে সব ভাসিয়ে নেয়া সহজ; কিন্তু ভাটা লেগে গেলে আবার তেমন জোয়ার জাগানো কঠিন।

দেশবাসী এ জোয়ারের সুফল পেতে চায়। অবৈধ-অন্যায়কারীদের হাতে সারা দেশে যে অর্থ-সম্পদ ছড়িয়ে আছে তা দেশকল্যাণে ব্যবহৃত হবে এবং একটি সুস্থ ধারা ফিরে আসবে। দেশবাসীর এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই।

এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Advertisement

এ কে এম শাহনাওয়াজ টাকা সম্পদ ক্যাসিনো

Advertisement

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকার সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম