ইলিশের সংকট : উৎপাদন ফেরাতে চাই কার্যকর উদ্যোগ
Advertisement
ড. মাসুদ রানা
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মৎস্যজীবীদের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এই মাছ। নদী ও সমুদ্র-দুই পরিবেশে বিচরণকারী ইলিশ বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ দশমিক ২৯ লাখ টন, যার আনুমানিক মূল্য ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ টন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫.৫ শতাংশ কম, কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়ার পর সর্বশেষ হিসাবে তা কমে যাওয়ায় ইলিশসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্য হ্রাস, পানি দূষণ, পানি প্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ সব মিলিয়েই ইলিশসম্পদের ওপর চাপ তৈরি করছে। সমুদ্রে ট্রলিংও ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের ওপর অতিরিক্ত আহরণচাপ তৈরি করতে পারে। সরকারি নথিতে শিল্প ট্রলারের জন্য ৪০ মিটার গভীরতার বাইরে মাছ ধরার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নির্ধারিত গভীরতা অঞ্চলের ভেতরে ট্রলিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল বা অনুপযুক্ত জাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে একসঙ্গে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের মাছ ধরা পড়তে পারে। এতে ইলিশের ছোট বয়সের মাছসহ অন্যান্য মাছও প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই আহরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মা ইলিশ রক্ষায় কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। একটি প্রজননক্ষম মা ইলিশ নদীতে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে তার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক ইলিশ জন্ম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করলেই হবে না; নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় টহল, নৌযান পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। মা ইলিশ রক্ষায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলে সম্প্রদায়, বাজার কমিটি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
নদীতে অভিযান, বাজারে নজরদারি
ইলিশের জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পন্ন হয় নদী ও মোহনা অঞ্চলে। তাই শুধু মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; প্রজননক্ষেত্রের সামগ্রিক পরিবেশও রক্ষা করতে হবে। নদীতে পানি দূষণ, বর্জ্য ফেলা, নাব্য হ্রাস এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রজননক্ষেত্রগুলোকে নিয়মিত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কোথায় ইলিশ বেশি ডিম ছাড়ছে, কোন সময় বেশি আসে এবং কোন পরিবেশগত পরিবর্তন তার প্রজননে প্রভাব ফেলছে এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা উচিত। প্রজননক্ষেত্র রক্ষায় মৎস্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি পরিবেশ, পানি, নৌপরিবহণ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
অভয়াশ্রমে শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকারিতাও দেখতে হবে
ইলিশ সংরক্ষণে অভয়াশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শুধু অভয়াশ্রম ঘোষণা করলেই হবে না। এসব এলাকায় নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ, নিয়মিত টহল এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অভয়াশ্রমের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করে প্রয়োজন হলে এর সীমানা বা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
ইলিশের চলাচলের পথ সচল রাখা জরুরি
ইলিশ নদী ও সমুদ্রের মধ্যে চলাচল করে। ফলে ইলিশের জীবনচক্রের জন্য নদী ও সমুদ্রের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর নাব্য কমে গেলে, পানি প্রবাহ পরিবর্তিত হলে কিংবা নদীর স্বাভাবিক গতিপথে মানবসৃষ্ট বাধা তৈরি হলে ইলিশের চলাচল ব্যাহত হতে পারে। মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশবিষয়ক তথ্যেও অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভার্ট ও ব্রিজ, পলি জমা, নাব্য হ্রাস এবং পানি প্রবাহের পরিবর্তনকে ইলিশের পরিভ্রমণপথ, প্রজননক্ষেত্র ও বিচরণক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ মাইগ্রেটরি রুটগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর ওপর নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রচলিত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। স্যাটেলাইট ও জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের বিচরণ, প্রজনন ও নার্সারি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা, এআই ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, নদীর প্রবাহ, ক্লোরোফিল ও অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইলিশের গতিবিধি ও সম্ভাব্য সমাগমের পূর্বাভাস দেওয়া, নদী ও মোহনায় IoT সেন্সরের মাধ্যমে পানির গুণাগুণ রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ, eDNA ও hydroacoustic প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের উপস্থিতি ও মজুত নির্ণয় এবং ড্রোন ও AI-ভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি GPS-ভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় স্মার্ট ফিশিং গিয়ার, ডিজিটাল ক্যাচ ডেটাবেজ এবং জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করা হলে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। এসব প্রযুক্তিকে সমন্বিত করে একটি ‘Smart Hilsa Management System’ গড়ে তুলতে পারলে ইলিশের প্রাকৃতিক মজুত সংরক্ষণ, অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
ইলিশে গুজরাট অভিজ্ঞতা ও কৌশল প্রয়োগের সম্ভাবনা
ভারতের গুজরাট রাজ্যের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভরুচ অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে, যা বাংলাদেশের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। গুজরাটে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ১৪,১৯৮.৯৮ টন, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ৮,২০৯.৪৮ টনে দাঁড়ায়। পরবর্তী দুই বছরে উৎপাদন আবার বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮,৫৩৫.৭৫ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪,৫৮৭.৭২ টনে পৌঁছায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভরুচ জেলায় ৭,৪১০.০৯ টন ইলিশ আহরিত হয়, যা গুজরাটের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫১ শতাংশ। এ উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে অতিবৃষ্টির ফলে নর্মদা নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, মোহনা অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তন, ইলিশের চলাচল অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং মৌসুমি মাছের প্রাপ্যতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মিঠাপানি ও লবণাক্ত পানির মিশ্রণে গঠিত মোহনা ইলিশের বিচরণ ও প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এছাড়া ইলিশের চলাচলের সময় ও গতিপথের পরিবর্তন এবং মাছ ধরার প্রচেষ্টার তারতম্যও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব কারণের প্রকৃত অবদান এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়। নর্মদা নদীতে বাঁধ নির্মাণ, পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পলি জমা এবং মোহনার পরিবেশগত পরিবর্তন অতীতে ইলিশের প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। গুজরাটের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রথমেই পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ এবং মোহনার পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। নদীর পানিপ্রবাহ, লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, পানির গভীরতা ও দ্রবীভূত অক্সিজেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের চলাচল ও প্রজননের অনুকূল পরিবেশ চিহ্নিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে উজানের পানি প্রত্যাহার, বাঁধের প্রভাব, নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নদী অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ও নার্সারি এলাকা সংরক্ষণ, জাটকা আহরণ বন্ধ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের সুরক্ষা এবং নিষিদ্ধ সময়ে অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রজনন সাফল্য বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি বিদ্যমান ইলিশ অভয়াশ্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, প্রয়োজনে নতুন সংরক্ষণ এলাকা নির্ধারণ এবং জেলেদের অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা উচিত। সংরক্ষণকালীন জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান, খাদ্যসহায়তা এবং সচেতনতা কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গুজরাটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে, তবে কোনো কৌশল গ্রহণের আগে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিবেশগত ও সামাজিক বাস্তবতায় তার কার্যকারিতা যাচাই করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা বজায় রাখা, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, মোহনা ও উপকূলীয় পরিবেশের সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত মৎস্য আহরণ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাদের জীবিকা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। গুজরাটের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণ নির্ধারণে আরও গবেষণা এবং বাংলাদেশ-গুজরাটের নদী ও মোহনা পরিবেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণও প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচলের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ইলিশসম্পদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
জেলেদের জীবিকা নিশ্চিত না হলে সংরক্ষণ কঠিন
ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল করার জন্য জেলেদের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ নিষেধাজ্ঞার সময় একজন জেলে মাছ ধরতে না পারলে তার পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ ব্যবস্থাপনার আওতায় নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের খাদ্য সহায়তা এবং বিকল্প আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চার মাসের নিষেধাজ্ঞাকালে পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি খাদ্যশস্য সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি অভয়াশ্রম এলাকায় ২০ হাজার জেলে বিকল্প আয়মূলক কর্মকাণ্ডের সুবিধা পাচ্ছেন। তবে সহায়তা প্রকৃত জেলেদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলেদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা, ভুয়া সুবিধাভোগী বাদ দেওয়া এবং সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
একক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে একটি মাত্র উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জাটকা রক্ষা, মা ইলিশ সংরক্ষণ, সঠিক মেস সাইজের জাল ব্যবহার, বাজার মনিটরিং, প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, মৎস্য আইন বাস্তবায়ন এবং মাইগ্রেটরি রুট সচল রাখা; সবই একই ব্যবস্থাপনার অংশ হিসাবে দেখতে হবে। এর পাশাপাশি জেলেদের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ইলিশ সংরক্ষণ সফল হবে তখনই, যখন সংরক্ষণনীতি এবং জেলেদের জীবিকার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা যাবে। ইলিশ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় মাছ নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠী এবং সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গত কয়েক বছরে উৎপাদন বাড়ার পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ৫ দশমিক ২৯ লাখ টনে নেমে আসা নতুন করে সতর্ক হওয়ার কারণ তৈরি করেছে। ইলিশের উৎপাদন পুনরুদ্ধারে তাই এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা, নিষিদ্ধ জাল নিয়ন্ত্রণ, প্রজননক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম সংরক্ষণ, বাজার মনিটরিং, আইন বাস্তবায়ন এবং ইলিশের চলাচলের পথ নিরাপদ রাখার পাশাপাশি জেলেদের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে। ইলিশকে বাঁচাতে হলে শুধু আজকের মাছ নয়, আগামী দিনের ইলিশের কথাও ভাবতে হবে। সংরক্ষণ কার্যক্রম যত বেশি বাস্তবভিত্তিক, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক হবে, ইলিশের টেকসই উৎপাদনের সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে।
ড. মাসুদ রানা : চেয়ারম্যান, ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
