Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

Advertisement

Icon

সৈয়দ আশরাফুর রহমান

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী ও বিশ্বস্ত বন্ধু। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ, স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনে সহায়তার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। স্বাধীনতার পর থেকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এ সম্পর্ক ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগেও এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে জাপানের ভূমিকা ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি সহযোগিতা করেছিল। সিলেট ও ঘোড়াশালে সার কারখানা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ইস্পাত কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জাপানের সংবাদমাধ্যম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি সমর্থন জানান। জাপান সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ শাখা গঠন করে, যার মাধ্যমে জাপানে অবস্থানরত বাঙালিদের স্বার্থ রক্ষা ও সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। একই বছরের মে মাসে জাপান পাকিস্তানকে সহায়তা প্রদান স্থগিত করে এবং আগস্টে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেয়। এভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনেও জাপান ভূমিকা রাখে।

স্বাধীনতার পর জাপান বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে সহযোগিতা শুরু করে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রেও দেশটি সমর্থন জানায়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফর দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের তৎকালীন ক্রাউন প্রিন্স আকিহিতো ও ক্রাউন প্রিন্সেস মিচিকোর বাংলাদেশ সফর দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করে।

১৯৭৭ সালে জাপান এয়ারলাইনসের একটি ছিনতাই হওয়া বিমান ঢাকায় অবতরণের পর বাংলাদেশ সরকার দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। এতে জাপানের সরকার ও জনগণের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়।

রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব

বাংলাদেশ ও জাপানের পররাষ্ট্রনীতিতে বেশকিছু মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় দেশই শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা মোকাবিলা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে গুরুত্ব দেয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়নে জাপান বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সমর্থনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার এবং উত্তর কোরিয়াবিষয়ক প্রস্তাবের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা লক্ষ করা যায়।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাপান বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদান, আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে দেশটি ভূমিকা রাখছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য মানবিক সহায়তা দিয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করতে মিয়ানমারকে ৩০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করে জাপান।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাংলাদেশকে প্রায় ৪৫ লাখ ডোজ টিকা, চিকিৎসাসামগ্রী এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করে জাপান। ২০২১ সালের নভেম্বরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে মহামারি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে ৪০ বিলিয়ন ইয়েনের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে।

২০১৪ সালে দুই দেশের সম্পর্ক ‘সামগ্রিক অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। একই সময় বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০২৩ সালে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। এর মধ্যদিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান জাপানের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। জাপানের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জাপানের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমব্যয়, তৈরি পোশাকশিল্প, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাবনা জাপানি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। তবে এ সহযোগিতার প্রধান ভিত্তি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক স্বার্থ।

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের অবদান

জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র তিনটি। প্রথমত, বেসরকারি খাতের বিকাশ, পরিবহণ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো, কৃষি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির সহায়তায় বাংলাদেশে ৬০০টিরও বেশি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে এবং পাঁচ হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়নে সহযোগিতা পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপানের সহায়তায় প্রায় ২ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা গড়ে উঠেছে। দেশের ৬৪টি জেলায় অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ উন্নয়ন মডেল শক্তিশালী করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৪৯৬টি উপজেলার মধ্যে ৪৯২টিতে প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা হয়েছে।

ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে জাপানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেল প্রকল্প নগর পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এছাড়া হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পেও জাপানের সহায়তা রয়েছে। আড়াইহাজারে বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও খুলনার প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহে জাপান সহায়তা করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য পরিবেশবান্ধব ২৬২টি যানবাহন সরবরাহ করা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে ১১৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, পাঁচটি আবহাওয়া রাডার স্থাপন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে ২৪০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে সহায়তা করেছে জাপান। এ ছাড়া দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে ৩০০টি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ এবং পোলিও নির্মূলে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়নে ৭০ হাজার শিক্ষককে পাঠ পর্যালোচনাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও জাপানের অবদান উল্লেখযোগ্য। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যৌথভাবে ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজও করেছে জাপান। এসব উদ্যোগ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষকের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা

জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশ জাপানে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, চিংড়ি ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে। অন্যদিকে জাপান থেকে বাংলাদেশ লোহা, ইস্পাত, যানবাহন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানি করে।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাপানে ১২০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং জাপান থেকে ১৮০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। এ বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগও ক্রমাগত বাড়ছে। ৩২০টিরও বেশি জাপানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উৎপাদনশিল্পে এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শ্রমব্যয় বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যিক বিরোধের কারণে বাংলাদেশ জাপানি বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। আড়াইহাজারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে বিদেশি সহায়তা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। নির্ভরশীলতা তত্ত্বের প্রবক্তারা মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগ ও সহায়তার মাধ্যমে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশ থেকে মুনাফা ও সুদ অর্জন করে সম্পদ নিজেদের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর আধুনিকায়ন ও শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনে বৈদেশিক সহযোগিতার গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিদেশি সহায়তা ও বিনিয়োগকে এমনভাবে কাজে লাগানো, যাতে তা দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ায়। একইসঙ্গে ঋণের শর্ত, প্রকল্পের ব্যয়, অর্থনৈতিক সুফল এবং পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

উপসংহার

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসাবে ভূমিকা পালন করে আসছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জাপানের অবদান বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। রোহিঙ্গা সংকট ও কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকটেও জাপান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।

তবে এ অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করতে কিছু বাধা দূর করা জরুরি। জাপানে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য শুল্ক ও শুল্কবহির্ভূত বাধা কমানো, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দ্বৈত করব্যবস্থাসহ বাণিজ্যিক জটিলতা দূর করতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও জবাবদিহিমূলক আইনি কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি। কোম্পানি আইন, পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিধিবিধান এবং অন্যান্য করপোরেট আইন নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে আইনের কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও উন্নয়ন সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এ সম্পর্কের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যেতে পারবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা সম্ভব হবে।

সৈয়দ আশরাফুর রহমান : অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

সাক্ষাৎকার উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম