Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

Advertisement

Icon

ড. মাসুদ রানা

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বাংলাদেশের দক্ষিণে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক পানিসীমায় সার্বভৌম অধিকার ও এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা করে। এ অর্জন বাংলাদেশের জন্য সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ আহরণ, সামুদ্রিক জীবসম্পদভিত্তিক শিল্পের বিকাশ এবং নীল অর্থনীতি সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু সমুদ্রসীমা অর্জনের এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গভীর সমুদ্রে আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২৩-২০২৪ অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে বাংলাদেশে সামুদ্রিক উৎস থেকে প্রায় ৬.২৯ লাখ টন মাছ আহরিত হয়, যা দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২.৫৩ শতাংশ। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ক্ষুদ্র ও কারিগরি নৌযানের অবদান এখনো প্রধান। অন্যদিকে শিল্পভিত্তিক ট্রলারনির্ভর মাছ আহরণের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাতের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উপকূলীয় ও অপেক্ষাকৃত কম গভীরতার পানিতে মাছ আহরণের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি পর্যালোচনায় বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছ আহরণ কার্যক্রম মূলত প্রায় ৮০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এর অর্থ, গভীর সমুদ্রে সম্ভাব্য মৎস্যসম্পদ অনুসন্ধান, আহরণযোগ্য প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

উপকূলীয় মাছ আহরণ ও গভীর সমুদ্রের মাছ আহরণ : সক্ষমতার পার্থক্য?

উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত ছোট নৌযান ও প্রচলিত আহরণপদ্ধতি গভীর সমুদ্রে দীর্ঘসময় মাছ ধরার জন্য সব ক্ষেত্রে উপযোগী নয়। গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে মাছ আহরণ করতে প্রয়োজন উপযুক্ত আকার ও ধারণক্ষমতার জাহাজ, শক্তিশালী ইঞ্জিন, উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থা, ফিশ-ফাইন্ডার বা ইকো-সাউন্ডার, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম। পাশাপাশি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় মাছের গুণগত মান বজায় রাখতে অনবোর্ড বরফায়ন, চিলড স্টোরেজ অথবা হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ বহরে সক্রিয় বড় শিল্প ট্রলারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৩১টি। পাশাপাশি ছিল প্রায় ৩০ হাজার ছোট মাছ ধরার নৌযান। কিন্তু এসব নৌযানের সবকটি গভীর সমুদ্রে দীর্ঘসময় অবস্থান করে বাণিজ্যিকভাবে মাছ আহরণের উপযোগী নয়। ফলে কেবল ট্রলারের সংখ্যা বাড়িয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সক্ষমতা অর্জন সম্ভব নয়; নৌযানের প্রযুক্তিগত মান, পরিচালন দক্ষতা, মাছ সংরক্ষণ এবং বাজারসংযোগও উন্নত করতে হবে। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উপযুক্ত আহরণ পদ্ধতি নির্বাচন। প্রজাতি ও মৎস্যসম্পদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী লংলাইন, পার্স-সেইন, পেলাজিক ট্রলসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনো পদ্ধতি গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রজাতির মজুত, প্রজনন, পরিবেশগত প্রভাব এবং টেকসই আহরণের সীমা নিরূপণ করা জরুরি। গভীর সমুদ্রে মাছের উপস্থিতি থাকলেই সেখানে নির্বিচারে মাছ আহরণ লাভজনক বা পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে-এমন ধারণা সঠিক নয়।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে তুলনা : বাংলাদেশ কোথায় পিছিয়ে?

ভারত ও মিয়ানমারের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যদিও তিন দেশের সামুদ্রিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক কাঠামো, মৎস্যসম্পদের ধরন এবং নৌবহরের সক্ষমতা এক নয়। তাই শুধু মোট উৎপাদন বা জাহাজের সংখ্যা দিয়ে তুলনা না করে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, গবেষণা, মাছ সংরক্ষণ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার পার্থক্য বিশ্লেষণ করা দরকার। ভারত গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত জাহাজ, সরকারি সহায়তা এবং আধুনিক মৎস্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র ও আন্তর্জাতিক পানিসীমায় টেকসই মাছ আহরণ এবং একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্দেশনা ও বিধিমালা প্রণয়ন করে। আধুনিক জাহাজ পরিচালনায় সমবায় সমিতি ও মৎস্যজীবী উৎপাদক সংগঠনকে যুক্ত করার উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, আধুনিক জাহাজ সংগ্রহের পাশাপাশি জেলেদের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, সমবায়ভিত্তিক মালিকানা এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে ভারতের ক্ষেত্রেও উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, পরিচালন ব্যয় এবং বাস্তবায়নগত জটিলতা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তাই বড় অর্থনীতি ও সরকারি সহায়তা থাকলেই এ খাত দ্রুত লাভজনক হয়ে ওঠে না। মিয়ানমারের সামুদ্রিক মৎস্য খাতেও উপকূলীয় ও অফশোর-দুই ধরনের মাছ আহরণ কার্যক্রম রয়েছে। দেশটির উপকূলরেখা ও সামুদ্রিক পানিসীমা বিস্তৃত হওয়ায় সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ উল্লেখযোগ্য। তবে মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার প্রকৃত সক্ষমতা বাংলাদেশের তুলনায় কতটা বেশি, তা নির্ধারণ করতে হালনাগাদ ও তুলনাযোগ্য উপাত্ত দরকার। বাংলাদেশের প্রধান ঘাটতি হলো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক জরিপ, বিশেষায়িত জাহাজ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার সমন্বয়ের অভাব। ফলে ভারতের মতো উন্নত প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং মিয়ানমারের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া গেলেও বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

কেন গভীর সমুদ্রে যেতে পারছেন না বাংলাদেশের জেলেরা?

বাংলাদেশের সাধারণ মৎস্যজীবীদের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে না যাওয়ার পেছনে অনাগ্রহের চেয়ে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আধুনিক জাহাজ নির্মাণ বা কেনা, ইঞ্জিন, মাছ শনাক্তকরণ যন্ত্র, নেভিগেশন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং সংরক্ষণব্যবস্থা স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের পক্ষে এককভাবে এ ব্যয় বহন করা কঠিন। ব্যাংকঋণের জামানত, সুদ, ঋণ পরিশোধের শর্ত এবং অনিশ্চিত আয় বিনিয়োগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার অর্থনীতিকে জটিল করে তোলে। দূরবর্তী আহরণক্ষেত্রে যাতায়াত, সমুদ্রে দীর্ঘসময় অবস্থান, ক্রুদের বেতন, খাদ্য, জাহাজ মেরামত, বিমা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যয় উল্লেখযোগ্য। মাছের প্রত্যাশিত মজুত না পাওয়া গেলে একটি যাত্রার লোকসান-পরবর্তী কার্যক্রমের মূলধনেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে। গভীর সমুদ্রে নিরাপদে মাছ ধরতে প্রশিক্ষিত ক্যাপ্টেন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, নাবিক ও মৎস্যকর্মী প্রয়োজন। ফিশ-ফাইন্ডার, জিপিএস, ইলেকট্রনিক চার্ট এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহারের দক্ষতাও জরুরি। শুধু জাহাজ কিনে দিলেই এ ধরনের কার্যক্রম সফল হবে না। চতুর্থত, মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মাছ ধরার পর দ্রুত উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে অবতরণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভরযোগ্য বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকলে উচ্চমূল্যের মাছও কম দামে বিক্রি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের মান পূরণ করতে না পারলে রপ্তানির সম্ভাবনাও সীমিত থাকবে। এর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, বৈরী আবহাওয়া, দুর্ঘটনা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং অপর্যাপ্ত বিমা সুরক্ষা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ায়।

গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগ : লাভের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার মাধ্যমে উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক মাছ আহরণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এ খাতে বিনিয়োগের লাভ নির্ভর করবে জাহাজের ক্রয়মূল্য, আহরণযোগ্য মাছের পরিমাণ, প্রজাতিভেদে বাজারদর, জ্বালানি ব্যয়, ট্রিপের সংখ্যা, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বাজারসংযোগের ওপর। বিষয়টি বোঝাতে একটি কাল্পনিক অর্থনৈতিক মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। ধরা যাক, একটি আধুনিক ট্রলার ও সরঞ্জাম কেনায় ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলো। বছরে ১২টি যাত্রা পরিচালিত হলো এবং প্রতি যাত্রায় গড়ে ২০ টন বিক্রয়যোগ্য মাছ আহরণ করা গেল। প্রতি কেজি মাছের গড় বিক্রয়মূল্য ২৫০ টাকা হলে বার্ষিক মোট বিক্রয় দাঁড়াবে ৬ কোটি টাকা। প্রতি যাত্রায় পরিচালন ব্যয় ৩৫ লাখ টাকা হলে বার্ষিক পরিচালন ব্যয় হবে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। সে ক্ষেত্রে বার্ষিক পরিচালন উদ্বৃত্ত হবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

তবে এই হিসাবটি কেবল উদাহরণ; এটি বাংলাদেশের বাজারদর, বাস্তব আহরণক্ষমতা বা কোনো নির্দিষ্ট জাহাজের যাচাইকৃত আর্থিক পূর্বাভাস নয়। এতে ঋণের সুদ, অবচয়, কর, বড় ধরনের মেরামত, অপ্রত্যাশিত ক্ষতি এবং অন্যান্য অনুল্লিখিত ব্যয় বাদ রয়েছে। তাই ১ কোটি ৮০ লাখ টাকাকে নিট মুনাফা বলা যাবে না। এ উদাহরণ আরও দেখায়, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়লে বার্ষিক পরিচালন উদ্বৃত্ত ৯৬ লাখ টাকায় নেমে আসবে। আবার মাছের বিক্রয়মূল্য বা বিক্রয়যোগ্য আহরণ ২০ শতাংশ কমে গেলে, ব্যয় অপরিবর্তিত থাকলেও উদ্বৃত্ত কমে ৬০ লাখ টাকায় দাঁড়াবে। দুটি ঝুঁকি একসঙ্গে ঘটলে আর্থিক ফল আরও প্রতিকূল হতে পারে। অতএব, বিনিয়োগের আগে বৈজ্ঞানিক মৎস্যসম্পদ জরিপ, জাহাজের প্রকৃত কোটেশন, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়, বাজারদর এবং সম্ভাব্য আহরণের পরিমাণের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন। আশাবাদী, স্বাভাবিক ও প্রতিকূল-এই তিনটি পরিস্থিতিতে নগদ প্রবাহ, ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং বিনিয়োগ ফেরতের সময় হিসাব করা উচিত।

উত্তরণের পথ : গবেষণা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তির সমন্বয়

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ সম্প্রসারণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন আধুনিক গবেষণা জাহাজ ও নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ। বিভিন্ন গভীরতা, ঋতু ও অঞ্চলে মাছের প্রজাতি, প্রাচুর্য, আকার, প্রজনন এবং আহরণযোগ্য পরিমাণ নিরূপণ করতে হবে। টুনা, বিলফিশ, ম্যাকারেল ও স্কুইডের মতো সম্ভাব্য বাণিজ্যিক প্রজাতির ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদার পাশাপাশি প্রকৃত মজুত ও টেকসই আহরণের সীমা নির্ধারণ জরুরি। দ্বিতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, মৎস্যজীবী সমবায়, ব্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে বিনিয়োগের উপযোগী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, উপযুক্ত বিমা, জাহাজের মান যাচাই এবং দক্ষ জনবল তৈরির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, মাছ আহরণ থেকে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি পর্যন্ত সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক বরফকল, চিলড স্টোরেজ, ফ্রিজিং, স্বাস্থ্যসম্মত অবতরণকেন্দ্র, মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার এবং নির্ভরযোগ্য বাজারসংযোগ ছাড়া গভীর সমুদ্রের মাছের পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য পাওয়া কঠিন। মাছের উপজাত থেকে ফিশমিল, মাছের তেল ও অন্যান্য মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির উদ্যোগও এ খাতের আয় বাড়াতে পারে।

চতুর্থত, ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ন্যায্য লাভ বণ্টনের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি ও পুঁজির সুবিধা কেবল বড় উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সামুদ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।

সবশেষে, বিশ্ববিদ্যালয়, মৎস্য অধিদপ্তর, সামুদ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার মধ্যে সমন্বিত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন। গবেষণার ফল যেন শুধু প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা জাহাজ পরিচালনা, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বাজার পরিকল্পনা এবং সরকারি নীতিতে ব্যবহার করতে হবে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য কেবল মাছ আহরণের ক্ষেত্র নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর সামুদ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। গবেষণা, দক্ষতা, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ ও সম্পদ সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ড. মাসুদ রানা : চেয়ারম্যান, ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

ইলিশের সংকট : উৎপাদন ফেরাতে চাই কার্যকর উদ্যোগ

ইলিশের সংকট : উৎপাদন ফেরাতে চাই কার্যকর উদ্যোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম