Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান-সংশ্লিষ্টদেরও নজরদারি দরকার

Advertisement

Icon

মেজর রেজাউল করিম (অব.)

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান-সংশ্লিষ্টদেরও নজরদারি দরকার

Advertisement

প্রত্যেক জাতির ক্ষেত্রে এমন কিছু সময় আসে, যে সময়গুলো সে জাতির দীর্ঘমেয়াদে ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে সে ধরনের একটা সময় অতিক্রম করছে।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মূল্যবোধ- সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিবর্তনের ফলাফল কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে সমাজজীবনে সার্বিকভাবে মানুষের মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা রয়েছে। এ অস্থিরতা অবশ্যই তার নিজের ও সমাজের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে, সে বিষয়ে। গত এক দশকে বাংলাদেশে যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়েছে, তা একটা জাতিকে উন্নয়নের একটা স্তর থেকে আরেকটা স্তরে নিয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো মানুষের মনে স্বস্তি এনে দিতে পারছে না। এর বড় কারণ হিসেবে বলা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও মানবিকতার সংমিশ্রণ যথাযথ না হওয়া।

সার্বিকভাবে অর্থনীতির সূত্র মেনে এ কথা সবাই স্বীকার করবেন, দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, মানুষের আয় বাড়ছে, জীবনযাত্রার মান ও ব্যয় বাড়ছে। আবার এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না, এগুলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, হত্যা, খুন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ইত্যাদিও বাড়ছে। শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান কমছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও মানুষের ক্যালরি গ্রহণ কমছে।

চিকিৎসাসেবার মান ও পরিসর বাড়লেও মানুষের অসুস্থতার হার বাড়ছে। আয় বেড়েছে, সম্পদ বেড়েছে, পাশাপাশি সম্পদ বণ্টনের বৈষম্যও বেড়েছে, আয়-বৈষম্য বেড়েছে। অর্থাৎ ইতিবাচক উন্নয়ন বা পরিবর্তনের অনেক নিদের্শক চোখে পড়লেও তা আমাদের স্বস্তি এনে দিতে পারছে না। কারণ ইতিবাচক উন্নয়নের পাশাপাশি এগুলো স্থায়িত্বের যে নির্ধারকগুলো রয়েছে, সেগুলো খুব ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এ বিষয়গুলো আমাদের যেমন ভাবিয়ে তোলে, তেমনি সম্ভবত দেশের সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একজন নাগরিক হিসেবে এ ভাবনাগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক সরকারই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্বের পেছনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে যেটা চিহ্নিত হয়েছে, তা হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি কমানো সম্ভব হলে আমাদের এ দেশের অনেক সমস্যার সমাধান স্বাভাবিকভাবেই হয়ে যাবে। দেশের সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী হয় তো এ বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন।

অন্যান্য সরকার ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে মূল পার্থক্যের জায়গা হচ্ছে দুর্নীতি দূরীকরণে তিনি যে অভিযান শুরু করেছেন, তা করেছেন নিজের দলের অভ্যন্তর থেকে। এর আগে কখনও কোনো সরকারই এ সৎসাহস দেখাতে পারেনি। কিন্তু এরপরও প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে হয়তো অনেক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। তবে আজকের এ লেখায় আমি একটিমাত্র বিষয় উল্লেখ করতে চাই, আর তা হল- দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটা পোস্ট অনেককে শেয়ার করতে দেখেছি। পোস্টটি ছিল এমন- ‘৫২ জন মন্ত্রী, ৬৪ জন সচিব, ৩৫০ জন এমপি, ৬৪ জন ডিসি, ৬৪ জন এসপি, ৪৯০ জন ইউএনও, ৬৫০ জন ওসি সৎ হ?লেই বাংলাদেশের দুর্নীতি পালাতে বাধ্য হবে।’ ফেসবুকে তো মানুষ কতকিছুই শেয়ার করে। সবকিছুতে নজর না দেয়াই ভালো। এ পোস্টটাও কেউ তেমন গুরুত্বহীন ভাবতে পারেন। তবে এ পোস্টের একটি গূঢ় বার্তা আছে, যে বার্তাটিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বার্তাটি হল ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভেতরে অনেকে অসৎ।’ বার্তাটা যদি এমনই হয় তাহলে এটি ভয়ংকর। আবার এ বার্তাটিকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না।

বাংলাদেশের যেসব প্রতিষ্ঠান সমাজের অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে কাজ করে তার মধ্যে জনপ্রশাসন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অন্যতম। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু এতগুলো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন একটি প্রতিষ্ঠান কি রয়েছে, যার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি? এমনকি এগুলোর প্রতিটির কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো না কোনোভাবে মামলা হয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, অনেকে সাজাও পেয়েছেন। তার চেয়েও বড় কথা- সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশই মনে করে এসব প্রতিষ্ঠান আদতে নিজেরাই অসৎ। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, এরা টাকার বিনিময়ে যে কোনো কিছুকে পাল্টে দিতে পারেন বা পাল্টে দেন। সাধারণ মানুষ এটাও মনে করে, দেশের কোনো প্রান্তে মাদক, চুরি, ছিনতাই, খুন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, লুটপাটসহ এমন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় না, যে অপরাধ সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো না কোনোভাবে অবগত থাকে না। অর্থাৎ সব ধরনের অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কোনো না কোনোভাবে তথ্য থাকে। তারা কখন কীভাবে কাকে পাকড়াও করবেন, তা একান্তই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট।

এ অবস্থায় গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সরকার যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে, তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহা অভিযান অনেকের কাছে টাকা উপার্জনের মাধ্যম হতে পারে। এ অবস্থায় যেহেতু এ অভিযান একান্তই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নিজের ইচ্ছা ও সাহসের বহিঃপ্রকাশ, সেহেতু প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে বিশ্বাস করা কঠিন। চারদিকে যখন এত অবিশ্বাস, তখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহা অভিযান অব্যাহত রাখতে ও সফল করতে অভিযান পরিচালনাকারী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বাহিনী ও অধিদফতরের ওপর একটি কাউন্টার ফোর্স তৈরি করা দরকার, যারা অভিযান পরিচালনাকারীদের তদারকি করবেন। আর এ কাউন্টার ফোর্সের সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দেখা যায়। আমাদের দেশেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার সুফল মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়ার জন্য এমন একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

মেজর রেজাউল করিম (অব.) : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

 

Advertisement

দুর্নীতি

Advertisement

আরও পড়ুন

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম