ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ
Advertisement
মোহাম্মদ হাসান শরীফ
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশাল ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গণতন্ত্র। আর এ কারণেই দেশটি ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারত নিজেকে নির্বাচনি বৈধতা, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার একটি অনন্য উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেছে। প্রতিবেশী অনেক দেশে যখন সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেছে, তখন ভারত তার গণতান্ত্রিক কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এত ভাষা, এত জাতিগত বৈচিত্র্য, এত ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যেও দেশটি টিকে আছে মূলত একটি মৌলিক বিশ্বাসের ওপর, আর তা হলো নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ শেষ পর্যন্ত নিজেদের শাসক নির্বাচন করতে পারবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে নয়, বরং পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আর এ প্রেক্ষাপটেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) উত্থান। বর্তমানে আন্দোলনটি তার দ্বিতীয় ধাপে বা ‘সিজন ২’-এ প্রবেশ করেছে। বিশ্বজুড়ে জেন-জির যে উত্থান ঘটেছে, ভারতে তার প্রতিফলন ঘটেছে এদের মাধ্যমে। এবার তাদের দাবি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও অপসারণ। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিরোধী দলের কোটি কোটি ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ব্যাপক গ্রেফতার, নির্যাতন, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা, রাজধানী দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করেও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না প্রশাসন।
ভারতের উগ্রবাদীরা দেশটির অনেক স্তম্ভের ওপর হামলা চালাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করা, বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পবিত্রতা নস্যাৎ করার মতো কাজগুলো করা হয়েছে অবলীলায়। এবার ভারতের গণতন্ত্রের ভিত্তি ভোটাধিকারের ওপর হাত দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধেই সোচ্চার হয়ে ওঠেছে তরুণরা।
রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাসহ রাজনীতিকদের আটক পরিস্থিতিতে নমনীয় করার বদলে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিরোধী দলগুলো একে সরকারের দমনমূলক আচরণের অংশ হিসাবে দেখছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। সরকার পতনের ডাক দেওয়ার কথাও উঠেছে। অর্থাৎ সিইসি যদি পদত্যাগ না করেন, তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবি উঠবে। রাহুল গান্ধী ইতোমধ্যেই মোদি সরকারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন : ‘জ্ঞানেশ কুমারকে বিদায় নিতে হবে। এ সরকারকেও বিদায় নিতে হবে। এরপরই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হবে।’
এমন জোরালো দাবি কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। অভিযোগ ভয়াবহ। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতভেদ নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি (কোনো কোনো হিসাবে ১৩ কোটি) মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে, নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে গুরুতর আপত্তি ছিল। ভোটার তালিকা, নিবন্ধন, নাম বাদ দেওয়া এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে অসন্তোষের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। আর এর ফলে যা হয়েছে, তা হলো নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর জনআস্থার প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, দিল্লি কিংবা বিহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর নির্বাচন নিয়েও ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, যদি জনগণ নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তাহলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের একটি প্রশাসনিক পদ্ধতি নয়। নির্বাচন হচ্ছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি। পরাজিত পক্ষ নির্বাচনের ফল মেনে নেয় এ বিশ্বাসে যে, প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু ছিল। বিজয়ী পক্ষ সরকার গঠন করে এই বিশ্বাসে যে, জনগণ সত্যিকার অর্থেই তাকে সেই দায়িত্ব দিয়েছে। আর জনগণ নির্বাচনে অংশ নেয় এই বিশ্বাসে যে, তাদের ভোটের মূল্য রয়েছে। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক স্যামুয়েল হান্টিংটন লিখেছিলেন, গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচনের ফলাফলে নয়, বরং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থার মধ্যেই নিহিত থাকে।
এ আস্থা যখন দুর্বল হতে শুরু করে, তখন সংকটটি কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন রাষ্ট্রের বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
এ কারণেই নির্বাচন কমিশন, আদালত, পার্লামেন্ট কিংবা গণমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতন্ত্রের ‘বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়। এদের ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে গেলে সংবিধান কাগজে থাকলেও গণতন্ত্র কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা একবার বলেছিলেন, যে সমাজে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস কমে যায়, সেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ দ্রুত বাড়ে এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। গণতন্ত্রে একটি ভোটও মূল্যবান। সেখানে কোটি কোটি ভোটারের নাম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিকভাবেই ভয়াবহ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের ভেতর থেকেই কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ মতভেদ প্রকাশ্যে চলে এলে জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ জন্মায়।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বহুবার বলেছেন, গণতন্ত্র শুধু ভোটের বিষয় নয়; এটি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং জনসম্পৃক্ততার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই পুরো প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু যখন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের আগে ব্যাপক গ্রেফতার, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ সীমাবদ্ধকরণ বা নিরাপত্তার অজুহাতে জনসমাগমে বাধা দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে। সরকারের অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী মতের উপস্থিতি কখনোই রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়। বরং সেটিই সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ।
জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস বলেছেন, গণতন্ত্রের শক্তি বন্দুকের নল থেকে আসে না; আসে উন্মুক্ত বিতর্ক ও জনপরিসরের স্বাধীনতা থেকে।
ভারতের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখানেই। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বদলে যদি প্রশ্ন তোলার অধিকারই সংকুচিত হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে সন্দেহ আরও বাড়বে।
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আস্থার সংকট প্রায়ই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। চলমান এ আন্দোলনকে বিশ্লেষকরা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ দেখছেন না; বরং একে মোদি সরকারের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ বা ‘জ্ঞানেশগেট’ হিসাবে অভিহিত করছেন। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। ঠিক তেমনি ভারতের বিরোধীদের মতে, ‘জ্ঞানেশগেট’ ঘটনায় যদি সিইসি প্রধান অভিযুক্ত হন, তবে এর পেছনের অনুঘটক ও প্রধান মদদদাতা হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ফলাফল ছিল প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগ। আর ‘জ্ঞানেশগেট’ ঘটনা সেই দিকে যেতে পারে বলেই অনেকের শঙ্কা। বিরোধীরা ইতোমধ্যে ‘জ্ঞানেশগেট’ শব্দটি ব্যবহার শুরু করেছে। তারা এটিকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করতে চায়। সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা সময় বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বিতর্ক দীর্ঘায়িত হলে তা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে।
লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। আফ্রিকার কেনিয়া ২০০৭ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে বিরোধের কারণে হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। নেপাল দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল। শ্রীলংকায়ও রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও দেখা গেছে, নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট সমাজকে কীভাবে বিভক্ত করে ফেলতে পারে। গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন জনগণের বড় অংশ মনে করতে শুরু করে যে, নির্বাচনের ফল আগেই নির্ধারিত।
এ বিতর্ককে কেবল বিরোধী রাজনীতির কৌশল হিসাবে দেখলে ভুল হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতা শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই আঘাত হানে। কারণ যে সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সরকারের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ কারণেই গণতান্ত্রিক সরকারগুলো সাধারণত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে।
ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আস্থা পুনর্গঠন। আর সেটার জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তার অবিলম্বে পদত্যাগ বা অপসারণ নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগ (যেমন ভারতের প্রধান বিচারপতি), বিরোধীদলীয় নেতা এবং নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী কমিটির পূর্ণ কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে সরকারি অনুগতদের বসানোর সুযোগ বন্ধ হয়।
আর ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ পুনঃপরীক্ষার জন্য একটি স্বাধীন অডিট টিম গঠন করা যেতে পারে। ভোটার তালিকার যে কোনো পরিবর্তন বা ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিদের যুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ করা যেতে পারে। ভোটার তালিকা সম্পর্কিত সব তথ্য জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা দরকার। যেসব সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলে অনেক প্রশ্নের সুরাহা হতে পারে। প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত বা বিচারিক পর্যালোচনার পথ খুলে দেওয়ার উদ্যোগও নিতে হবে।
গণতন্ত্রে নির্বাচন কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান। নাগরিক যখন ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন, তখন তিনি শুধু একটি ব্যালটে সিল মারেন না; তিনি রাষ্ট্রের প্রতি নিজের আস্থাও প্রকাশ করেন। সেই আস্থা যদি ভেঙে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ ভারতের সামনে সেই চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের বৃহত্তর স্বার্থেই নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছতা বাড়ানো উচিত, সরকারকে জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার, আদালতকে প্রয়োজন হলে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত এবং বিরোধী দলগুলোকে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আর জেন-জি তো আছেই। তারাই এখন অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সোচ্চার হচ্ছে।
গণতন্ত্র কোনো স্থায়ী সৌধ নয় যে, একে পরিচর্যা না করলেও এটি চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকবে। এটি নির্ভর করে নাগরিকদের বিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সততার ওপর। ভারতের জেন-জি সেটাই চাচ্ছে। নির্বাচন কিংবা গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাটি যাতে কোনোভাবেই শেষ হয়ে না যায়। সেই আস্থা নষ্ট হলে কেবল ভারতেরই নয়, পুরো দুনিয়ারই ক্ষতি হবে।
ভারতের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই-নির্বাচন নিয়ে ছেলেখেলা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা একবার ভেঙে গেলে সেটি পুনর্গঠন করতে বছরের পর বছর লেগে যায়; আর সেই ক্ষতি শুধু কোনো সরকার বা দলের নয়, পুরো জাতির। গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে টিকে থাকে না; টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাস রক্ষা করাই আজ ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ। তরুণরা সেই চ্যালেঞ্জই গ্রহণ করেছেন। এই লড়াইয়ের ফলই ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে।
মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক
