এই হত্যার দায় আমাদের সবার
jugantor
এই হত্যার দায় আমাদের সবার

  রুমিন ফারহানা  

১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আবরার ফাহাদ

ঘটনাটি নৃশংস, বীভৎস, বর্বরতম- ঠিক কী ভাষায় লিখলে প্রকাশ করা যায় তা আমি জানি না। কিন্তু ঘটনাটি নতুন নয়। ২২ বছরের অতি মেধাবী, শান্ত, পড়ুয়া একটি ছেলে যার কোনো দলীয় পরিচয় নেই, একেবারেই মধ্যবিত্ত ঘরে যেমন ছেলেকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে পরিবার, ঠিক তেমন একটা ছেলেকে বিনা কারণে স্রেফ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা। ঘটনাটি বুয়েটের, ছেলেটির নাম আবরার।

ঘটনাটি পড়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু অবাক হইনি একদম। কারণ এ ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ঘটেছে। এমন ঘটনা আমরা দেখেছি, পড়েছি, শুনেছি, ফেসবুকে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিয়েছি, দুই একটি ঘটনা নিয়ে টকশোতে চিৎকার করেছি, বিচার চেয়েছি, তারপর ব্যস! সব শান্ত, চুপচাপ, নিস্তরঙ্গ।

একদিনে তো আর পরিস্থিতি এখানে নামেনি। বছরের পর বছর আমাদের চোখের সামনে একটির পর একটি ঘটনা ঘটতে দিয়েছি আমরা। দলীয় রাজনীতি দানব তৈরি করেছে আর আমরা তাকিয়ে দেখেছি।

দু’দিনও পার হয়নি, ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই বুয়েট ছাত্রলীগের দানবদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হল আবরার। ঘটনাটি আমাদের সামনে যে বিষয়গুলোকে স্পষ্ট করেছে তা হল-

১. এদেশে ভিন্নমত প্রকাশের ন্যূনতম স্বাধীনতা নেই। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘রোব ঃযব ফড়ম ধ হধসব ধহফ শরষষ রঃ’. বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন কাউকে শিক্ষা দিতে চাইলে প্রথমে তাকে ‘জামায়াত-শিবির’ নাম দেয়, তারপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন থেকে শুরু করে পিটিয়ে-কুপিয়ে মেরে ফেলা পর্যন্ত সবই জায়েজ।

আবার উল্টো দিকে একই ধরনের ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে লেখক-প্রকাশকসহ ভিন্নমতের মানুষদের কুপিয়ে মেরে ফেলতে। স্পষ্টভাবে বলে রাখা ভালো, শিবির হোক কিংবা নাস্তিক, চূড়ান্ত বাম কিংবা ডান, কাউকেই তার মতপ্রকাশের জন্য হত্যা তো দূরেই থাক, কোনো রকমের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার ন্যূনতম অধিকার কারও নেই।

তিন পুরুষ ‘আওয়ামী পরিবারের’ সন্তান আবরার যখন সরকারের ভারত সফরের ব্যর্থতা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা এবং দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি নিয়ে কথা বলে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন তাকে অবলীলায় ‘শিবির’ তকমা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের স্বার্থে এখন কথা বলা বিপজ্জনক, যদি তা সরকারের বিপক্ষে যায়। বাংলাদেশে এখন মতপ্রকাশের এমনই স্বাধীনতা যে আবরার যে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জীবন দেয়, সেই একই বিষয়ে লেখার কারণে পদ হারান খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, যিনি বিএমএ খুলনা শাখার সভাপতিও।

সরকার একদিকে বড় গলায় গর্ব করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর গণমাধ্যমের সংখ্যা নিয়ে আর অন্যদিকে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশের রিপোর্ট শুরু হয়, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার সরকারের কঠোর নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান শিকার বাংলাদেশি সাংবাদিকরা’ এই বাক্য দিয়ে। যে দেশে সাংবাদিকদের এ অবস্থা সেদেশে একজন সাধারণ নাগরিকের মতপ্রকাশ কতটা উন্মুক্ত সেটা সহজেই অনুমেয়।

২. নোংরা রাজনীতির চক্করে পড়ে মেধাবী-অমেধাবী নির্বিশেষে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বহু ছাত্র নরপিশাচে পরিণত হয়েছে। ৭ ঘণ্টা দফায় দফায় আবরারের ওপর স্টাম্প ভেঙে তার মৃত্যু নিশ্চিত করার ফাঁকে ফাঁকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা মেসেঞ্জারে চ্যাটিং করেছে, রাতের খাবার খেয়েছে, বার্সেলোনার খেলা দেখেছে, গল্প করেছে।

এই জান্তব বর্বরতা তো হঠাৎ একদিনে তৈরি হয় না- মন, মগজ, মস্তিষ্ক, চোখ সবকিছু একটা সওয়ানোয় ব্যাপার আছে। আবরারের ঘটনার পরই বেরিয়ে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি ছাত্র হলের কথা যেখানে আছে শতাধিক টর্চার সেল।

সেখানে আছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। র‌্যাগিংয়ের নামে সেখানে চলে দানবীয় অত্যাচার। প্রায় প্রতিটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহের ১-২ দিন থাকে নির্যাতনের জন্য বরাদ্দ, যেদিন জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ম্যানার শেখানোর নামে চলে ভয়ংকর নির্যাতন। পঙ্গু হওয়া, চোখ হারানো, শীতের রাতে সারা রাত বাইরে নির্ঘুম দাঁড়িয়ে থাকা, বীভৎস পিটুনি, এগুলো খুব স্বাভাবিক ঘটনা এখানে।

৩. অতীতেও বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু বিচার পায়নি কেউ। ২০১২ সালে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে দিনদুপুরে বীভৎসভাবে কুপিয়ে মারা হয়েছে বিশ্বজিৎকে। অসংখ্য সাক্ষী আর ভাইরাল হওয়া ভিডিও থাকা সত্ত্বেও ছাত্রলীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মীকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছিল।

এরপর একে একে ঘটেছে যুবায়ের, দিয়াজ, ইরফান, আবু বকর, আবেদসহ বহু হত্যাকাণ্ড। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ার জের ধরে দৃষ্টি হারান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এহসান রফিক। প্রায় সব ঘটনাতেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হয় খালাস পেয়েছে, নয়তো তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলাই হয়নি। পুলিশ প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, আইন-আদালত সবাই দাঁড়িয়ে গেছে তাদের রক্ষা করতে।

এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে একেকজন রাসেল, ফুয়াদ, অমিত, জিয়ন, আকাশ, বিটু, রাফিদ, সকাল, অনিক কিংবা ইশতিয়াকের মতো দানবরা। বুয়েটের খোলা ওয়েব পেজ বলছে মার্চ, ২০১৭ থেকে অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত বুয়েটেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৬৬ জন। তার কোনো একটির বিচার হয়েছে বলে জানা যায়নি। এসব ঘটনাই সাহস জুগিয়েছে এক একজনকে দানব হতে।

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গে জৌলুশ হারিয়েছে উপাচার্যের পদটিও। এখন বেশিরভাগ উপাচার্য ছাত্রদের অভিভাবক, দক্ষ প্রশাসক, নাকি দলীয় কর্মী তা বোঝা দায়। সন্তানতুল্য ছাত্র আবরার হত্যার ৩৮ ঘণ্টার পর উপাচার্যের সময় হয় ছাত্রদের সামনে আসার, এমনকি আবরারের জানাজায় শামিল হওয়ার সময়ও তিনি পাননি।

এত বড় ঘটনা ঘটার পর ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি জানতেন না যে আবরারের জানাজা হচ্ছে। জানাজায় না থাকলেও দু’দিন পর পুলিশ, প্রশাসন আর দলীয় ক্যাডারদের সহায়তায় নিরাপত্তা নিয়ে তিনি কুষ্টিয়া যান আবরারের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে।

সেখানে মাত্র ২ মিনিটের মধ্যে দোয়া শেষ করার নির্দেশনা আসে, সবাইকে হতবাক করে দিয়ে হামলা হয় আবরারের পরিবারের সদস্যদের ওপর। ৩৮ ঘণ্টা ভিসি কী করেছেন বুঝতে চাইলে দেখা যায় তিনি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন, তিনি ‘অনাকাক্সিক্ষত’ বলে জিডি করছিলেন অথচ মামলা পর্যন্ত করতে হয়েছে সদ্য সন্তানহারা আবরারের পিতাকে।

৫. বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে প্রক্টর, প্রভোস্ট বা ছাত্রকল্যাণ পরিচালক আছেন তারাও তাদের যার যার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। হলের যিনি প্রভোস্ট তিনি কি জানতেন না তার হলে কী হয়? যদি না জানেন তাহলে সেটাই তার ব্যর্থতা এবং এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে তার পদত্যাগ করা উচিত।

আর যদি তিনি জেনেও নীরব থাকেন তবে একজন সহায়ক হিসেবে একই মামলায় তার আসামি হওয়ার কথা। ছাত্রদের সার্বিক কল্যাণ দেখার কথা ডিএসডাব্লুউ বা ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের। গত ৫ বছরে নির্যাতনের শিকার হয়েছে অসংখ্য ছাত্র, যার মধ্যে অন্তত ৩০ জন বুয়েট ছাড়তে বাধ্য হয়।

এ বিষয়টা তার না জানা যেমন অপরাধ তেমনি জেনেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়া আরও বড় অপরাধ। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে যদিও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে, নেপথ্যের আসামি আসলে অনেকে। যাদের সবার উদাসীনতা, অযোগ্যতা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, জবাবদিহিতাহীন অবস্থা আর দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের সব অপকর্মে চোখ বুজে থাকা আজকের এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

শিক্ষার মান আমরা বহু আগেই হারিয়েছি। কারণগুলো চিহ্নিত করলে দেখা যায় নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা, সততার অনেক উপরে স্থান দেয়া হয়েছে ব্যক্তির দলীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়কে।

যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আমরা দেখেছি লন্ডনভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী ‘Times Higher Education’ বলছে, বিশ্বের প্রথম ১০০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। ঠিক যেমন এশিয়ার ৪১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকলেও নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম।

শিক্ষক, প্রশাসক, বুদ্ধিজীবী সবাই সব জানেন। কিন্তু পদ আঁকড়ে থাকার লোভ, প্রমোশনের লোভ, সরকারি নানা উচ্ছিষ্টের লোভ, সরকারদলীয় বড় নেতাদের আনুকূল্য লাভের লোভ, যোগ্যতার বহু ঊর্ধ্বে গিয়ে পাওয়া পদ-পদবির লোভ, এমনকি কপাল খুললে বলা যায় না প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে দু’একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ঘুরঘুর করার সুযোগ তাদের প্রলুব্ধ করে চুপ থাকতে। একটা কথা না বলে পারছি না।

হঠাৎ দেখি সরকারের মোটামুটি সব অপকর্মে নীরব-নিথর থাকা এক জাতীয় অধ্যাপক আবরারের ঘটনায় ব্যথিত। একের পর এক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, খুন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা অত্যাচার, নির্যাতন, বিচারহীনতা, সর্বোপরি নির্বাচনের নামে যা হয়েছে এই দেশে, সেসব নিয়ে কখনই বিচলিত হতে দেখিনি তাকে। তাদের মতো প্রাতঃস্মরণীয় ভারতের পদ্মভূষণে ভূষিত মানুষরা যদি সব অন্যায় আর অন্যায্যতায় এমনিভাবে ব্যথিত হতেন তাহলে আবরারের মতো ঘটনা দেশে বহু আগেই বন্ধ হতো।

আবরার এবং এমন আরও সব খুনে আমরাও দায়ী যারা নিজ নিজ স্বার্থে দিনের পর দিন চুপ থেকেছি। পাশে জ্বলা আগুনের ওম গায়ে লাগিয়েছি আর পরিতৃপ্ত বোধ করেছি এই ভেবে যে, আগুন তো আর আমার গায়ে লাগেনি।

‘নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না’, আপ্তবাক্যটি আওড়াই আমি আপনি; কিন্তু মর্মে এই বাক্য নেই আমাদের। আমাদের সবার ভেতরে একটা করে ব্ল্যাকহোল তৈরি করেছি আমরা। সেখানে ব্ল্যাকহোলের মতো একটা ইভেন্ট হরাইজনও আছে, যার ওপারে আমরা একে একে পাঠিয়ে দেই যাবতীয় নৃশংসতা, বর্বরতা, যেগুলো আর ফিরে আসে না এপারে, ফিরে এসে উপদ্রব তৈরি করতে পারে না আমাদের ভোগের জীবনে।

নিশ্চয়ই আমরা সবাই খুনি। আমরা খুনি আবরারের, আমরা খুনি আগে যত আবরার খুন হয়েছিল তাদের, আমরা খুনি ভবিষ্যতে আরও যত আবরার খুন হতে যাচ্ছে তাদেরও।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য; আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহসম্পাদক, বিএনপি

এই হত্যার দায় আমাদের সবার

 রুমিন ফারহানা 
১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
আবরার ফাহাদ
আবরার ফাহাদ। ছবি-ফেসবুক

ঘটনাটি নৃশংস, বীভৎস, বর্বরতম- ঠিক কী ভাষায় লিখলে প্রকাশ করা যায় তা আমি জানি না। কিন্তু ঘটনাটি নতুন নয়। ২২ বছরের অতি মেধাবী, শান্ত, পড়ুয়া একটি ছেলে যার কোনো দলীয় পরিচয় নেই, একেবারেই মধ্যবিত্ত ঘরে যেমন ছেলেকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে পরিবার, ঠিক তেমন একটা ছেলেকে বিনা কারণে স্রেফ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা। ঘটনাটি বুয়েটের, ছেলেটির নাম আবরার।

ঘটনাটি পড়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু অবাক হইনি একদম। কারণ এ ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ঘটেছে। এমন ঘটনা আমরা দেখেছি, পড়েছি, শুনেছি, ফেসবুকে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিয়েছি, দুই একটি ঘটনা নিয়ে টকশোতে চিৎকার করেছি, বিচার চেয়েছি, তারপর ব্যস! সব শান্ত, চুপচাপ, নিস্তরঙ্গ।

একদিনে তো আর পরিস্থিতি এখানে নামেনি। বছরের পর বছর আমাদের চোখের সামনে একটির পর একটি ঘটনা ঘটতে দিয়েছি আমরা। দলীয় রাজনীতি দানব তৈরি করেছে আর আমরা তাকিয়ে দেখেছি।

দু’দিনও পার হয়নি, ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই বুয়েট ছাত্রলীগের দানবদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হল আবরার। ঘটনাটি আমাদের সামনে যে বিষয়গুলোকে স্পষ্ট করেছে তা হল-

১. এদেশে ভিন্নমত প্রকাশের ন্যূনতম স্বাধীনতা নেই। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘রোব ঃযব ফড়ম ধ হধসব ধহফ শরষষ রঃ’. বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন কাউকে শিক্ষা দিতে চাইলে প্রথমে তাকে ‘জামায়াত-শিবির’ নাম দেয়, তারপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন থেকে শুরু করে পিটিয়ে-কুপিয়ে মেরে ফেলা পর্যন্ত সবই জায়েজ।

আবার উল্টো দিকে একই ধরনের ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে লেখক-প্রকাশকসহ ভিন্নমতের মানুষদের কুপিয়ে মেরে ফেলতে। স্পষ্টভাবে বলে রাখা ভালো, শিবির হোক কিংবা নাস্তিক, চূড়ান্ত বাম কিংবা ডান, কাউকেই তার মতপ্রকাশের জন্য হত্যা তো দূরেই থাক, কোনো রকমের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার ন্যূনতম অধিকার কারও নেই।

তিন পুরুষ ‘আওয়ামী পরিবারের’ সন্তান আবরার যখন সরকারের ভারত সফরের ব্যর্থতা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা এবং দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি নিয়ে কথা বলে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন তাকে অবলীলায় ‘শিবির’ তকমা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের স্বার্থে এখন কথা বলা বিপজ্জনক, যদি তা সরকারের বিপক্ষে যায়। বাংলাদেশে এখন মতপ্রকাশের এমনই স্বাধীনতা যে আবরার যে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জীবন দেয়, সেই একই বিষয়ে লেখার কারণে পদ হারান খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, যিনি বিএমএ খুলনা শাখার সভাপতিও।

সরকার একদিকে বড় গলায় গর্ব করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর গণমাধ্যমের সংখ্যা নিয়ে আর অন্যদিকে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশের রিপোর্ট শুরু হয়, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার সরকারের কঠোর নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান শিকার বাংলাদেশি সাংবাদিকরা’ এই বাক্য দিয়ে। যে দেশে সাংবাদিকদের এ অবস্থা সেদেশে একজন সাধারণ নাগরিকের মতপ্রকাশ কতটা উন্মুক্ত সেটা সহজেই অনুমেয়।

২. নোংরা রাজনীতির চক্করে পড়ে মেধাবী-অমেধাবী নির্বিশেষে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বহু ছাত্র নরপিশাচে পরিণত হয়েছে। ৭ ঘণ্টা দফায় দফায় আবরারের ওপর স্টাম্প ভেঙে তার মৃত্যু নিশ্চিত করার ফাঁকে ফাঁকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা মেসেঞ্জারে চ্যাটিং করেছে, রাতের খাবার খেয়েছে, বার্সেলোনার খেলা দেখেছে, গল্প করেছে।

এই জান্তব বর্বরতা তো হঠাৎ একদিনে তৈরি হয় না- মন, মগজ, মস্তিষ্ক, চোখ সবকিছু একটা সওয়ানোয় ব্যাপার আছে। আবরারের ঘটনার পরই বেরিয়ে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি ছাত্র হলের কথা যেখানে আছে শতাধিক টর্চার সেল।

সেখানে আছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। র‌্যাগিংয়ের নামে সেখানে চলে দানবীয় অত্যাচার। প্রায় প্রতিটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহের ১-২ দিন থাকে নির্যাতনের জন্য বরাদ্দ, যেদিন জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ম্যানার শেখানোর নামে চলে ভয়ংকর নির্যাতন। পঙ্গু হওয়া, চোখ হারানো, শীতের রাতে সারা রাত বাইরে নির্ঘুম দাঁড়িয়ে থাকা, বীভৎস পিটুনি, এগুলো খুব স্বাভাবিক ঘটনা এখানে।

৩. অতীতেও বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু বিচার পায়নি কেউ। ২০১২ সালে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে দিনদুপুরে বীভৎসভাবে কুপিয়ে মারা হয়েছে বিশ্বজিৎকে। অসংখ্য সাক্ষী আর ভাইরাল হওয়া ভিডিও থাকা সত্ত্বেও ছাত্রলীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মীকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছিল।

এরপর একে একে ঘটেছে যুবায়ের, দিয়াজ, ইরফান, আবু বকর, আবেদসহ বহু হত্যাকাণ্ড। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ার জের ধরে দৃষ্টি হারান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এহসান রফিক। প্রায় সব ঘটনাতেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হয় খালাস পেয়েছে, নয়তো তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলাই হয়নি। পুলিশ প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, আইন-আদালত সবাই দাঁড়িয়ে গেছে তাদের রক্ষা করতে।

এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে একেকজন রাসেল, ফুয়াদ, অমিত, জিয়ন, আকাশ, বিটু, রাফিদ, সকাল, অনিক কিংবা ইশতিয়াকের মতো দানবরা। বুয়েটের খোলা ওয়েব পেজ বলছে মার্চ, ২০১৭ থেকে অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত বুয়েটেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৬৬ জন। তার কোনো একটির বিচার হয়েছে বলে জানা যায়নি। এসব ঘটনাই সাহস জুগিয়েছে এক একজনকে দানব হতে।

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গে জৌলুশ হারিয়েছে উপাচার্যের পদটিও। এখন বেশিরভাগ উপাচার্য ছাত্রদের অভিভাবক, দক্ষ প্রশাসক, নাকি দলীয় কর্মী তা বোঝা দায়। সন্তানতুল্য ছাত্র আবরার হত্যার ৩৮ ঘণ্টার পর উপাচার্যের সময় হয় ছাত্রদের সামনে আসার, এমনকি আবরারের জানাজায় শামিল হওয়ার সময়ও তিনি পাননি।

এত বড় ঘটনা ঘটার পর ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি জানতেন না যে আবরারের জানাজা হচ্ছে। জানাজায় না থাকলেও দু’দিন পর পুলিশ, প্রশাসন আর দলীয় ক্যাডারদের সহায়তায় নিরাপত্তা নিয়ে তিনি কুষ্টিয়া যান আবরারের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে।

সেখানে মাত্র ২ মিনিটের মধ্যে দোয়া শেষ করার নির্দেশনা আসে, সবাইকে হতবাক করে দিয়ে হামলা হয় আবরারের পরিবারের সদস্যদের ওপর। ৩৮ ঘণ্টা ভিসি কী করেছেন বুঝতে চাইলে দেখা যায় তিনি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন, তিনি ‘অনাকাক্সিক্ষত’ বলে জিডি করছিলেন অথচ মামলা পর্যন্ত করতে হয়েছে সদ্য সন্তানহারা আবরারের পিতাকে।

৫. বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে প্রক্টর, প্রভোস্ট বা ছাত্রকল্যাণ পরিচালক আছেন তারাও তাদের যার যার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। হলের যিনি প্রভোস্ট তিনি কি জানতেন না তার হলে কী হয়? যদি না জানেন তাহলে সেটাই তার ব্যর্থতা এবং এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে তার পদত্যাগ করা উচিত।

আর যদি তিনি জেনেও নীরব থাকেন তবে একজন সহায়ক হিসেবে একই মামলায় তার আসামি হওয়ার কথা। ছাত্রদের সার্বিক কল্যাণ দেখার কথা ডিএসডাব্লুউ বা ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের। গত ৫ বছরে নির্যাতনের শিকার হয়েছে অসংখ্য ছাত্র, যার মধ্যে অন্তত ৩০ জন বুয়েট ছাড়তে বাধ্য হয়।

এ বিষয়টা তার না জানা যেমন অপরাধ তেমনি জেনেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়া আরও বড় অপরাধ। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে যদিও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে, নেপথ্যের আসামি আসলে অনেকে। যাদের সবার উদাসীনতা, অযোগ্যতা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, জবাবদিহিতাহীন অবস্থা আর দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের সব অপকর্মে চোখ বুজে থাকা আজকের এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

শিক্ষার মান আমরা বহু আগেই হারিয়েছি। কারণগুলো চিহ্নিত করলে দেখা যায় নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা, সততার অনেক উপরে স্থান দেয়া হয়েছে ব্যক্তির দলীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়কে।

যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আমরা দেখেছি লন্ডনভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী ‘Times Higher Education’ বলছে, বিশ্বের প্রথম ১০০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। ঠিক যেমন এশিয়ার ৪১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকলেও নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম।

শিক্ষক, প্রশাসক, বুদ্ধিজীবী সবাই সব জানেন। কিন্তু পদ আঁকড়ে থাকার লোভ, প্রমোশনের লোভ, সরকারি নানা উচ্ছিষ্টের লোভ, সরকারদলীয় বড় নেতাদের আনুকূল্য লাভের লোভ, যোগ্যতার বহু ঊর্ধ্বে গিয়ে পাওয়া পদ-পদবির লোভ, এমনকি কপাল খুললে বলা যায় না প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে দু’একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ঘুরঘুর করার সুযোগ তাদের প্রলুব্ধ করে চুপ থাকতে। একটা কথা না বলে পারছি না।

হঠাৎ দেখি সরকারের মোটামুটি সব অপকর্মে নীরব-নিথর থাকা এক জাতীয় অধ্যাপক আবরারের ঘটনায় ব্যথিত। একের পর এক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, খুন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা অত্যাচার, নির্যাতন, বিচারহীনতা, সর্বোপরি নির্বাচনের নামে যা হয়েছে এই দেশে, সেসব নিয়ে কখনই বিচলিত হতে দেখিনি তাকে। তাদের মতো প্রাতঃস্মরণীয় ভারতের পদ্মভূষণে ভূষিত মানুষরা যদি সব অন্যায় আর অন্যায্যতায় এমনিভাবে ব্যথিত হতেন তাহলে আবরারের মতো ঘটনা দেশে বহু আগেই বন্ধ হতো।

আবরার এবং এমন আরও সব খুনে আমরাও দায়ী যারা নিজ নিজ স্বার্থে দিনের পর দিন চুপ থেকেছি। পাশে জ্বলা আগুনের ওম গায়ে লাগিয়েছি আর পরিতৃপ্ত বোধ করেছি এই ভেবে যে, আগুন তো আর আমার গায়ে লাগেনি।

‘নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না’, আপ্তবাক্যটি আওড়াই আমি আপনি; কিন্তু মর্মে এই বাক্য নেই আমাদের। আমাদের সবার ভেতরে একটা করে ব্ল্যাকহোল তৈরি করেছি আমরা। সেখানে ব্ল্যাকহোলের মতো একটা ইভেন্ট হরাইজনও আছে, যার ওপারে আমরা একে একে পাঠিয়ে দেই যাবতীয় নৃশংসতা, বর্বরতা, যেগুলো আর ফিরে আসে না এপারে, ফিরে এসে উপদ্রব তৈরি করতে পারে না আমাদের ভোগের জীবনে।

নিশ্চয়ই আমরা সবাই খুনি। আমরা খুনি আবরারের, আমরা খুনি আগে যত আবরার খুন হয়েছিল তাদের, আমরা খুনি ভবিষ্যতে আরও যত আবরার খুন হতে যাচ্ছে তাদেরও।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য; আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহসম্পাদক, বিএনপি

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০