সংগঠন দায় এড়াতে পারে কি?

  কামাল লোহানী ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সংগঠন দায় এড়াতে পারে কি?
বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ। ফাইল ছবি

আবরার ফাহাদ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী। ঢাকা ফিরে কুষ্টিয়ায় মাকে জানিয়েছিল, সে নিরাপদেই পৌঁছেছে। এটি সন্ধ্যাবেলার কথোপকথন; কিন্তু এরপর বর্বরতার হিংস্রতায় তার জীবন প্রদীপ নিভে গেল।

শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ‘টর্চার সেল’ নামে পরিচিত ২০১১ নম্বর কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে খুনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন শিক্ষার্থী, যারা ছাত্রলীগের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নানা পদে অধিষ্ঠিত। তাদের নাকি জিজ্ঞাসা ছিল, সে শিবিরের কর্মী কিনা

আবরার যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে, ততই ছাত্রলীগ নেতারা তাকে পেটানোর মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। পেটাতে পেটাতে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে নিয়ে গেছে এবং সে শিবির করে এমন স্বীকারোক্তি জবরদস্তিমূলক তার মুখ থেকে বের করার চেষ্টা করেছে; পারেনি। মারধরের মাত্রা ক্রমেই বেড়েছে।

দু’জন ডেকে নিয়ে গেলেও বেদম পেটানোতে অংশ নিয়েছে অনেকে। অবশেষে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্নের জবাব না পেয়ে প্রচণ্ড প্রহারে ক্ষতবিক্ষত অবসন্ন দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার পর কী করবে এ লাশ নিয়ে ছাত্রলীগ নেতারা, সে ভাবনায় দৌড়াদৌড়ি করছিল। অবশেষে তাকে সিঁড়ির কাছে ফেলে রেখেছিল।

শোনা যায়, প্রহারে প্রহারে অজ্ঞান হয়ে গেলে- কী বীভৎস, ভাবতে অবাক লাগে, ওই ছাত্রলীগ নেতারা আবরারকে কক্ষে ফেলে রেখে মাঝরাতে খাবারও খেতে গিয়েছিল এবং ফিরে এসে তাদের ‘কাজ’ সম্পন্ন করে আবরারকে সিঁড়িতে ফেলে রাখে। আবরার মেধাবী ছাত্র ছিল। সে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিল। সে পোস্টের সঙ্গে ছাত্রলীগ বা ক্ষমতাসীনদের মতের মিল ছিল না। সেজন্য ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক’রা তা সহ্য করতে না পেরে তাকে মেরেই ফেলেছে। কী আশ্চর্য, কী বীভৎস এ ঘটনা!

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সংঘাতপূর্ণ রাজনীতিতে ইতিপূর্বে সম্পৃক্ত ছিল না। বেশ কিছুদিন আগে সনি হত্যা আর এবার আবরার হত্যার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ইতিপূর্বে কখনও ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির জন্য ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মীকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অপসারণ করেছেন।

এটি ছিল এক অসাধারণ সিদ্ধান্ত। শুধু কী তাই, তারও আগে একসময় ছাত্রলীগের আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি ‘সাংগঠনিক উপদেষ্টা’র দায়িত্বও ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রলীগের মধ্যে এর কোনো প্রভাব পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। না হলে বুয়েটে আবরার হত্যার মতো ঘটনা ঘটবে কেন?

এদিকে এ ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তারা ১০ দিন ধরে উত্তাল ক্যাম্পাসে ভিসি, শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ ও ছাত্রকল্যাণ দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের অপসারণসহ ১০ দফা দাবির ভিত্তিতে দিনভর জমায়েত হয়েছে এবং খুনিদের সবাইকে গ্রেফতার, আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার, আবরারের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান ইত্যাদিসহ ১০ দফা দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। কী আশ্চর্য! বীভৎস বর্বরতার শিকারে পরিণত হয়ে তারই এক ছাত্র প্রাণ দিল; অথচ ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তিনি এলেন না, এমনকি হত্যার শিকার আবরার ফাহাদের জানাজায়ও উপস্থিত হলেন না।

হায়রে নির্মম পিতা, সন্তানের মৃত্যুতেও মনে তার কোনো শোক সৃষ্টি হল না। শিক্ষার্থীরা প্রথমদিন নিরবচ্ছিন্ন বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ভিসির উপস্থিতি দাবি করছিল, কিন্তু তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে না এসে কিংবা আবরার ফাহাদের হত্যার খবর শুনেও অনুপস্থিত থেকে, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়েছিলেন বলেই মনে হয়।

অবশেষে সেই ভিসি আন্দোলনকারীদের সামনে উপস্থিত হতে বাধ্য হন। বিক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত ভিসি সাইফুল ইসলাম নানা অজুহাত দেখিয়ে তার অনুপস্থিতিকে জায়েজ করার চেষ্টা করছিলেন; কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হচ্ছিল না।

তারা ১০ দফার দাবি তাকে জানিয়ে আবরারের হত্যার বিচার, পরিবারকে সহযোগিতা, লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি বন্ধ, প্রাধ্যক্ষের অপসারণ ও ভিসির পদত্যাগ ইত্যাদি দাবিতে সোচ্চার ছিল।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ নেতাদের মতো অসহিষ্ণু হয়নি, তারা ভিসি সাইফুল ইসলামকে রাত সাড়ে ৯টায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়। এদিকে আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা তো বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলই, এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও যুক্ত হলেন, সংহতি প্রকাশ করলেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এ নির্মম হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবিও জানিয়েছে। সেই সঙ্গে তারা বলেছে, ‘ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ কখনও এ ধরনের নৃশংসতায় অংশগ্রহণ করতে পারে না।’ আমি এ তরুণ বন্ধুদের বলতে চাই, ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল অতীত পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসই মনে করিয়ে দেয়। মহান ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার কথা অবিস্মরণীয়। পরবর্তীকালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা, ছাত্রদের ১১ দফা এবং ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, সর্বোপরি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সাক্ষ্য দেয় ছাত্রলীগের গর্বিত অতীতের।

কিন্তু বন্ধুরা, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ছাত্রলীগ সেই ঐতিহ্যকে ধরে এগিয়ে চলতে গিয়েও কেন বিভিন্ন সময় হোঁচট খেয়েছে? আর ঐতিহ্যের পাশাপাশি আদর্শকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ক্ষমতার দাপট যখন জড়িত হয়েছে, তখনই এমন কিছু কিছু ঘটনা ছাত্রলীগ কেন জন্ম দিয়েছে- এ প্রশ্ন আজ কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মনেও।

অতীতে ক্ষমতাসীন অবস্থায় বিএনপি এবং অন্য পার্টিকেও দেখেছি, তারাও নতুন করে ছাত্র সংগঠন দাঁড় করিয়ে অন্যদের ঠেঙানোর কাজ তাদের দিয়ে করিয়েছে। সেই কুৎসিত ও অবাঞ্ছিত ঘটনাপঞ্জির কথা শিক্ষার্থীরা যেমন, তেমনি দেশবাসীও ভুলতে পারেনি। তাই বলছিলাম, ঐতিহ্য যে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, সেই সংগঠন যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন, তার আচরণ তো গণতান্ত্রিক ও উদার হওয়া উচিত। নিজের দুর্ব্যবহারের সুযোগে প্রতিক্রিয়াশীলদের জায়গা করে দেয়া উচিত নয়, ওরা তো সুযোগ গ্রহণের জন্যই ওঁত পেতে থাকে। ওরা তো মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ভাড়াটে ও ঠেঙারে বাহিনী।

বিরোধী দল বলতে যদি বিএনপিকে ভাবি, তাহলে তাদের সৃষ্ট ছাত্রদল ক্ষমতার প্রতাপে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আমলে যেসব কুকর্ম করেছে, তার কথা তো দেশের মানুষ ভোলেনি। এটা ঠিক, সংগঠনের পদধারী যদি কেউ কুৎসিত কিংবা ভয়ংকর ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকে তাহলে সেই সংগঠনের ওপরই গিয়ে সবার ক্ষোভটা পড়ে, তা এড়ানো যায় না। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে। কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, ব্যক্তি অপরাধ করলে সংগঠনকে জড়িত করা উচিত নয়।

কথাটা যদি মেনেও নিই, তাহলে প্রশ্ন ওঠে পদধারী এতজন যখন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত তখন কী করে সংগঠনের দায় এড়ানো সম্ভব? অতীতে কখনও কোনো দুর্ঘটনা বা অঘটন ঘটলে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের নেতারা তা স্বীকার করে তীব্র নিন্দা করেছেন এবং সেই সঙ্গে দায়ও স্বীকার করে নিয়েছেন।

তাই আমার ধারণা, একজনও যদি এ ধরনের কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তা মেনে নিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা ও নীতি-নৈতিকতার বিচারেই তার শাস্তি হওয়া উচিত, এড়িয়ে যাওয়া নয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দলীয়প্রধান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও, তার কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, সব ব্যাপারে যাতে দলের সাধারণ কিংবা প্রচার সম্পাদকের অথবা কোনো মন্ত্রী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করেন, এটা নিশ্চিত করুন।

ছাত্ররা যেখানে জড়িত সেখানে ছাত্রলীগ নেতারাই এর জবাব দেবে, অন্য কারও উপযাচক হয়ে কথা বলা উচিত নয়। আর তরুণ বন্ধুদের বলব, ঘটনা যদি সত্যি হয়, আর সংগঠনের ভেতরে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি যদি থাকে তবে ‘ছদ্মবেশী অপশক্তি’ প্রশ্রয় পাবে।

ছাত্রলীগের বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, নিজেদের সংগঠনের বাইরে বহু রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন রয়েছে, তারা সবাই যে তোমাদের সঙ্গে একমত হয়ে কথা বলবে, তাইবা ভাবছ কেন? গণতান্ত্রিক পদ্ধতি যদি মানতেই চাও, তাহলে কিন্তু অন্যের মতকে মেনে নেয়া বা তার প্রতি সহনশীল হওয়া অতীব প্রয়োজন। মতের মিল হল না বলে তাকে শিবির তকমা লাগিয়ে হত্যা করাটা কি গণতান্ত্রিক?

আপনারা এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই ‘অনুপ্রবেশকারী’র অপকর্ম বলে নিজেদের দায় এড়াতে চান, এটা ঠিক নয়। মনে রাখবেন, আপনারা কিন্তু নিজেরা নিজেদেরই ফাঁকি দিচ্ছেন। আর এতে করে সংগঠনের সুনামই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

আমাদের সবার ধারণা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তো কট্টর বাঙালি জাতীয়তাবাদী মন-মানসিকতার সংগঠন, সেখানে ‘অনুপ্রবেশ’ করার সুযোগটা পায় কী করে? এর জন্য আপনাদের মধ্যেই কেউ কেউ দায়ী নয়?

সুতরাং, সংগঠনের শৃঙ্খলাকে মজবুত করে ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠনের সুনাম রক্ষা করার দায়িত্ব নেতৃত্বের। আর নেতৃত্বকে সজাগ-সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ভিন্ন মতাবলম্বী কেউ দলে প্রবেশ করতে না পারে। সংগঠন যদি কোনো অঘটনের দায় এড়িয়ে যেতে চায়, তাহলে কিন্তু ‘অনুপ্রবেশকারী’ দুষ্কৃতকারীরাই প্রশ্রয় পাবে।

কামাল লোহানী : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×