দেশে কতজন ডাক্তার প্রয়োজন?
jugantor
দেশে কতজন ডাক্তার প্রয়োজন?

  ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন  

১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন
লেথক: অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

দেশে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে নিবন্ধনকৃত আনুমানিক সত্তর হাজার এমবিবিএস পাস করা ডাক্তার সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত। তার মধ্যে ক্যাডার-নন-ক্যাডার মিলিয়ে প্রায় ত্রিশ হাজার ডাক্তার সরকারি পর্যায়ে কাজ করছেন।

বর্তমানে শতাধিক মেডিকেল কলেজ থেকে প্রতি বছর প্রায় দশ হাজার ছাত্রছাত্রী ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে কোনো দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার থাকা উচিত।

জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশসহ ৪৪ শতাংশ দেশে এখনও জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তারের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ২ হাজার ৫শ’ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এই মুহূর্তে আমাদের কমপক্ষে দেড় লাখ ডাক্তার থাকা দরকার ছিল।

আমাদের দেশে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে চাকরি বলতে এখনও সরকারি চাকরিই বুঝি। পাস করার পর অধিকাংশ ডাক্তারের স্বপ্ন থাকে বিসিএস পাস করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার।

কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় পদ স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ ডাক্তারেরই এই স্বপ্ন আজকাল অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সরকারি ডাক্তারের চেয়ে দেশে এখন বেসরকারি ডাক্তারের সংখ্যা বেশি। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ডাক্তারের সংখ্যা দিন দিন আরও বাড়বে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় এই বিশাল বেসরকারি চিকিৎসকদের কীভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবতে হবে।

বর্তমানে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক ধরনের হযবরল অবস্থা বিরাজমান। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা শহরে একজন নবীন বেসরকারি ডাক্তারের চেয়ে একজন রিকশাওয়ালার মাসিক আয় তুলনামূলকভাবে বেশি। আমি জানি না, এই দুঃসহ বাস্তবতা আমাদের নীতিনির্ধারক কিংবা পেশাজীবী নেতাদের আদৌ ব্যথিত করে কিনা! বাংলাদেশে একজন গার্মেন্টস কর্মীর ন্যূনতম বেতন নির্ধারিত থাকলেও একজন নবীন ডাক্তারের ক্ষেত্রে তা নেই। দালাল পরিবেষ্টিত ক্লিনিক ব্যবসায় মুনাফার লোভে মালিকরাও যে যার মতো পারছে নবীন ডাক্তারদের পারিশ্রমিক প্রদানের বেলায় ঠকাচ্ছে। এসব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দেখার যেন কেউ নেই।

উন্নত বিশ্বে রেফারেল সিস্টেম চালু আছে। ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা ছাড়া যে কোনো অসুখের জন্য রোগীকে প্রথমে একজন সাধারণ এমবিবিএস পাস করা বা সমমানের কোনো ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।

এই ডাক্তারদের সাধারণত জেনারেল প্রাক্টিশনার বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বলা হয়। এরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যদি মনে করেন রোগীর উন্নত মানের চিকিৎসা লাগবে, তাহলেই কেবল তারা রোগীকে প্রয়োজনীয় বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠান বা রেফার করেন। আমাদের দেশের মতো সামান্য সর্দি-কাশি বা ঠাণ্ডাজ্বর হলেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে সরাসরি চলে যাওয়ার সুযোগ সেখানে নেই।

এর ফলে জেনারেল প্রাক্টিশনাররা যেমন সাধারণ রোগীদের দেখার সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররাও অপ্রয়োজনীয় রোগী দেখে সময় নষ্ট না করে জটিল রোগীদের অধিক মনোযোগ সহকারে দেখতে পারেন। এর ফলে ডাক্তারদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপ্তিও বাড়ে। আমাদের দেশেও এ ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। তাহলে এখন যেমন ডাক্তারদের মধ্যে এফসিপিএস, এমডি, এমএসসহ বিভিন্ন ধরনের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করার জন্য এক ধরনের অসুস্থ উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে, সেটি তখন অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

গুরুত্ব বাড়বে এমবিবিএস ডিগ্রিরও। বর্তমানের মতো তখন আর এমবিবিএস ডিগ্রিকে গুরুত্বহীন মনে করার অবকাশ কমে যাবে। এমবিবিএস পাস করার পর সবাইকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

দেশে রেফারেল পদ্ধতি চালু করতে হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি এমবিবিএস ডিগ্রির মান নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে যে শতাধিক মেডিকেল কলেজ রয়েছে, সবগুলোর শিক্ষার মান সমান কিংবা কাছাকাছি নয়। অনেক মেডিকেল কলেজ তো করা হল, এখন এগুলোর শিক্ষার মান নিশ্চিত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ডাক্তারকে কেন্দ্র করেই যেহেতু রেফারেল সিস্টেমের চিকিৎসাসেবা প্রদান আবর্তিত হয়, সেহেতু এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারকে দক্ষ হিসেবেই গড়ে তুলতে হবে। ডাক্তারের চিকিৎসাসংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ডকেই নিয়মিত তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। নিয়মিত তাদের প্রেসক্রিপশন অডিট করতে হবে যাতে ডাক্তারের পক্ষে কোনোরকমের ম্যালপ্রাক্টিস করার অবকাশ না থাকে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি রেফারেল সিস্টেমের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাহলে তা বাস্তবায়নে পৃথিবীর বহু দেশ থেকেই সহায়তা পাওয়া যাবে। নতুন করে খুব বেশি কিছু তৈরি করতে হবে না।

স্বাস্থ্যখাতে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সংকট থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশী জনগণ। যদিও বাংলাদেশের প্রচলিত মিথ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাত মানে শুধু ডাক্তার। জনগণের আচরণ দেখে মনে হয়, ডাক্তারের কাছে কোনো মতে হাজির হতে পারলেই হল, ডাক্তার যে কোনো রোগীকেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করতে পারবেন।

এমনকি মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসা প্রদান সত্ত্বেও যদি রোগীর মৃত্যু হয়, তাও ডাক্তারের দোষ। ইদানীং আবার চালু হয়েছে ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’র মতো ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ। পরিস্থিতি জটিল করতে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আরও যোগ হয়েছে গ্রাম-গঞ্জে-মফস্বলে হাতুড়ে ডাক্তার এবং নানারকমের ডিগ্রিধারী ভুয়া ডাক্তার।

এদের ভুল চিকিৎসার খপ্পরে পড়ে অসংখ্য রোগীর জীবন বিপন্ন হয়, রোগকে জটিলতর করে এসব রোগী যখন প্রকৃত ডাক্তারের কাছে আসে, ততক্ষণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেক দেরি হয়ে যায়। ডাক্তারের তখন চিকিৎসা করার তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। এই বাস্তবতার পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় বাজেট, চিকিৎসা ও ওষুধ সামগ্রী এবং অনুকূল পরিবেশ না থাকলে ডাক্তারদের পক্ষেও সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রদান যে কষ্টসাধ্য- এই বোধটা এখনও সাধারণ জনগণের ভেতরে সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

বরং স্বাস্থ্য খাতের যে কোনো সীমাবদ্ধতার জন্য অভিযোগের আঙুল ডাক্তারের দিকেই উত্তোলিত হয়। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও তা সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ও ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ এবং জনবল নিয়োগসহ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা তো প্রধানত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, ঢালাওভাবে ডাক্তারদের নয়। এই সত্য কেন আমরা এড়িয়ে যেতে চাই?

আমার ধারণা, ২০৪১ সালে দেশে প্রতি এক হাজার জন মানুষের জন্য ন্যূনতম একজন ডাক্তার থাকবে। তবে শুধু পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার থাকলেই হবে না, সেই সঙ্গে আনুপাতিক হারে নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদেরও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশে বর্তমানে ডাক্তারের চেয়ে নার্সদের সংখ্যা কম। অথচ এর উল্টো হওয়ার কথা ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিজন ডাক্তারের জন্য তিনজন নার্স থাকা আবশ্যক। চিকিৎসার মতো নার্সিংও যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পেশা, সেটাকেও আমাদের অনুধাবন করতে হবে।

চিকিৎসাসেবাকে যদি একটি দলগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়, সে ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক হবেন দলনেতা আর সে দলের সদস্য হবেন নার্স, প্যারামেডিক্স, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে ওয়ার্ডবয়, সুইপার পর্যন্ত। রোগীর সুচিকিৎসার স্বার্থে সেবা প্রদানকারী এই দলের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় গড়ে ওঠা জরুরি।

বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এই বিস্ময় যাত্রা যদি কাঙ্ক্ষিত গতিতে অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে। উন্নত দেশ হতে হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতেরও টেকসই উন্নয়ন হতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের যথাযথ উন্নয়ন ছাড়া উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশের নাম লেখানোর প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন : কবি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস

[email protected]

 

দেশে কতজন ডাক্তার প্রয়োজন?

 ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন 
১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন
লেথক: অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

দেশে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে নিবন্ধনকৃত আনুমানিক সত্তর হাজার এমবিবিএস পাস করা ডাক্তার সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত। তার মধ্যে ক্যাডার-নন-ক্যাডার মিলিয়ে প্রায় ত্রিশ হাজার ডাক্তার সরকারি পর্যায়ে কাজ করছেন।

বর্তমানে শতাধিক মেডিকেল কলেজ থেকে প্রতি বছর প্রায় দশ হাজার ছাত্রছাত্রী ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে কোনো দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার থাকা উচিত।

জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশসহ ৪৪ শতাংশ দেশে এখনও জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তারের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ২ হাজার ৫শ’ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এই মুহূর্তে আমাদের কমপক্ষে দেড় লাখ ডাক্তার থাকা দরকার ছিল।

আমাদের দেশে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে চাকরি বলতে এখনও সরকারি চাকরিই বুঝি। পাস করার পর অধিকাংশ ডাক্তারের স্বপ্ন থাকে বিসিএস পাস করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার।

কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় পদ স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ ডাক্তারেরই এই স্বপ্ন আজকাল অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সরকারি ডাক্তারের চেয়ে দেশে এখন বেসরকারি ডাক্তারের সংখ্যা বেশি। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ডাক্তারের সংখ্যা দিন দিন আরও বাড়বে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় এই বিশাল বেসরকারি চিকিৎসকদের কীভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবতে হবে।

বর্তমানে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক ধরনের হযবরল অবস্থা বিরাজমান। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা শহরে একজন নবীন বেসরকারি ডাক্তারের চেয়ে একজন রিকশাওয়ালার মাসিক আয় তুলনামূলকভাবে বেশি। আমি জানি না, এই দুঃসহ বাস্তবতা আমাদের নীতিনির্ধারক কিংবা পেশাজীবী নেতাদের আদৌ ব্যথিত করে কিনা! বাংলাদেশে একজন গার্মেন্টস কর্মীর ন্যূনতম বেতন নির্ধারিত থাকলেও একজন নবীন ডাক্তারের ক্ষেত্রে তা নেই। দালাল পরিবেষ্টিত ক্লিনিক ব্যবসায় মুনাফার লোভে মালিকরাও যে যার মতো পারছে নবীন ডাক্তারদের পারিশ্রমিক প্রদানের বেলায় ঠকাচ্ছে। এসব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দেখার যেন কেউ নেই।

উন্নত বিশ্বে রেফারেল সিস্টেম চালু আছে। ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা ছাড়া যে কোনো অসুখের জন্য রোগীকে প্রথমে একজন সাধারণ এমবিবিএস পাস করা বা সমমানের কোনো ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।

এই ডাক্তারদের সাধারণত জেনারেল প্রাক্টিশনার বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বলা হয়। এরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যদি মনে করেন রোগীর উন্নত মানের চিকিৎসা লাগবে, তাহলেই কেবল তারা রোগীকে প্রয়োজনীয় বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠান বা রেফার করেন। আমাদের দেশের মতো সামান্য সর্দি-কাশি বা ঠাণ্ডাজ্বর হলেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে সরাসরি চলে যাওয়ার সুযোগ সেখানে নেই।

এর ফলে জেনারেল প্রাক্টিশনাররা যেমন সাধারণ রোগীদের দেখার সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররাও অপ্রয়োজনীয় রোগী দেখে সময় নষ্ট না করে জটিল রোগীদের অধিক মনোযোগ সহকারে দেখতে পারেন। এর ফলে ডাক্তারদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপ্তিও বাড়ে। আমাদের দেশেও এ ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। তাহলে এখন যেমন ডাক্তারদের মধ্যে এফসিপিএস, এমডি, এমএসসহ বিভিন্ন ধরনের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করার জন্য এক ধরনের অসুস্থ উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে, সেটি তখন অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

গুরুত্ব বাড়বে এমবিবিএস ডিগ্রিরও। বর্তমানের মতো তখন আর এমবিবিএস ডিগ্রিকে গুরুত্বহীন মনে করার অবকাশ কমে যাবে। এমবিবিএস পাস করার পর সবাইকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

দেশে রেফারেল পদ্ধতি চালু করতে হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি এমবিবিএস ডিগ্রির মান নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে যে শতাধিক মেডিকেল কলেজ রয়েছে, সবগুলোর শিক্ষার মান সমান কিংবা কাছাকাছি নয়। অনেক মেডিকেল কলেজ তো করা হল, এখন এগুলোর শিক্ষার মান নিশ্চিত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ডাক্তারকে কেন্দ্র করেই যেহেতু রেফারেল সিস্টেমের চিকিৎসাসেবা প্রদান আবর্তিত হয়, সেহেতু এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারকে দক্ষ হিসেবেই গড়ে তুলতে হবে। ডাক্তারের চিকিৎসাসংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ডকেই নিয়মিত তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। নিয়মিত তাদের প্রেসক্রিপশন অডিট করতে হবে যাতে ডাক্তারের পক্ষে কোনোরকমের ম্যালপ্রাক্টিস করার অবকাশ না থাকে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি রেফারেল সিস্টেমের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাহলে তা বাস্তবায়নে পৃথিবীর বহু দেশ থেকেই সহায়তা পাওয়া যাবে। নতুন করে খুব বেশি কিছু তৈরি করতে হবে না।

স্বাস্থ্যখাতে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সংকট থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশী জনগণ। যদিও বাংলাদেশের প্রচলিত মিথ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাত মানে শুধু ডাক্তার। জনগণের আচরণ দেখে মনে হয়, ডাক্তারের কাছে কোনো মতে হাজির হতে পারলেই হল, ডাক্তার যে কোনো রোগীকেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করতে পারবেন।

এমনকি মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসা প্রদান সত্ত্বেও যদি রোগীর মৃত্যু হয়, তাও ডাক্তারের দোষ। ইদানীং আবার চালু হয়েছে ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’র মতো ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ। পরিস্থিতি জটিল করতে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আরও যোগ হয়েছে গ্রাম-গঞ্জে-মফস্বলে হাতুড়ে ডাক্তার এবং নানারকমের ডিগ্রিধারী ভুয়া ডাক্তার।

এদের ভুল চিকিৎসার খপ্পরে পড়ে অসংখ্য রোগীর জীবন বিপন্ন হয়, রোগকে জটিলতর করে এসব রোগী যখন প্রকৃত ডাক্তারের কাছে আসে, ততক্ষণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেক দেরি হয়ে যায়। ডাক্তারের তখন চিকিৎসা করার তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। এই বাস্তবতার পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় বাজেট, চিকিৎসা ও ওষুধ সামগ্রী এবং অনুকূল পরিবেশ না থাকলে ডাক্তারদের পক্ষেও সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রদান যে কষ্টসাধ্য- এই বোধটা এখনও সাধারণ জনগণের ভেতরে সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

বরং স্বাস্থ্য খাতের যে কোনো সীমাবদ্ধতার জন্য অভিযোগের আঙুল ডাক্তারের দিকেই উত্তোলিত হয়। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও তা সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ও ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ এবং জনবল নিয়োগসহ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা তো প্রধানত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, ঢালাওভাবে ডাক্তারদের নয়। এই সত্য কেন আমরা এড়িয়ে যেতে চাই?

আমার ধারণা, ২০৪১ সালে দেশে প্রতি এক হাজার জন মানুষের জন্য ন্যূনতম একজন ডাক্তার থাকবে। তবে শুধু পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার থাকলেই হবে না, সেই সঙ্গে আনুপাতিক হারে নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদেরও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশে বর্তমানে ডাক্তারের চেয়ে নার্সদের সংখ্যা কম। অথচ এর উল্টো হওয়ার কথা ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিজন ডাক্তারের জন্য তিনজন নার্স থাকা আবশ্যক। চিকিৎসার মতো নার্সিংও যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পেশা, সেটাকেও আমাদের অনুধাবন করতে হবে।

চিকিৎসাসেবাকে যদি একটি দলগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়, সে ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক হবেন দলনেতা আর সে দলের সদস্য হবেন নার্স, প্যারামেডিক্স, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে ওয়ার্ডবয়, সুইপার পর্যন্ত। রোগীর সুচিকিৎসার স্বার্থে সেবা প্রদানকারী এই দলের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় গড়ে ওঠা জরুরি।

বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এই বিস্ময় যাত্রা যদি কাঙ্ক্ষিত গতিতে অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে। উন্নত দেশ হতে হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতেরও টেকসই উন্নয়ন হতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের যথাযথ উন্নয়ন ছাড়া উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশের নাম লেখানোর প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন : কবি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস

[email protected]