জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য
Advertisement
মোহাম্মদ হাসান শরীফ
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতিহাসের কিছু নগরী আছে, যেগুলো কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়; তারা একেকটি ধারণা, একেকটি আবেগ, কখনো বা সভ্যতার আত্মপ্রতিকৃতি। জেরুজালেম তেমনই একটি নগরী। বলা হয়ে থাকে, জেরুজালেম হলো এক স্রষ্টার ঘর, দুই জাতির রাজধানী, তিন ধর্মের উপাসনালয়। পৃথিবীর বহু নগর সাম্রাজ্যের রাজধানী হয়েছে, বহু নগর ধর্মীয় গুরুত্ব অর্জন করেছে, কিন্তু জেরুজালেম একই সঙ্গে ধর্ম, রাজনীতি, স্মৃতি, রক্তপাত ও মুক্তির প্রতীক। ব্রিটিশ ইতিহাসবেত্তা সাইমন সেবাগ মন্টেফিওরি Jerusalem : The Biography গ্রন্থে এ নগরীর তিন হাজার বছরের ইতিহাসকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যেন তিনি কোনো শহরের নয়, একজন জীবন্ত মানুষের জীবনী লিখছেন। গ্রন্থটি ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় এবং জেরুজালেমের ইতিহাসকে রাজা ডেভিডের (দাউদ নবী) যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করে। লেখক একই সঙ্গে এ কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, নগরীটির পবিত্রতা যত বৃদ্ধি পেয়েছে, এটি তত বেশি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বইটির একটি প্রধান উপজীব্য হলো-কীভাবে জেরুজালেম একই সঙ্গে ঐশী শান্তি এবং পার্থিব ধ্বংসের প্রতীক হয়ে উঠল। মন্টেফিওরি দেখিয়েছেন, শহরটির কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, নেই কোনো বড় নদী বা বাণিজ্যিক সুবিধা। তবুও শুধু ‘পবিত্রতা’ বা ‘ঐশীপ্রীতি’র কারণে শত শত বছর ধরে রাজারা এ নগরীর জন্য নিজেদের রক্ত ঝরিয়েছেন।
প্রথমেই বলতে হয়, বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর ধারণাগত নির্মাণ। মন্টেফিওরি জেরুজালেমকে কেবল একটি স্থান হিসাবে দেখেন না; তিনি একে একটি চরিত্রে রূপ দেন। এ শহর জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে, আক্রান্ত হয়, ধ্বংস হয়, আবার ফিরে আসে। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে সে নতুন পরিচয় ধারণ করে। ফলে পাঠক যখন বইটি পড়েন, তখন কেবল ঘটনাপরম্পরা অনুসরণ করেন না; বরং এক দীর্ঘ মানবিক নাটকের দর্শক হয়ে ওঠেন।
মন্টেফিওরির লেখার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি ইতিহাসকে শুধু রাজা-বাদশাহ ও যুদ্ধের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ রাখেন না। তার ইতিহাসে যেমন রয়েছেন ডেভিড (দাউদ), সলোমন (সোলায়মান), হেরোদ, সালাহউদ্দিন, সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসকরা; তেমনই আছেন পুরোহিত, তীর্থযাত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, ষড়যন্ত্রী, মাতৃসমাজ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, জেরুজালেমের প্রকৃত ইতিহাস গড়ে উঠেছে রাজসিংহাসন ও জনজীবনের আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে।
বইটির বর্ণনাশৈলী অসাধারণ। ইতিহাসবিষয়ক অনেক গ্রন্থ তথ্যসমৃদ্ধ হলেও পাঠ-আনন্দ দেয় না। কিন্তু ‘জেরুজালেম : দ্য বায়োগ্রাফি’ এক অর্থে উপন্যাসের মতো সাবলীল। লেখকের দীর্ঘ গবেষণা থাকলেও ভাষা কখনো শুষ্ক হয়নি। তিনি চরিত্র নির্মাণ করেন, দৃশ্য তৈরি করেন, উত্তেজনা সৃষ্টি করেন। ফলে ক্রুসেডের যুদ্ধ, উমাইয়া খিলাফতের উত্থান, মামলুক যুগ, উসমানিয়া শাসন বা ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি হয়ে থাকে না; জীবন্ত অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়।
জেরুজালেমকে ঘিরে তিনটি আব্রাহামীয় ধর্মের দাবি বইটির কেন্দ্রীয় বিষয়। ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের কাছে এ শহরের পবিত্রতা কীভাবে গড়ে উঠেছে, সেই গল্প মন্টেফিওরি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রত্যেক ধর্মই জেরুজালেমকে নিজের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে এবং সেই প্রচেষ্টা বহু সময়ে সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। একই শহর তিনটি ধর্মের কাছে আশীর্বাদের প্রতীক হলেও বাস্তবে তা বহু সহিংসতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ দ্বৈধতাই বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান।
তবে মন্টেফিওরির কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি কেবল ধর্মীয় আবেগের ইতিহাস লেখেননি; ক্ষমতার ইতিহাসও লিখেছেন। জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে যে সংগ্রাম, তার নেপথ্যে আধ্যাত্মিকতা যেমন কাজ করেছে, তেমনই রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদও। রোমান সম্রাট থেকে আরব খলিফা, ক্রুসেডার রাজা থেকে উসমানিয়া সুলতান, ব্রিটিশ প্রশাসক থেকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র-সবাই কোনো-না-কোনোভাবে জেরুজালেমকে নিজেদের বৈধতার উৎস হিসাবে ব্যবহার করেছে। ফলে শহরটির ইতিহাস মূলত ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতারও ইতিহাস।
লেখক নিজে ইহুদি ধর্মাবলম্বী। তবে কোনো ধর্মের প্রতিই তিনি বিদ্বেষ ভাব প্রকাশ করেননি। হজরত উমর এবং গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবির জেরুজালেম জয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাগুলোও যত্নের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। মন্টেফিওরি তার বইয়ে খলিফা উমরের জেরুজালেম প্রবেশকে ইতিহাসের অন্যতম বিনয়ী এবং যুগান্তকারী রাজনৈতিক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসাবে বর্ণনা করেছেন। মুসলিম সেনাপতি আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী যখন শহর ঘেরাও করে, তখন জেরুজালেমের খ্রিষ্টান প্যাট্রিয়ার্ক সোফ্রোনিয়াস চুক্তি করতে রাজি হন। তবে তার শর্ত ছিল, তিনি খলিফা উমরের নিজ হাতেই কেবল শহরের চাবি হস্তান্তর করবেন। উমর মদিনা থেকে এক সাধারণ উটে চেপে জেরুজালেমে পৌঁছান। তার পরনে ছিল তালি দেওয়া পোশাক। চার্চ অব প্যাট্রিয়ার্ক সোফ্রোনিয়াস খলিফাকে পবিত্র চার্চ অব দ্য হলি সেপাচর (পবিত্র কবরড়-গির্জা) ঘুরে দেখাচ্ছিলেন। ঘোরাঘুরির সময় জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেলে সোফ্রোনিয়াস খলিফাকে গির্জার ভেতরেই নামাজ আদায় করতে অনুরোধ করেন; কিন্তু খলিফা উমর তা বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন : ‘আমি যদি এখানে নামাজ আদায় করি, তবে ভবিষ্যতে মুসলিমরা আমার অনুসরণে এ গির্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করবে।’ তিনি গির্জার বাইরে গিয়ে নামাজ আদায় করেন, যেখানে পরে ‘মসজিদে উমর’ নির্মিত হয়। খলিফা উমর জেরুজালেমের খ্রিষ্টানদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং গির্জাগুলো সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া রোমান যুগে নির্বাসিত ইহুদিদের খলিফা উমর আবার জেরুজালেমে এসে বসবাস ও উপাসনা করার অনুমতি প্রদান করেন। মন্টেফিওরির বর্ণনা অনুযায়ী, টেম্পল মাউন্ট (হারাম আল-শরিফ) এলাকাটি তখন রোমানরা আবর্জনার স্তূপ হিসাবে ফেলে রেখেছিল। খলিফা উমর নিজ হাতে সেই আবর্জনা পরিষ্কার করা শুরু করেন এবং পরে সেখানেই আল-আকসা মসজিদ নির্মাণের সূচনা হয়।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির (গাজী সালাহউদ্দিন) জেরুজালেম পুনর্দখলও দারুণ ঘটনা। ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিষ্টানরা জেরুজালেম দখল করে মুসলিম ও ইহুদি অধিবাসীদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল। এর প্রায় ৮৮ বছর পর গাজী সালাহউদ্দিন জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। ১১৮৭ সালের জুলাই মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ‘হাত্তিনের যুদ্ধে’ ক্রুসেডার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এ যুদ্ধে ক্রুসেডারদের সামরিক শক্তি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, যা জেরুজালেম পুনর্দখলের পথ খুলে দেয়। ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা যেভাবে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিল, সালাহউদ্দিন তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক অনন্য উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মন্টেফিওরি বইটিতে লিখেছেন, সালাহউদ্দিন শহরের খ্রিষ্টানদের মুক্তির জন্য নির্দিষ্ট মুক্তিপণ ধার্য করেছিলেন; কিন্তু অনেক গরিব মানুষ যারা মুক্তিপণ দিতে অসমর্থ ছিল, তাদের সালাহউদ্দিন, তার ভাই আল-আদিল এবং সেনাপতিরা নিজেদের খরচে মুক্তি দিয়ে দেন। বৃদ্ধ ও অসচ্ছল ব্যক্তিদের কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই শহর ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হয়। সালাহউদ্দিন আইয়ুবি সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য বইটির বর্ণনায় ফুটে ওঠে : ‘তোমাদের লোকদের গিয়ে বলো, তোমাদের পূর্বসূরিরা যেভাবে আমাদের সঙ্গে আচরণ করেছিল, আমরা তোমাদের সঙ্গে তেমন আচরণ করব না।’ ১১৮৭ সালের ২৭ রজব (শবেমেরাজের রাতে) গাজী সালাহউদ্দিন বিজয়ী হিসাবে অত্যন্ত শান্তভাবে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন, যা পরে বিশ্ব ইতিহাসে বিজয়ী শাসকের মানবিকতা ও সহনশীলতার অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসাবে স্থান করে নেয়।
বই পড়তে পড়তে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, জেরুজালেমের ইতিহাস কখনো সরলরৈখিক নয়। এখানে বিজয়ীও পরাজিত, পরাজিতও কোনো না কোনোভাবে বিজয়ী। যারা শহর ধ্বংস করেছে, তারাই কখনো পুনর্নির্মাণ করেছে; যারা পবিত্রতার কথা বলেছে, তারাই কখনো রক্তপাত ঘটিয়েছে। মন্টেফিওরি এ বৈপরীত্যকে আড়াল করেন না। বরং তিনি দেখান, মানবসভ্যতার সবচেয়ে গভীর বিশ্বাসগুলোর মধ্যেও সহিংসতার সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। জেরুজালেম এমন একটি বিষয়, যেখানে নিরপেক্ষতা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। পাঠকের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে একই ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। মন্টেফিওরি সাধারণত তথ্য ও উৎসের ভিত্তিতে একটি বিস্তৃত চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তিনি কোনো একক ধর্মীয় বা জাতীয় বয়ানের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য দেখাননি। বরং বিভিন্ন পক্ষের অভিজ্ঞতা ও দাবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। এ কারণে বইটি গবেষণামূলক গুরুত্ব লাভ করেছে।
তবে সমালোচনারও কিছু জায়গা রয়েছে। প্রথমত, বইটির আয়তন বিশাল এবং চরিত্রের সংখ্যা এত বেশি যে, সাধারণ পাঠক অনেক সময় বিভ্রান্ত হতে পারেন। একের পর এক রাজবংশ, শাসক, ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিকের আবির্ভাব ঘটে। ফলে পাঠে মনোযোগ ধরে রাখা একটি চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয়ত, কিছু সমালোচকের মতে, লেখক নাটকীয় বর্ণনার প্রতি এতটাই আকৃষ্ট যে, কখনো কখনো ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের গভীরতা কিছুটা কমে যায়। তিনি গল্প বলতে দক্ষ, কিন্তু কিছু জটিল কাঠামোগত প্রশ্ন, যেমন : অর্থনীতি, সামাজিক বিন্যাস বা শ্রেণি-সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় সবসময় যান না। ফলে বইটি কঠোর একাডেমিক ইতিহাসের চেয়ে জনপ্রিয় ইতিহাসের ধারার কাছাকাছি অবস্থান করে।
তৃতীয়ত, আধুনিক ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে লেখকের ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি যথেষ্ট ভারসাম্য দেখিয়েছেন, আবার অন্যদের মতে তার বর্ণনার কিছু অংশ বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু এ-ও সত্য, জেরুজালেমের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে পরিপূর্ণ নিরপেক্ষতা হয়তো বাস্তবেই অসম্ভব।
গ্রন্থটির একটি গভীর মানবিক তাৎপর্য আছে। বই পড়ার পর উপলব্ধি হয়, জেরুজালেমের জন্য মানুষের ভালোবাসা যেমন অফুরন্ত, তেমনই সেই ভালোবাসাই অনেকবার ধ্বংস ডেকে এনেছে। শহরটিকে মানুষ এত বেশি পবিত্র মনে করেছে যে, শেষ পর্যন্ত তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ এখানে একে অপরের সঙ্গে মিশে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, সমগ্র মানবজাতির ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশি বা দক্ষিণ এশীয় পাঠকের জন্যও বইটির গুরুত্ব কম নয়। কারণ এটি কেবল জেরুজালেমের ইতিহাস নয়; এটি দেখায় কীভাবে স্মৃতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয় একটি ভূখণ্ডকে শত শত বছরের সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। আমাদের অঞ্চলের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও এ উপলব্ধি মূল্যবান।
সব মিলিয়ে ‘জেরুজালেম : দ্য বায়োগ্রাফি’ একাধারে ইতিহাস, জীবনী, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং মানবসভ্যতার আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। মন্টেফিওরি এমন এক শহরের গল্প বলেছেন, যা পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত, সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সম্ভবত সবচেয়ে ভুল বোঝা নগর। বইটি শুধু তথ্য দেয় না; পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে-কেন একটি শহর হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষের কল্পনার কেন্দ্র হয়ে থাকে। কেন মানুষ একই সঙ্গে তাকে ভালোবাসে এবং তার জন্য যুদ্ধ করে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে ‘জেরুজালেম : দ্য বায়োগ্রাফি’ অপরিহার্য পাঠ্য।
জেরুজালেম নিয়ে অব্যাহত সংঘাতের জের ধরে লেখকের শেষ মন্তব্য হলো : জেরুজালেমের ইতিহাস হলো ক্রমাগত পুনর্গঠন, অন্ধ ধর্মান্ধতা এবং ধ্বংসের এক উপাখ্যান-তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে এটি টিকে থাকার গল্প; কিন্তু আজকের জেরুজালেম ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভক্ত, যা চরম প্রত্যাশা, একচ্ছত্র আধিপত্যের দাবি এবং ধর্মান্ধতার এমন এক চক্রে বন্দি-যা নগরীটির নিজস্ব অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। যতক্ষণ না এটি সবার অথচ কারও একা নয় হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে, ততক্ষণ এর ভাগ্য এক অনিশ্চিত ও প্রলয়ংকরী ঘন ছায়ার নিচে ঝুলন্ত থাকবে।
মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক
