সুবোধ পালাবে, কিন্তু যাবে কোথায়?
Advertisement
জয়া ফারহানা
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যদি পড়তে ভুল করে না থাকি তবে মানতেই হবে আমাদের সংবিধান স্বাধীন ও সার্বভৌম ব্যক্তিসত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিকের জন্য ব্যক্তিসত্তার প্রধান গ্যারান্টি এ সংবিধান। কিন্তু ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ নামের এ মৌলিক অধিকার কতটুকু রক্ষা পাচ্ছে?
অজ্ঞাতসারে, অজানায়-অনিচ্ছায় আমাদের ব্যক্তিগত কথা, ছবি নিরাপদ পরিসরের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কীভাবে কেমন করে আমরা অন্যের কাছে একটা খোলা বই হয়ে যাচ্ছি? আপনি, আমি, আমরা কেউই কিন্তু এ বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্ত নই।
ধরুন, কোনোদিন হয়তো আপনি কোনো একটি ফ্ল্যাটের বুকিং দিতে চেয়েছিলেন বলে ইন্টারনেটে সার্চ দিয়েছিলেন কোথায় আপনার চাহিদামাফিক ফ্ল্যাট পাবেন। এরপর আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন বিষয়টি।
এ ঘটনার বছরখানেক পরও আপনি যদি ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি কমছে কি না এমন কোনো প্রবন্ধ অনলাইনে পড়েন দেখবেন চট করে ‘কোথায় সস্তায় ফ্ল্যাট পাওয়া যায়’জাতীয় কোনো বিজ্ঞাপন ডান দিকের কোনায় উঁকি দিয়ে গেল।
অর্থাৎ কেউ না কেউ অথবা ফেসবুক নিজেই তার স্মৃতিতে আপনার এ চাহিদার তথ্যটি ধরে রেখেছিল। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের আইনজীবী টিমস পারাপানি, যিনি ফেসবুকের একজন সাবেক নীতিনির্ধারকও, বলছেন ‘আমরা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে যতটুকু জানি ফেসবুক তার চেয়ে বেশি জানে।’
কী ভয়ংকর! মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছে, বিশ কোটি মার্কিন নাগরিকের জনপ্রতি অন্তত পনেরোশ’টি তথ্য মজুদ রয়েছে তাদের কাছে। না জানি আমাদের কী দশা! ডেটা সেলফি সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের আচরণ বিশ্লেষণ করে তাকে বিভিন্ন তকমায় বিশেষিত করার রেওয়াজ তো আছেই।
কে আর কাকে বোঝায় সোশ্যাল মিডিয়া আর যাই হোক ব্যবহারকারীর যথার্থ ফেস দেখায় না; কিন্তু কোনো পোস্টে লাইক দেয়ার মতো তাৎক্ষণিক একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেও কত বড় বড় দুর্ঘটনা যে ঘটে যাচ্ছে ব্যক্তিজীবনে!
তথ্য গোয়েন্দাদের চব্বিশ ঘণ্টা এহেন নজরদারি ফেসবুক ব্যবহারকারী সব নাগরিকের ওপর। ফেসবুক ওয়াল তো বটেই, বাস্তব দেয়ালগুলোও কি আমাদের নিজেদের? সেই দেয়ালেও রাজনৈতিক নেতাদের চাটুকাররা তোষামোদি বাক্য দিয়ে ভরে রাখেন এবং তা আমাদের অনুমতি ছাড়াই।
শরীর, মন, চেতনা, ব্যক্তিগত বলে কিছু আর থাকছে না। কে মুক্তমনা, কে বামপন্থী, কে ধর্ম মানে আর কে মানে না সব তথ্যই জানা এ অদৃশ্য গুপ্তচরদের। তবে সঠিকভাবে কি না, সেটাই প্রশ্ন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের এ অদৃশ্য গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়ে আইন কী বলে?
কোনো সমাজে যখন তর্ক-বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা, ভিন্নমত, ভিন্নমতের সহাবস্থান থাকে তখন বুঝতে হবে সে দেশের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বাস্থ্য ভালো আছে। অন্তত গণতন্ত্র হাইপারটেনশন বা ট্রমায় নেই।
আবার অসাম্য ও বিভেদ যদি রাজনীতির মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে, শ্রেষ্ঠত্বের অহংবোধ যদি জাতিগত ঐক্য ও সমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্র গভীরভাবে অসুস্থ।
অসুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে যুক্তি ক্রমেই দূরে সরতে থাকে। উগ্র জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ রাজনীতি ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে ফেলে। এসব সূচকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবস্থান কোথায়?
ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে কতটুকু? বাকস্বাধীনতায় কি সরকার বাধা দিচ্ছে? কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গত কয়েক বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে বলে বিভিন্ন সময় মন্তব্য করা হয়েছে।
এমন প্রতিবেদন পড়তে খারাপ লাগে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সময় বহুত্ববাদ, গণতন্ত্রকে আমরা শিরা-উপশিরা, ধমনিতে বহন করতাম। ইতিহাসের সেই পৃষ্ঠাগুলো অনেক মর্মস্পর্শী ঘটনায় ভারাক্রান্ত। যারা আমাদের সংবিধান রচনা করেছেন তারাও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও পরবর্তীকালের প্রতিটি সরকার তা মুখে স্বীকার করলেও কাজের ক্ষেত্রে অস্বীকার করেছে।
প্রতিটি শাসনামলে শাসক শ্রেণি তাদের অন্যায় কার্যকলাপ অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রের বিরোধিতা হিসেবে নিয়েছেন। এটি একরকম বিপজ্জনক অতি সরলীকরণ। শাসক শ্রেণির সমালোচনাকারীকে কখনও তকমা দিয়ে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহী, কখনও উন্নয়নবিরোধী হিসেবে।
একবার ভাবুন, শুধু ভিন্নমত প্রকাশের কারণে রাষ্ট্রযন্ত্র যখন একজন নাগরিককে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে তখন সেই নাগরিক কী অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক। বাংলাদেশ ছোট্ট দেশ।
জনসংখ্যার ঘনত্বে প্রতি বর্গকিলোমিটারে এখানে এক হাজার একশ’ পাঁচজনের বসবাস। এখন হয়তো এ সংখ্যা আরও বেশি। এমন একটি জনঘনত্বের দেশে এত মোটাদাগের বিভাজন কখনও ভালো হতে পারে না।
প্রতিটি পেশাজীবী শ্রেণি অনেক আগে থেকে বিভাজিত হয়ে আছে। পেশার স্বার্থেও তারা এক হতে পারে না। কে জানে কখন এমন পরিস্থিতি দেখতে হয় যে, আওয়ামীপন্থী চিকিৎসক শুধু আওয়ামী সমর্থকদেরই দেখবেন, বিএনপিপন্থীদের দেখবেন না, বিএনপিমনা আর্কিটেক্ট আওয়ামী লীগারদের বাড়িঘরের নকশা করে দেবেন না, আওয়ামী আইনজীবীরা বিপদগ্রস্ত বামদের জন্য আইনি লড়াই লড়বেন না।
এ যেন সেই গান্ধারির মতো- নিন্দারে করিব ধ্বংস কণ্ঠ রুদ্ধ করি/নিস্তব্ধ করিয়া দিব মুখরা নগরী। বাস্তবিকই নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে মুখরা নগরী। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের ফেক আইডি থেকে একখানা পোস্ট আপলোড করে মনে মনে নিজেকে বিপ্লবী ভাবা ছাড়া মত প্রকাশের প্রায় সব পথ বন্ধ।
কোন গরলে গণতন্ত্রের এমন নীলকণ্ঠ দশা? ইহুদি ইতিহাসের রাজা প্রাজ্ঞ সলেমানের বহুশ্রুত গল্পটি আবার বলি। দুই রমণী যখন একটি শিশুকে নিয়ে আর্জি জানাল, বলে দিন আমাদের মধ্যে কে এর প্রকৃত মা, তখন সলেমান আদেশ দেন শিশুটিকে দুই অংশে কেটে রমণীদ্বয়ের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হোক।
তখন ওই দুই রমণীর প্রথমজন বলে ওঠে শিশুটির মৃত্যু সে চায় না বরং তাকে নিয়ে যাক তার প্রতিদ্বন্দ্বী। সলেমান তখন তার আদেশ প্রত্যাহার করে পাল্টা আদেশ দেন শিশুটিকে প্রথম রমণীর কাছে প্রত্যর্পণ করা হোক; কারণ সে-ই শিশুটির প্রকৃত মা। শেষ পর্যন্ত শিশুটির বিভাজন রক্ষা করা গিয়েছিল সলেমানের প্রাজ্ঞতায়।
আমাদের দেশটি কি বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা পাবে?
অতিরিক্ত ক্ষমতালোভী একটি শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা কোনোভাবেই ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারছে না। তাহলে তারা যে পরিমাণ বিত্ত-বৈভব ক্ষমতা দিয়ে একেকটি ক্ষুদ্র রাজ্য তৈরি করেছেন তা থেকে পতিত হতে হয় তাদের।
ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে রানী মারি আঁতোয়ানেত খেতে না পাওয়া অভুক্ত দরিদ্র দেখে বলেছিলেন, ওরা রুটি খেতে পারছে না তো কী হয়েছে, কেক তো খেতে পারে। কেকের দাম যে রুটির চেয়ে অনেক বেশি, জনবিচ্ছিন্ন রানী তা জানতেন না।
ক্ষমতাসীনদের একটি অংশের এমনই জনবিচ্ছিন্ন অবস্থান। ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রভাব খাটিয়ে তারা নিজেদের জন্য বেগমপাড়ায়, মালয়েশিয়ায় বাস্তিল দুর্গের মতো প্রাসাদ তৈরি করে রেখেছেন। দেশের অর্থনীতি, দেশের বাজার, দেশের শিক্ষা কোনোকিছু সম্পর্কেই তাদের কোনো ধারণা নেই।
এরাই মারি আঁতোয়ানেতের মতো খেতে না পাওয়া অভুক্ত মানুষ দেখে বলতে পারে ওরা রুটি খেতে পারছে না তো কী হয়েছে, কেক তো খেতে পারে!
ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে ‘বাগে বৈদৎ সর্বং বিজ্ঞাপয়তি।’ যদি বাক না থাকত তবে ধর্ম-অধর্ম, সত্য-অসত্য, সাধু-অসাধু, প্রীতিকর-অপ্রীতিকর কিছুই বোঝা যেত না। সুতরাং বাকই মা জননী। বৃহদারণ্যকের ঋষি বলেছেন, ‘মনঃয়েব পিতা; বাক মাতা, প্রাণ প্রজা’। উপনিষদে সেই কবে বলা হয়েছে বাকস্বাধীনতার কথা। আজ এ একুশ শতকেও প্রজা বা নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা বাস্তবায়ন হল না।
যে প্রজাকে রাষ্ট্রের প্রাণ বলা হচ্ছে সেই প্রাণও প্রাণরূপে আছে? ভিন্নমতের অবস্থান নিষ্ক্রিয়-নিষ্প্রভ, প্রায় সমাধিপ্রাপ্ত। ক্ষমতাসীন শ্রেণির একাংশের অপশাসন, অরাজকতা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে নানাভাবে হেনস্তা হতে হচ্ছে।
সন্দেহ নেই মানুষের প্রতিবাদী স্বভাব ধর্মকে নির্মূল করার জন্যই এ হয়রানি। এমনকি সাধারণ মানুষের সংঘবদ্ধ শক্তিকেও নানা বিতর্কিত ট্যাগজুড়ে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। আমি বা আমার লোকেরাই সব, এ একটি মাত্র একাত্মতা যখন অন্য আর সব একাত্মতাকে দমিয়ে বা দাবিয়ে রাখে, সমস্যা তৈরি হয় তখনই।
জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
