Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

সাক্ষাৎকার

সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

Advertisement

Icon

মাহবুব কামাল

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

সংগৃহীত

Advertisement

প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক টমাস পিকেটি বর্তমান সময়ে এক বহুল আলোচিত নাম। তাকে অনেকেই একুশ শতকের কার্ল মার্কস বলছেন। তিনি কিছুদিন আগে বিশ্ববাসীর জন্য ‘গ্লোবাল জাস্টিস প্রজেক্ট’ হাজির করেছেন। এই প্রজেক্টে তিনি ২০২৬ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত একটি রোডম্যাপ এঁকেছেন, যা বাস্তবায়ন করলে আমাদের এই গ্রহ পাবে অর্থনৈতিক সাম্য এবং বসবাসের এক সুন্দর পরিবেশ। যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার কর্মস্থলে একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-মাহবুব কামাল

যুগান্তর : প্রথমেই আপনাকে বামপন্থি রাজনীতি নিয়ে একটু প্রশ্ন করি। আপনি জানেন, বাংলাদেশে, বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকে বামপন্থি রাজনীতি ও মার্কসবাদ যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে মার্কসবাদী ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। মার্কসবাদে ঠিক কী ঘাটতি ছিল বলে আপনি মনে করেন?

টমাস পিকেটি : সত্তরের দশকে আমি তো খুব ছোট ছিলাম। আমার জন্ম ১৯৭১ সালে। বলতে পারেন, ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকেই আমার বড় হয়ে ওঠা। ফলে মার্কসবাদী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। মার্কসবাদ-অন্তত মার্কসবাদের অনেক ধারার-একটি বড় সমস্যা হলো গণতন্ত্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক। মার্কস ও লেনিন এমন একসময়ে কাজ করেছেন, যখন ‘নির্বাচনি গণতন্ত্র’ আজকের মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা হয়ে ওঠেনি। যদিও আজকের নির্বাচনি গণতন্ত্রও যে সব সময় আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করে, তা নয়। কিন্তু তাই বলে তাকে বাদ দেওয়ার উপায় নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষ করে ১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে, একটা বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনি গণতন্ত্র সমাজের সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একে উপেক্ষা করে কোনো কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। ইউরোপের সামাজিক গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি বোঝা যায়। সেখানে সম্পদের অসম বণ্টন পুরোপুরি দূর হয়নি, উত্তর-ঔপনিবেশিক অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। তারপরও এসব দেশ এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে, যা মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। মার্কস ও লেনিনের সময়ে এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখার সুযোগ ছিল না। ১৮৪৮ সালে ইউরোপের বিপ্লব কিংবা ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের সময় নির্বাচনি গণতন্ত্র বাস্তবে আজকের মতো প্রতিষ্ঠিত ছিল না। আমার মনে হয়, এখানেই মার্কসবাদের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা। সমাজ বদলাতে হলে শুধু অর্থনৈতিক সমতার কথা বললেই হয় না। মানুষ কীভাবে নিজের মত প্রকাশ করবে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর কীভাবে প্রভাব রাখবে, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হয়।

যুগান্তর : তাহলে কি গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রই সেই বিকল্প, যেখানে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র পাশাপাশি চলতে পারে?

পিকেটি : আমার কাছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র এবং সামাজিক গণতন্ত্র একই বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ। নির্বাচনি গণতন্ত্রের বিকাশেও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ভূমিকা ছিল। কিছু উদাহরণ দিই। ১৯৪৫ সালে ব্রিটেনে লেবার পার্টি একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল ছিল। সুইডেনেও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির যথেষ্ট জনসমর্থন ছিল। ফ্রান্সে ১৯৩৬ ও ১৯৪৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ও সোশ্যালিস্ট পার্টির জাতীয় পরিষদে শক্তিশালী অবস্থান ছিল। এই দলগুলো সমাজে পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন বলশেভিক বিপ্লবের চেয়েও বেশি সফল হয়েছিল। আমার মনে হয়, এই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

যুগান্তর : মার্কসবাদ শ্রেণিগত সমতার ওপর জোর দেয়। কিন্তু মানুষের একটি মৌলিক প্রবৃত্তি হলো নিজেকে অন্যের চেয়ে স্বতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রবণতার সঙ্গে সমতার কি কোনো মৌলিক বিরোধ আছে?

পিকেটি : আমার মনে হয়, প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের কাছে এসে দাঁড়ায়। প্রত্যেক মানুষ আলাদা-এটা সত্য। আর সেই স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে আসে মতবিনিময়, বিতর্ক এবং গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা। সব মতপার্থক্যের পেছনে যে শ্রেণিগত অবস্থান কাজ করে, তা নয়। একই শ্রেণির দুজন মানুষের মধ্যেও যুক্তিসংগত মতভেদ থাকতে পারে। দুজনই হয়তো সমতা চান, কিন্তু সমতায় পৌঁছানোর পথ নিয়ে তাদের মত এক নয়। তাই প্রকৃতপক্ষে মতপার্থক্যের অবসান সমাধান নয়। বরং এমন একটা জায়গা দরকার, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে। গণতান্ত্রিক আলোচনা ও মতবিনিময় সেই জায়গাটিই তৈরি করে।

যুগান্তর : আপনার Global Justice Report পড়ে যে কেউ বলতে পারেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রস্তাবগুলো যথেষ্ট সুসংহত, কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতায় সেগুলো কার্যকর করা কঠিন। আপনার নিজের প্রস্তাবের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোনগুলো? কোন অংশটি বাস্তবায়ন করা সবচেয়ে কঠিন হবে?

পিকেটি : কঠিন হবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কঠিন বলে বড় স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিলে চলবে না। প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিনির্ভর জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং প্রযুক্তি খাতের বিলিয়নিয়াররা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় আকারে ভাবছে। তারা জানে তারা কী চায়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে তারা কাজও করছে। যারা বিশ্বায়ন, সমতা, মুক্তি এবং সবার সমান স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাদেরও বড় লক্ষ্য সামনে রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত একে শ্রেণিসংগ্রাম বলা যায়। তবে এবার সেই সংগ্রাম শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর পরিসর হবে বিশ্বব্যাপী। বিংশ শতাব্দীতে সামাজিক গণতন্ত্রের বিকাশের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। সুইডেন ও ফ্রান্স এর উদাহরণ। আবার বর্তমানে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের একটি বিশাল অংশ এখন বাস করে সাব-সাহারান আফ্রিকা, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো অঞ্চলে। একবিংশ শতাব্দীর দিকে তাকালে আমার মনে হয়, বড় পরিবর্তন আসবে এই দেশগুলো থেকেই। এই মানুষদের রাজনৈতিক শক্তিকে এক জায়গায় আনতে হবে। তাদের জন্য এমন একটি রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করতে হবে, যা ১৯১৭ সালের বলশেভিক মঞ্চের মতো হবে না। আমাদের অন্য পথ খুঁজতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমরা বৈশ্বিক পরিবর্তনের কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নিয়ে ভাবা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা সেই চিন্তাকে আবার সামনে আনতে চাই। আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে চাই, যেখানে সত্যিকার অর্থেই সমতা অর্জন করা সম্ভব।

যুগান্তর : আপনার প্রতিবেদনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সেবামূলক খাতের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বস্তুগত সম্পদ ব্যবহার কমানোর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশ এখনো উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর নির্ভর করে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষে এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

পিকেটি : এই পরিবর্তনের কথা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখনই একইভাবে প্রযোজ্য নয়। আপাতত উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ২০ বা ৩০ বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বস্তুগত উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাদের আরও উৎপাদন করতে হবে, মানুষের আয় বাড়াতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে অন্য খাতের দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আমাদের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২১০০ সালে সব দেশের মাথাপিছু জিডিপি মাসে প্রায় ৫ হাজার ইউরো হতে পারে। অর্থাৎ আজকের মূল্যে বছরে প্রায় ৬০ হাজার ইউরো। অঙ্কটা শুনলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি অর্থনীতি ছোট করার কোনো পরিকল্পনা নয়। বরং এর অর্থ হলো বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এই আয় আজকের যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু জিডিপির চেয়েও সামান্য বেশি। তবে একটা সময়ে গিয়ে আমাদের সবাইকে প্রশ্ন করতে হবে, কতটা উৎপাদন যথেষ্ট? কোথায় গিয়ে থামা উচিত? আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে পারলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। কিন্তু তার জন্য বৈষম্য অনেক কমাতে হবে। কারণ শুধু অর্থনীতির আকার বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থনীতি থেকে কে কতটা লাভবান হচ্ছে, সেটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যুগান্তর : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। আপনার প্রস্তাবে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচারের অর্থ কী?

পিকেটি : জলবায়ু ন্যায়বিচারকে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমার মনে হয়, জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্যানেল বা আইপিসিসির প্রতিবেদনগুলোর একটি সমস্যা হলো, তাদের সবচেয়ে আশাবাদী প্রেক্ষাপটেও বৈশ্বিক সমৃদ্ধি কীভাবে আরও সমানভাবে বণ্টন করা যায়, সেই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ২১০০ সালের সবচেয়ে আশাবাদী প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশ বা কঙ্গোর মাথাপিছু জিডিপি ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশেরও কম থাকবে। পৃথিবীর একটা বড় অংশকে দরিদ্র রেখে দিলে বৈশ্বিক উষ্ণতা দুই ডিগ্রির নিচে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। কিন্তু সেটি কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ? আমরা এমন একটি পৃথিবীর কথা ভাবতে চাই, যেখানে মানুষ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের বোঝাই ভাগ করে নেবে না, সমৃদ্ধিও ভাগ করে নেবে।

যুগান্তর : যদি সরকারগুলো আপনার পুরো প্রস্তাব গ্রহণ করতে না চায়, তাহলে কোন দুই বা তিনটি সংস্কার দিয়ে শুরু করা সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

পিকেটি : প্রতিটি সরকার নিজের দেশে একটি ‘গ্লোবাল জাস্টিস ফান্ড’ গঠন করতে পারে। বিলিয়নিয়ারদের ওপর কর ও আয়করের মাধ্যমে সেই তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। অবশ্য ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলোর পক্ষে কাজটি শুরু করা সহজ হবে। দরিদ্র দেশগুলোও নিজেদের মধ্যে জোট গঠন করে এগোতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৪ সালে জি-২০ সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ার করের প্রস্তাব রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও জলবায়ুতে বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা। আমাদের Global Justice Report-এর প্রস্তাবের সঙ্গে এই উদ্যোগের যথেষ্ট মিল আছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও জোরালো সমর্থন পেতে পারত। কিন্তু বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক অবস্থান এক না হওয়ায় এর বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন দেশগুলোর পক্ষ থেকে চাপ ক্রমেই বাড়বে। জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা চলছে। জি-৭৭-এর বহু দেশ একটি ভিন্ন উন্নয়ন মডেলের পক্ষে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে চাইছে। এই দাবিগুলো চিরকাল উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না। জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসবে।

যুগান্তর : বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় সবচেয়ে জোরালোভাবে কোন দাবিটি এখন তুলতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

পিকেটি : তাদের জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি তুলতে হবে। ধনী দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বেশি দায়ী। অথচ এর ক্ষতিকর পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে এমন অনেক দেশকে, যাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম। সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও নেপালে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি দেশের জন্য তথাকথিত ‘গ্লোবাল জাস্টিস ডিভিডেন্ড’ মাথাপিছু প্রায় ১,০০০ ইউরো হতে পারে। কোনো কোনো হিসাবে তা ১,০০০ থেকে ২,০০০ ইউরোর মধ্যে থাকতে পারে। ধনী দেশগুলোর জন্য এই অর্থ খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশ বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে। তবে আমি একে শুধু অর্থ স্থানান্তর বলতে চাই না। এটি আংশিকভাবে ক্ষতিপূরণ, যে ক্ষতি করা হয়েছে, তার জন্য দায় স্বীকার। অনেক সরকার ইতোমধ্যেই ‘রিপারেশন’ বা ক্ষতিপূরণের মতো ভাষা ব্যবহার করছে। আমার মনে হয়, এই দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা দরকার।

যুগান্তর : আপনার রিপোর্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করা হয়নি। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, এমনকি বৈষম্যের ধরনও বদলে দিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

পিকেটি : আমি একমত যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক ডেটা সেন্টার তৈরির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এসব স্থাপনার বস্তুগত ও পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে। আমরা যে উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি থেকে সেবামূলক ও জ্ঞানভিত্তিক খাতের দিকে যাওয়ার কথা বলছি, সেটিকে এক অর্থে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকল্প পথ হিসাবেও দেখা যেতে পারে। আমরা কোথায় বেশি বিনিয়োগ করতে চাই, তা নিয়ে ভাবতে হবে। আরও বেশি ডেটা সেন্টার, নাকি আরও ভালো শিক্ষা? আরও বেশি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, নাকি শিল্প-সংস্কৃতি ও মানবিক সৃজনশীলতা? আমি বলছি না যে প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি তৈরির জন্য আমরা কী ত্যাগ করছি এবং তার সুফল কারা পাচ্ছে। তবে আমি গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আস্থা রাখতে চাই। গণতান্ত্রিক আন্দোলন অতীতেও প্রতিষ্ঠান বদলেছে, ভবিষ্যতেও তা সম্ভব। আমি এমন একটি ভবিষ্যতের কথা ভাবতে চাই, যেখানে প্রযুক্তির শক্তি ও গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি হবে।

যুগান্তর : ধরুন, ২০৩৫ সালে আমরা আবার আপনার সঙ্গে কথা বলছি। কোন পরিবর্তনগুলো দেখলে আপনি মনে করবেন, গত ১০ বছরে পৃথিবী সত্যিই এগিয়েছে?

পিকেটি : আমি প্রথমেই দেখতে চাইব, গণতান্ত্রিক শক্তি ও গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলো আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে কি না। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোয় আরও ভারসাম্যের প্রয়োজন। বৈশ্বিক বৈষম্য কমাতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন কাঠামো তৈরি করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবশ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা। কিন্তু বাধা থাকলেই যে আমরা থেমে যাব, তা তো নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, গণতান্ত্রিক শক্তি পরিবর্তন আনতে পেরেছে। ভবিষ্যতেও পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি চাই, দশ বছর পর ফিরে তাকিয়ে আমরা বলতে পারি-পৃথিবী শুধু প্রযুক্তিতে এগোয়নি, মানুষের মধ্যকার সম্পর্কেও কিছুটা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

যুগান্তর : বাংলাদেশের বামপন্থি রাজনীতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য আপনাকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনি কি এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন?

পিকেটি : কবে যাওয়া সম্ভব হবে, তা এখনই বলতে পারছি না। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশে যেতে পারলে আমার ভালো লাগবে। আমি আগে কখনো বাংলাদেশে যাইনি। ভারতে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। এখন অবশ্য ভ্রমণ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছি। অতীতে অনেক ভ্রমণ করেছি। আমার ব্যক্তিগত কার্বন বাজেট বা ভ্রমণের কারণে কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। আমার দুটি মেয়ে আছে প্যারিসে, তাদের বয়স এখন দুই ও চার বছর। তাদের সঙ্গে সময় কাটানোও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই চেষ্টা করছি, বছরে এক বা দুটি সফরের মধ্যে ভ্রমণ সীমিত রাখতে। তবে বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ পেলে আমি আনন্দিত হব।

সাক্ষাৎকারটি ট্রান্সক্রিপ্ট করেছেন : রাহাত আলম

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকার সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম